রাশিয়ায় ‘প্লেগ আতঙ্ক’: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

রাশিয়ার সাইবেরিয়ার ইরকুতস্ক অঞ্চলে একটি অ্যান্টি-প্লেগ গবেষণাগারের এক কর্মীর মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ২৮ বছর বয়সী গবেষণাগারকর্মী দারিয়া শিপিলোভা সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও তাঁর এক বন্ধু জানিয়েছে। রাশিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, তিনি অজ্ঞাত কারণে হওয়া নিউমোনিয়ায় মারা গেছেন। তবে তাঁর কর্মস্থল ছিল একটি প্লেগ গবেষণাগার এবং মৃত্যুর পর তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা ও হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কী থেকে শুরু হলো উদ্বেগ?
২ অক্টোবর ইরকুতস্কের গভর্নর ইগর কোবজেভ জানান, রাশিয়ার স্বাস্থ্য নজরদারি সংস্থা রসপোট্রেবনাদজর ওই অঞ্চলে ‘বিশেষভাবে বিপজ্জনক সংক্রমণ’-এর সম্ভাব্য একটি ঘটনা নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছে। তিনি সরাসরি প্লেগের কথা বলেননি। তবে প্রতিবেশী বুরিয়াতিয়ার গভর্নর আলেক্সেই সিডেনভ প্রথমে দাবি করেন, ওই নারী প্লেগে মারা গেছেন। পরে তাঁর বক্তব্য পরিবর্তন করে বলা হয়, তিনি ‘সম্ভবত’ প্লেগে মারা গেছেন।
রাশিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ অবশ্য প্লেগের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ওই নারী অজ্ঞাত কারণে হওয়া নিউমোনিয়ায় মারা গেছেন এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে কর্মস্থলের কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইরকুতস্কে কী ধরনের সতর্কতা নেওয়া হয়েছে?
ঘটনার পর ইরকুতস্কের একটি অ্যান্টি-প্লেগ গবেষণাগারের প্রায় ৬০ কর্মীকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কয়েকটি হাসপাতালেও অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, হাসপাতালে যাওয়ার সময় তাঁর তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হয়, মাস্ক পরতে বলা হয় এবং হাত জীবাণুমুক্ত করার পাশাপাশি দুটি প্রশ্নপত্র পূরণ করতে হয়। এর একটির শিরোনাম ছিল ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক সংক্রামক রোগ প্লেগের সন্দেহে চেকলিস্ট’। সেখানে উচ্চ জ্বর ও বুকে ব্যথার মতো উপসর্গের কথা উল্লেখ ছিল।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। কোথাও কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হলেও রাস্তাঘাটে ব্যাপক অস্থিরতার খবর পাওয়া যায়নি।
রাশিয়া কী বলছে?
রাশিয়ার স্বাস্থ্য নজরদারি সংস্থা জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং সাধারণ মানুষের জন্য কোনো মহামারি ঝুঁকি নেই। সংস্থাটি জানিয়েছে, মৃত নারীর সংস্পর্শে আসা ৯০ শতাংশের বেশি ব্যক্তির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ শেষ হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে কোনো ‘বিপজ্জনক’ রোগজীবাণু পাওয়া যায়নি।
ক্রেমলিনও মানুষকে গুজব বা অনুমানের পরিবর্তে সরকারি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সীমিত থাকায় সন্দেহ ও জল্পনা পুরোপুরি থামেনি।
WHO কী বলেছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনাটি যাচাই করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত পাওয়া অনানুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী সাধারণ মানুষের জন্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি কম বলেই মনে হচ্ছে।
WHO প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস জানিয়েছেন, রাশিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে যে ইরকুতস্ক অঞ্চলে সম্প্রতি কোনো প্লেগের ঘটনা নিবন্ধিত হয়নি। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত, পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে উচ্চঝুঁকির কোনো রোগজীবাণু পাওয়া যায়নি।
তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত আরেকজন কর্মীর ‘অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়া’ আক্রান্ত হওয়ার খবর নিয়েও WHO রাশিয়ার কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। দ্বিতীয় সংক্রমণের বিষয়টি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
অন্য দেশগুলো কেন সতর্ক?
রাশিয়ার আশ্বাস সত্ত্বেও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান সীমান্তে কোয়ারেন্টাইন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করেছে। উজবেকিস্তান জানিয়েছে, উচ্চসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতি বাড়ানো হয়েছে।
তবে চীন এখন পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্তে অতিরিক্ত কোনো বড় ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। ইরকুতস্ক থেকে চীনের ফ্লাইটও বাতিল হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
কেন ওই গবেষণাগারে প্লেগ নিয়ে গবেষণা হয়?
ইরকুতস্ক রিসার্চ অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউট সাইবেরিয়া ও রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য অঞ্চলে উচ্চঝুঁকির সংক্রামক রোগ পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৩৪ সালে প্লেগ মোকাবিলার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
প্লেগের কারণ Yersinia pestis নামের একটি ব্যাকটেরিয়া। রোগটি ইতিহাসে ভয়াবহ মহামারির জন্য পরিচিত হলেও আধুনিক চিকিৎসায় এর চিকিৎসা সম্ভব। তবে ব্যাকটেরিয়াটি এখনো সাইবেরিয়ার কিছু অঞ্চলের বন্যপ্রাণীর মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে ছড়িয়ে আছে। সে কারণেই রাশিয়ার মতো দেশগুলোতে প্লেগ নিয়ে গবেষণা ও নজরদারি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
এই মুহূর্তে রাশিয়ায় নতুন কোনো প্লেগ মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে—এমন প্রমাণ নেই। একজন গবেষণাগারকর্মীর মৃত্যু, তাঁর সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন এবং হাসপাতালগুলোর অতিরিক্ত সতর্কতা উদ্বেগ তৈরি করলেও রুশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও WHO—দুই পক্ষই সাধারণ মানুষের ঝুঁকি কম বলে জানিয়েছে।
তবে ওই নারীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ভাইরাস বা অন্য কোনো রোগজীবাণুর ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন। তদন্ত ও পরীক্ষার ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটিকে নিশ্চিত প্লেগের প্রাদুর্ভাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি এমন একটি ঘটনা, যেখানে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বড় ধরনের সংক্রমণের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর: একাত্তরের ইতিহাস, স্মৃতি ও স্বাধীনতার দলিল
পরবর্তীজাতীয় স্মৃতিসৌধ: সাত জোড়া দেয়ালে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস
সম্পর্কিত সংবাদ
বিজ্ঞান বার্তা
টেকসই জ্বালানির ভবিষ্যৎ: বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও তরুণ গবেষকদের ভূমিকা
বিজ্ঞান বার্তা
মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা শক্তি: কেন ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের জ্বালানি বিশ্ব

বিজ্ঞান বার্তা
কাগজের আবিষ্কার: যে উদ্ভাবন জ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছিল মানুষের ঘরে ঘরে
বিজ্ঞান বার্তা
জিপিএস (GPS): পৃথিবীর যেকোনো জায়গা খুঁজে পেতে যে প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন

বিজ্ঞান বার্তা
স্মার্টফোন: যে আবিষ্কার মানুষের পকেটেই এনে দিয়েছে পুরো পৃথিবী
বিজ্ঞান বার্তা
অ্যারিস্টটল: যে দার্শনিক যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত খুলেছিলেন
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
