জর্জ সিমেনঁ: সেই মানুষ, যিনি অপরাধকে দেখেছিলেন মানব আত্মার আয়না হিসেবে
সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত লেখক

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যারা জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও সাহিত্যিক মর্যাদার স্বীকৃতি পেয়েছেন সর্বোচ্চ মহল থেকে। জর্জ সিমেনঁ তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর, সবচেয়ে উৎপাদনশীল, আর সবচেয়ে রহস্যময় নাম। আন্দ্রে জিদ তাকে বলেছিলেন “আমাদের সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ফরাসি ঔপন্যাসিক”, আর নিজে জিদ একদিনে তার আটটা বই গোগ্রাসে গিলেছিলেন। তিনি লিখেছেন দুশোরও বেশি উপন্যাস, যার মধ্যে চুরাশিটি মাইগ্রে সিরিজের, আর বাকিগুলো তিনি নিজেই বলতেন “রোমাঁ দ্যুর” — কঠিন উপন্যাস। তার বই বিক্রি হয়েছে পঞ্চাশ কোটিরও বেশি, অনূদিত হয়েছে পঞ্চাশেরও বেশি ভাষায়। অথচ তিনি নিজেই বলতেন, মাইগ্রে লেখেন “বিশ্রাম নেওয়ার জন্য”, আর তার আসল কাজ লুকিয়ে আছে সেইসব উপন্যাসে, যেখানে তিনি মানুষের আত্মার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ঢুকে পড়েন।
১৯০৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার, বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন জর্জ জোসেফ ক্রিশ্চিয়ান সিমেনঁ। তার বাবা দেজিরে ছিলেন একজন হিসাবরক্ষক, মা অঁরিয়েত ছিলেন এক ডিপার্টমেন্ট স্টোরের কর্মচারী। সিমেনঁর মা ছিলেন প্রভাবশালী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আর টাকার অভাবের ভয়ে সবসময় আচ্ছন্ন। সেই অভাব পূরণের জন্য তিনি বাড়িতে ভাড়াটে রাখতেন — বেশিরভাগই বিদেশি ছাত্র। ছোট্ট জর্জ সেই ভাড়াটেদের মধ্যেই বড় হয়েছেন, তাদের গল্প শুনেছেন, তাদের জীবন দেখেছেন। এই অভিজ্ঞতাই তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল, মানুষ কত বিচিত্র, কত জটিল, আর কত নিঃসঙ্গ।
আট বছর বয়স থেকে তিনি ছিলেন বাভিয়ের হাসপাতালের চ্যাপেলের কোরাস বয়। সেই অভিজ্ঞতা ফিরে এসেছে তার “ল’অ্যাফেয়ার সাঁ-ফিয়াক্র” আর “লে তেমোয়ানিয়াজ দ্য ল’অঁফঁ দ্য ক্যোর”-এ। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়, ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বরে, তিনি কলেজ সাঁ-লুইতে ভর্তি হন। বারো বছর বয়সেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন — তিনি সারা জীবন উপন্যাস লিখবেন। তারপর কলেজ সাঁ-সার্ভে-তে তিন বছর পড়াশোনা। কিন্তু ১৯১৬ সালে পারিবারিক ডাক্তার তাকে জানান, তার বাবার বেশি দিন বাকি নেই, তাকে কাজ করতে হবে। ১৯১৮ সালের জুনে, পরীক্ষা না দিয়েই তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এরপর বেকারির শিক্ষানবিশ, বইয়ের দোকানের কেরানি — ছোট ছোট কাজ করতে থাকেন।
১৯১৯ সালে, মাত্র ষোলো বছর বয়সে, তিনি যোগ দেন “লা গ্যাজেত দ্য লিয়েজ” পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে। এই কাজ তাকে শহরের নিচুতলার জীবন দেখার সুযোগ দিল — রাজনীতি, অপরাধ, রাতের জীবন, বারের অতিরেক্ত, পতিতালয়ের অন্ধকার। তিনি শিখলেন দ্রুত সম্পাদনার শিল্প। “জি. সিম” ছদ্মনামে তিনি এক হাজারেরও বেশি নিবন্ধ লিখেছিলেন। সেই সময়েই তিনি পুলিশি তদন্তে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, ফরাসি ক্রিমিনোলজিস্ট এদমোঁ লোকারের দেওয়া পুলিশি কৌশলের বক্তৃতায় অংশ নিতেন।
১৯২১ সালে তিনি লিয়েজ ছেড়ে প্যারিসে চলে যান। দুই বছর পর বিয়ে করেন রেজিন রেনশঁকে, যার ডাকনাম ছিল “তিজি”। ১৯২৩ সালে কোলেতের সাথে তার পরিচয় হয়, এবং কোলেতের পরামর্শ তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। কোলেত তাকে বলেছিলেন: “সহজ গল্প লেখো, সাহিত্য না।” এই পরামর্শই সিমেনঁর স্টাইলের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় — সংক্ষিপ্ত বাক্য, ন্যূনতম বর্ণনা, বিশেষণ ও ক্রিয়া-বিশেষণের মিতব্যয়িতা।
১৯২৯ সালে জন্ম নেয় ইন্সপেক্টর মাইগ্রে। এই চরিত্রটি তাকে রাতারাতি খ্যাতি এনে দেয়, কিন্তু সিমেনঁর সম্পর্ক মাইগ্রের সাথে ছিল জটিল। তিনি বলতেন, মাইগ্রে লেখেন “কঠিন উপন্যাসের মাঝে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য”। তিনি মাইগ্রের উপর কিছুটা বিরক্তও ছিলেন, কারণ বহু মানুষের কাছে সিমেনঁ মানেই শুধু মাইগ্রের স্রষ্টা। তিনি মনে করতেন, তার আসল কাজ অন্যত্র। দুইশো উপন্যাসের মধ্যে মাত্র পঁচাত্তরটি মাইগ্রে সিরিজের। কিন্তু সময়ের সাথে তিনি মেনে নেন, এবং আজকের দৃষ্টিতে সিমেনঁর সম্পূর্ণ কাজ একসাথে বিচার করা উচিত — মাইগ্রে আর কঠিন উপন্যাস মিলিয়ে এক বিশাল ক্যানভাস, যার নাম দেওয়া যায় “মানব অবস্থা”।
মাইগ্রে চরিত্রটি নিজেই এক বিস্ময়। তিনি পার্থিব, সংসারী, পাইপ খাওয়া এক ফরাসি বুর্জোয়া। তার প্রিয় খাবার কডের ক্রিম, মিষ্টি লেবুর ক্রিম। তিনি তাড়াহুড়ো ঘৃণা করেন, শান্ত স্বভাবের, কোনো স্কুলশিক্ষক বা দেশি ডাক্তারের মতো দেখতে। অথচ এই সাধারণ মানুষটির গভীর অন্তর্দৃষ্টি, মানুষের প্রতি অসীম সহানুভূতি। মাইগ্রে আঙুলের ছাপ, পায়ের ছাপ, অ্যালিবাই — এসব নিয়ে মাথা ঘামান না। কখনো কখনো মৃতদেহের দিকে ঠিকভাবে তাকানও না। তার কম্পাস যুক্তির নয়, আবেগের। তিনি খুঁজে বের করেন সেই মানসিক সংকট, যা অপরাধের জন্ম দিয়েছে। সত্য উদঘাটনের সাথে সাথে সাধারণত অপরাধীর প্রতি সহানুভূতি জাগে, এক ধরনের ক্ষমা।
সিমেনঁর সাহিত্যিক উদ্দেশ্য ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তিনি মনে করতেন, আধুনিক উপন্যাস মানে আমাদের যুগের ট্র্যাজেডির পুনর্নির্মাণ, গ্রিক ট্র্যাজেডির মতোই যার একমাত্র কাজ মানুষের ভাগ্য ও নিয়তির প্রশ্ন তোলা। তিনি তার উপন্যাসগুলোকে বলতেন “রোমাঁ-ত্রাজেদি”। তার গল্প শুরু হয় সংকটের মুহূর্তে, তারপর অবশ্যম্ভাবীভাবে এগিয়ে চলে ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে। ফ্রাঁসোয়া মোরিয়াক বলেছিলেন, সিমেনঁর কাজ “দুঃস্বপ্ন, যা শিল্পসম্মতভাবে বর্ণিত, এবং যার গভীরে তাকানোর সাহস খুব কম মানুষের আছে”।
সিমেনঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এই — তিনি প্রমাণ করেছেন জনপ্রিয়তা আর সাহিত্যিক গুণ একসাথে থাকতে পারে। আন্দ্রে জিদ তাকে “আমাদের সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ফরাসি ঔপন্যাসিক” বলেছেন। আবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের সমালোচক তার স্টাইলকে “এতটাই নীরব, প্রায় বৈশিষ্ট্যহীন” বলে বর্ণনা করেছেন। কেউ বলেছেন তিনি “সাসপেন্সের জোলা বা বালজাক”। আবার কেউ বলেছেন তার বই “প্রোডাকশন লাইন” থেকে আসা, “কাস্টম-মেড নয়”। এই বিতর্কই প্রমাণ করে, সিমেনঁ কোনো সহজ বিভাজনে পড়েন না।
তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল তার উপন্যাসের মতোই জটিল। তিনি ছিলেন অ্যালকোহলিক, নারী-লোভী, ঈর্ষাপরায়ণ। তার বিবাহিত জীবন শেষ হয়েছিল ট্র্যাজেডিতে — তার কন্যার আত্মহত্যায়। তিনি বলতেন তার আদর্শ ছিল পারিবারিক জীবন, অথচ তার মায়ের সাথে পঞ্চাশ বছরের ঝগড়া চলত, আর তার নিজের পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তিনি দুইবার বিয়ে করেছেন, শত শত নারীকে মোহিত করেছেন — জোসেফিন বেকার সহ। তার স্ত্রী তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেন। একবার এক হোটেলে তিনি একের পর এক চারজন নারীকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, আর তার স্ত্রী পাশের ঘরে লাগেজ গোছাচ্ছিলেন।
সিমেনঁ উপন্যাস লিখতেন এক সপ্তাহে, লক করে নিজেকে স্টাডিতে। কখনো কখনো খামের পিছনে কিছু নোট নিয়ে ঢুকতেন, বেরোতেন সম্পূর্ণ উপন্যাস নিয়ে। এরপর কয়েকদিন সংশোধন। বছরে চারবার এই প্রক্রিয়া। বাকি সময় পরিবারের সাথে, গলফ খেলে, পড়ে। তিনি বলেন, লেখার সময় তার একমাত্র সঙ্গী ছিল তার টাইপরাইটার — এমনকি নৌকায় চড়ে ফ্রান্সের নদীগুলো ঘোরার সময়ও। তিনি বিশ্বাস করতেন, শহরের আসল চেহারা দেখা যায় নদীর দিক থেকে, রাস্তার দিক থেকে নয়।
তার প্রভাব আজও অপরিমেয়। ফরাসি অপরাধ সাহিত্যে জাঁ-পাত্রিক মাঞ্চেত, এর্ভে প্রুদোঁ, তিয়েরি জোঁকে — সবার মধ্যে সিমেনঁর প্রভাব রয়েছে, যদিও সেটা সরাসরি নয়, বরং আরও সূক্ষ্ম, প্রায় গন্ধের মতো ছড়ানো। তিনি মাইগ্রের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, গোয়েন্দা কাহিনি কেবল ধাঁধাঁ নয় — এটা মানুষের আত্মার অন্বেষণ। সিমেনঁর মাইগ্রে হলেন সেই চরিত্র, যিনি অপরাধের পিছনে খুঁজে বের করেন মানুষটাকে, আর মানুষটার পিছনে খুঁজে বের করেন তার ভাগ্যকে।
শেষ বিচারে, জর্জ সিমেনঁ মানে কেবল কিছু গোয়েন্দা উপন্যাস নয়। তিনি মানে সেই মানুষ, যিনি ছোটবেলায় ভাড়াটেদের গল্প শুনে বড় হয়েছেন, যিনি রিপোর্টার হিসেবে শহরের অন্ধকার দেখেছেন, যিনি নিজের জীবনে সেই অন্ধকারের অনেকটাই বেঁচে গেছেন। তিনি মানে সেই কণ্ঠস্বর, যিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়, ষড়যন্ত্র, উদ্বেগ আর নিঃসঙ্গতাকে তুলে এনেছেন এবং দেখিয়েছেন, এই সবকিছু এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে — হিংসা বা অপরাধে। সিমেনঁর মাইগ্রে কোনো অতিমানব নন, তিনি একজন সাধারণ মানুষ, যিনি অন্য সাধারণ মানুষদের ভুল, দুর্বলতা, আর কখনো কখনো অপরাধের মুখোমুখি হন — বিচার না করে, বোঝার চেষ্টা করে। আর সেই বোঝার চেষ্টাই সম্ভবত সিমেনঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
হ্যারল্ড রবিন্স: সেই মানুষ, যিনি আমেরিকান স্বপ্নের অন্ধকার দিকটাকে বিক্রি করে কোটিপতি হয়েছিলেন
পরবর্তীজে. কে. রাউলিং: সেই নারী, যিনি একা মা থেকে উঠে এসে গোটা একটা প্রজন্মকে বই পড়তে শিখিয়েছিলেন
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
