সিডনি শেলডন: সেই মানুষ, যিনি প্রমাণ করেছেন পঞ্চাশ বছর বয়সেও নতুন করে শুরু করা যায়
সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত লেখক

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবনী নিজেই এক উপন্যাসের মতো। তারা কেবল গল্প লেখেন না, তাদের জীবনটাই হয়ে ওঠে এক গল্প — সংগ্রাম, ব্যর্থতা, উত্থান আর অসম্ভব সাফল্যের গল্প। সিডনি শেলডন ঠিক তেমনই একজন মানুষ। তিনি ছিলেন একাডেমি অ্যাওয়ার্ড, টনি অ্যাওয়ার্ড আর এমি অ্যাওয়ার্ড — এই তিনটি পুরস্কারই জেতা একমাত্র লেখক । কিন্তু এই সাফল্যের পিছনে লুকিয়ে ছিল এক নির্মম শৈশব, এক যন্ত্রণাদায়ক মানসিক রোগ, আর পঞ্চাশ বছর বয়সে এসে সম্পূর্ণ নতুন এক পেশায় হাত দেওয়ার সাহস।
শিকাগোর সেই দরিদ্র ছেলেটি: সতেরো বছর বয়সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা
১৯১৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি শিকাগোর এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সিডনি শেলডন । তার বাবা ছিলেন একজন সেলসম্যান, আর তার বাবা-মা দুজনেই পড়াশোনা করেছিলেন মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত । সেই পরিবারে বই পড়ুয়া সিডনি ছিলেন এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম — এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব তাকে ঘিরে রাখত সবসময়।
তার শৈশব ছিল বিষণ্ণতায় ভরা। তার নিজের স্মৃতিকথা দ্য আদার সাইড অফ মি-এর শুরুতেই তিনি লিখেছেন: "সতেরো বছর বয়সে, শিকাগোর আফ্রেমো ফার্মেসিতে ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ করা ছিল এক নিখুঁত চাকরি, কারণ সেটা আমাকে যথেষ্ট ঘুমের ওষুধ চুরি করে আত্মহত্যা করার সুযোগ দিত" । এই একটি বাক্যই তার যৌবনের যন্ত্রণার গভীরতা প্রকাশ করে।
তিনি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি পেয়ে ভর্তি হন, কিন্তু মহামন্দার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি । তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়ে ম্যানহাটনে চলে যান গান লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে, কিন্তু সেখানেও সাফল্য আসেনি। এরপর তিনি পশ্চিম উপকূলে যান এবং ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে স্ক্রিপ্ট রিডার হিসেবে চাকরি পান ।
হলিউড, ব্রডওয়ে, টেলিভিশন: তিন জগতের রাজা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সেনাবাহিনীর বিমান বাহিনীতে পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন, কিন্তু চিকিৎসা কারণে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় । যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি ব্রডওয়ের জন্য মিউজিক্যাল ও কমেডি লেখা শুরু করেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তার তিনটি মিউজিক্যাল একসাথে ব্রডওয়েতে চলছিল ।
১৯৪৭ সালে তিনি দ্য ব্যাচেলর অ্যান্ড দ্য ববি-সক্সার চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের জন্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জেতেন । ১৯৫৯ সালে রেডহেড মিউজিক্যালের জন্য টনি অ্যাওয়ার্ড পান । এরপর তিনি টেলিভিশনে যান এবং দ্য প্যাটি ডিউক শো, আই ড্রিম অফ জিনি, হার্ট টু হার্ট-এর মতো সিরিজ তৈরি করেন । তিনি টানা পাঁচ বছর এমি অ্যাওয়ার্ড জেতেন । এভাবে তিনি হলিউড, ব্রডওয়ে আর টেলিভিশন — এই তিন জগতেই সফলতার শীর্ষে পৌঁছে যান।
পঞ্চাশ বছর বয়সে নতুন শুরু: দ্য নেকেড ফেস থেকে দ্য আদার সাইড অফ মিডনাইট
কিন্তু শেলডনের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে সেই বয়সে, যখন অনেক মানুষ অবসরের কথা ভাবেন। ১৯৭০ সালে, ৫৩ বছর বয়সে, তিনি প্রকাশ করেন তার প্রথম উপন্যাস দ্য নেকেড ফেস । বইটি সমালোচকদের কাছে নাকচ হয়েছিল, কিন্তু হার্ডকভারে ২১,০০০ কপি বিক্রি হয়, আর পেপারব্যাকে তা explode করে ৩১ লক্ষ কপি বিক্রি হয় । নিউ ইয়র্ক টাইমস এটিকে বছরের সেরা রহস্য উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ।
এরপর আসে দ্য আদার সাইড অফ মিডনাইট (১৯৭৪), যা তাকে রাতারাতি বিশ্বখ্যাত বেস্টসেলার লেখকে পরিণত করে । এরপর একের পর এক আসে আ স্ট্রেঞ্জার ইন দ্য মিরর (১৯৭৬), রেজ অফ অ্যাঞ্জেলস (১৯৮০), মাস্টার অফ দ্য গেম (১৯৮২), ইফ টুমরো কামস (১৯৮৫), উইন্ডমিলস অফ দ্য গডস, দ্য স্যান্ডস অফ টাইম, দ্য ডুমসডে কনস্পিরেসি, নাথিং লাস্টস ফর এভার, টেল মি ইয়োর ড্রিমস — প্রতিটি বই বেস্টসেলার ।
যে বইগুলো বাংলা ভাষায় পাঠকের হৃদয় জিতেছে
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে সিডনি শেলডন সমান জনপ্রিয়। তার অনেক বই বাংলায় অনূদিত হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুবাদক অনীশ দাস অপু । দ্য আদার সাইড অফ মিডনাইট বাংলায় অনূদিত হয়েছে দ্য আদার সাইড অভ মিডনাইট নামে, যা প্রকাশিত হয়েছে অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে ২০০৮ সালে । মাস্টার অফ দ্য গেম-এর বাংলা অনুবাদ পাঠকদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় যে একজন পাঠক এটিকে বলেছেন "রোলার কোস্টার" । ইফ টুমরো কামস-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন অনীশ দাস অপু, যেখানে প্রধান চরিত্র ট্রেসি হুইনির প্রতিশোধ আর প্রতারণার গল্প পাঠকদের মুগ্ধ করে । মেমোরিজ অফ মিডনাইট, দ্য স্যান্ডস অফ টাইম, ব্লাড লাইন, নাথিং লাস্টস ফর এভার — এই সব বই বাংলায় পাওয়া যায় ।
লেখার পদ্ধতি: মুখে বলে বলে উপন্যাস লেখা
শেলডনের লেখার পদ্ধতি ছিল একেবারে অনন্য। তিনি টাইপরাইটার বা কম্পিউটার ব্যবহার করতেন না। তিনি তার সেক্রেটারিকে দিনে ৫০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মুখে বলে বলে লিখিয়ে নিতেন, আর পরদিন সেটা সংশোধন করতেন । এই পদ্ধতিতে তিনি প্রতি বছর একটি উপন্যাস লিখতেন — এই ধারাবাহিকতা তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন।
তার লেখার সূত্র ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। একটি সিডনি শেলডন উপন্যাসে সাধারণত থাকত: হতবাক করা সুন্দরী নারী, চৌকস নায়ক আর নিষ্ঠুর খলনায়ক; খ্যাতি, ভাগ্য আর ষড়যন্ত্র; পেন্টহাউস, ভিলা আর জেট ভ্রমণ; ধর্ষণ, খুন আর আত্মহত্যা; রহস্যময় দুর্ঘটনা আর নিখোঁজ হওয়া; আন্তর্জাতিক কার্টেল আর গুপ্তচর; জোরপূর্বক বিবাহ আর স্মৃতিভ্রংশ; আর প্রচুর পরিমাণে প্রতিশোধ ।
গিনেস রেকর্ড: বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনূদিত লেখক
শেলডনের সবচেয়ে বড় রেকর্ড সম্ভবত তার অনূদিত হওয়ার সংখ্যা। তার বই ৫১টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ১৮১টি দেশে প্রকাশিত হয়েছে । ১৯৯৭ সালে গিনেস বুক অফ রেকর্ডস তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনূদিত লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । তার বই বিক্রি হয়েছে ৩০ কোটিরও বেশি কপি । তিনি সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত কথাসাহিত্যিকদের তালিকায় সপ্তম স্থানে আছেন ।
মানসিক রোগের সাথে সারাজীবনের লড়াই
শেলডনের জীবনের সবচেয়ে কম আলোচিত অধ্যায় সম্ভবত তার ম্যানিক ডিপ্রেশন বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের সাথে সারাজীবনের লড়াই । তিনি ২০০৫ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথা দ্য আদার সাইড অফ মি-তে এই রোগ নিয়ে খোলাখুলি লিখেছেন। সতেরো বছর বয়সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সারা জীবনের ওঠানামা — এই রোগ তাকে কখনো ছাড়েনি। কিন্তু তিনি কখনো সেটাকে তার সাফল্যের পথে বাধা হতে দেননি।
শেষ দিন পর্যন্ত সক্রিয়
২০০৭ সালের ৩০ জানুয়ারি, ৮৯ বছর বয়সে, ক্যালিফোর্নিয়ার রাঞ্চো মিরাজে নিউমোনিয়ার জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন সিডনি শেলডন । মৃত্যুর সময় তার পাশে ছিলেন তার স্ত্রী আলেকজান্দ্রা এবং কন্যা মেরি শেলডন । তার পাবলিসিস্ট ওয়ারেন কাউয়ান বলেছিলেন: "তিনি ছিলেন একজন সুন্দর মানুষ এবং সুন্দর বন্ধু। আমি ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তার বন্ধু এবং পাবলিসিস্ট ছিলাম। আমি কখনো কাউকে তার সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে শুনিনি" ।
শেষ বিচারে
সিডনি শেলডন মানে কেবল কিছু থ্রিলার উপন্যাস নয়। তিনি মানে সেই মানুষ, যিনি সতেরো বছর বয়সে আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু পঞ্চাশ বছর বয়সে এসে দেখিয়ে দিয়েছিলেন নতুন করে শুরু করার সাহস কী। তিনি মানে সেই কণ্ঠস্বর, যিনি প্রমাণ করেছেন বয়স কেবল একটা সংখ্যা, আর সাফল্যের কোনো সময়সীমা নেই। তিনি মানে সেই প্রতিভা, যিনি একাডেমি, টনি আর এমি — তিনটিই জিতেছেন, আর তারপরও থামেননি, বরং পঞ্চাশ বছর বয়সে নতুন এক জগতে পা রেখে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনূদিত লেখক হয়েছেন।
সিডনি শেলডন কোনো এক দেশের, এক যুগের, এক ভাষার লেখক নন — তিনি সমগ্র মানবজাতির সেই স্বপ্নদ্রষ্টাদের প্রতিনিধি, যারা জানে, জীবনের যেকোনো সময়ে নতুন শুরু করা যায়, আর সেই নতুন শুরু যদি সঠিক হয়, তাহলে সেটা ইতিহাস বদলে দিতে পারে।
আর. এল. স্টাইন: সেই মানুষ, যিনি কোটি কোটি শিশুকে ভয় পাওয়ার আনন্দ শিখিয়েছিলেন
পরবর্তীশিক্ষকদের প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষতা অর্জনের আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
