বার্ট্রান্ড রাসেল: যে দার্শনিক যুক্তি, সংশয় ও মুক্তচিন্তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন
প্রশ্ন করতে শেখার দর্শন
মানুষ যা বিশ্বাস করে, তার সবকিছু কি সত্য? কোনো বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নেওয়ার আগে তার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ আছে কি না, তা কি পরীক্ষা করা উচিত নয়? আর যুক্তি দিয়ে পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি নিজের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসও প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে কী করা উচিত?
এসব প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল। তাঁর কাছে দর্শনের কাজ শুধু জটিল তত্ত্ব তৈরি করা ছিল না; বরং মানুষের চিন্তাকে পরিষ্কার করা, ভুল যুক্তি শনাক্ত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য অনুসন্ধানের অভ্যাস গড়ে তোলাও ছিল দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বিংশ শতাব্দীর দর্শনে রাসেলের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো বিশ্লেষণী দর্শনের বিকাশ। তিনি মনে করতেন, অনেক দার্শনিক সমস্যার জন্ম হয় ভাষার অস্পষ্টতা, ধারণার বিভ্রান্তি কিংবা যুক্তির ভুল প্রয়োগ থেকে। তাই কোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রথমে সেটিকে পরিষ্কারভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
তবে রাসেল শুধু দর্শনের জগতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। গণিতের ভিত্তি, শিক্ষা, ধর্ম, যুদ্ধ, রাজনীতি, মানবাধিকার এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি নিয়েও তিনি লিখেছেন ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। যুক্তির পাশাপাশি মানবিক স্বাধীনতা ও শান্তির পক্ষে তাঁর অবস্থান তাঁকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে।
অভিজাত পরিবারে জন্ম ও শৈশব
১৮৭২ সালের ১৮ মে ওয়েলসের ট্রেলেক এলাকায় এক অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারে বার্ট্রান্ড রাসেলের জন্ম। তাঁর দাদা জন রাসেল ছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এবং বাবা জন রাসেল ছিলেন একজন রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। রাসেলের পরিবারে উদারপন্থী রাজনৈতিক চিন্তা, শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ঐতিহ্য ছিল।
তবে তাঁর শৈশব খুব একটা সুখের ছিল না। অল্প বয়সেই তিনি বাবা-মাকে হারান। এরপর দাদা-দাদির তত্ত্বাবধানে বড় হন। তাঁর দাদি ছিলেন ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী একজন নারী। পরিবারের পরিবেশে ধর্মীয় অনুশাসন থাকলেও রাসেল ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনভাবে চিন্তা করার প্রবণতা দেখান।
শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ তিনি বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করে কাটান। গণিতের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়। কৈশোরে জ্যামিতি ও গাণিতিক প্রমাণের সৌন্দর্য তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি মনে করতেন, গণিতের যুক্তি এমন এক ধরনের নিশ্চয়তা দিতে পারে, যা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস বা প্রচলিত মতামতে সবসময় পাওয়া যায় না।
১৮৯০ সালে রাসেল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি গণিত ও দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর চিন্তার জগৎ আরও বিস্তৃত হয়। বিশেষ করে জি. ই. মুর এবং আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেডের মতো চিন্তাবিদদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় পরবর্তী সময়ে তাঁর দর্শনচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গণিতের ভিত্তি অনুসন্ধান
রাসেলের দর্শনচর্চার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল গণিতের ভিত্তি নিয়ে গবেষণা। গণিতের সূত্রগুলো এত নির্ভরযোগ্য কেন? গাণিতিক সত্য কি কেবল মানুষের তৈরি নিয়ম, নাকি এর পেছনে আরও মৌলিক কোনো যৌক্তিক কাঠামো রয়েছে? এসব প্রশ্ন তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল।
তাঁর ধারণা ছিল, গণিতের অনেক মৌলিক সত্যকে যুক্তিবিদ্যার সাহায্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এই চিন্তা থেকে তিনি আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেডের সঙ্গে যৌথভাবে Principia Mathematica রচনা করেন। বইটির প্রথম খণ্ড ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয়; পরবর্তী খণ্ডগুলো প্রকাশিত হয় ১৯১২ ও ১৯১৩ সালে।
এই বিশাল গবেষণাকর্মে তাঁরা গাণিতিক ধারণাগুলোকে যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। বইটির একটি বিখ্যাত উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে গণিতের বিভিন্ন শাখার ভিত্তি যুক্তিবিদ্যার নিয়মের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
Principia Mathematica অত্যন্ত জটিল ও কারিগরি গ্রন্থ। সাধারণ পাঠকের জন্য এটি সহজপাঠ্য নয়। তবে আধুনিক গাণিতিক যুক্তিবিদ্যা, কম্পিউটার বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং বিশ্লেষণী দর্শনের বিকাশে এই কাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
বিশ্লেষণী দর্শন: ভাষা ও যুক্তির ভেতর সমস্যার সন্ধান
বার্ট্রান্ড রাসেলকে বিশ্লেষণী দর্শনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দর্শনধারার মূল লক্ষ্য হলো জটিল দার্শনিক প্রশ্নকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা এবং যুক্তি ও ভাষার মাধ্যমে সমস্যার প্রকৃত রূপ বুঝে নেওয়া।
রাসেল মনে করতেন, কোনো বক্তব্য শুনতে অর্থপূর্ণ মনে হলেই সেটি যুক্তিগতভাবে সঠিক হয়ে যায় না। অনেক সময় একটি বাক্যের গঠন আমাদের এমন ধারণা দিতে পারে, যেন সেখানে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা সত্যের উল্লেখ রয়েছে, যদিও বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়।
এখানে তাঁর বিখ্যাত Theory of Descriptions বা বর্ণনাতত্ত্বের কথা বলা যায়। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত ‘On Denoting’ প্রবন্ধে তিনি এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন।
ধরা যাক, কেউ বলল, ‘বর্তমান ফ্রান্সের রাজা টাক।’ বাক্যটি শুনলে মনে হতে পারে, ফ্রান্সে একজন রাজা আছেন এবং তাঁর মাথায় চুল নেই। কিন্তু বাস্তবে ফ্রান্সে বর্তমানে কোনো রাজা নেই। তাহলে বাক্যটি কীভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত?
রাসেলের মতে, বাক্যটির বাহ্যিক গঠন দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বরং এর অন্তর্নিহিত যৌক্তিক অর্থ বিশ্লেষণ করতে হবে। বাক্যটি আসলে এমন একটি অস্তিত্বের দাবি করছে, যা বাস্তবে সত্য নয়। এভাবে তিনি দেখিয়েছিলেন, ভাষার ব্যাকরণগত কাঠামো এবং যুক্তিগত কাঠামো সবসময় এক নয়।
এই তত্ত্ব পরবর্তী সময়ে ভাষাদর্শন ও বিশ্লেষণী দর্শনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দর্শনের বহু পুরোনো সমস্যাকে নতুনভাবে বিশ্লেষণের পথ তৈরি হয়।
সংশয়বাদ ও জ্ঞানের অনুসন্ধান
রাসেলের দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্ঞান সম্পর্কে তাঁর অনুসন্ধান। মানুষ কীভাবে কোনো বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়? আমাদের ইন্দ্রিয় কি সবসময় নির্ভরযোগ্য? আমরা যা দেখি, তা কি বাস্তবতার সম্পূর্ণ প্রতিফলন?
রাসেল মনে করতেন, জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও প্রমাণের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো ধারণাকে শুধু প্রচলিত বিশ্বাস, কর্তৃত্ব কিংবা আবেগের ভিত্তিতে সত্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়।
তাঁর The Problems of Philosophy (১৯১২) বইয়ে তিনি জ্ঞান, বাস্তবতা, ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতা এবং দর্শনের মৌলিক প্রশ্নগুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করেন। বইটির উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ পাঠকের কাছেও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো তুলে ধরা।
রাসেল মনে করতেন, দর্শনের একটি বড় কাজ হলো এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া, যেগুলোর উত্তর আমরা সহজে জানি না। সব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর পাওয়া সম্ভব না হলেও প্রশ্ন করার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান ও চিন্তার পরিধি বিস্তৃত হয়।
ধর্ম সম্পর্কে যুক্তিনির্ভর সমালোচনা
রাসেল ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়ে সংশয়বাদী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের অনেক দাবি যুক্তি ও প্রমাণের পরীক্ষায় যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আছে বলেই সেটিকে সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
১৯২৭ সালে দেওয়া তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা Why I Am Not a Christian পরবর্তী সময়ে বই আকারে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে প্রচলিত কয়েকটি দার্শনিক যুক্তির সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বাসের সামাজিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তবে রাসেলের ধর্মবিষয়ক লেখাগুলোকে শুধু ধর্মের বিরোধিতা হিসেবে দেখলে তাঁর অবস্থানের পূর্ণতা বোঝা যায় না। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, মানুষের বিশ্বাস যেন অন্ধ আনুগত্যের ওপর নির্ভর না করে; বরং যুক্তি, স্বাধীন চিন্তা ও প্রমাণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।
এই অবস্থানের কারণে তিনি ধর্মীয় চিন্তাবিদদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। আবার মুক্তচিন্তা ও সংশয়বাদী দর্শনের অনুসারীদের কাছে তাঁর লেখা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শিক্ষা ও শিশুর স্বাধীনতা
রাসেল শিক্ষাকে মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম মনে করতেন। তাঁর মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু তথ্য মুখস্থ করানো নয়। বরং শিক্ষার্থীর মধ্যে কৌতূহল, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
১৯২৭ সালে তাঁর ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ডোরা রাসেলের উদ্যোগে ইংল্যান্ডে Beacon Hill School প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল একটি পরীক্ষামূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে শিশুদের স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। রাসেল বিশ্বাস করতেন, অতিরিক্ত ভয়, শাস্তি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
শিক্ষা নিয়ে তাঁর চিন্তা Education and the Good Life এবং On Education গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়। তিনি মনে করতেন, একজন ভালো শিক্ষকের কাজ শুধু জ্ঞান প্রদান করা নয়; শিক্ষার্থীর মধ্যে সত্য অনুসন্ধানের আগ্রহ তৈরি করাও তাঁর দায়িত্ব।
যুদ্ধবিরোধী অবস্থান ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা
রাসেলের রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর জীবনের বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। তিনি মনে করতেন, জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা ও সামরিক প্রতিযোগিতা মানুষের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে ১৯১৬ সালে তাঁকে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে যুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে জরিমানাও করা হয়। ১৯১৮ সালে তাঁর একটি লেখার কারণে তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কারাগারে থাকাকালেও তিনি লেখালেখি চালিয়ে যান। তাঁর কাছে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের নীতি বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতের সঙ্গে একমত না হলেও একজন মানুষের নিজের মত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত—এমন বিশ্বাস তিনি আজীবন ধারণ করেছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর অবস্থানে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। নাৎসি জার্মানির আগ্রাসন ও ফ্যাসিবাদের উত্থানের মুখে তিনি যুদ্ধের বিরোধিতার বিষয়ে আগের মতো কঠোর অবস্থানে থাকেননি। এই পরিবর্তন তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার বাস্তববাদী দিকটি প্রকাশ করে।
পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রাসেলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার ভয়াবহতা এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্ত্র প্রতিযোগিতা তাঁকে আন্তর্জাতিক শান্তি আন্দোলনে আরও সক্রিয় করে।
১৯৫৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনসহ কয়েকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে রাসেল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। এটি রাসেল-আইনস্টাইন ইশতেহার (Russell–Einstein Manifesto) নামে পরিচিত। এতে পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশ্বনেতাদের সতর্ক করা হয় এবং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষায় সংঘাতের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানানো হয়।
এই ইশতেহারের প্রভাবেই ১৯৫৭ সালে কানাডার পাগওয়াশে বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এই উদ্যোগ Pugwash Conferences on Science and World Affairs নামে পরিচিত হয়।
রাসেল পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি যুদ্ধ, সামরিক আগ্রাসন ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
নোবেল পুরস্কার ও সাহিত্যিক অবদান
বার্ট্রান্ড রাসেল শুধু দর্শন ও যুক্তিবিদ্যায় অবদান রাখেননি; তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রাবন্ধিক ও লেখকও। দর্শনের জটিল বিষয়কে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা তাঁর লেখাকে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৫০ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর লেখার স্বচ্ছতা, মানবিক আদর্শ এবং স্বাধীন চিন্তার পক্ষে অবস্থানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:
The Principles of Mathematics (১৯০৩): গণিতের ভিত্তি ও যুক্তিবিদ্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।
The Problems of Philosophy (১৯১২): জ্ঞান, বাস্তবতা ও দর্শনের মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে সাধারণ পাঠকের উপযোগী আলোচনা।
Principia Mathematica (১৯১০–১৯১৩): আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেডের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম।
Our Knowledge of the External World (১৯১৪): বাইরের জগৎ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দার্শনিক বিশ্লেষণ।
Why I Am Not a Christian (১৯২৭): ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে প্রচলিত যুক্তির সমালোচনা।
A History of Western Philosophy (১৯৪৫): প্রাচীন গ্রিস থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস নিয়ে লেখা বহুলপঠিত গ্রন্থ।
শেষ জীবন ও উত্তরাধিকার
জীবনের শেষ কয়েক দশক রাসেল লেখালেখি, বক্তৃতা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কাটান। বয়স বাড়লেও তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্রিয়তা কমেনি। বরং পারমাণবিক অস্ত্র, যুদ্ধ এবং মানবাধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থান তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও পরিচিত করে তোলে।
১৯৬১ সালে পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁকে আবারও কারাবরণ করতে হয়। তখন তাঁর বয়স প্রায় ৯০ বছর। বয়সের ভার সত্ত্বেও তিনি শান্তি ও মানবিক স্বাধীনতার পক্ষে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
১৯৭০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওয়েলসে নিজের বাড়িতে বার্ট্রান্ড রাসেল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিংশ শতাব্দীর এক অসাধারণ দার্শনিক ও জনবুদ্ধিজীবীর জীবনাবসান ঘটে।
রাসেলের উত্তরাধিকার শুধু তাঁর লেখা বই কিংবা দার্শনিক তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন, কোনো ধারণাকে প্রশ্ন করা মানেই সেটিকে অস্বীকার করা নয়; বরং সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য প্রশ্ন করা জরুরি। অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি, কর্তৃত্বের পরিবর্তে স্বাধীন চিন্তা এবং সংঘাতের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে তাঁর অবস্থান আজও প্রাসঙ্গিক।
দর্শনকে মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বার্ট্রান্ড রাসেলের অবদান তাই বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর জীবন ও চিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জ্ঞানী হওয়ার অর্থ শুধু অনেক কিছু জানা নয়; বরং নিজের বিশ্বাসকেও যুক্তির আলোয় যাচাই করার সাহস রাখা।
কার্ল মার্ক্স: যে চিন্তাবিদ প্রশ্ন তুলেছিলেন, সমাজের সম্পদ তৈরি করে যারা, তারা নিজেরাই কেন বঞ্চিত?
পরবর্তীজ্যঁ-পল সার্ত্র: যে দার্শনিক বলেছিলেন, মানুষ নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করে
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
দ্বিতীয় মেহমেদ: কনস্টান্টিনোপল জয় করে যিনি বদলে দিয়েছিলেন ইউরোপ ও এশিয়ার ইতিহাস
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
জোয়ান অব আর্ক: যে কিশোরী সেনানায়িকা বদলে দিয়েছিলেন ফ্রান্সের যুদ্ধের ইতিহাস
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তৈমুর লং: মধ্য এশিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত যার অভিযানে কেঁপে উঠেছিল সাম্রাজ্যগুলো
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সালাহউদ্দিন আইয়ুবি: যিনি ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন মুসলিম বিশ্বকে এবং পুনরুদ্ধার করেছিলেন জেরুজালেম
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ: ইসলামের ইতিহাসের সেই সেনাপতি, যিনি পরিচিত ছিলেন ‘সাইফুল্লাহ’ নামে

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
চেঙ্গিস খান: যাযাবর যোদ্ধাদের একত্র করে যিনি গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাসের বৃহত্তম স্থল সাম্রাজ্য
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
