মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা শক্তি: কেন ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের জ্বালানি বিশ্ব
পৃথিবীর পৃষ্ঠের নিচে রয়েছে বিপুল তাপশক্তি। এই তাপের উৎস পৃথিবীর জন্মলগ্নের অবশিষ্ট তাপ, গভীর অভ্যন্তরে পদার্থের চলাচল এবং তেজস্ক্রিয় মৌলের ক্ষয়। এত দিন এই শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ মূলত আগ্নেয়গিরি, উষ্ণ প্রস্রবণ কিংবা ভূত্বকের পাতের সংযোগস্থলের মতো বিশেষ কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আধুনিক ড্রিলিং প্রযুক্তি ও নতুন প্রকৌশল পদ্ধতি সেই সীমাবদ্ধতা বদলে দিচ্ছে।
ভূ-তাপীয় শক্তি বা জিওথার্মাল এনার্জি এখন বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অন্যতম সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে আলোচনায় এসেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) ২০২৪ সালের শেষ দিকে পূর্বাভাস দিয়েছিল, প্রযুক্তির অগ্রগতি ও বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ভূ-তাপীয় শক্তি বিশ্বের বিদ্যুতের চাহিদার সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে পারে। মাত্র দুই বছর আগে এই উৎসের সম্ভাব্য অবদান দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে গভীর ভূগর্ভে পৌঁছানোর উন্নত প্রযুক্তি, তেল-গ্যাস শিল্পের অভিজ্ঞতার ব্যবহার, নতুন বিনিয়োগ এবং এমন বিদ্যুতের চাহিদা, যা দিন-রাত নির্ভরযোগ্যভাবে সরবরাহ করা যায়। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে ব্যয়, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার মতো চ্যালেঞ্জ।
ভূ-তাপীয় শক্তি কীভাবে কাজ করে?
পৃথিবীর গভীরে নামতে থাকলে সাধারণত তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। নির্দিষ্ট অঞ্চলে এই তাপমাত্রা তুলনামূলক কম গভীরতাতেই অনেক বেশি হতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানি যখন উত্তপ্ত শিলার সংস্পর্শে আসে, তখন তা গরম হয়ে যায়। কোথাও এই পানি প্রাকৃতিকভাবে মাটির ওপরে উঠে উষ্ণ প্রস্রবণ বা গিজার তৈরি করে। আবার কোথাও তাপ আহরণের জন্য গভীর কূপ খনন করতে হয়।
ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাধারণত ভূগর্ভের উত্তপ্ত পানি বা বাষ্প ব্যবহার করা হয়। উচ্চ তাপমাত্রার বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, আর টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভূগর্ভ থেকে পাওয়া গরম পানির তাপ সরাসরি কাজে লাগানো হয় না; বরং হিট এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে অন্য একটি তরলকে গরম করা হয়। সেই তরল বাষ্পে পরিণত হয়ে টারবাইন চালাতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর ব্যবহৃত পানি আবার ভূগর্ভে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এই পুনঃপ্রবেশ ব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাপ আহরণ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভূ-তাপীয় শক্তি সূর্যের আলো বা বাতাসের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। সূর্য ডুবে গেলেও কিংবা বাতাস কমে গেলেও পৃথিবীর গভীরের তাপ থেকে শক্তি আহরণ করা সম্ভব। ফলে এটি বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্য একটি উৎস হতে পারে।
কেন হঠাৎ বেড়েছে ভূ-তাপীয় শক্তির গুরুত্ব?
ভূ-তাপীয় শক্তি নতুন কোনো আবিষ্কার নয়। কয়েক দশক ধরে আইসল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, নিউজিল্যান্ড ও কেনিয়ার মতো দেশে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় বাধা ছিল ভূগোল। যেখানে উত্তপ্ত পানি স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না, সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় পৌঁছানো ব্যয়বহুল হয়ে উঠত।
এখন সেই বাধা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য তৈরি গভীর কূপ খনন, অনুভূমিক ড্রিলিং এবং ভূগর্ভের শিলার বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের মতো প্রযুক্তি ভূ-তাপীয় প্রকল্পেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে আগে যেখানে ভূগর্ভের তাপ কাজে লাগানো কঠিন ছিল, সেখানেও নতুন প্রকল্প গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা ভূ-তাপীয় শক্তির সম্ভাবনা বৈশ্বিক বিদ্যুতের চাহিদার শতগুণেরও বেশি। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সব শক্তি সহজে বা কম খরচে আহরণ করা যাবে। বাস্তবে কতটা শক্তি ব্যবহার করা সম্ভব, তা নির্ভর করে ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি, প্রযুক্তি, প্রকল্পের খরচ এবং পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার ওপর।
তবু সম্ভাব্য শক্তির বিশাল ভান্ডার, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের সুযোগ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজন—সব মিলিয়ে ভূ-তাপীয় শক্তি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
নতুন প্রযুক্তি: গরম শিলা থাকলেই কি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব?
প্রচলিত ভূ-তাপীয় ব্যবস্থায় সাধারণত এমন অঞ্চল দরকার, যেখানে উত্তপ্ত ভূগর্ভস্থ পানি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর অনেক জায়গায় গভীরে গরম শিলা থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত পানি নেই, অথবা শিলার ফাটল দিয়ে তরল সহজে চলাচল করতে পারে না।
এই সমস্যার সমাধানে কাজ করছে নতুন প্রজন্মের ভূ-তাপীয় প্রযুক্তি। এর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত দুটি পদ্ধতি হলো এনহ্যান্সড জিওথার্মাল সিস্টেমস (EGS) এবং ক্লোজড-লুপ জিওথার্মাল সিস্টেম।
এনহ্যান্সড জিওথার্মাল সিস্টেমস: শিলার ভেতরেই তৈরি করা হয় পানির পথ
এনহ্যান্সড জিওথার্মাল সিস্টেমস বা EGS এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে গরম কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম ভেদ্য শিলার ভেতর কৃত্রিমভাবে তরল চলাচলের পথ তৈরি করা হয়। এর জন্য নিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভে তরল প্রবেশ করিয়ে শিলার ফাটল সক্রিয় বা প্রসারিত করা হতে পারে।
এরপর অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা পানি কূপের মাধ্যমে গভীরে পাঠানো হয়। পানি উত্তপ্ত শিলার ফাটল দিয়ে চলাচল করার সময় তাপ শোষণ করে। পরে সেই গরম পানি অন্য একটি কূপ দিয়ে ওপরে তুলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা তাপ সরবরাহে ব্যবহার করা হয়।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, শুধু প্রাকৃতিকভাবে উত্তপ্ত পানির ভান্ডার আছে এমন অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না। উপযুক্ত গরম শিলা পাওয়া গেলে আরও বিস্তৃত এলাকায় ভূ-তাপীয় শক্তি আহরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তেল-গ্যাস শিল্পে ব্যবহৃত অনুভূমিক ড্রিলিং ও ভূগর্ভের ক্ষুদ্র কম্পন পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তি EGS-কে আরও কার্যকর করে তুলছে। তবে ভূগর্ভে তরল প্রবেশ করানোর ফলে শিলার মধ্যে চাপের পরিবর্তন হতে পারে এবং কখনো কখনো ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি হতে পারে। তাই এই প্রযুক্তির প্রসারে নিরাপত্তা ও ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রযুক্তি নিয়ে বড় আকারের প্রকল্প এগোচ্ছে। ওরেগনে একটি প্রকল্পে প্রায় ৩৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার শুষ্ক শিলায় পৌঁছানোর কথা জানানো হয়েছে। এ ধরনের উচ্চ তাপমাত্রা ভবিষ্যতে বড় পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ক্লোজড-লুপ ব্যবস্থা: ভূগর্ভস্থ পানি না তুলেও তাপ আহরণ
আরেকটি প্রযুক্তি হলো ক্লোজড-লুপ জিওথার্মাল। এই ব্যবস্থায় ভূগর্ভের উত্তপ্ত শিলার ভেতর দিয়ে বন্ধ পাইপের একটি নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। পাইপের ভেতরে একটি বিশেষ তরল ঘুরতে থাকে। গভীরে গিয়ে তরলটি শিলা থেকে তাপ শোষণ করে ওপরে ফিরে আসে। এরপর সেই তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ভবন গরম রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়।
এ ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো, তাপ পরিবহনের তরলটি একটি বন্ধ চক্রে চলাচল করে। ফলে ভূগর্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ পানি তুলে আনার প্রয়োজন হয় না। পাশাপাশি শিলার ভেতরে তরল প্রবাহের জন্য বড় আকারের ফাটল তৈরির প্রয়োজনও অনেক ক্ষেত্রে এড়ানো যায়।
জার্মানি ও কানাডাসহ কয়েকটি দেশে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। জার্মানির বাভারিয়ায় Eavor নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ ও স্থানীয় তাপ সরবরাহের কথা জানানো হয়েছে। প্রকল্পটির উল্লেখিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৮ দশমিক ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এবং ৬৪ মেগাওয়াট তাপ।
তবে ক্লোজড-লুপ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও গভীর কূপ খননের ব্যয়, পাইপের স্থায়িত্ব এবং শিলা থেকে পর্যাপ্ত তাপ স্থানান্তর নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
আরও গভীরে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা
ভূ-তাপীয় শক্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে কম সময়ে ও কম খরচে গভীর কূপ খননের ওপর। কারণ, গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা সাধারণত বাড়লেও খননকাজের জটিলতা ও ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
এই বাধা কাটাতে বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে। পলিক্রিস্টালাইন ডায়মন্ড কমপ্যাক্ট বা PDC ড্রিল বিটের মতো উন্নত যন্ত্র ব্যবহার করে খননের গতি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিছু প্রকল্পে শিলা দ্রুত ভাঙা বা গলিয়ে ফেলার বিকল্প পদ্ধতিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় প্রকল্প DeepU শিলা ভাঙার কাজে লেজার ও অত্যন্ত ঠান্ডা গ্যাসের সমন্বিত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের Quaise Energy মিলিমিটার-তরঙ্গ বিকিরণ ব্যবহার করে শিলাকে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও বাষ্পীভূত করার প্রযুক্তি তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় দ্রুত গভীর কূপ খনন করা।
এসব প্রযুক্তি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। তাই এগুলো ভবিষ্যতে কতটা কম খরচে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা নিশ্চিত নয়। তবে সফল হলে ভূ-তাপীয় শক্তি উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত অঞ্চলের পরিসর অনেকটাই বাড়তে পারে।
ভূ-তাপীয় শক্তির আরেক আকর্ষণ: লিথিয়াম আহরণ
ভূ-তাপীয় প্রকল্পের আরেকটি সম্ভাবনা হলো একই সঙ্গে লিথিয়াম উৎপাদন। লিথিয়াম বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের ব্যাটারির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। বিশ্বজুড়ে ব্যাটারির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধাতুর নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিছু ভূগর্ভস্থ উত্তপ্ত তরলে প্রাকৃতিকভাবে লিথিয়াম দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। উপযুক্ত প্রযুক্তির সাহায্যে সেই তরল থেকে লিথিয়াম আলাদা করা সম্ভব। এতে একই কূপ ও তরল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি মূল্যবান খনিজও পাওয়া যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার একটি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে উন্নয়নাধীন ভূ-তাপীয় প্রকল্পগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ৪৭ হাজার টন লিথিয়াম উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এটি তখনকার বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ পূরণ করতে পারে বলে সংস্থাটি ধারণা দিয়েছে।
তবে সব ভূ-তাপীয় তরলে পর্যাপ্ত লিথিয়াম থাকে না। অর্থনৈতিকভাবে আহরণযোগ্য পরিমাণ, রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণের খরচ এবং পরিবেশগত প্রভাবের ওপর নির্ভর করবে এই সহ-উৎপাদনের বাস্তব সাফল্য।
পরিবেশের জন্য কতটা নিরাপদ?
ভূ-তাপীয় শক্তির বড় সুবিধা হলো, এটি সাধারণত কম জমি ব্যবহার করে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় জীবাশ্ম জ্বালানির মতো বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে না। তবে একে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত বলা যাবে না।
প্রথমত, ভূগর্ভ থেকে উত্তপ্ত তরল তোলার সময় কিছু প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ পদার্থ বেরিয়ে আসতে পারে। তরলের রাসায়নিক গঠন অনুযায়ী সেগুলোকে নিরাপদে ব্যবস্থাপনা করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ভূগর্ভে পানি প্রবেশ করানো বা শিলার ফাটল তৈরি করার ফলে ভূকম্পন ঘটতে পারে। অধিকাংশ ক্ষুদ্র কম্পন মানুষ অনুভব করেন না, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে কম্পন বড় হয়ে স্থানীয় অবকাঠামো বা মানুষের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়ত, ভূগর্ভ থেকে তরল তোলার হার এবং পুনরায় তরল প্রবেশ করানোর মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রকল্পের উৎপাদনক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য ভূগর্ভস্থ চাপ, তাপমাত্রা, পানির চলাচল ও কম্পনের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, ভূ-তাপীয় শক্তির পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না; প্রকল্পের পরিকল্পনা, ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়ন, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণও জরুরি।
যুক্তরাজ্যে নতুন সম্ভাবনা
যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ভূ-তাপীয় শক্তি মূলত ভবন গরম রাখা এবং স্থানীয় তাপ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কর্নওয়ালের রেডরুথে দেশটির প্রথম ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার খবর এই খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
Geothermal Engineering Limited বা GEL পরিচালিত এই প্রকল্পে পাঁচ কিলোমিটারেরও বেশি গভীরতায় কূপ খনন করে প্রায় ১৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার ভূগর্ভস্থ তরলে পৌঁছানো হয়েছে। সেই উত্তপ্ত তরলের তাপ ব্যবহার করে একটি দ্বিতীয় তরলকে বাষ্পে পরিণত করা হয়। বাষ্প টারবাইন চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
প্রকল্পটির লক্ষ্য প্রায় ১০ হাজার বাড়ির সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। পাশাপাশি ভূ-তাপীয় তরল থেকে লিথিয়াম আহরণের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কর্নওয়ালে আরও প্রকল্প উন্নয়নের কাজ করছে।
যুক্তরাজ্যের এই অভিজ্ঞতা দেখায়, দেশটিতে ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বড় পরিসরে সম্প্রসারণের জন্য খননব্যয় কমানো, প্রয়োজনীয় অনুমতি দ্রুত পাওয়া এবং বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিনিয়োগ বাড়ছে, কিন্তু খরচ এখনো বড় বাধা
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরবর্তী প্রজন্মের ভূ-তাপীয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ২০১৮ সালের প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। প্রচলিত ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ প্রকল্পেও বিনিয়োগ বেড়েছে। একই সময়ে ভূ-তাপীয় তাপ সরবরাহ ও গ্রাউন্ড-সোর্স হিট পাম্পের মতো ব্যবস্থায় বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বেশি ছিল।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে একটি বড় কারণ হলো নির্ভরযোগ্য পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের চাহিদা। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা সেন্টারের বিস্তারে বিদ্যুতের প্রয়োজন বাড়ছে। এসব স্থাপনায় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি হওয়ায় ভূ-তাপীয় শক্তির মতো ধারাবাহিক উৎপাদনক্ষম উৎস আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
তবে বিনিয়োগ বাড়লেই সব প্রকল্প লাভজনক হয়ে যাবে না। গভীর কূপ খননে বিপুল প্রাথমিক ব্যয়, ভূগর্ভের প্রকৃত তাপমাত্রা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা, পরিবেশগত অনুমোদন এবং গ্রিড সংযোগের খরচ—সব মিলিয়ে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ঝুঁকি থাকে। নতুন প্রযুক্তি যদি খননের সময় ও ব্যয় কমাতে পারে এবং প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন স্থিতিশীল উৎপাদন দিতে পারে, তবেই ভূ-তাপীয় বিদ্যুতের দাম আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় ভূ-তাপীয় শক্তির জায়গা কোথায়?
সূর্য ও বাতাসের মতো নবায়নযোগ্য উৎসের উৎপাদন আবহাওয়া ও দিনের সময়ের ওপর নির্ভর করে। ভূ-তাপীয় শক্তি এই সীমাবদ্ধতা অনেকাংশে কাটিয়ে উঠতে পারে। উপযুক্ত স্থানে একটি ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে এবং চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো বা কমানোও সম্ভব।
এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ কিছু জলাধার বা পরিত্যক্ত তেল-গ্যাস ক্ষেত্রকে শক্তি সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। অতিরিক্ত শক্তি কাজে লাগিয়ে ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থায় তাপ বা শক্তি সঞ্চয় করে পরে প্রয়োজনের সময় তা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে নির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি ও প্রযুক্তির ওপর।
সব দেশেই ভূ-তাপীয় শক্তি সমানভাবে সহজলভ্য নয়। কোথাও উচ্চ তাপমাত্রার উৎস অগভীরেই পাওয়া যায়, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় পৌঁছাতে অনেক গভীরে যেতে হয়। ফলে ভূ-তাপীয় শক্তি একাই বিশ্বের সব জ্বালানি সমস্যার সমাধান করবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে এটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যেখানে গভীর ভূগর্ভে পর্যাপ্ত তাপ রয়েছে, সেখানে নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি এমন শক্তির উৎসকে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে পারে, যা এত দিন মানুষের নাগালের বাইরে ছিল।
পৃথিবীর গভীরে থাকা এই তাপের ভান্ডার রাতারাতি শক্তি উৎপাদনের পদ্ধতি বদলে দেবে না। কিন্তু উন্নত ড্রিলিং, নিরাপদ ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে মাটির নিচের তাপ ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সূর্য ও বাতাসের পাশাপাশি পৃথিবীর নিজের তাপও তখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিশ্বে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী
পরবর্তীটেকসই জ্বালানির ভবিষ্যৎ: বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও তরুণ গবেষকদের ভূমিকা
সম্পর্কিত সংবাদ
বিজ্ঞান বার্তা
টেকসই জ্বালানির ভবিষ্যৎ: বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও তরুণ গবেষকদের ভূমিকা

বিজ্ঞান বার্তা
কাগজের আবিষ্কার: যে উদ্ভাবন জ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছিল মানুষের ঘরে ঘরে
বিজ্ঞান বার্তা
জিপিএস (GPS): পৃথিবীর যেকোনো জায়গা খুঁজে পেতে যে প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন

বিজ্ঞান বার্তা
স্মার্টফোন: যে আবিষ্কার মানুষের পকেটেই এনে দিয়েছে পুরো পৃথিবী
বিজ্ঞান বার্তা
অ্যারিস্টটল: যে দার্শনিক যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত খুলেছিলেন

বিজ্ঞান বার্তা
প্লেটো: যে দার্শনিক দেখিয়েছিলেন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চাই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
