রোয়াল্ড ডাহল: সেই মানুষ, যিনি শিশুদের শিখিয়েছিলেন বড়দের বিরুদ্ধে জেতা যায়
সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত লেখক

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যারা শিশুদের জন্য লিখেছেন, কিন্তু তাদের গল্প কখনো কেবল শিশুদের জন্য ছিল না। রোয়াল্ড ডাহল তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত, সবচেয়ে বিতর্কিত, আর সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম। তাকে বলা হয় "বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিশু-গল্পকারদের একজন" । তার বই বিশ্বব্যাপী ২৫ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে । কিন্তু সংখ্যা কখনোই ডাহলের আসল উত্তরাধিকার ছিল না। তার আসল উত্তরাধিকার হলো এই — তিনি প্রথম প্রমাণ করলেন শিশুদের বই অন্ধকার, অশ্লীল, বিদ্রোহী আর ভয়ংকর হতে পারে, আর সেটাই শিশুরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
ওয়েলসের সেই ছেলেটি: বাবার মৃত্যু থেকে দুঃস্বপ্নের স্কুলজীবন
১৯১৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ওয়েলসের কার্ডিফের ল্যান্ডাফে জন্মগ্রহণ করেন রোয়াল্ড ডাহল । তার বাবা হারাল্ড ছিলেন নরওয়েজীয় বংশোদ্ভূত, যিনি কার্ডিফে জাহাজ ব্যবসা শুরু করেছিলেন । ডাহলের যখন মাত্র তিন বছর বয়স, তখন তার সাত বছরের বোন আস্ত্রি অ্যাপেন্ডিসাইটিসে মারা যায়, আর কয়েক সপ্তাহ পরেই তার বাবাও নিউমোনিয়ায় মারা যান । এই দুই মৃত্যু ডাহলের জীবনে গভীর ছাপ ফেলে।
ডাহলের মা সোফি তখন ছয় সন্তান নিয়ে একা হয়ে যান, কিন্তু নরওয়েতে ফিরে যাওয়ার বদলে ইংল্যান্ডেই থেকে যান, কারণ ডাহলের বাবার ইচ্ছা ছিল সন্তানরা ইংরেজি স্কুলে পড়বে । ডাহলকে পাঠানো হয় ল্যান্ডাফ ক্যাথেড্রাল স্কুলে, তারপর রেপটন স্কুলে । এই স্কুলজীবন ছিল অসুখী। ডাহল নিজেই বলেছেন, ল্যান্ডাফ স্কুলের একমাত্র সুখস্মৃতি ছিল মিষ্টির দোকানে যাওয়া — যা পরে চার্লি অ্যান্ড দ্য চকলেট ফ্যাক্টরি-র অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়াবে । রেপটন স্কুলে তিনি প্রিফেক্টের ব্যক্তিগত দাস হিসেবে কাজ করতেন, আর এই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল ক্ষমতার অপব্যবহার কী ।
যুদ্ধের পাইলট থেকে গল্পকার: এক বিমান দুর্ঘটনা যেভাবে লেখক বানাল
স্কুল শেষে ডাহল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি, বরং শেল অয়েল কোম্পানিতে চাকরি নেন এবং ১৯৩৮ সালে তাকে আফ্রিকার তানজানিয়ায় পাঠানো হয় । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি রয়্যাল এয়ার ফোর্সে যোগ দেন ফাইটার পাইলট হিসেবে । ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর আফ্রিকায় তার বিমান বিধ্বস্ত হয়, তিনি গুরুতর আহত হন । সেই দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় তার প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প "শট ডাউন ওভার লিবিয়া" (১৯৪২) ।
লেখক সি. এস. ফরেস্টার তাকে তার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি গল্প লিখতে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি "আ পিস অফ কেক" নামের গল্পটি লেখেন, যা স্যাটারডে ইভনিং পোস্ট ১,০০০ ডলারে কেনে । এই একটি গল্পই তার লেখক জীবনের দরজা খুলে দেয়।
শিশুদের বই: বড়দের বিরুদ্ধে ছোটদের জয়
ডাহলের শিশুতোষ বইগুলোর কেন্দ্রীয় থিম একটাই — বড়রা সাধারণত খারাপ, আর শিশুরা তাদের বিরুদ্ধে জিতে যায়। তার গল্পে বাবা-মা প্রায় অনুপস্থিত, বা নিষ্ঠুর, বা বোকা। আর শিশুরা একা হাতে সেই অত্যাচারী বড়দের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
জেমস অ্যান্ড দ্য জায়ান্ট পিচ (১৯৬১) থেকে শুরু — বাবা-মা মারা যাওয়ার পর জেমস তার দুই নিষ্ঠুর খালার সাথে বাস করে, যারা তাকে মারধর করে। তারপর এক বিশাল পিচ তাকে নিয়ে যায় এক অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চারে । চার্লি অ্যান্ড দ্য চকলেট ফ্যাক্টরি (১৯৬৪) — দরিদ্র চার্লি যে চকলেট কারখানার টিকিট পায়, আর দুষ্টু বাচ্চারা একে একে শাস্তি পায়। মাটিল্ডা (১৯৮৮) — এক অসাধারণ মেধাবী মেয়ে, যার বাবা-মা তাকে ঘৃণা করে, যে আবিষ্কার করে তার টেলিকাইনেটিক শক্তি আছে, আর সেই শক্তি দিয়ে অত্যাচারী প্রধান শিক্ষিকা মিস ট্রাঞ্চবুলের বিরুদ্ধে লড়াই করে । দ্য বিএফজি (১৯৮২) — এক বিশাল বন্ধুত্বপূর্ণ দৈত্য যে শিশুদের স্বপ্ন ফুঁকে দেয় । দ্য উইচেস (১৯৮৩) — ডাইনি আর শিশুদের গল্প, যেখানে দাদি নায়কের একমাত্র রক্ষক ।
অন্ধকার, অশ্লীল আর বিদ্রোহী: কেন শিশুরা ডাহলকে ভালোবাসে
ডাহলের গল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অন্ধকার। তার গল্পে ভয় লুকিয়ে থাকে ছায়ায়, কিন্তু হাস্যরস সবসময় জয়ী হয় । ডাহল কখনো শিশুদের সাথে কথা বলার সময় তাদের ছোট করে দেখেননি। তিনি তাদের বোকার মতো কথা বলেননি, সহজ ভাষায় সবকিছু বুঝিয়ে দেননি। তিনি তাদের সাথে সোজাসুজি কথা বলেছেন, যেভাবে বড়দের সাথে কথা বলা হয় ।
ডাহল নিজে একবার বলেছিলেন, "শিশুরা যে জোকস পড়ে হাসে, আমিও সেই একই জোকস পড়ে হাসতে পারি" । তিনি শিশুদের কৌতূহল আর কল্পনাকে বিশ্বাস করতেন, তাদের "সাহস" আর "বিদ্রোহ"কে উৎসাহ দিতেন। দ্য টুইটস (১৯৮০) থেকে শুরু করে দ্য উইচেস পর্যন্ত — প্রতিটি গল্পে ডাহল দেখিয়েছেন, বড়রা যত শক্তিশালীই হোক, শিশুরা যদি চায়, তারা জিততে পারে।
কুয়েন্টিন ব্লেক: ডাহলের আঁকা মুখ
ডাহলের বইগুলোর আরেকটি বড় সৌন্দর্য হলো কুয়েন্টিন ব্লেকের আঁকা ছবি । ব্লেকের এলোমেলো, অদ্ভুত, প্রায় আলগা লাইনের ছবিগুলো ডাহলের গল্পের ভাষার সাথে এতটাই মিলে যায় যে, অনেকে ডাহলের চরিত্রগুলোকে ব্লেকের ছবি ছাড়া কল্পনাই করতে পারেন না। ডাহলের চরিত্রদের মুখগুলো ব্লেকের আঁকায় প্রথম জীবন্ত হয়ে ওঠে, আর সেই মুখগুলোই আজ কোটি কোটি শিশুর মনের ভেতরে বাস করে।
সমালোচনা: অ্যান্টিসেমিটিজম, যৌনবিদ্বেষ আর বর্ণবাদ
ডাহলের উত্তরাধিকার মোটেই সমালোচনামুক্ত নয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে অ্যান্টিসেমিটিজম, যৌনবিদ্বেষ, আর বর্ণবাদ-এর । তার সম্পাদকরা পর্যন্ত তার "ক্রমবর্ধমান বিদেশি-বিদ্বেষী, নারী-বিদ্বেষী আর বর্ণবাদী মন্তব্যে" বিরক্ত হয়েছিলেন । ২০২০ সালে তার পরিবার তার অ্যান্টিসেমিটিক মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছিল। ২০২৩ সালে তার কিছু বই নতুন করে সম্পাদনা করা হয়, যা নিয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে।
তবে ডাহলের সাহিত্যিক প্রতিভা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। দ্য টাইমস ২০০৮ সালে তাকে "১৯৪৫ সালের পরের ৫০ জন সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ লেখকের" তালিকায় ১৬তম স্থানে রেখেছে । ১৯৮৩ সালে তিনি ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড ফর লাইফ অ্যাচিভমেন্ট পান, আর ১৯৯০ সালে ব্রিটিশ বুক অ্যাওয়ার্ডের চিলড্রেনস অথর অফ দ্য ইয়ার হন । ২০০০ সালে ওয়ার্ল্ড বুক ডে উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে পাঠকরা তাকে সবচেয়ে প্রিয় লেখক হিসেবে ভোট দেয় ।
বাংলা ভাষায় ডাহল: মাতিল্ডা থেকে পচছক
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছেও ডাহল সমান জনপ্রিয়। রকমারি.কম, পাঠক পয়েন্ট, ওয়াফিলাইফ-এর মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তার অনেক বই পাওয়া যায়। মাটিল্ডা (অনুবাদ: আবুল বাসার, বাংলাপ্রকাশ) , জেমস অ্যান্ড দ্য জায়ান্ট পীচ (অনুবাদ: মোহাম্মদ শাহজাহান, উৎস প্রকাশন) , দ্য ইনোরমাস ক্রোকোডাইল (অনুবাদ: ওয়াসি আহমেদ, আফসার ব্রাদার্স) , দ্য ওয়ান্ডারফুল স্টোরি অফ হেনরি সুগার (অনুবাদ: সাগর রহমান, গোল্ডেন বুকস) , জিরাফ পেলি এবং আমি (অনুবাদ: মাহবুব সাদিক, নবযুগ প্রকাশনী) , পচছক (অনুবাদ: ওয়াসি আহমেদ, আফসার ব্রাদার্স) , ড্যানি পৃথিবীর সেরা বিজয়ী (বাংলাপ্রকাশ) — এই তালিকা দীর্ঘ।
রোয়াল্ড ডাহল মানে কেবল কিছু শিশুতোষ গল্প নয়। তিনি মানে সেই মানুষ, যিনি তিন বছর বয়সে বাবা-বোন হারিয়েছেন, যিনি অসুখী স্কুলজীবনে বড় হয়েছেন, যিনি যুদ্ধে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে বেঁচে গেছেন। তিনি মানে সেই কণ্ঠস্বর, যিনি শিশুদের শিখিয়েছেন বড়রা সবসময় সঠিক নয়, আর শিশুদেরও প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। তিনি মানে সেই প্রতিভা, যিনি প্রমাণ করেছেন শিশুদের বই অন্ধকার, ভয়ংকর আর বিদ্রোহী হতে পারে — আর সেটাই শিশুরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
ডাহল ১৯৯০ সালের ২৩ নভেম্বর ৭৪ বছর বয়সে মারা যান । কিন্তু তার গল্পগুলো আজও বেঁচে আছে, আর বেঁচে থাকবে — কারণ তিনি শিশুদের মন বুঝতেন, আর শিশুরা কখনো তাকে ভুলবে না।
ডিন কুন্টজ: সেই মানুষ, যিনি ভয়কে একা রাখেননি — তার সাথে নিয়ে গেছেন আশার আলোও
পরবর্তীসিডনি শেলডন: সেই মানুষ, যিনি প্রমাণ করেছেন পঞ্চাশ বছর বয়সেও নতুন করে শুরু করা যায়
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
