জিপিএস (GPS): পৃথিবীর যেকোনো জায়গা খুঁজে পেতে যে প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন
ধরুন, আপনি এমন একটি শহরে গেছেন, যেখানে আগে কখনো যাননি। আশপাশের রাস্তা আপনার পরিচিত নয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর পথও জানা নেই। অথচ হাতে থাকা স্মার্টফোনটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আপনাকে জানিয়ে দিতে পারে আপনি ঠিক কোথায় আছেন, কোন রাস্তা দিয়ে এগোতে হবে এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় লাগতে পারে। এই সুবিধার পেছনে রয়েছে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি—জিপিএস (GPS)।
GPS-এর পূর্ণরূপ Global Positioning System। এটি এমন একটি উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয়ব্যবস্থা, যার সাহায্যে পৃথিবীর প্রায় যেকোনো জায়গায় থাকা কোনো যন্ত্রের অবস্থান, চলাচলের গতি এবং সময় নির্ধারণ করা যায়। আজ স্মার্টফোনে মানচিত্র দেখা, গাড়ির পথ নির্ধারণ, বিমান চলাচল, জাহাজ পরিচালনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলাসহ নানা ক্ষেত্রে GPS গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
GPS কীভাবে কাজ করে?
GPS-এর কার্যক্রম বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহগুলো কীভাবে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থায় পৃথিবীর কক্ষপথে একাধিক উপগ্রহ অবস্থান করছে। এগুলো নিয়মিতভাবে নিজেদের অবস্থান ও সঠিক সময়সংক্রান্ত সংকেত পৃথিবীতে পাঠায়।
আপনার স্মার্টফোন বা GPS রিসিভার সেই সংকেত গ্রহণ করে। সংকেতটি উপগ্রহ থেকে আপনার যন্ত্রে পৌঁছাতে কত সময় লাগল, তা থেকে উপগ্রহটির সঙ্গে যন্ত্রটির আনুমানিক দূরত্ব হিসাব করা যায়। একাধিক উপগ্রহের সংকেত বিশ্লেষণ করে যন্ত্রটি নিজের অবস্থান নির্ণয় করে। সাধারণত সঠিক ত্রিমাত্রিক অবস্থান ও ঘড়ির ত্রুটি নির্ণয়ের জন্য অন্তত চারটি উপগ্রহের সংকেত প্রয়োজন হয়।
এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় trilateration বা দূরত্বের ভিত্তিতে অবস্থান নির্ণয়। এখানে GPS উপগ্রহগুলো সরাসরি আপনার ফোনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আপনার অবস্থান জানতে চায় না। বরং তারা সংকেত পাঠায়, আর আপনার যন্ত্র সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে নিজের অবস্থান হিসাব করে।
GPS ব্যবহারের জন্য সাধারণত ফোনে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ওয়াই-ফাই সংযোগ থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে মানচিত্র ডাউনলোড করা, যানজটের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া কিংবা অনলাইনে গন্তব্য খোঁজার জন্য ইন্টারনেট প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া উঁচু ভবন, ঘন গাছপালা, সুড়ঙ্গ বা ঘরের ভেতরে উপগ্রহের সংকেত দুর্বল হলে অবস্থান নির্ণয়ের নির্ভুলতা কমে যেতে পারে।
GPS-এর জন্ম কীভাবে?
GPS-এর বিকাশ শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে। কৃত্রিম উপগ্রহ ও বেতার প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে উপগ্রহের সংকেত ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ GPS প্রকল্পের উন্নয়ন শুরু করে। প্রাথমিকভাবে এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সামরিক বাহিনীর জন্য আরও নির্ভুল নেভিগেশন বা পথনির্দেশনার ব্যবস্থা তৈরি করা।
১৯৭৮ সালে প্রথম দিকের GPS উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে আরও উপগ্রহ যুক্ত হয় এবং ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা উন্নত করা হয়। ১৯৯০-এর দশকে GPS-এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম গড়ে ওঠে। পরে সাধারণ মানুষের ব্যবহারেও এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
শুরুতে GPS-এর ব্যবহার প্রধানত সামরিক ও বিশেষায়িত ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তী সময়ে বেসামরিক বিমান, জাহাজ, পরিবহন, জরিপকাজ এবং ব্যক্তিগত নেভিগেশনে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্মার্টফোনের বিস্তার GPS-কে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।
তবে GPS পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা নয়। রাশিয়ার GLONASS, ইউরোপীয় ইউনিয়নের Galileo এবং চীনের BeiDou-ও একই ধরনের সেবা দেয়। অনেক আধুনিক স্মার্টফোন একাধিক ব্যবস্থার সংকেত ব্যবহার করতে পারে, ফলে অবস্থান নির্ণয়ের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে।
দৈনন্দিন জীবনে GPS-এর ব্যবহার
১. পথ খুঁজে পাওয়া ও যাতায়াত
GPS-এর সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহার হলো পথনির্দেশনা। Google Maps-এর মতো অ্যাপের সাহায্যে চালক, সাইকেল আরোহী কিংবা পথচারী নিজের অবস্থান দেখতে পারেন এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার পথ খুঁজে নিতে পারেন। রাইড-শেয়ারিং সেবায় যাত্রী ও চালকের অবস্থান মিলিয়ে নেওয়া এবং ডেলিভারি কর্মীদের গন্তব্য খুঁজে পেতেও এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।
২. বিমান ও জাহাজ চলাচল
বিমান চলাচলে GPS অবস্থান ও নেভিগেশনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। জাহাজও সমুদ্রে নিজের অবস্থান নির্ণয় এবং নির্ধারিত পথ অনুসরণ করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তবে নিরাপদ চলাচলের জন্য GPS-এর পাশাপাশি অন্যান্য নেভিগেশন ব্যবস্থা, যোগাযোগ এবং নিয়ন্ত্রণপদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।
৩. কৃষিকাজে নির্ভুলতা
আধুনিক কৃষিতে GPS-নির্ভর প্রযুক্তি জমির মানচিত্র তৈরি, বীজ বপন, সার প্রয়োগ এবং ফসল কাটার কাজ আরও নির্ভুল করতে সাহায্য করে। নির্দিষ্ট স্থানের তথ্য ব্যবহার করে কৃষকেরা জমির বিভিন্ন অংশের প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ ব্যবহার করতে পারেন। এতে কিছু ক্ষেত্রে খরচ কমানো এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা সম্ভব হয়।
৪. দুর্যোগ মোকাবিলা ও উদ্ধারকাজ
ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় উদ্ধারকারী দলকে দুর্গত এলাকার অবস্থান চিহ্নিত করতে GPS সহায়তা করে। নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান জানানো, উদ্ধারকারী দলের চলাচল সমন্বয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানচিত্র তৈরিতেও এটি কার্যকর হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করে যন্ত্রের কার্যকারিতা, সংকেতের প্রাপ্যতা এবং উদ্ধারকাজের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর।
৫. খেলাধুলা ও স্বাস্থ্যচর্চা
স্মার্টওয়াচ ও ফিটনেস ট্র্যাকার GPS ব্যবহার করে দৌড়ানো, সাইকেল চালানো কিংবা হাঁটার দূরত্ব ও গতিপথ রেকর্ড করতে পারে। এতে ব্যবহারকারীরা নিজেদের অনুশীলনের অগ্রগতি বুঝতে পারেন। কিছু যন্ত্রে উচ্চতা ও গতির তথ্যও পাওয়া যায়, যদিও সব পরিমাপের নির্ভুলতা এক রকম নয়।
GPS-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ: সঠিক সময় নির্ধারণ
GPS শুধু অবস্থান নির্ণয়ের প্রযুক্তি নয়; এটি অত্যন্ত নির্ভুল সময়সংকেতও সরবরাহ করে। উপগ্রহগুলোতে অত্যন্ত নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ি থাকে, আর তাদের পাঠানো সংকেতের সময় বিশ্লেষণ করেই রিসিভার দূরত্ব নির্ণয় করে।
এই সময়সংক্রান্ত তথ্য টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা এবং আর্থিক লেনদেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে। বিভিন্ন ব্যবস্থার ঘড়ি সঠিকভাবে সমন্বিত থাকলে তথ্য আদান-প্রদান ও কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়।
অর্থাৎ, আমরা যখন GPS ব্যবহার করে একটি রাস্তা খুঁজে নিই, তখন হয়তো বুঝতে পারি না যে একই প্রযুক্তির সময়সংকেত আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কার্যক্রমেও সহায়তা করছে।
GPS-এর সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি
GPS মানুষের জীবন সহজ করলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, অবস্থান সব সময় শতভাগ নির্ভুল হয় না। উঁচু ভবনের মাঝখানে, ঘন বনাঞ্চলে কিংবা সুড়ঙ্গের ভেতরে সংকেত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে মানচিত্রে দেখানো অবস্থান প্রকৃত অবস্থান থেকে কিছুটা সরে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, GPS সংকেত তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় কিছু পরিস্থিতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে সংকেত বাধাগ্রস্ত করা বা ভুয়া সংকেত পাঠানোর ঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা বিমান, জাহাজ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই সংবেদনশীল ক্ষেত্রে বিকল্প নেভিগেশন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা জরুরি।
তৃতীয়ত, GPS-নির্ভর অ্যাপ ও ডিভাইসের মাধ্যমে অবস্থানের তথ্য সংগ্রহ করা হলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন ওঠে। কোন অ্যাপ আপনার অবস্থান জানতে পারবে, কখন তা ব্যবহার করবে এবং তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করবে—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন না হলে অবস্থান-অনুমতি বন্ধ রাখা এবং অ্যাপের গোপনীয়তা সেটিংস যাচাই করা ভালো অভ্যাস।
GPS ছাড়া কি আধুনিক জীবন কল্পনা করা যায়?
GPS না থাকলেও মানচিত্র, কম্পাস, রেডিও যোগাযোগ এবং অন্যান্য নেভিগেশন প্রযুক্তি দিয়ে পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু GPS আধুনিক অবস্থান নির্ণয়কে অনেক সহজ, দ্রুত এবং সহজলভ্য করেছে। এটি পরিবহন থেকে কৃষি, গবেষণা থেকে জরুরি উদ্ধারকাজ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
GPS-এর সবচেয়ে বড় অবদান হলো জটিল উপগ্রহ প্রযুক্তিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারযোগ্য একটি সেবায় পরিণত করা। এখন একটি ছোট যন্ত্রের সাহায্যে মানুষ নিজের অবস্থান জানতে পারে, দূরের গন্তব্যে যাওয়ার পথ খুঁজে পায় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য নির্ভুল সময়সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করতে পারে।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে ভবিষ্যতে অবস্থান নির্ণয় আরও নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হতে পারে। তবে GPS-এর সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
স্মার্টফোন: যে আবিষ্কার মানুষের পকেটেই এনে দিয়েছে পুরো পৃথিবী
পরবর্তীকাগজের আবিষ্কার: যে উদ্ভাবন জ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছিল মানুষের ঘরে ঘরে
সম্পর্কিত সংবাদ
বিজ্ঞান বার্তা
টেকসই জ্বালানির ভবিষ্যৎ: বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও তরুণ গবেষকদের ভূমিকা
বিজ্ঞান বার্তা
মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা শক্তি: কেন ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের জ্বালানি বিশ্ব

বিজ্ঞান বার্তা
কাগজের আবিষ্কার: যে উদ্ভাবন জ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছিল মানুষের ঘরে ঘরে

বিজ্ঞান বার্তা
স্মার্টফোন: যে আবিষ্কার মানুষের পকেটেই এনে দিয়েছে পুরো পৃথিবী
বিজ্ঞান বার্তা
অ্যারিস্টটল: যে দার্শনিক যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত খুলেছিলেন

বিজ্ঞান বার্তা
প্লেটো: যে দার্শনিক দেখিয়েছিলেন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চাই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
