ডক্টর সিউস: সেই মানুষ, যিনি প্রমাণ করেছেন শিশুদের বই লেখা মানে কেবল গল্প বলা নয় — এটা এক গোটা প্রজন্মের কল্পনাশক্তিকে মুক্ত করা
সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত লেখক
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের নাম শুনলেই একটা গোটা জগৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে — রঙিন, অদ্ভুত, হাস্যরসে ভরা, আর গভীরভাবে মানবিক। ডক্টর সিউস ঠিক তেমনই একজন। তার আসল নাম থিওডর সিউস গাইসেল, কিন্তু তিনি যে নামে পরিচিত হয়েছেন, সেটাই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে । তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, কবি, চিত্রকর, কার্টুনিস্ট — আর পাশাপাশি তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি প্রমাণ করেছেন শিশুদের বই কেবল শেখার হাতিয়ার নয়, বরং কল্পনার মুক্তির দরজা।
স্প্রিংফিল্ডের সেই ছেলেটি: যে ডাক্তার কখনো ডাক্তারি পড়েনি
১৯০৪ সালের ২ মার্চ ম্যাসাচুসেটসের স্প্রিংফিল্ডে জন্মগ্রহণ করেন থিওডর সিউস গাইসেল । তার পরিবার ছিল জার্মান বংশোদ্ভূত, বাবা ছিলেন একজন ব্রুয়ারি মালিক, আর মা হেনরিয়েটা তার ছোটবেলায় ছড়া আর গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন — সেই ছন্দই পরবর্তীকালে তার লেখার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে ।
ছোটবেলা থেকেই গাইসেল আঁকতে ভালোবাসতেন, আর স্কুলজীবনে তিনি ছিলেন একজন মজার আর অদ্ভুত স্বভাবের ছেলে। ডার্টমাউথ কলেজে পড়ার সময় তিনি কলেজের হাস্যরসাত্মক ম্যাগাজিন জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন-এর সম্পাদক ছিলেন । কিন্তু একবার মদ্যপান করার সময় ধরা পড়ার পর তাকে সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখনই তিনি তার মাঝের নাম "সিউস" ব্যবহার করে ছদ্মনামে লেখালেখি শুরু করেন । পরে অক্সফোর্ডে পড়তে গিয়ে তার সাথে পরিচয় হয় হেলেন পামারের, যিনি তাকে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে শুধু আঁকা আর লেখার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন — আর সেই পরামর্শই তার জীবন বদলে দেয় ।
"ডক্টর" শব্দটি তিনি যোগ করেন তার বাবার ইচ্ছার প্রতি এক ধরনের রসিকতা হিসেবে, কারণ তার বাবা চেয়েছিলেন তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করুন — যদিও তিনি কখনো তা করেননি ।
সাতাশটি প্রত্যাখ্যান থেকে যে বই পৃথিবী বদলে দিল
গাইসেলের প্রথম শিশুতোষ বই অ্যান্ড টু থিঙ্ক দ্যাট আই স হু ইট অন মালবেরি স্ট্রিট প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে — কিন্তু তার আগে বইটি সাতাশটিরও বেশি প্রকাশক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন । অবশেষে বন্ধুদের সহায়তায় এটি প্রকাশিত হয়, আর সেই থেকে শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য যাত্রা ।
কিন্তু তার আসল সাফল্য আসে ১৯৫৭ সালে, যখন তিনি প্রকাশ করেন দ্য ক্যাট ইন দ্য হ্যাট । এই বইটির জন্ম এক আকর্ষণীয় প্রেক্ষাপটে। ১৯৫৪ সালে লাইফ ম্যাগাজিনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে বলা হয়েছিল যে শিশুদের পড়ার দক্ষতা কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো স্কুলের পাঠ্যবইগুলো বিরক্তিকর আর আনন্দহীন। সেই প্রতিবেদন পড়ে হৌটন মিফলিন (Houghton Mifflin)-এর শিক্ষা বিভাগের পরিচালক উইলিয়াম স্পলডিং গাইসেলকে চ্যালেঞ্জ করেন — এমন একটি বই লিখুন যা শিশুরা পড়তে গিয়ে থামতে পারবে না, কিন্তু যেখানে ব্যবহার করতে হবে শুধু সেই শব্দগুলো যা একজন নতুন পাঠক ইতিমধ্যেই জানে । গাইসেল সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন, আর জন্ম নেয় দ্য ক্যাট ইন দ্য হ্যাট — যা আজ পর্যন্ত শিশুদের পড়তে শেখানোর সবচেয়ে সফল বইগুলোর একটি ।
সংখ্যার বিস্ময়: সাতশো মিলিয়নেরও বেশি বই
ডক্টর সিউসের বইয়ের বিক্রির সংখ্যা আক্ষরিক অর্থেই বিস্ময়কর। তার বই ৭০০ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে । শুধু তাই নয় — তার মৃত্যুর পর থেকে ৪৫০ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে, অর্থাৎ তার সাফল্য মৃত্যুর পরেও বেড়েই চলেছে । দ্য ক্যাট ইন দ্য হ্যাট একাই বিক্রি হয়েছে ৭২ লক্ষেরও বেশি কপি, আর গ্রিন এগস অ্যান্ড হ্যাম বিক্রি হয়েছে ৮১ লক্ষেরও বেশি কপি । তার বই ১৭টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ৯৫টিরও বেশি দেশে বিতরণ করা হয়েছে । সিউসভিল.কম ওয়েবসাইটে প্রতি বছর ৬০ লক্ষেরও বেশি দর্শক আসেন ।
গ্রিন এগস অ্যান্ড হ্যাম: পঞ্চাশ শব্দের বাজি
ডক্টর সিউসের সবচেয়ে বিখ্যাত বইগুলোর একটি গ্রিন এগস অ্যান্ড হ্যাম-এর জন্ম হয়েছিল একটি মজার বাজি থেকে। কথিত আছে, তার প্রকাশক বেনেট সের্ফ বাজি ধরেছিলেন যে গাইসেল পঞ্চাশটি শব্দের কম দিয়ে একটি সম্পূর্ণ বই লিখতে পারবেন না। গাইসেল সেই বাজি জিতে নেন — আর জন্ম দেন এমন একটি বইয়ের, যা আজও কোটি কোটি শিশুর প্রিয় ।
যে বইগুলো কেবল গল্প নয়, দর্শনও
ডক্টর সিউসের বইগুলো কখনো কেবল শিশুদের বিনোদনের জন্য ছিল না। তিনি তার গল্পের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন গভীর সামাজিক আর রাজনৈতিক বার্তা। দ্য লোরাক্স (১৯৭১) পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ । দ্য স্নিচেস (১৯৬১) বর্ণবাদ আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লেখা, যা তিনি নিজেই বলেছেন ইহুদি-বিরোধীতার বিরুদ্ধে তার প্রতিক্রিয়া থেকে এসেছে । দ্য বাটার-ব্যাটল বুক (১৯৮৪) স্নায়ুযুদ্ধের বিরুদ্ধে এক সরাসরি সমালোচনা । হাউ দ্য গ্রিঞ্চ স্টোল ক্রিসমাস বাণিজ্যিক ভোগবাদ-এর বিরুদ্ধে এক ব্যঙ্গ ।
তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি ছিলেন "বিদ্রোহী" — প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি তার সবসময় অবিশ্বাস ছিল, আর তার বইগুলো ছিল সেই অবিশ্বাসেরই প্রকাশ ।
সেন্সরশিপ আর বিতর্ক: যে বইগুলো নিষিদ্ধ হয়েছিল
ডক্টর সিউসের উত্তরাধিকার মোটেই সমালোচনামুক্ত নয়। ২০২১ সালে তার এস্টেট ঘোষণা করে যে ছয়টি বই বর্ণবাদী আর জাতিগত গৎবাঁধা ধারণা (stereotyping)-এর কারণে প্রকাশ বন্ধ করা হবে : অ্যান্ড টু থিঙ্ক দ্যাট আই স হ্যাট অন মালবেরি স্ট্রিট, ইফ আই রান দ্য জু, ম্যাকএলিগটস পুল, অন বিয়ন্ড জেব্রা, স্ক্র্যাম্বলড এগস সুপার, আর দ্য ক্যাটস কুইজার । এই ঘোষণার পর সেই বইগুলোর বিক্রি হঠাৎ করেই চার গুণেরও বেশি বেড়ে যায় — কারণ যারা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন তারা সেই বইগুলো কিনতে শুরু করেন । ২০১৭ সালে রিচার্ড মিনিয়ার লেখা ডক্টর সিউস গোজ টু ওয়ার বইটি প্রকাশিত হয়, যা দেখায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জাপানি-বিরোধী বর্ণবাদী কার্টুন এঁকেছিলেন ।
লেখার পদ্ধতি: টুপির আলমারি আর নিখুঁততার সাধনা
ডক্টর সিউসের লেখার পদ্ধতি ছিল নিজেই এক বিস্ময়। তিনি ছিলেন এক চরম নিখুঁততাবাদী — একটি বই লেখতে তার কখনো কখনো মাসের পর মাস, এমনকি বছর লেগে যেত । লেখক ব্লকের সময় তার একটি অদ্ভুত সমাধান ছিল: তার বাড়িতে একটি গোপন আলমারি ছিল, যেখানে শত শত টুপি রাখা ছিল। তিনি একটি টুপি পরে অপেক্ষা করতেন, যতক্ষণ না কোনো বুদ্ধি আসে । তিনি আঁকতেনও, সেই একই কারণে।
ডক্টর সিউস মানে কেবল কিছু শিশুতোষ ছড়ার বই নয়। তিনি মানে সেই মানুষ, যার প্রথম বই সাতাশটি প্রকাশক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, অথচ যিনি পরে সাতশো মিলিয়নেরও বেশি বই বিক্রি করেছেন। তিনি মানে সেই কণ্ঠস্বর, যিনি প্রমাণ করেছেন শিশুদের বই কেবল শেখার হাতিয়ার নয়, সেটা হতে পারে প্রতিবাদের ভাষা, দর্শনের বাহন, আর কল্পনার মুক্তির দরজা। তিনি মানে সেই প্রতিভা, যিনি গ্রিন এগস অ্যান্ড হ্যাম লিখেছেন পঞ্চাশ শব্দের বাজি জিতে, আর দ্য ক্যাট ইন দ্য হ্যাট লিখেছেন শিশুদের পড়তে শেখানোর জন্য — অথচ সেই দুটি বই আজ কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অমর।
ডক্টর সিউস কোনো এক দেশের, এক যুগের, এক ভাষার লেখক নন — তিনি সমগ্র মানবজাতির সেই কল্পনাপ্রবণ শিশুদের প্রতিনিধি, যারা জানে, বই মানে কেবল শব্দ নয়, বই মানে এক গোটা জগৎ — আর সেই জগৎে ঢোকার চাবি হলো হাসি, ছন্দ, আর একটু অদ্ভুত কল্পনা। তিনি ১৯৯১ সালে চলে গেছেন, কিন্তু তার আঁকা সেই অদ্ভুত চরিত্রগুলো, সেই রঙিন জগৎ, সেই হাস্যরসে ভরা ছড়াগুলো — সব এখনো কোটি কোটি শিশুর শৈশবের অংশ হয়ে আছে।
ড্যান ব্রাউন: সেই মানুষ, যিনি ইতিহাস, ধর্ম আর বিজ্ঞানকে মিশিয়ে একটা গোটা প্রজন্মকে রহস্যের নেশায় ডুবিয়ে দিয়েছিলেন
পরবর্তীডিন কুন্টজ: সেই মানুষ, যিনি ভয়কে একা রাখেননি — তার সাথে নিয়ে গেছেন আশার আলোও
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
