জে. কে. রাউলিং: সেই নারী, যিনি একা মা থেকে উঠে এসে গোটা একটা প্রজন্মকে বই পড়তে শিখিয়েছিলেন
সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত লেখক

সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু প্রতিভা আছেন, যাদের জন্ম কোনো এক যুগে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তারা কালের স্রোতকে নিজের ভেতর ধারণ করে যুগ যুগ ধরে পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। জে. কে. রাউলিং তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর, সবচেয়ে প্রভাবশালী, আর সবচেয়ে বিতর্কিত নাম। তার হ্যারি পটার সিরিজের সাতটি বই বিক্রি হয়েছে ছয়শো মিলিয়নেরও বেশি কপি, অনূদিত হয়েছে ৮৫টিরও বেশি ভাষায়, আর আটটি চলচ্চিত্র মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী আয় করেছে ৭৭০ কোটি ডলারেরও বেশি । কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নারীর জীবনের এক অসাধারণ যাত্রা — এক কিশোরীর কল্পনা থেকে জন্ম নেওয়া এক জাদুকর, আর সেই জাদুকরকে ঘিরে এক নারীর দারিদ্র্য থেকে কোটিপতি হয়ে ওঠার গল্প।
১৯৬৫ সালের ৩১ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়েটে জন্মগ্রহণ করেন জোয়ান রাউলিং । তার বাবা পিটার ছিলেন রোলস রয়েস কারখানার বিমান প্রকৌশলী, আর মা অ্যান ছিলেন ওয়াইডিয়ান কমপ্রিহেনসিভ স্কুলের রসায়ন বিভাগের প্রযুক্তিবিদ । ছোটবেলা থেকেই জো বইয়ের মধ্যে বড় হয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, “আমি বইয়ের জন্য বেঁচে থাকতাম। আমি ছিলাম এক সাধারণ বইপোকা, সাথে ফ্রেকলস আর ন্যাশনাল হেলথ স্পেক্টাকল” । মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি প্রথম গল্প লেখেন — একটি খরগোশকে নিয়ে, যার নাম দিয়েছিলেন ‘র্যাবিট’। এগারো বছর বয়সে তিনি লিখে ফেলেন তার প্রথম উপন্যাস — সাতটি অভিশপ্ত হীরা আর তাদের মালিকদের নিয়ে ।
কিন্তু রাউলিংয়ের জীবন কখনো সহজ ছিল না। তার মা অ্যানের মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস ধরা পড়ে যখন জো কিশোরী, আর ১৯৯০ সালে, হ্যারি পটারের প্রথম বই প্রকাশিত হওয়ারও আগে, তিনি মারা যান । সেই বছরেরই একটি ঘটনা বদলে দেয় রাউলিংয়ের জীবন — ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডন কিংস ক্রস স্টেশনে যাওয়ার পথে ট্রেন দেরি হয়ে যায়, আর সেই অবসরে তার মাথায় আসে হ্যারি পটারের চরিত্র এবং হগওয়ার্টসের ধারণা । পরের পাঁচ বছরে তিনি সাতটি বইয়ের সম্পূর্ণ পরিকল্পনা মাথায় এঁকে ফেলেন, বেশিরভাগ সময় হাতে লিখতেন, আর নোট জমাতেন ছোট ছোট কাগজের টুকরোয় ।
১৯৯২ সালে তিনি পর্তুগালে চলে যান ইংরেজি শেখাতে, সেখানে বিয়ে করেন সাংবাদিক জর্জ আরান্তেসকে, আর ১৯৯৩ সালে জন্ম নেয় তার কন্যা জেসিকা । কিন্তু সেই বিয়ে টেকেনি, এবং বছর শেষে তিনি সদ্যোজাত কন্যাকে নিয়ে ফিরে আসেন এডিনবরায়, হাতে একটি স্যুটকেস আর হ্যারি পটারের প্রথম তিনটি অধ্যায়ের পাণ্ডুলিপি । এডিনবরায় তিনি শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ নেন, কিন্তু সেই সাথে প্রতি মুহূর্তে লেখা চালিয়ে যান । তখন তিনি থাকতেন সরকারি সাহায্যের উপর, “বিরক্তিকর আর বিষণ্ণ” সরকারি বাসস্থানে । তিনি প্রাম নিয়ে জেসিকাকে ঘোরাঘুরি করাতেন যতক্ষণ না সে ঘুমিয়ে পড়ে, তারপর ক্যাফেতে গিয়ে লেখেন। তার প্রিয় ক্যাফে নিকোলসনের মালিকরা তাকে সারা দিন থাকতে দিতেন — জেসিকা পাশে ঘুমিয়ে থাকত, আর রাউলিং শুধু একটা গ্লাস পানি আর এক কাপ এসপ্রেসো অর্ডার করে হাতে লিখে যেতেন । স্কটিশ আর্টস কাউন্সিলের অনুদান দিয়ে তিনি একটা টাইপরাইটার কেনেন, আর সেটাতেই টাইপ করেন সেই পাণ্ডুলিপি, যা একদিন ব্লুমসবেরিকে হ্যারি পটার প্রকাশে রাজি করাবে ।
প্রকাশকরা প্রথমে রাউলিংকে “জে. কে.” নাম ব্যবহার করতে বলেন, কারণ তারা মনে করেছিল একজন স্পষ্টতই নারী লেখকের বই কিশোর ছেলেদের কাছে আকর্ষণীয় নাও লাগতে পারে । রাউলিংয়ের কোনো মিডল নেম ছিল না, তাই তিনি তার দাদি ক্যাথলিনের নাম থেকে ‘কে’ নেন । ১৯৯৭ সালের জুন মাসে ব্লুমসবেরি চিলড্রেনস বুকস থেকে প্রকাশিত হয় হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন, এবং রাউলিং তখন ছিলেন একজন ফরাসি শিক্ষক । প্রকাশের পরপরই এটি রাতারাতি sensation হয়ে যায়, ব্রিটিশ বুক অ্যাওয়ার্ডসের “চিলড্রেনস বুক অফ দ্য ইয়ার” জেতে, আর তিনি টানা তিন বছর স্মার্টিজ বুক প্রাইজ জেতেন — একমাত্র লেখক হিসেবে ।
এরপরের গল্পটা ইতিহাস। সাতটি বই, প্রতিটি হ্যারির হগওয়ার্টসের একেক বছরের গল্প । প্রতিটি বই বেস্টসেলার, প্রতিটি বই আগেরটার চেয়ে বেশি পাঠক আনে। চূড়ান্ত বই ডেথলি হ্যালোজ প্রকাশের প্রথম দিনেই বিক্রি হয় ৮৩ লক্ষ কপি — প্রকাশনার ইতিহাসে এক রেকর্ড । সিরিজটি অনূদিত হয় ৮৫টিরও বেশি ভাষায়, ২০০টিরও বেশি অঞ্চলে পাওয়া যায়, আর অডিওবুক শোনা হয় একশো কোটিরও বেশি ঘণ্টা । আটটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়, যার শেষটি ২০১১ সালে মুক্তি পায়, আর মোট আয় ৭৭০ কোটি ডলারেরও বেশি ।
কিন্তু হ্যারি পটারের সবচেয়ে বড় প্রভাব সম্ভবত প্রকাশনার জগতে, পাঠকের অভ্যাসে। এই সিরিজটি প্রমাণ করেছে শিশুদের বই প্রাপ্তবয়স্করাও পড়তে পারে — এই সীমারেখা প্রথমবার ভেঙে গেছে হ্যারি পটারের হাতেই । ডিকিন ইউনিভার্সিটির সাহিত্যের সিনিয়র লেকচারার মিশেল স্মিথ বলেছেন, ১৯৯০-এর দশকে ফ্যান্টাসি জঁর প্রায় মৃতপ্রায় ছিল, কেউ সেটা ছুঁতে চাইত না — “পুরনো ধাঁচের” মনে হতো। কিন্তু হ্যারি পটার প্রমাণ করেছে ফ্যান্টাসি আবার জীবন্ত হতে পারে, এবং সেটা শিশুদের বইয়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী জঁর হয়ে ওঠে । অরসন স্কট কার্ড, যিনি নিজে একজন বিখ্যাত লেখক, একবার লিখেছিলেন: “হ্যারি পটার শুরু থেকেই সমস্ত নিয়ম ভেঙেছে। এটি বিক্রি হয়েছে কারণ গল্পটি কল্পনাময় আর মুগ্ধকর ছিল, আর সেটা স্পষ্ট ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল। সাধারণ পাঠক সাহিত্যিক অভিজাতদের চেয়ে অনেক বেশি বিচক্ষণ” ।
রাউলিংয়ের লেখার সাফল্যের পিছনে একটা গভীর মানবিক কারণ আছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক গোলটেবিল আলোচনায় বলা হয়েছিল, হ্যারি পটার আমাদের সেই গভীর, শক্তিশালী, নিবিড় সম্পর্কগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয় যা আমরা জন্মগতভাবে চাই, কিন্তু আজকের পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। “রাউলিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী গল্প ভালো বনাম মন্দের যুদ্ধ নয়। এটা হলো ভলডেমর্টের দুর্বলতা আর হ্যারির শক্তির সেই দীর্ঘ ব্যাখ্যা: বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, সম্প্রদায় — সেই জিনিসগুলো যাকে আমরা তুচ্ছ ভাবি আর স্যাকারিন বলি, কিন্তু যার প্রয়োজন আমরা গ্রিন্ডিলোর পানির মতো করি” ।
হ্যারি পটারের সাফল্যের পর রাউলিং থেমে থাকেননি। তিনি রবার্ট গ্যালব্রেথ ছদ্মনামে করমোরান স্ট্রাইক সিরিজ লিখেছেন, যা প্রমাণ করেছে তার প্রতিভা শুধু জাদুর জগতে সীমাবদ্ধ নয় । ২০১২ সালে তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লিখেছেন দ্য ক্যাজুয়াল ভ্যাকেন্সি, ২০২০ সালে শিশুদের জন্য দ্য ইকাবগ, ২০২১ সালে দ্য ক্রিসমাস পিগ । তার নাটক হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য কার্সড চাইল্ড ২০১৬ সালে লন্ডনে মঞ্চস্থ হয় এবং তাৎক্ষণিক বেস্টসেলার হয়ে ওঠে । ফ্যান্টাস্টিক বিস্টস চলচ্চিত্র সিরিজের চিত্রনাট্যও তিনি লিখেছেন ।
রাউলিংয়ের সমাজসেবার কাজও কম নয়। ২০০০ সালে তিনি ভোলান্ট চ্যারিটেবল ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের চিকিৎসার গবেষণা আর দারিদ্র্য মোকাবেলা । ২০০৫ সালে তিনি লুমোস প্রতিষ্ঠা করেন, যা বিশ্বের প্রায় আট মিলিয়ন প্রাতিষ্ঠানিক শিশুকে পরিবারের জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করে । তার মায়ের স্মৃতিতে এডিনবরায় অ্যান রাউলিং নিউরোলজি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছেন, আর তিনি জিঞ্জারব্রেড চ্যারিটির সভাপতি, যা একক অভিভাবক পরিবারদের সহায়তা করে । তিনি তার বইয়ের রয়্যালটি থেকে প্রায় ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড দান করেছেন । ২০০০ সালে শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি OBE(Officer of the Order of the British Empire) পান, আর ২০১৬ সালে পান PEN/অ্যালেন ফাউন্ডেশন লিটারারি সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড ।
কিন্তু রাউলিং কেবল আলোচনার কেন্দ্রে নন প্রশংসার জন্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি ট্রান্সজেন্ডার অধিকার নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য সমালোচিত হয়েছেন। তিনি নারী-পুরুষের জৈবিক ভিত্তি নিয়ে সরব, আর হ্যারি পটার অভিনেতা ড্যানিয়েল র্যাডক্লিফ ও এমা ওয়াটসনের সাথে তার প্রকাশ্য মতবিরোধ হয়েছে । সমালোচকরা তাকে ট্রান্সফোবিক বলেছেন, আর রাউলিং নিজে সেটাকে বলেছেন মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর আক্রমণ । এই বিতর্ক তার উত্তরাধিকারকে জটিল করে তুলেছে, এবং সেটা কোনোভাবে আড়াল করার চেষ্টা করাও ঠিক হবে না।
শেষ বিচারে, জে. কে. রাউলিং মানে কেবল কিছু জাদুর গল্প নয়। তিনি মানে সেই নারী, যিনি সরকারি বাসস্থানে বসে কলম হাতে, একটি কন্যাকে কোলে নিয়ে, এক গ্লাস পানি আর এক কাপ এসপ্রেসো নিয়ে লিখেছিলেন এমন এক জগতের কথা যা তখনো কেউ কল্পনাও করেনি। তিনি মানে সেই কণ্ঠস্বর, যিনি কোটি কোটি শিশুকে — এবং তাদের বাবা-মাকে — প্রমাণ করেছেন বই পড়া মানে পালানো নয়, বরং নিজের শক্তি খুঁজে পাওয়া। হ্যারি পটার সেই ছোট ছেলে, যাকে কোনোদিন কেউ ভালোবাসেনি, যে একদিন আবিষ্কার করে তার বাবা-মা ছিলেন জাদুকর, আর তার কপালে যে দাগটা আছে সেটা অভিশাপ নয় বরং বেঁচে থাকার প্রমাণ। আর সেই গল্পই রাউলিং লিখেছেন নিজের জীবনের ছন্দে — একা, দরিদ্র, হতাশ, কিন্তু কখনো হার না মানা এক নারী, যিনি প্রমাণ করেছেন একটা গল্প গোটা একটা প্রজন্মকে বই পড়তে শেখাতে পারে। আর সেই প্রজন্ম আজ বড় হয়ে নিজেদের সন্তানদের কাছে সেই গল্পই পড়ছে।
জর্জ সিমেনঁ: সেই মানুষ, যিনি অপরাধকে দেখেছিলেন মানব আত্মার আয়না হিসেবে
পরবর্তীএইচিরো ওডা: সেই মানুষ, যিনি একটিমাত্র গল্প দিয়ে প্রমাণ করেছেন — ধৈর্য আর কল্পনা দিয়েই ইতিহাস বদলানো সম্ভব
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
