বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যারা জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও সাহিত্যিক গভীরতার স্বীকৃতি পেয়েছেন। ডিন কুন্টজ তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর, সবচেয়ে উৎপাদনশীল, আর সবচেয়ে বেশি পঠিত নাম। তাকে বলা হয় "আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাসপেন্স ঔপন্যাসিক" — এই উপাধি দিয়েছে খোদ রোলিং স্টোন ম্যাগাজিন । তার বই বিক্রি হয়েছে ৫০ কোটিরও বেশি কপি, অনূদিত হয়েছে ৩৮টি ভাষায়, আর ১৪টি হার্ডকভার এবং ১৬টি পেপারব্যাক নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষে পৌঁছেছে । কিন্তু সংখ্যা কখনোই কুন্টজের আসল উত্তরাধিকার ছিল না। তার আসল উত্তরাধিকার হলো এই — তিনি প্রমাণ করেছেন ভয় আর আশা একসাথে থাকতে পারে, আর সবচেয়ে অন্ধকার গল্পেও আলো জ্বালানোর জায়গা থাকে।
পেনসিলভানিয়ার সেই ছেলেটি: মদ্যপ বাবার হাত থেকে পালিয়ে বইয়ের জগতে
১৯৪৫ সালের ৯ জুলাই পেনসিলভানিয়ার এভারেটে জন্মগ্রহণ করেন ডিন রে কুন্টজ । তার শৈশব ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো। তার বাবা ছিলেন মদ্যপ, যিনি প্রায়ই মারধর করতেন। ছোট্ট ডিন সেই নিষ্ঠুরতা থেকে পালিয়ে যেতেন লাইব্রেরিতে — বইয়ের পাতায়, গল্পের জগতে, যেখানে কেউ তাকে আঘাত করত না । এই অভিজ্ঞতাই তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল, গল্প মানে পালানো নয়, গল্প মানে বাঁচার উপায়।
তিনি শিপেনসবার্গ স্টেট কলেজ থেকে শিক্ষায় ডিগ্রি নেন ১৯৬৭ সালে । কলেজে থাকতেই তিনি আটলান্টিক মান্থলি ম্যাগাজিনের ফিকশন প্রতিযোগিতায় জিতে নেন — যা তাকে প্রমাণ করে দেয়, লেখালেখিই তার আসল পথ । স্নাতক হওয়ার পর তিনি অ্যাপালাচিয়ান পোভার্টি প্রোগ্রামে কাউন্সেলর হিসেবে কাজ নেন, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াতেন। কিন্তু প্রথম দিনেই তিনি আবিষ্কার করেন, তার পূর্বসূরিকে সেই শিশুরাই মারধর করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে । সেই চাকরি কঠিন ছিল, কিন্তু কুন্টজ ততটাই বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন লেখক হওয়ার জন্য।
পঁচিশ বছরে ডজনখানেক উপন্যাস: ছদ্মনামের জগৎ
কুন্টজ ছিলেন অত্যন্ত উৎপাদনশীল। পঁচিশ বছর বয়সেই তিনি ডজনখানেক উপন্যাস বিক্রি করে ফেলেছিলেন । তার প্রথম দিকের কেরিয়ারে তিনি অসংখ্য ছদ্মনামে লিখতেন — ডেভিড অ্যাক্সটন, ব্রায়ান কফি, কে. আর. ডোয়ার, লেই নিকোলস, রিচার্ড পেইজ, ওয়েন ওয়েস্ট — এই তালিকা দীর্ঘ । কিন্তু ১৯৭৩ সালের ডেমন সিড এবং ১৯৭৫ সালের ইনভেশন বেস্টসেলার হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, আসল নামেই লেখা উচিত । ১৯৮৬ সাল থেকে তিনি শুধু ডিন কুন্টজ নামেই বই প্রকাশ করতে শুরু করেন ।
স্ত্রীর পাঁচ বছরের সমর্থন: যে বাজি তাকে ইতিহাসে বসিয়েছে
কুন্টজের জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে তার স্ত্রী গের্ডা-র এক সিদ্ধান্তে। যখন তিনি ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কাজ করছিলেন, আর রাত-ছুটির দিনে লিখতেন, তখন গের্ডা তাকে একটি প্রস্তাব দেন: "আমি তোমাকে পাঁচ বছর সমর্থন করব। যদি এই পাঁচ বছরে তুমি লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারো, তাহলে কখনোই পারবে না" । সেই পাঁচ বছরের শেষে গের্ডা তার নিজের চাকরি ছেড়ে দেন স্বামীর লেখালেখির ব্যবসায়িক দিক সামলানোর জন্য । এই সমর্থনই কুন্টজকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছিল, যা ছাড়া এত বিশাল রচনাসম্ভার সম্ভব ছিল না।
লেখার ধরন: ভয়ের ভেতরে আশার আলো
কুন্টজের উপন্যাসগুলোকে সাসপেন্স থ্রিলার বলা হয়, কিন্তু তার ভেতরে মিশে থাকে হরর, ফ্যান্টাসি, সায়েন্স ফিকশন, মিস্ট্রি আর ব্যঙ্গ । তার গল্পের কেন্দ্রে সাধারণত থাকে সাধারণ মানুষ — একজন স্ক্রিনরাইটার, একজন গৃহিণী, একজন কিশোর — যারা হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক, ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তার গল্পে প্রায়ই থাকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা, আর চরিত্রগুলোকে সেই সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় ।
নিউ ইয়র্ক টাইমস তার লেখাকে বলেছে "মনস্তাত্ত্বিকভাবে জটিল, দক্ষ আর সন্তোষজনক" । লন্ডন টাইমস তাকে বলেছে "সাহিত্যিক জাদুকর" । কিন্তু সবচেয়ে সঠিক মূল্যায়ন সম্ভবত পাবলিশার্স উইকলি-র: কুন্টজ "অন্ধকার জগতে পাঠককে উজ্জ্বল আশা দেন। তিনি একজন সত্যিকারের মৌলিক" ।
বাংলা ভাষায় কুন্টজ: দ্য আইজ অব ডার্কনেস থেকে ইনটেনসিটি
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছেও কুন্টজ সমান জনপ্রিয়। রকমারি.কম, কিতাবঘর, বইঘর-এর মতো প্ল্যাটফর্মে তার অনেক বই পাওয়া যায়। দ্য আইজ অব ডার্কনেস (অনুবাদ: কাজী ম্যাক ও মারুফ বিল্লাহ, নয়েস পাবলিকেশন্স, ২০২০) — একটি সফল থ্রিলার, যা একজন মা আর তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের গল্প । দ্য মুনলিট মাইন্ড (অনুবাদ: মামুনুর রশিদ তানিম, ঈহা প্রকাশ, ২০২২) — বারো বছরের এক কিশোর আর তার বোবা কুকুরের গল্প । ইনটেনসিটি (অনুবাদ: শাহেদ জামান, আদী প্রকাশন, ২০১৫) — এক সাইকোপ্যাথের হাতে বন্দী এক তরুণীর মুক্তির গল্প । দ্য মার্সি অভ স্নেকস (অনুবাদ: মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ) — নামলেস ডিটেকটিভ সিরিজের একটি বই ।
সমালোচনা ও বিতর্ক
কুন্টজের সমালোচনাও কম নেই। অনেকে বলেন তার বই ফর্মুলাইক, বারবার একই ধরনের গল্প। অনেকে বলেন তার চরিত্রগুলো গভীর নয়। কিন্তু কুন্টজ কখনো এই সমালোচনায় বিচলিত হননি। তিনি তার পাঠকদের জন্য লেখেন, আর তার পাঠকরা তাকে ভালোবাসেন। ২০১২ সালে তিনি ১৯ মিলিয়ন ডলার আয় করে গ্লোবাল অথর ইনকাম লিস্টে দশম স্থানে ছিলেন । আর আজও প্রতি বছর তার ২ কোটিরও বেশি বই বিক্রি হয় ।
ডিন কুন্টজ মানে কেবল কিছু থ্রিলার উপন্যাস নয়। তিনি মানে সেই মানুষ, যিনি মদ্যপ বাবার মারধর থেকে পালিয়ে লাইব্রেরিতে আশ্রয় নিতেন, যিনি পঁচিশ বছর বয়সেই ডজনখানেক উপন্যাস লিখে ফেলেছিলেন, যিনি স্ত্রীর পাঁচ বছরের সমর্থনে বিশ্বাস রেখেছিলেন। তিনি মানে সেই কণ্ঠস্বর, যিনি প্রমাণ করেছেন ভয় আর আশা পরস্পরবিরোধী নয় — বরং একই মুদ্রার দুই পিঠ। তার গল্পে পাঠক ভয় পায়, কিন্তু শেষ পাতায় পৌঁছে আশা খুঁজে পায়। তিনি মানে সেই প্রতিভা, যিনি স্টিফেন কিং-এর সাথে সাসপেন্স জগতের দুই স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন — কিং যদি হন রোলিং স্টোনস, কুন্টজ তবে বিটলস ।
ডিন কুন্টজ কোনো এক দেশের, এক যুগের, এক ভাষার লেখক নন — তিনি সমগ্র মানবজাতির সেই পাঠকদের প্রতিনিধি, যারা জানে, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলো জ্বালানোর জায়গা সবসময় থাকে। আর সেই আলো জ্বালানোর কাজটাই ডিন কুন্টজ সারাজীবন করে গেছেন।