আর. এল. স্টাইন: সেই মানুষ, যিনি কোটি কোটি শিশুকে ভয় পাওয়ার আনন্দ শিখিয়েছিলেন
সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত লেখক

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের নাম শুনলেই একটা নির্দিষ্ট অনুভূতি জাগে — গা শিউরে ওঠা, পিছনে তাকানোর ইচ্ছা, অথচ বইটা বন্ধ করতে না পারা। আর. এল. স্টাইন ঠিক তেমনই একজন। তাকে বলা হয় "শিশুসাহিত্যের স্টিফেন কিং" । তিনি লিখেছেন শতাধিক ভৌতিক উপন্যাস, যার মধ্যে রয়েছে গুজবাম্পস, ফিয়ার স্ট্রিট, মোস্টলি ঘোস্টলি, দ্য নাইটমেয়ার রুম আর রটেন স্কুল সিরিজ । ২০০৮ সাল নাগাদ তার বই বিক্রি হয়েছে ৪০ কোটিরও বেশি কপি । কিন্তু সংখ্যা কখনোই স্টাইনের আসল উত্তরাধিকার ছিল না। তার আসল উত্তরাধিকার হলো এই — তিনি প্রমাণ করেছেন ভয় পাওয়াটাও একটা আনন্দ, যদি সেটা সঠিকভাবে বলা হয়।
ওহাইওর সেই ছেলেটি: নয় বছর বয়সে টাইপরাইটারে হাত
১৯৪৩ সালের ৮ অক্টোবর ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কলম্বাসে জন্মগ্রহণ করেন রবার্ট লরেন্স স্টাইন । তার বাবা ছিলেন লুইস স্টাইন, মা অ্যানি ফাইনস্টাইন । ছোটবেলা থেকেই স্টাইন ছিলেন এক অদ্ভুত মিশ্রণ — একদিকে তিনি ছিলেন লাজুক, অন্তর্মুখী; অন্যদিকে তিনি ছিলেন মজার, রসিক। এই দুই বৈপরীত্যই পরবর্তীকালে তার লেখার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াবে।
তার লেখক জীবনের শুরুটা হয়েছিল ভয়ের গল্প দিয়ে নয়, বরং হাসির গল্প দিয়ে। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি পুরনো টাইপরাইটারে গল্প লেখা শুরু করেন । ১৯৬৫ সালে ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি নিউইয়র্কে চলে যান । সেখানে তিনি "জোভিয়াল বব স্টাইন" ছদ্মনামে ডজনখানেক হাসির বই আর মজার গল্পের বই লেখেন, যার মধ্যে আছে হাউ টু বি ফানি, ১০১ সিলি মনস্টার জোকস, আর বোজোস অন পেট্রোল । তিনি ব্যানানাস নামের একটি হাস্যরসাত্মক ম্যাগাজিনও তৈরি করেন, যা তিনি দশ বছর ধরে চালিয়েছিলেন ।
ভয়ের জগতে প্রবেশ: ব্লাইন্ড ডেট থেকে ফিয়ার স্ট্রিট
১৯৮৬ সালে স্টাইন তার প্রথম কিশোর ভৌতিক উপন্যাস ব্লাইন্ড ডেট প্রকাশ করেন, ছদ্মনাম আর. এল. স্টাইন ব্যবহার করে । এরপর আসে বিচ হাউস, হিট অ্যান্ড রান, দ্য বেবিসিটার, দ্য গার্লফ্রেন্ড । কিন্তু তার প্রকৃত খ্যাতি শুরু হয় ১৯৮৯ সালে, যখন তিনি ফিয়ার স্ট্রিট সিরিজ চালু করেন । এই সিরিজটি টিনএজ পাঠকদের মধ্যে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরে নেটফ্লিক্সে চারটি ফিচার ফিল্মের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায় ।
গুজবাম্পস: যে সিরিজ কোটি কোটি শিশুর শৈশব বদলে দিল
কিন্তু স্টাইনের সবচেয়ে বড় সৃষ্টি আসে ১৯৯২ সালে — গুজবাম্পস । এই সিরিজটি প্রথমে শিশুদের জন্য লেখা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সারা পৃথিবীর কোটি কোটি শিশুর প্রিয় হয়ে ওঠে। গুজবাম্পস আজ পর্যন্ত ৩২টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এর ৪০ কোটিরও বেশি কপি মুদ্রিত হয়েছে ।
গুজবাম্পস সিরিজের কেন্দ্রে আছে এক অনন্য ধারণা — প্রতিটি বইয়ের মূল চরিত্র সাধারণ শিশুরা, যারা হঠাৎ করেই অলৌকিক, ভয়ংকর বা অদ্ভুত কোনো ঘটনার মুখোমুখি হয়। কোনো বইয়ে থাকে স্ল্যাপি নামের ডামি, যে নিজে থেকে কথা বলে আর মানুষকে ভয় দেখায় । কোনো বইয়ে থাকে মনস্টার ব্লাড, যা ভুলবশত খেয়ে ফেললে মানুষ দানবে পরিণত হয় । কোনো বইয়ে থাকে দ্য হন্টেড মাস্ক, যা পরলে মানুষ বদলে যায় ।
স্টাইনের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিনি জানেন শিশুরা ভয়কে কীভাবে উপভোগ করে। তার বইয়ের ভয় কখনো এতটা সহিংস বা রক্তাক্ত নয় যে শিশুদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। বরং তা ঠিক ততটাই ভয়ংকর, যতটা একটি রোলারকোস্টার রাইডের সময় হাত ছেড়ে দিলে লাগে — উত্তেজনাময়, কিন্তু নিরাপদ।
বাংলা ভাষায় স্টাইন: গুজবাম্পস থেকে দ্য স্ল্যাপি
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছেও স্টাইন সমান জনপ্রিয়। রকমারি.কম, বইবাজার.কম, বইশালা-র মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তার গুজবাম্পস বই পাওয়া যায়, যা প্রজন্ম পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত । একদল শিশু — জ্যাক, হেনা, স্টাইন আর চ্যাম্প — যারা ভুলবশত স্টাইনের মূল পাণ্ডুলিপি থেকে দানবগুলোকে মুক্ত করে ফেলে, আর সেই দানবগুলো শহরজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে শুরু করে । তাদের থামাতে হলে আগে থামাতে হবে স্ল্যাপি-কে, যে সবচেয়ে বিপজ্জনক আর সবচেয়ে ধূর্ত ।
লেখার পদ্ধতি: প্রথমে টুইস্ট, তারপর গল্প
স্টাইনের লেখার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। তিনি একবার বলেছিলেন, তার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শেষের টুইস্ট — সেই চমকপ্রদ মোচড়, যা পাঠককে শেষ পাতায় পৌঁছে চমকে দেয়। তিনি প্রথমে সেই টুইস্টটা ঠিক করতেন, তারপর সেটার দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য গোটা গল্পটা বুনতেন। এই পদ্ধতিই তাকে "গুজবাম্পস"-এর প্রতি বইকে এতটা আসক্তিপূর্ণ করে তুলেছে — পাঠক জানেন শেষে চমক আছে, কিন্তু কী চমক, সেটা জানার জন্য তাকে শেষ পাতা পর্যন্ত পড়তেই হবে।
স্বীকৃতি ও পুরস্কার
স্টাইনের কেরিয়ার জুড়ে তিনি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি তিনবার নিকেলোডিয়ন কিডস চয়েস অ্যাওয়ার্ড এবং তিনবার ডিজনি অ্যাডভেঞ্চারস কিডস চয়েস অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন । ২০০৭ সালে তিনি থ্রিলার রাইটার্স অফ আমেরিকার সিলভার বুলেট অ্যাওয়ার্ড পান । ২০২৪ সালে তিনি মিস্ট্রি রাইটার্স অফ আমেরিকার গ্র্যান্ড মাস্টার অ্যাওয়ার্ড পান ।
শেষ বিচারে
আর. এল. স্টাইন মানে কেবল কিছু ভৌতিক উপন্যাস নয়। তিনি মানে সেই মানুষ, যিনি নয় বছর বয়সে টাইপরাইটারে হাত দিয়েছিলেন, যিনি প্রথমে হাসির বই লিখতেন, তারপর আবিষ্কার করেছিলেন ভয় আর হাসির মধ্যে গভীর এক সম্পর্ক। তিনি মানে সেই কণ্ঠস্বর, যিনি কোটি কোটি শিশুকে শিখিয়েছেন ভয় পাওয়া মানে দুর্বলতা নয় — ভয় পাওয়া মানে বেঁচে থাকা, আর সেই বেঁচে থাকার আনন্দটাই সবচেয়ে বড়।
স্টাইন কোনো এক দেশের, এক যুগের, এক ভাষার লেখক নন — তিনি সমগ্র মানবজাতির সেই শিশুদের প্রতিনিধি, যারা অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে ভয়কে স্পর্শ করতে চায়, কিন্তু জানে যে আলো জ্বালানোর শক্তিটাও তাদের হাতেই আছে। তিনি "শিশুসাহিত্যের স্টিফেন কিং" — কারণ তিনিও প্রমাণ করেছেন, ভয়কে ভাষা দিতে পারলে কোটি কোটি পাঠক তা পড়তে চায়, আর সেই পাঠক যদি শিশু হয়, তাহলে সেই দায়িত্ব আরও বেশি।
ডিন কুন্টজ: সেই মানুষ, যিনি ভয়কে একা রাখেননি — তার সাথে নিয়ে গেছেন আশার আলোও
পরবর্তীসিডনি শেলডন: সেই মানুষ, যিনি প্রমাণ করেছেন পঞ্চাশ বছর বয়সেও নতুন করে শুরু করা যায়
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
