জ্যঁ-পল সার্ত্র: যে দার্শনিক বলেছিলেন, মানুষ নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করে
মানুষ কি নিজের জীবন নিজেই তৈরি করে?
মানুষ কি জন্মের সময় থেকেই নির্দিষ্ট কোনো পরিচয় নিয়ে পৃথিবীতে আসে? তার জীবনের উদ্দেশ্য, চরিত্র কিংবা ভবিষ্যৎ কি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে? নাকি মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত, কাজ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলে?
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত দার্শনিক জ্যঁ-পল সার্ত্র এই প্রশ্নগুলোকে তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর মতে, মানুষের কোনো পূর্বনির্ধারিত সারবস্তু বা পরিচয় নেই, যা তার জীবনকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। মানুষ প্রথমে পৃথিবীতে অস্তিত্ব লাভ করে, তারপর নিজের কাজ, সিদ্ধান্ত ও পছন্দের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করে।
এই ধারণাই সার্ত্রের বিখ্যাত বক্তব্য—“অস্তিত্ব সারবস্তুর আগে” (Existence precedes essence)। সহজভাবে বললে, মানুষ কী হবে, তা কেবল জন্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা ভাগ্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং সে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং কীভাবে জীবনযাপন করে, তার মধ্য দিয়েই নিজের পরিচয় নির্মাণ করে।
সার্ত্রের দর্শন শুধু বিমূর্ত তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও রাজনৈতিক লেখার মাধ্যমে তিনি মানুষের স্বাধীনতা, উদ্বেগ, দায়িত্ব, সামাজিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার প্রশ্নগুলো তুলে ধরেছেন। দর্শনের পাশাপাশি সাহিত্য ও রাজনীতিতেও তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
১৯০৫ সালের ২১ জুন ফ্রান্সের প্যারিসে সার্ত্রের জন্ম। তাঁর বাবা জ্যঁ-ব্যাপতিস্ত সার্ত্র ছিলেন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা। সার্ত্রের বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান। এরপর তিনি মা অ্যান-মারি শোয়েৎজারের কাছে বড় হন। তাঁর নানা চার্লস শোয়েৎজার ছিলেন একজন শিক্ষক এবং জার্মান ভাষার অধ্যাপক। ছোটবেলা থেকেই নানার বাড়ির সমৃদ্ধ বইয়ের সংগ্রহ সার্ত্রের পড়াশোনার জগৎকে বিস্তৃত করে।
শৈশবে সার্ত্র বই পড়া, গল্প লেখা এবং কল্পনার জগতে ডুবে থাকতে ভালোবাসতেন। সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি তাঁর আগ্রহ ধীরে ধীরে গভীর হয়। স্কুলজীবন শেষে তিনি প্যারিসের বিখ্যাত উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান École Normale Supérieure-এ ভর্তি হন। সেখানে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তী সময়ে ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থার দর্শনশিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তাঁর পরিচয় হয় সিমোন দ্য বোভোয়ারের সঙ্গে। বোভোয়ার নিজেও ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক, লেখক ও নারীবাদী চিন্তাবিদ। তাঁদের সম্পর্ক প্রচলিত দাম্পত্যের কাঠামো থেকে ভিন্ন ছিল। তাঁরা নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রেখে দীর্ঘদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন। দুজনের চিন্তাভাবনা ও লেখালেখিতে একে অপরের প্রভাবও ছিল গভীর।
অস্তিত্ববাদ: মানুষের স্বাধীনতা ও দায়িত্ব
সার্ত্রের নামের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে দর্শনধারাটি যুক্ত, তা হলো অস্তিত্ববাদ (Existentialism)। এই দর্শনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—মানুষের অস্তিত্বের অর্থ কী এবং মানুষ কীভাবে নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে পায়?
সার্ত্রের মতে, মানুষের জীবনের জন্য আগে থেকে নির্ধারিত কোনো সার্বজনীন উদ্দেশ্য নেই। মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেয়, বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় এবং নিজের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জীবনের পথ তৈরি করে। সে কী হবে, তা সম্পূর্ণভাবে কোনো পূর্বনির্ধারিত নিয়ম ঠিক করে দেয় না।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সার্ত্রের স্বাধীনতার ধারণা মানে এই নয় যে মানুষ যা খুশি তা-ই করতে পারে কিংবা তার ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। মানুষের জন্মপরিস্থিতি, সমাজ, অর্থনৈতিক অবস্থা, ইতিহাস ও শারীরিক বাস্তবতা তার জীবনের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে। তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং নিজের কাজের দায় বহন করতে হয়।
ধরা যাক, একজন মানুষ এমন একটি পেশায় কাজ করছেন, যা তিনি পছন্দ করেন না। তিনি হয়তো পরিবার বা সমাজের প্রত্যাশার কারণে সেই পেশা বেছে নিয়েছেন। সার্ত্রের দৃষ্টিতে, এই পরিস্থিতি তাঁর সিদ্ধান্তের বাস্তবতা বোঝার একটি সুযোগ তৈরি করে। তিনি নিজের অবস্থাকে কীভাবে গ্রহণ করবেন, পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন, নাকি আগের পথেই থাকবেন—এসব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তাঁর পরিচয় গড়ে উঠবে।
এই কারণেই সার্ত্রের দর্শনে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। মানুষ শুধু নিজের সিদ্ধান্তের জন্যই দায়ী নয়; তার পছন্দের মধ্য দিয়ে সে অন্যদের কাছেও মানুষের জীবন ও আচরণ সম্পর্কে এক ধরনের ধারণা তুলে ধরে।
“অস্তিত্ব সারবস্তুর আগে”: বিখ্যাত দার্শনিক ধারণা
সার্ত্রের সবচেয়ে পরিচিত বক্তব্য হলো, “অস্তিত্ব সারবস্তুর আগে”। এই ধারণা বুঝতে হলে আগে সারবস্তু বা essence বলতে কী বোঝায়, তা জানা প্রয়োজন।
কোনো বস্তু তৈরি করার আগে সাধারণত তার উদ্দেশ্য বা নকশা নির্ধারণ করা হয়। যেমন, একজন কারিগর একটি ছুরি তৈরি করার আগে জানেন ছুরিটির কাজ কী হবে। অর্থাৎ ছুরিটির নকশা ও উদ্দেশ্য আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে; তারপর সেটি তৈরি হয়।
কিন্তু সার্ত্র মানুষের ক্ষেত্রে এই ধারণা গ্রহণ করেননি। তাঁর মতে, মানুষের জন্য আগে থেকে নির্ধারিত কোনো নকশা বা উদ্দেশ্য নেই। মানুষ প্রথমে অস্তিত্ব লাভ করে, তারপর নিজের কাজ, সিদ্ধান্ত ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিজের পরিচয় তৈরি করে।
এই ধারণা ধর্মীয় ও প্রচলিত কিছু দার্শনিক ব্যাখ্যার বিপরীতে দাঁড়ায়, যেখানে মানুষের প্রকৃতি বা উদ্দেশ্যকে আগে থেকেই নির্ধারিত বলে মনে করা হয়। সার্ত্র বিশেষভাবে নাস্তিক অস্তিত্ববাদী অবস্থান থেকে যুক্তি দেন যে, ঈশ্বরের পূর্বনির্ধারিত কোনো পরিকল্পনা না থাকলে মানুষের পরিচয় ও জীবনের উদ্দেশ্য তাকে নিজেকেই নির্মাণ করতে হয়।
তবে এই স্বাধীনতা আনন্দের পাশাপাশি কঠিন দায়িত্বও তৈরি করে। কারণ নিজের জীবনের সিদ্ধান্তের দায় অন্য কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে না।
উদ্বেগ, একাকিত্ব ও অর্থহীনতার অনুভূতি
স্বাধীনতা মানুষের জন্য শুধু সম্ভাবনা তৈরি করে না; এটি উদ্বেগও তৈরি করতে পারে। সার্ত্রের দর্শনে এই উদ্বেগ বা Anguish একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তার সিদ্ধান্তের দায় তাকেই নিতে হবে, তখন সে অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার মুখোমুখি হয়।
ধরা যাক, একজন তরুণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। তিনি জানেন না কোন পথটি সঠিক হবে। অন্য কেউ তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, আবার সিদ্ধান্তের পরিণতি থেকেও তিনি সম্পূর্ণভাবে মুক্ত থাকতে পারবেন না। এই অবস্থাই সার্ত্রের আলোচনায় অস্তিত্বগত উদ্বেগের একটি উদাহরণ।
সার্ত্র মনে করতেন, মানুষ অনেক সময় এই স্বাধীনতার ভার এড়িয়ে যেতে চায়। নিজের সিদ্ধান্তের দায় স্বীকার না করে সে বলে, পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছে, সমাজ তাকে এমন করেছে কিংবা তার চরিত্রই তাকে এই কাজ করতে বাধ্য করেছে। কিন্তু সার্ত্রের মতে, এভাবে নিজের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা আত্মপ্রবঞ্চনার একটি রূপ।
আত্মপ্রবঞ্চনা বা Bad Faith
সার্ত্রের দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Bad Faith, যার বাংলা অর্থ আত্মপ্রবঞ্চনা বা নিজের সঙ্গে অসততা। মানুষ যখন নিজের স্বাধীনতা ও দায়িত্বকে অস্বীকার করে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন তার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই, তখন এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।
সার্ত্র তাঁর Being and Nothingness গ্রন্থে এই ধারণা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। তিনি দেখান, মানুষ কখনো কখনো নিজের সামাজিক পরিচয়, পেশা কিংবা ভূমিকার সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে যায় যে সে ভুলে যায়—এসব পরিচয়ের বাইরেও তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে একজন কর্মচারীর কথা ভাবা যায়, যিনি মনে করেন, তিনি কেবল একজন কর্মচারী; তাই তাঁকে যা বলা হবে, সেটাই করতে হবে। তিনি নিজের নৈতিক বিচারবোধ বা সিদ্ধান্তের ক্ষমতাকে অস্বীকার করছেন। সার্ত্রের দৃষ্টিতে, এ ধরনের আচরণ নিজের স্বাধীনতার বাস্তবতা থেকে পালানোর চেষ্টা হতে পারে।
তবে Bad Faith বলতে সব ধরনের সীমাবদ্ধতা বা বাধ্যবাধকতাকে অস্বীকার করা বোঝায় না। বরং মানুষ যখন নিজের ভূমিকা বা পরিস্থিতিকে এমনভাবে গ্রহণ করে যে নিজের সিদ্ধান্ত ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি পুরোপুরি আড়াল হয়ে যায়, তখনই এই ধারণাটি প্রযোজ্য হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও চিন্তার পরিবর্তন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সার্ত্রের জীবন ও চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯৩৯ সালে তিনি ফরাসি সেনাবাহিনীতে আবহাওয়াবিদ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪০ সালে জার্মান বাহিনীর হাতে বন্দি হন এবং কিছু সময় যুদ্ধবন্দি হিসেবে কাটান। পরে মুক্তি পেয়ে ফ্রান্সে ফিরে আসেন।
নাৎসি দখলদারত্বের সময় তিনি লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। তাঁর নাটক ও সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে স্বাধীনতা, নৈতিকতা এবং মানুষের সিদ্ধান্তের প্রশ্নগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে যে মানুষের স্বাধীনতা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
যুদ্ধের পর সার্ত্র রাজনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি মনে করতেন, একজন লেখক বা বুদ্ধিজীবী সমাজের অন্যায় ও ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কে নীরব থাকতে পারেন না। সাহিত্য ও দর্শনকে তিনি সামাজিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।
সাহিত্য ও নাটকে সার্ত্রের দর্শন
সার্ত্র শুধু দার্শনিক গ্রন্থ রচনা করেননি; উপন্যাস, নাটক ও ছোটগল্পের মাধ্যমেও তাঁর দর্শন প্রকাশ করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে মানুষের স্বাধীনতা, বিচ্ছিন্নতা, উদ্বেগ এবং জীবনের অর্থহীনতার অনুভূতি বারবার ফিরে এসেছে।
১৯৩৮ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস Nausea (La Nausée) অস্তিত্ববাদী সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে পরিচিত। উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র আঁতোয়ান রকাঁত একসময় উপলব্ধি করতে শুরু করে যে পৃথিবীর বস্তু ও মানুষের অস্তিত্বের কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ নেই। এই উপলব্ধি তার মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি ও অস্তিত্বগত সংকট তৈরি করে।
তাঁর আরেকটি বিখ্যাত নাটক No Exit (Huis Clos), যা ১৯৪৪ সালে মঞ্চস্থ হয়। নাটকটির একটি বহুল আলোচিত বক্তব্য হলো—“অন্যরাই নরক” (Hell is other people)। এই বক্তব্যকে প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। সার্ত্র এখানে বলতে চাননি যে অন্য মানুষ সবসময় আমাদের জন্য দুর্ভোগের কারণ। বরং অন্যের দৃষ্টিতে নিজেকে বন্দি করে ফেলা, অন্যের বিচার ও স্বীকৃতির ওপর নিজের পরিচয় নির্ভরশীল করে তোলা—এসব বিষয় মানুষের স্বাধীনতার সংকট তৈরি করতে পারে।
মার্কসবাদ, রাজনীতি ও সামাজিক দায়িত্ব
সার্ত্রের চিন্তা শুধু ব্যক্তির স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী সময়ে তিনি মার্কসবাদ ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে গভীরভাবে আগ্রহী হন। তাঁর মতে, মানুষের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করতে হলে দারিদ্র্য, শ্রেণিবৈষম্য, ঔপনিবেশিকতা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মতো বাস্তব সমস্যাগুলোও বিবেচনা করতে হবে।
তিনি ফরাসি উপনিবেশবাদের সমালোচনা করেন এবং আলজেরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬০-এর দশকে ফ্রান্সের ছাত্র আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিও তাঁর সমর্থন ছিল।
তবে সার্ত্রের রাজনৈতিক অবস্থান সবসময় বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পর্কে তাঁর অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনাবলির মধ্যে টানাপোড়েন নিয়েও বহু আলোচনা হয়েছে।
নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান
১৯৬৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য সার্ত্রের নাম নির্বাচিত হয়। কিন্তু তিনি পুরস্কারটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর যুক্তি ছিল, কোনো লেখককে প্রাতিষ্ঠানিক সম্মাননা দিয়ে নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা উচিত নয়। তিনি মনে করতেন, একজন লেখকের কাজ স্বাধীন থাকা প্রয়োজন এবং রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি সেই স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্ত্রের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে স্বেচ্ছায় সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। তবে নোবেল কমিটির দেওয়া পুরস্কারের ইতিহাসে তাঁর নাম বিজয়ী হিসেবেই তালিকাভুক্ত রয়েছে।
সার্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ
সার্ত্রের দর্শন ও সাহিত্য বোঝার জন্য কয়েকটি বই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
Nausea (১৯৩৮): অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা, অর্থহীনতা ও মানুষের অভিজ্ঞতার সংকট নিয়ে লেখা উপন্যাস।
Being and Nothingness (১৯৪৩): স্বাধীনতা, চেতনা, অস্তিত্ব, আত্মপ্রবঞ্চনা ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর প্রধান দার্শনিক গ্রন্থ।
No Exit (১৯৪৪): মানুষের সম্পর্ক, অন্যের দৃষ্টি এবং আত্মপরিচয়ের সংকট নিয়ে বিখ্যাত নাটক।
Existentialism Is a Humanism (১৯৪৬): অস্তিত্ববাদ সম্পর্কে তাঁর চিন্তা সাধারণ পাঠকের কাছে ব্যাখ্যা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা ও প্রবন্ধ।
Critique of Dialectical Reason (১৯৬০): মার্কসবাদ, ইতিহাস, সামাজিক কাঠামো ও ব্যক্তির স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃত দার্শনিক আলোচনা।
শেষ জীবন ও উত্তরাধিকার
জীবনের শেষ পর্যায়েও সার্ত্র লেখালেখি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তবু তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও জনপরিসরের বিতর্কে অংশ নেওয়া অব্যাহত রাখেন।
১৯৮০ সালের ১৫ এপ্রিল প্যারিসে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর শেষকৃত্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। এটি শুধু একজন দার্শনিকের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল না; বরং ফরাসি সমাজ ও বিশ্ববুদ্ধিজীবী মহলে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেরও প্রকাশ ছিল।
সার্ত্রের দর্শনের সঙ্গে সবাই একমত নন। তাঁর স্বাধীনতার ধারণা বাস্তব জীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় কি না, তা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। আবার তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিতর্ক আছে। তবু মানুষের সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব ও আত্মপরিচয় নিয়ে তাঁর প্রশ্নগুলো দর্শনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
সার্ত্র আমাদের সামনে এমন এক মানুষের ছবি তুলে ধরেন, যিনি নিজের পরিচয়কে পূর্বনির্ধারিত বলে মেনে নিতে চান না। তাঁর মতে, মানুষ নিজের কাজ ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই নিজেকে তৈরি করে। স্বাধীনতা তাই শুধু একটি অধিকার নয়, এটি দায়িত্বও। নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার দায়িত্ব অন্য কারও নয়—মানুষের নিজের।
বার্ট্রান্ড রাসেল: যে দার্শনিক যুক্তি, সংশয় ও মুক্তচিন্তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন
পরবর্তীজালালউদ্দিন রুমি: যে কবি প্রেমের মধ্যেই খুঁজেছিলেন স্রষ্টা ও আত্মার সন্ধান
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
দ্বিতীয় মেহমেদ: কনস্টান্টিনোপল জয় করে যিনি বদলে দিয়েছিলেন ইউরোপ ও এশিয়ার ইতিহাস
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
জোয়ান অব আর্ক: যে কিশোরী সেনানায়িকা বদলে দিয়েছিলেন ফ্রান্সের যুদ্ধের ইতিহাস
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তৈমুর লং: মধ্য এশিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত যার অভিযানে কেঁপে উঠেছিল সাম্রাজ্যগুলো
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সালাহউদ্দিন আইয়ুবি: যিনি ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন মুসলিম বিশ্বকে এবং পুনরুদ্ধার করেছিলেন জেরুজালেম
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ: ইসলামের ইতিহাসের সেই সেনাপতি, যিনি পরিচিত ছিলেন ‘সাইফুল্লাহ’ নামে

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
চেঙ্গিস খান: যাযাবর যোদ্ধাদের একত্র করে যিনি গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাসের বৃহত্তম স্থল সাম্রাজ্য
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
