হ্যারল্ড রবিন্স: সেই মানুষ, যিনি আমেরিকান স্বপ্নের অন্ধকার দিকটাকে বিক্রি করে কোটিপতি হয়েছিলেন
সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত লেখক
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যারা সাহিত্যিক মর্যাদার চেয়ে পাঠকের নাড়ি ছোঁয়ার ক্ষমতাকে বড় করে দেখেছেন। হ্যারল্ড রবিন্স তাদের মধ্যে সবচেয়ে নির্মম, সবচেয়ে সাহসী, আর সবচেয়ে বিতর্কিত নাম। বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রীত কথাসাহিত্যিকদের তালিকায় তিনি পঞ্চম — শেক্সপিয়ার, আগাথা ক্রিস্টি, বারবারা কার্টল্যান্ড আর ড্যানিয়েল স্টিলের পরেই । তার বই বিক্রি হয়েছে সাতশো পঞ্চাশ মিলিয়নেরও বেশি কপি, অনূদিত হয়েছে বত্রিশটি ভাষায় । অথচ তিনি যা লিখেছেন, সেটাকে কেউ সাহিত্য বলে ডাকতে রাজি নয় — সমালোচকরা তাকে বলেছেন "আবর্জনার স্তূপের রাজা", আবার পাঠকরা তাকে বানিয়েছেন রাতারাতি কোটিপতি।
১৯১৬ সালের ২১ মে নিউইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন হ্যারল্ড রুবিন — যিনি পরে হ্যারল্ড রবিন্স নামে পরিচিত হবেন। তার বাবা ছিলেন ম্যানহাটনের একজন সফল ফার্মাসিস্ট, পরিবারটি ছিল শিক্ষিত, রুশ-পোলিশ অভিবাসী, সচ্ছল । কিন্তু রবিন্স কখনো এই সত্যিটা মেনে নিতে চাননি। তিনি বরং গোটা জীবনে একটা ভুয়া জীবনী রচনা করে বেড়িয়েছেন — বলতেন তিনি ইহুদি এতিম, ক্যাথলিক অনাথ আশ্রমের সিঁড়িতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, বিশ বছর বয়সে চিনি ব্যবসা করে প্রথম মিলিয়ন ডলার কামিয়েছিলেন, তারপর সব হারিয়ে হলিউডে চলে যান । সত্যিটা অনেক বেশি প্রозаик: তিনি ব্রুকলিনে বাবা-মায়ের সাথে বড় হয়েছেন, জর্জ ওয়াশিংটন হাই স্কুলে পড়েছেন, আর বাস্তব জীবনে যা করেছেন তা হলো — দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা এক সাধারণ ছেলে, যিনি হলিউডে ইউনিভার্সাল পিকচার্সে চাকরি নিয়ে নিজের ভাগ্য বদলেছেন ।
তার লেখক হয়ে ওঠার গল্পটা নিজেই একটা রবিন্স উপন্যাসের মতো। ১৯৪৮ সালে, ইউনিভার্সাল পিকচার্সে এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করার সময়, সহকর্মীর সাথে একশো ডলারের বাজি ধরে তিনি লিখতে বসেন নেভার লাভ আ স্ট্রেঞ্জার — এবং সেটা বেস্টসেলার হয়ে যায় । এরপর তিনি আর থামেননি। ১৯৫৭ সাল থেকে তিনি পূর্ণকালীন লেখক । তার কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে দ্য ড্রিম মার্চেন্টস (১৯৪৯), আ স্টোন ফর ড্যানি ফিশার (১৯৫১), দ্য কার্পেটব্যাগার্স (১৯৬১), দ্য বেটসি (১৯৭১), দ্য স্টোরিটেলার (১৯৮২) — মোট তেইশটিরও বেশি উপন্যাস ।
কিন্তু রবিন্সের আসল প্রতিভা ছিল একটাই — তিনি জানতেন পাঠক আসলে কী চায়। আর পাঠক চায় রোমাঞ্চ, ক্ষমতা, যৌনতা, মাদক, আর সেই সব গোপন কাহিনি যা সম্পর্কে সবাই জানতে চায় কিন্তু কেউ বলতে সাহস পায় না। রবিন্স সেটাই করেছেন, নির্দ্বিধায়, নির্মমভাবে, প্রায় অশ্লীলভাবে। দ্য কার্পেটব্যাগার্স তার সবচেয়ে বড় সাফল্য — এই বইয়ের চরিত্রগুলো আংশিকভাবে বিমান টাইকুন হাওয়ার্ড হিউজ আর অভিনেত্রী জিন হার্লোর উপর ভিত্তি করে তৈরি । বইটি লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়, আর সেই টাকায় রবিন্স সেই জীবনযাপন শুরু করেন যা তিনি তার উপন্যাসে বর্ণনা করতেন ।
তার সাহিত্যিক স্টাইল সম্পর্কে কোনো বিভ্রান্তি নেই। টাইম ম্যাগাজিন দ্য বেটসি নিয়ে রিভিউ করতে গিয়ে লিখেছিল, "আবর্জনার ইতিহাসে দুইজন সর্বশ্রেষ্ঠ মহা-বাজে লেখক সদ্য অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে উপন্যাস প্রকাশ করেছেন। আর্থার হেইলির হুইলস এসেছে আগে, এখন হ্যারল্ড রবিন্স এসেছেন হেইলিকে গুলি করে মারতে" । সেই রিভিউতে বলা হয়েছে, "অনেক যৌনতা আছে, যার বেশিরভাগই জড়িত এক মহিলা টেস্ট ড্রাইভারের সাথে, যিনি ইঞ্জিনের গর্জন শুনলেই নিজে নিজে জ্বলে ওঠেন" । এর চেয়ে নির্দয় মূল্যায়ন সম্ভবত হয় না। কিন্তু রবিন্স কখনো এই সমালোচনায় বিচলিত হননি। তিনি নিজেই বলতেন, তিনি "সরল ইংরেজিতে পৃথিবীর সেরা লেখক" ।
রবিন্স জানতেন তার পাঠক কারা। তারা সেই মানুষ, যারা সিনেমার পর্দায় দেখে আসেন গ্ল্যামার, সোনালি হলিউড, রাতের পার্টি, আর দামি গাড়ি — অথচ পর্দার আড়ালে কী ঘটে, কে কার সাথে শোবার ঘরে যায়, কে কার খুনের নির্দেশ দেয়, কে কার ব্যবসা দখল করে — সেই গল্প কেউ বলে না। রবিন্স সেটাই বলেছেন, নির্দ্বিধায়, সম্ভবত নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। কারণ তিনি নিজেই তো সেই জগতের ভেতরে ছিলেন — হলিউডের এক্সিকিউটিভ, মিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়ী, পাঁচবার বিবাহিত, আর শেষ জীবনে হুইলচেয়ারে আবদ্ধ ।
তার বই থেকে তৈরি হয়েছে তেরোটি সফল চলচ্চিত্র, আর টেলিভিশন সিরিজ — যেখানে অভিনয় করেছেন এলভিস প্রেসলি, স্টিভ ম্যাককুইন, লরেন্স অলিভিয়ের, বেট ডেভিস, রবার্ট ডুভালের মতো তারকারা । তার আ স্টোন ফর ড্যানি ফিশার থেকে তৈরি হয় কিং ক্রেওল (১৯৫৮), যেখানে এলভিস প্রেসলি অভিনয় করেন — অনেকে বলেন এটি এলভিসের সেরা অভিনয় । দ্য বেটসি থেকে তৈরি হয় একই নামের চলচ্চিত্র, হোয়ার লাভ হ্যাজ গন থেকে তৈরি হয় অস্কার মনোনীত ছবি ।
১৯৯৭ সালের ১৪ অক্টোবর, একাশি বছর বয়সে, ক্যালিফোর্নিয়ার পাম স্প্রিংসে শ্বাসযন্ত্রের হৃদযন্ত্র বিকলের কারণে মৃত্যুবরণ করেন হ্যারল্ড রবিন্স । তার মৃত্যুর পরেও ভূত-লেখকরা তার নোট আর অসমাপ্ত গল্পের ভিত্তিতে নতুন বই প্রকাশ করতে থাকেন । কারণ রবিন্স নামটা এখনো বিক্রি হয় — কারণ তিনি যে জিনিসটা বিক্রি করতেন, সেটার চাহিদা কোনোদিন শেষ হয় না।
শেষ বিচারে, হ্যারল্ড রবিন্স মানে কেবল কিছু বেস্টসেলার উপন্যাস নয়। তিনি মানে সেই মানুষ, যিনি আমেরিকান স্বপ্নের গায়ে সোনার প্রলেপ জড়ানো ভণ্ডামিটা তুলে ধরেছেন, আর দেখিয়েছেন — সাফল্যের পিছনে লুকিয়ে থাকে খুন, যৌনতা, লোভ, আর বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি মানে সেই কণ্ঠস্বর, যিনি সাহিত্যিক সমালোচকদের ঘৃণা কুড়িয়েছেন, তবু কোটি কোটি পাঠকের হাতে তার বই পৌঁছে দিয়েছেন। হ্যারল্ড রবিন্স কোনো এক দেশের, এক যুগের, এক ভাষার লেখক নন — তিনি সমগ্র মানবজাতির সেই লুকানো কামনা-বাসনার প্রতিনিধি, যারা ভদ্র সমাজের পর্দার আড়ালে বসে ভাবতে ভালোবাসে — ভেতরে আসলে কী ঘটে?
ড্যানিয়েল স্টিল: সেই নারী, যিনি মানুষের হৃদয়ের সমস্ত ভাঙন আর পুনর্জন্মকে অক্ষরে বন্দি করে ফেলেছেন
পরবর্তীজর্জ সিমেনঁ: সেই মানুষ, যিনি অপরাধকে দেখেছিলেন মানব আত্মার আয়না হিসেবে
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
