দ্বিতীয় মেহমেদ: কনস্টান্টিনোপল জয় করে যিনি বদলে দিয়েছিলেন ইউরোপ ও এশিয়ার ইতিহাস
যে বিজয় বদলে দিয়েছিল ইতিহাসের গতিপথ
ইতিহাসে কিছু সামরিক অভিযান শুধু একটি শহর বা রাজ্য দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো বদলে দেয় একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ। ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল বিজয় ছিল তেমনই একটি ঘটনা। প্রায় এক হাজার বছর ধরে পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে টিকে থাকা শহরটি উসমানীয়দের দখলে আসে এক তরুণ সুলতানের নেতৃত্বে। তাঁর নাম দ্বিতীয় মেহমেদ।
কনস্টান্টিনোপল ছিল ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী। এর অবস্থান, বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শহরটিকে বহু শতাব্দী ধরে প্রায় অজেয় করে রেখেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মেহমেদ সামরিক প্রযুক্তি, নৌবাহিনী, স্থলবাহিনী এবং কৌশলগত পরিকল্পনার সমন্বয়ে শহরটি জয় করেন। এই বিজয়ের পর তিনি ‘ফাতিহ’ বা বিজেতা উপাধিতে পরিচিত হন।
তবে দ্বিতীয় মেহমেদের কৃতিত্ব কেবল কনস্টান্টিনোপল বিজয় নয়। তাঁর শাসনামলে উসমানীয় সাম্রাজ্য বলকান, আনাতোলিয়া এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করেন, রাজধানীকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন এবং সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক বিকাশে ভূমিকা রাখেন।
শৈশব ও সিংহাসনে প্রথম আরোহণ
দ্বিতীয় মেহমেদের জন্ম ১৪৩২ সালের ৩০ মার্চ এদিরনে শহরে। তাঁর বাবা ছিলেন উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ এবং মা হুমা হাতুন। রাজপরিবারের সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই তিনি শাসন ও সামরিক বিষয়ে শিক্ষালাভের সুযোগ পান।
তাঁর শিক্ষার মধ্যে ধর্মতত্ত্ব, ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্য, গণিত এবং সামরিক বিদ্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি আরবি, ফারসি ও তুর্কি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন বলে জানা যায়। পরবর্তী জীবনে গ্রিক ও অন্যান্য ভাষা এবং প্রাচীন ইতিহাসের প্রতিও তাঁর আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি জ্ঞানী ব্যক্তি, কবি, শিল্পী ও পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
১৪৪৪ সালে তাঁর বাবা দ্বিতীয় মুরাদ সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়ালে মাত্র ১২ বছর বয়সে মেহমেদ প্রথমবারের মতো সুলতান হন। কিন্তু তখন উসমানীয় সাম্রাজ্য অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা সংকটের মুখে ছিল। ইউরোপীয় খ্রিষ্টান শক্তিগুলো উসমানীয়দের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান সংগঠিত করে। ১৪৪৪ সালের ভার্নার যুদ্ধে উসমানীয় বাহিনী জয়ী হলেও কিশোর সুলতানের পক্ষে সাম্রাজ্য পরিচালনা করা সহজ ছিল না।
রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার মধ্যে ১৪৪৬ সালে দ্বিতীয় মুরাদ আবার সিংহাসনে ফিরে আসেন। মেহমেদকে তখন শাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি পরবর্তী কয়েক বছর সামরিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৪৫১ সালে দ্বিতীয় মুরাদের মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সুলতান হন। এবার তাঁর বয়স ১৯ বছর।
কনস্টান্টিনোপল: কেন শহরটি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
কনস্টান্টিনোপল ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী এবং মধ্যযুগীয় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী। ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইন দ্য গ্রেট শহরটিকে নতুন রোম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে এটি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
শহরটির অবস্থান ছিল অত্যন্ত কৌশলগত। ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝখানে বসফরাস প্রণালির তীরে অবস্থিত হওয়ায় কৃষ্ণসাগর ও ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণে এর গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। একই সঙ্গে শহরটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগের অন্যতম শক্তিশালী।
কনস্টান্টিনোপলের স্থলভাগের চারপাশে ছিল বিখ্যাত থিওডোসীয় প্রাচীর। একাধিক স্তরের দেয়াল, পরিখা এবং প্রতিরক্ষা টাওয়ারের কারণে শহরটি বহুবার অবরোধের মুখেও টিকে ছিল। সমুদ্রপথের দিক থেকেও শহরটি সুরক্ষিত ছিল। বিশেষ করে গোল্ডেন হর্ন নামের প্রাকৃতিক বন্দরটির প্রবেশপথে বিশাল লোহার শিকল বসিয়ে শত্রুপক্ষের জাহাজ চলাচল বন্ধ করা যেত।
দ্বিতীয় মেহমেদ বুঝতে পেরেছিলেন, কনস্টান্টিনোপল জয় করতে হলে শুধু বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে প্রাচীরের সামনে দাঁড়ালেই হবে না। প্রয়োজন হবে নতুন ধরনের অবরোধ কৌশল, ভারী কামান, নৌবাহিনী এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থার।
বিজয়ের প্রস্তুতি: দুর্গ, কামান ও নৌবাহিনী
সিংহাসনে ফিরে আসার পর দ্বিতীয় মেহমেদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে কনস্টান্টিনোপল দখল। কিন্তু অভিযান শুরুর আগে তিনি শহরটির আশপাশে উসমানীয় নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করেন।
১৪৫২ সালে বসফরাস প্রণালির ইউরোপীয় তীরে তিনি রুমেলি হিসারি দুর্গ নির্মাণ করেন। এর বিপরীতে এশীয় তীরে আগে থেকেই আনাদোলু হিসারি দুর্গ ছিল। দুটি দুর্গের অবস্থানের ফলে বসফরাস দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর থেকে কনস্টান্টিনোপলে খাদ্য ও সামরিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হয়।
অবরোধের জন্য দ্বিতীয় মেহমেদ ভারী কামান তৈরির উদ্যোগ নেন। এই কাজে উরবান বা অরবান নামে পরিচিত একজন কামান নির্মাতার ভূমিকার কথা ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। তাঁর তৈরি বিশাল কামানগুলো শহরের প্রাচীর ভাঙার জন্য ব্যবহার করা হয়। কামানগুলো অত্যন্ত ভারী ছিল এবং এগুলো পরিবহন ও পরিচালনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়েছিল।
তবে শুধু কামানই ছিল না তাঁর পরিকল্পনার অংশ। স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী, প্রকৌশলী, কামানচালক এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে একত্র করে একটি বৃহৎ অবরোধ অভিযান প্রস্তুত করা হয়। এই প্রস্তুতি দেখায়, দ্বিতীয় মেহমেদ যুদ্ধকে শুধু সৈন্যসংখ্যার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেননি; বরং প্রযুক্তি, ভূগোল ও রসদের সমন্বিত প্রয়োগকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
১৪৫৩ সালের অবরোধ: কনস্টান্টিনোপলের পতন
১৪৫৩ সালের ৬ এপ্রিল উসমানীয় বাহিনী কনস্টান্টিনোপল অবরোধ শুরু করে। উসমানীয় সেনাবাহিনীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে ভিন্নতা রয়েছে। তবে বাহিনীটি বাইজেন্টাইন প্রতিরক্ষাকারীদের তুলনায় অনেক বড় ছিল। শহরের প্রতিরক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সম্রাট একাদশ কনস্টান্টাইন প্যালাইওলোগোস। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সৈন্য, স্বেচ্ছাসেবক এবং জেনোয়া ও অন্যান্য ইউরোপীয় অঞ্চল থেকে আসা যোদ্ধারা।
অবরোধের শুরু থেকেই উসমানীয় কামানগুলো শহরের স্থলপ্রাচীরের ওপর গোলাবর্ষণ চালায়। বিশাল কামানের গোলা প্রাচীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষতি করলেও বাইজেন্টাইনরা রাতের বেলায় মেরামত ও প্রতিরক্ষার কাজ চালিয়ে যায়। ফলে অবরোধ দীর্ঘায়িত হয়।
শহরের গোল্ডেন হর্ন বন্দরে প্রবেশ ঠেকাতে বাইজেন্টাইনরা একটি বিশাল শিকল ব্যবহার করেছিল। এতে উসমানীয় নৌবাহিনীর পক্ষে সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু দ্বিতীয় মেহমেদ একটি ব্যতিক্রমী কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি জাহাজগুলোকে স্থলপথে কাঠের রেল বা পিচ্ছিল পথের ওপর দিয়ে টেনে গোল্ডেন হর্নে নামানোর ব্যবস্থা করেন। ২১ এপ্রিলের দিকে উসমানীয় জাহাজগুলো গোল্ডেন হর্নে পৌঁছে যায়। এতে শহরের প্রতিরক্ষাকারীদের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়, কারণ এখন তাদের আরও বিস্তৃত এলাকায় প্রতিরক্ষা চালাতে হচ্ছিল।
অবরোধের শেষ পর্যায়ে উসমানীয় বাহিনী বারবার আক্রমণ চালায়। ২৯ মে ১৪৫৩ সালের ভোরে চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর উসমানীয় বাহিনী শহরের প্রতিরক্ষা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। সম্রাট একাদশ কনস্টান্টাইন যুদ্ধে নিহত হন বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, যদিও তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিশ্চিত নয়।
কনস্টান্টিনোপলের পতনের মধ্য দিয়ে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। শহরটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত হয়। দ্বিতীয় মেহমেদ ‘ফাতিহ’ বা বিজেতা উপাধি গ্রহণ করেন। এই বিজয় তাঁর ব্যক্তিগত সামরিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
বিজয়ের পর কনস্টান্টিনোপল: নতুন রাজধানী গড়ে তোলা
শহর দখলের পর দ্বিতীয় মেহমেদ কনস্টান্টিনোপলকে ধ্বংসস্তূপ হিসেবে ফেলে রাখেননি। বরং তিনি এটিকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রধান রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। যুদ্ধের সময় শহরটির জনসংখ্যা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাই নতুন করে মানুষ বসতি স্থাপন, বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করা এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল।
সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি জনগোষ্ঠীকে শহরে বসতি স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করা হয়। ব্যবসায়ী, কারিগর ও দক্ষ শ্রমিকদের আগমন শহরের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সহায়তা করে। শহরের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামো বজায় রাখার সুযোগ দেওয়া হয়, যদিও তাদের অবস্থান ও অধিকার উসমানীয় শাসনব্যবস্থার অধীন ছিল।
দ্বিতীয় মেহমেদ শহরে নতুন প্রাসাদ, মসজিদ, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ফাতিহ মসজিদ ও এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁর শাসনামলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ও শিক্ষাগত উদ্যোগ। তাঁর সময় থেকেই কনস্টান্টিনোপল ধীরে ধীরে উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে শহরটি ইস্তাম্বুল নামে পরিচিতি লাভ করে।
কনস্টান্টিনোপলের বাইরে সাম্রাজ্য বিস্তার
দ্বিতীয় মেহমেদের সামরিক অভিযান কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের মধ্যেই শেষ হয়নি। তাঁর শাসনামলে উসমানীয় সাম্রাজ্য বলকান ও আনাতোলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।
সার্বিয়া ও বলকান অভিযান: ১৪৫৪ থেকে ১৪৫৯ সালের মধ্যে উসমানীয় বাহিনী সার্বিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৪৬০ সালে মোরিয়ার প্যালিওলোগোস শাসনের অবসান ঘটে। বলকান অঞ্চলে উসমানীয় প্রভাব বৃদ্ধির ফলে মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যায়।
ট্রেবিজন্ড সাম্রাজ্যের পতন: ১৪৬১ সালে দ্বিতীয় মেহমেদ কৃষ্ণসাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত ট্রেবিজন্ড সাম্রাজ্য জয় করেন। এটি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের পর টিকে থাকা শেষ গুরুত্বপূর্ণ গ্রিক সাম্রাজ্যগুলোর একটি। এর পতনের ফলে কৃষ্ণসাগরের দক্ষিণ উপকূলে উসমানীয় কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়।
আনাতোলিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি: আনাতোলিয়ায় কারামানীয় বেইলিকসহ বিভিন্ন তুর্কি রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে উসমানীয়দের সংঘাত চলছিল। দ্বিতীয় মেহমেদ এসব অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব বিস্তৃত করেন। তবে পূর্ব আনাতোলিয়ায় আক কুয়ুনলু শাসক উজুন হাসানের সঙ্গে তাঁর সংঘাতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৪৭৩ সালের ওতলুকবেলি যুদ্ধে উসমানীয় বাহিনী উজুন হাসানের বাহিনীকে পরাজিত করে। এই বিজয় আনাতোলিয়ায় দ্বিতীয় মেহমেদের অবস্থান শক্তিশালী করে এবং পূর্ব দিকের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অগ্রযাত্রা সীমিত করে।
কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব: ১৪৭৫ সালে উসমানীয় বাহিনী জেনোয়া-নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ার উপকূলীয় বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এর ফলে কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্যপথে উসমানীয় প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং ক্রিমিয়ার খানাত উসমানীয়দের অধীনস্থ মিত্রশক্তিতে পরিণত হয়।
সামরিক কৌশল: কেন দ্বিতীয় মেহমেদ ছিলেন সফল?
দ্বিতীয় মেহমেদকে শুধু বড় সেনাবাহিনীর অধিকারী একজন শাসক হিসেবে দেখলে তাঁর সামরিক সাফল্যের প্রকৃত কারণ বোঝা যাবে না। তিনি প্রযুক্তি, ভূগোল, রসদ, মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনাকে একত্রে কাজে লাগাতেন।
১. কামান ও অবরোধ প্রযুক্তির ব্যবহার
কনস্টান্টিনোপল অভিযানে ভারী কামানের ব্যাপক ব্যবহার ছিল তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। মধ্যযুগীয় দুর্গপ্রাচীরের বিরুদ্ধে কামান তখন ক্রমেই কার্যকর হয়ে উঠছিল। দ্বিতীয় মেহমেদ এই প্রযুক্তিকে সামরিক পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ করেন। তবে কামান একাই শহরটি জয় করেনি; স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী ও দীর্ঘ অবরোধের সমন্বয় ছিল বিজয়ের মূল ভিত্তি।
২. স্থল ও নৌবাহিনীর সমন্বয়
কনস্টান্টিনোপলের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শুধু স্থলপথে আক্রমণ যথেষ্ট ছিল না। দ্বিতীয় মেহমেদ সমুদ্রপথেও চাপ সৃষ্টি করেন। গোল্ডেন হর্নে জাহাজ পৌঁছে দেওয়ার কৌশল শহরের প্রতিরক্ষার ওপর নতুন চাপ তৈরি করে। এটি তাঁর সামরিক পরিকল্পনায় ভূগোলকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
৩. সরবরাহ ও যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ
রুমেলি হিসারি দুর্গ নির্মাণের মাধ্যমে বসফরাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল অবরোধের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর ফলে শহরে বাইরের সাহায্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ অবরোধে খাদ্য, অস্ত্র, সৈন্য ও যোগাযোগের ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, দ্বিতীয় মেহমেদ তা ভালোভাবেই বুঝেছিলেন।
৪. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি
কনস্টান্টিনোপল বিজয় কোনো আকস্মিক অভিযান ছিল না। দুর্গ নির্মাণ, কামান তৈরি, সৈন্য সংগ্রহ, নৌবহর প্রস্তুত এবং রসদ সরবরাহ—সবকিছু পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছিল। শহরটির প্রতিরক্ষা সম্পর্কে ধারণা নিয়েই তিনি আক্রমণের পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।
৫. বিজয়ের পর রাজনৈতিক পুনর্গঠন
সামরিক বিজয়ের পর শহরটি ধরে রাখা এবং সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় মেহমেদ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ও কারিগর এনে শহর পুনর্গঠন করেন। অর্থাৎ তাঁর সামরিক কৌশলের সঙ্গে প্রশাসনিক পরিকল্পনাও যুক্ত ছিল।
শাসনব্যবস্থা, আইন ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা
দ্বিতীয় মেহমেদ সামরিক অভিযানের পাশাপাশি উসমানীয় রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করেন। তিনি কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থাকে সুসংহত করেন এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর সুলতানের কর্তৃত্ব বাড়ান।
তাঁর শাসনামলে উসমানীয় প্রশাসনের আইন ও নিয়মকানুন সংকলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ‘কানুননামা’ নামে পরিচিত আইনসংকলনের সঙ্গে তাঁর শাসনামলের সম্পর্ক রয়েছে। এসব বিধানের মাধ্যমে রাজস্ব, প্রশাসন, দরবার ও সামরিক ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়।
তিনি জ্ঞানচর্চা ও শিল্পকলারও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর দরবারে মুসলিম পণ্ডিতদের পাশাপাশি গ্রিক ও ইতালীয় জ্ঞানী ব্যক্তিদেরও স্থান ছিল। ইতালীয় চিত্রশিল্পী জেন্টিলে বেল্লিনি তাঁর দরবারে এসে সুলতানের বিখ্যাত প্রতিকৃতি আঁকেন। দ্বিতীয় মেহমেদের আগ্রহ শুধু সামরিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রাচীন ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য ও ভূগোলের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল।
তবে তাঁর শাসন ছিল একই সঙ্গে শক্তিশালী ও কঠোর কেন্দ্রীয় শাসনের উদাহরণ। সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে বহু অঞ্চলে যুদ্ধ, প্রাণহানি, বন্দিত্ব ও জনবসতির ক্ষতি হয়েছিল। কনস্টান্টিনোপল দখলের পরও লুটপাট ও সহিংসতা ঘটে। তাই তাঁর সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সামরিক বিজয়ের মানবিক মূল্যও মনে রাখা জরুরি।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৪৮১ সালের ৩ মে দ্বিতীয় মেহমেদের মৃত্যু হয়। তিনি তখন ইতালির দিকে নতুন একটি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে; অসুস্থতা বা বিষপ্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন দাবি থাকলেও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র দ্বিতীয় বায়েজিদ সিংহাসনে বসেন। দ্বিতীয় মেহমেদ যে সাম্রাজ্য রেখে যান, তা আর কেবল আনাতোলিয়া ও বলকানের একটি আঞ্চলিক শক্তি ছিল না। এটি ইউরোপ, এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী এক বৃহৎ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল।
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে এবং উসমানীয় সাম্রাজ্য পূর্ব ভূমধ্যসাগরের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। তবে এই ঘটনা ইউরোপের ইতিহাসে পরিবর্তনের একমাত্র কারণ ছিল না। বাণিজ্যপথ, কূটনীতি, সামরিক প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চার পরিবর্তন বহুদিন ধরেই চলছিল। কনস্টান্টিনোপলের পতন সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দ্বিতীয় মেহমেদ ইতিহাসে ‘ফাতিহ’ বা বিজেতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর সামরিক দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সাম্রাজ্য গঠনের ক্ষমতা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত শাসক ও সেনানায়কে পরিণত করেছে। কনস্টান্টিনোপল বিজয় তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি হলেও, একটি সামরিক বিজয়কে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার মধ্যেই তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিহিত।
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
জোয়ান অব আর্ক: যে কিশোরী সেনানায়িকা বদলে দিয়েছিলেন ফ্রান্সের যুদ্ধের ইতিহাস
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তৈমুর লং: মধ্য এশিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত যার অভিযানে কেঁপে উঠেছিল সাম্রাজ্যগুলো
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সালাহউদ্দিন আইয়ুবি: যিনি ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন মুসলিম বিশ্বকে এবং পুনরুদ্ধার করেছিলেন জেরুজালেম
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ: ইসলামের ইতিহাসের সেই সেনাপতি, যিনি পরিচিত ছিলেন ‘সাইফুল্লাহ’ নামে

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
চেঙ্গিস খান: যাযাবর যোদ্ধাদের একত্র করে যিনি গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাসের বৃহত্তম স্থল সাম্রাজ্য

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সান জু: যুদ্ধ না করেও শত্রুকে পরাজিত করার দর্শন যিনি শিখিয়েছিলেন
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
