মস্তিষ্কের নিজস্ব মানচিত্র তৈরি করে কমানো যাবে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা?

ব্যথা শরীরের স্বাভাবিক সতর্কবার্তা। কোথাও আঘাত লাগলে, হাড় ভেঙে গেলে কিংবা অস্ত্রোপচারের পর শরীর আমাদের জানিয়ে দেয় যে সেখানে সমস্যা হয়েছে। সাধারণত ক্ষত সেরে উঠলে ব্যথাও ধীরে ধীরে কমে যায়। কিন্তু সব ব্যথার গল্প এত সরল নয়। অনেক মানুষের ক্ষেত্রে শারীরিক ক্ষত সেরে যাওয়ার পরও ব্যথা থেকে যায় মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর। এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা শুধু শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অংশের সমস্যা নয়; অনেক সময় এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের পরিবর্তন। আর সে কারণেই এমন ব্যথার চিকিৎসাও বেশ কঠিন।
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার চিকিৎসায় এবার নতুন একটি পদ্ধতি আশার আলো দেখাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা একজন মানুষের মস্তিষ্কে ব্যথার সংকেত কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কোন অঞ্চলগুলো এতে সক্রিয় হচ্ছে এবং কোথায় বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিলে সেই সংকেত কমানো যায়—এসবের একটি ব্যক্তিগত মানচিত্র তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। এরপর সেই মানচিত্র অনুযায়ী মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠিয়ে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের ছোট একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সবার ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি কাজ না করলেও কিছু রোগীর তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Brain Stimulation জার্নালে। এতে অংশ নিয়েছিলেন দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মুখের ব্যথায় ভোগা তিনজন মানুষ। গবেষকদের ধারণা ছিল, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা সবার মস্তিষ্কে একইভাবে তৈরি হয় না। ফলে সবাইকে একই জায়গায় বা একই ধরনের বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পাওয়া যেতে পারে। বরং প্রত্যেক মানুষের মস্তিষ্কে ব্যথার নিজস্ব পথ খুঁজে বের করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হলে ফলাফল ভালো হতে পারে।
এই ধারণা বাস্তবায়নের জন্য গবেষকেরা প্রথমে অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কে সাময়িক ইলেকট্রোড স্থাপন করেন। মাথার খুলিতে ছোট ছিদ্র করে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঞ্চলে এসব ইলেকট্রোড পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর তিন দিন ধরে গবেষকেরা মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠান এবং প্রতিটি উদ্দীপনার পর অংশগ্রহণকারীদের ব্যথার অনুভূতি পর্যবেক্ষণ করেন। এভাবে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেন, কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোন অংশে এবং কী ধরনের উদ্দীপনা দিলে ব্যথা কমে।
এই পরীক্ষার ফলাফলই দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষের মস্তিষ্ক কতটা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। তিনজনের মধ্যে একজন কোনো নির্দিষ্ট উদ্দীপনা পদ্ধতি থেকেই উল্লেখযোগ্য উপকার পাননি। অন্যদিকে, দুজনের ব্যথা পরীক্ষামূলক উদ্দীপনার সময় কমে আসে। অর্থাৎ একই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থাকলেও মস্তিষ্কে তার কার্যপ্রক্রিয়া একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। গবেষকদের কাছে এই পার্থক্যই ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা।
এই গবেষণায় অংশ নেওয়া চল্লিশের কোঠার এক নারী পরীক্ষার সময় বৈদ্যুতিক উদ্দীপনায় ভালো সাড়া দেন। এরপর তাঁর মস্তিষ্কের সেই অঞ্চলগুলোতে চারটি স্থায়ী ইলেকট্রোড বসানো হয়, যেগুলো পরীক্ষার সময় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। গবেষকেরা জানিয়েছেন, স্থায়ী ইমপ্ল্যান্ট বসানোর ছয় মাস এবং এক বছর পরও তাঁর ব্যথার অবস্থার উন্নতি বজায় ছিল। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জন ভিভেক বুচ জানিয়েছেন, ওই রোগী নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁর অবস্থা ভালো যাচ্ছে। পরীক্ষায় উপকার পাওয়া দ্বিতীয় নারীও ভবিষ্যতে স্থায়ী ইমপ্ল্যান্ট নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড বসিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত দেওয়ার প্রযুক্তি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন বা DBS নামের এই পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে পারকিনসনস রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিষণ্নতা এবং আরও কিছু স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রেও এর সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত এর ফলাফল খুব একটা ধারাবাহিক ছিল না। কিছু রোগী উপকার পেয়েছেন, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে তেমন ফল পাওয়া যায়নি।
সমস্যাটির একটি বড় কারণ হতে পারে ব্যথার জটিল প্রকৃতি। আমরা সাধারণত ব্যথাকে শরীরের কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থেকে আসা সংকেত হিসেবে ভাবি। বাস্তবে ব্যথার অনুভূতি তৈরি হওয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের একাধিক নেটওয়ার্ক জড়িত। সংবেদন গ্রহণের পাশাপাশি রাসায়নিক সংকেত, আবেগ এবং অন্যান্য মানসিক প্রক্রিয়াও এতে ভূমিকা রাখে। এসব সংকেত একসঙ্গে কাজ করেই শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের মধ্যে ‘ব্যথা হচ্ছে’—এই অনুভূতি তৈরি করে। তাই একজনের মস্তিষ্কে যে জায়গায় ব্যথার সংকেত সবচেয়ে বেশি সক্রিয়, অন্য একজনের ক্ষেত্রে সেটি একই জায়গা নাও হতে পারে।
এ কারণেই নতুন পদ্ধতিটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। এখানে চিকিৎসক বা গবেষক আগে থেকে ধরে নিচ্ছেন না যে প্রত্যেক মানুষের ব্যথার জন্য মস্তিষ্কের একই জায়গা দায়ী। বরং পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথমে খুঁজে বের করা হচ্ছে ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির মস্তিষ্কে ব্যথার সংকেত কোথায় এবং কীভাবে কাজ করছে। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনার জায়গা ও ধরন নির্ধারণ করা হচ্ছে।
এই পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—চিকিৎসা কাজ করবে না, সেটিও আগে থেকে বোঝার সুযোগ তৈরি হতে পারে। গবেষণায় যে ব্যক্তি বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা থেকে উল্লেখযোগ্য উপকার পাননি, তাঁর ক্ষেত্রেও পরীক্ষাটি ব্যর্থ হয়নি। বরং গবেষকেরা বুঝতে পেরেছেন যে স্থায়ী চিকিৎসার জন্য তাঁকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভবত উপযুক্ত হবে না। স্ট্যানফোর্ডের নিউরোসায়েন্টিস্ট ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ডেইসেরথের মতে, কোনো রোগীর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা কাজ করবে কি না, তা আগে থেকে বোঝার মতো একটি নির্ভরযোগ্য উপায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে এখানেই গবেষণাটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মাত্র তিনজন মানুষের ওপর পরিচালিত এই গবেষণা খুবই ছোট এবং প্রাথমিক পর্যায়ের। আরও অনেক রোগীর ওপর বড় আকারের গবেষণা প্রয়োজন হবে। দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের ইলেকট্রোড কতটা নিরাপদ, কতদিন পর্যন্ত উপকার বজায় থাকে এবং কোন ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় এই পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো কাজ করে—এসব প্রশ্নের উত্তরও এখনও পাওয়া যায়নি।
তারপরও গবেষণাটি নিউরোসায়েন্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতের চিকিৎসা হয়তো শুধু রোগের নামের ওপর নির্ভর করবে না; বরং একজন নির্দিষ্ট মানুষের মস্তিষ্কে সেই রোগ কীভাবে কাজ করছে, সেটিও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থেকে শুরু করে আরও নানা ধরনের স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যায় ব্যক্তির মস্তিষ্কের নিজস্ব কার্যপ্রক্রিয়া শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়ার ধারণা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ব্যথা কমানোর এই গবেষণা তাই শুধু একটি নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির গল্প নয়। এটি মস্তিষ্ককে আরও ব্যক্তিগতভাবে বোঝারও একটি প্রচেষ্টা। হয়তো ভবিষ্যতে চিকিৎসকের কাছে শুধু ‘কোন রোগ হয়েছে’—এই প্রশ্নের উত্তর যথেষ্ট হবে না। তার সঙ্গে জানতে হবে, এই নির্দিষ্ট মানুষের মস্তিষ্কে সমস্যাটি কোথায়, কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং কোন উপায়ে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মস্তিষ্কের মানচিত্র তৈরির এই গবেষণা সেই ভবিষ্যতের দিকেই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জল্লাদখানা বধ্যভূমি: মিরপুরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের নির্মম ইতিহাস
পরবর্তীউইলিয়াম শেক্সপিয়ার: সেই মহাপুরুষ, যিনি মানবসভ্যতার আত্মাকে ভাষা দিয়েছিলেন
সম্পর্কিত সংবাদ
বিজ্ঞান বার্তা
টেকসই জ্বালানির ভবিষ্যৎ: বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও তরুণ গবেষকদের ভূমিকা
বিজ্ঞান বার্তা
মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা শক্তি: কেন ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের জ্বালানি বিশ্ব

বিজ্ঞান বার্তা
কাগজের আবিষ্কার: যে উদ্ভাবন জ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছিল মানুষের ঘরে ঘরে
বিজ্ঞান বার্তা
জিপিএস (GPS): পৃথিবীর যেকোনো জায়গা খুঁজে পেতে যে প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন

বিজ্ঞান বার্তা
স্মার্টফোন: যে আবিষ্কার মানুষের পকেটেই এনে দিয়েছে পুরো পৃথিবী
বিজ্ঞান বার্তা
অ্যারিস্টটল: যে দার্শনিক যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত খুলেছিলেন
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
