Stipendium Hungaricum: হাঙ্গেরির সরকারি বৃত্তির পূর্ণাঙ্গ গাইড
শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক বৃত্তিসমূহ

Stipendium Hungaricum হলো হাঙ্গেরি সরকারের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৃত্তি প্রোগ্রাম। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বৃত্তিটি হাঙ্গেরির সংস্কৃতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে Tempus Public Foundation দ্বারা পরিচালিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাঙ্গেরিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা সম্পর্ক উন্নয়ন করা।
বাংলাদেশ এই বৃত্তির জন্য যোগ্য দেশগুলোর মধ্যে একটি এবং প্রতি বছর বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এই বৃত্তি পেয়ে থাকেন। ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য বাংলাদেশ থেকে Undergraduate, Master's, One-tier Master's এবং Doctoral প্রোগ্রামে মোট ১৪০টি বৃত্তি প্রদান করা হবে, যার মধ্যে Nuclear Energetics-এর জন্য অতিরিক্ত ৩০টি বৃত্তি সংরক্ষিত থাকবে। ২০২৭-২০২৮ চক্রের আবেদন শুরু হবে আশা করা হচ্ছে ১৫ নভেম্বর ২০২৬ থেকে, এবং শেষ তারিখ ১৫ জানুয়ারি ২০২৭।
Stipendium Hungaricum কী দেয়
Stipendium Hungaricum বৃত্তি সম্পূর্ণ অর্থায়িত। এর মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ টিউশন ফি মাফ, মাসিক ভাতা, আবাসন সহায়তা এবং স্বাস্থ্য বীমা।
মাসিক ভাতা শিক্ষার স্তরভেদে ভিন্ন। Bachelor, Master, One-tier Master এবং Postgraduate Specialist Training কোর্সের জন্য মাসিক ভাতা HUF ৪৩,৭০০ (প্রায় EUR ১১০), যা বছরে ১২ মাস দেওয়া হয়। Doctoral প্রোগ্রামের জন্য প্রথম পর্যায়ে (৪ সেমিস্টার) মাসিক HUF ১,৪০,০০০ (প্রায় EUR ৩৫০) এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে (৪ সেমিস্টার) মাসিক HUF ১,৮০,০০০ (প্রায় EUR ৪৫০) দেওয়া হয়।
আবাসন সহায়তা হিসেবে শিক্ষার্থীরা হয় বিনামূল্যে ডরমিটরি স্থান পায়, অথবা মাসিক HUF ৪০,০০০ (প্রায় EUR ১০০) আবাসন ভাতা পায়। তবে বড় শহরে বিশেষত বুদাপেস্টে এই ভাতা সম্পূর্ণ ভাড়া কভার নাও করতে পারে, তাই নিজের খরচের পরিকল্পনা করতে হবে।
স্বাস্থ্য বীমা হিসেবে হাঙ্গেরির আইন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা এবং বছরে সর্বোচ্চ HUF ৬৫,০০০ (প্রায় EUR ১৬০) পর্যন্ত সম্পূরক চিকিৎসা বীমা দেওয়া হয়। এছাড়া যেসব শিক্ষার্থী ইংরেজি ভাষায় পড়বে তাদের হাঙ্গেরিয়ান ভাষা ও সংস্কৃতি কোর্সে অংশ নিতে হবে, এবং হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় পড়ার ক্ষেত্রে ভাষা প্রস্তুতি কোর্সের সুযোগ দেওয়া হয়।
যোগ্যতা: কারা আবেদন করতে পারবেন
Stipendium Hungaricum-এর যোগ্যতা যাচাই করা প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মূল শর্তগুলো হলো—আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং হাঙ্গেরির নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের অধিকারী থাকা যাবে না। Undergraduate ও Master's প্রোগ্রামে ভর্তির ক্ষেত্রে ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর হতে হবে; অর্থাৎ জন্ম তারিখ ৩১ আগস্ট ২০০৮ বা তার আগে হতে হবে (ব্যতিক্রম: Dance Study Programmes)।
আবেদনকারীকে পূর্ববর্তী ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হবে বা আবেদনের বছরে সম্পন্ন করার পথে থাকতে হবে। প্রোগ্রামের ভাষার উপর নির্ভর করে ইংরেজি বা হাঙ্গেরিয়ান ভাষার দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। ইংরেজি-মাধ্যম প্রোগ্রামের জন্য সাধারণত IELTS ৫.৫ বা TOEFL iBT ৬৫ প্রয়োজন, তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় Medium of Instruction সার্টিফিকেটও গ্রহণ করে।
গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো Dual Application Process। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দুইটি জায়গায় আবেদন করতে হবে—একটি Tempus Public Foundation-এর অনলাইন সিস্টেমে (apply.stipendiumhungaricum.hu), অন্যটি বাংলাদেশের Sending Partner বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। শুধু Tempus-এ আবেদন করলে নমিনেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় না, ফলে আবেদন বাতিল হয়ে যায়।
প্রস্তুতির কৌশল: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য
প্রথম ধাপ: প্রোগ্রাম নির্বাচন। Stipendium Hungaricum-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে (stipendiumhungaricum.hu) প্রোগ্রাম তালিকা প্রকাশিত হয়। আবেদনকারীরা সর্বোচ্চ দুইটি প্রোগ্রাম বেছে নিতে পারেন। হাঙ্গেরির ৩০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮০০-এর বেশি প্রোগ্রাম রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসা, কম্পিউটার সায়েন্স, মেডিসিন, সমাজবিজ্ঞান এবং কলা।
দ্বিতীয় ধাপ: Sending Partner-এর শর্ত জানা। বাংলাদেশে Sending Partner হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ (DSHE)। তাদের নিজস্ব অনলাইন আবেদন সিস্টেম রয়েছে এবং আলাদা ডেডলাইন থাকতে পারে। তাই আগেই DSHE-র বিজ্ঞপ্তি পড়ে নেওয়া জরুরি।
তৃতীয় ধাপ: মোটিভেশন লেটার। Stipendium Hungaricum-এ Motivation Letter সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। Budapest University of Economics and Business (BGE)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী মোটিভেশন লেটার ২০০-৪০০ শব্দের মধ্যে হতে হবে এবং এতে আপনার একাডেমিক পটভূমি, কেন এই প্রোগ্রাম বেছে নিলেন, কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়, বুদাপেস্টে কী অর্জন করতে চান, এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—এই বিষয়গুলো থাকতে হবে। AI ব্যবহার করবেন না; নিজের কণ্ঠস্বরেই লিখুন।
চতুর্থ ধাপ: সুপারিশপত্র। কমপক্ষে দুইটি সুপারিশপত্র প্রয়োজন। যারা আপনাকে একাডেমিকভাবে জানেন—শিক্ষক বা সুপারভাইজার—তাদের কাছ থেকে সুপারিশ নিন।
পঞ্চম ধাপ: এন্ট্রান্স পরীক্ষা ও ইন্টারভিউ। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভর্তি পরীক্ষা বা অনলাইন ইন্টারভিউ হতে পারে। যেমন BGE-তে অনলাইন অ্যাডমিশন ইন্টারভিউ হয়, যেখানে ইংরেজি দক্ষতা ও প্রোগ্রাম-সম্পর্কিত মোটিভেশন যাচাই করা হয়। ডক্টরাল আবেদনকারীদের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সুপারভাইজার খুঁজে বের করতে হবে এবং ১৫ মার্চের মধ্যে সুপারভাইজারের কাছ থেকে কনফার্মেশন লেটার জমা দিতে হবে।
আবেদনের সময়সূচি
Stipendium Hungaricum-এর আবেদন চক্র সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হয় এবং ১৫ জানুয়ারি শেষ হয়। ২০২৬-২০২৭ চক্রের জন্য আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, CET দুপুর ২টা (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা)। ২০২৭-২০২৮ চক্রের জন্য আবেদন শুরু হবে আশা করা হচ্ছে ১৫ নভেম্বর ২০২৬ থেকে এবং শেষ হবে ১৫ জানুয়ারি ২০২৭।
নমিনেশন, মূল্যায়ন এবং ভর্তির সিদ্ধান্ত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। পড়াশোনা শুরু হবে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ।
বাংলাদেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা
দীপ রঞ্জন সরকার, যিনি ELTE-তে Computer Science পড়ছেন Stipendium Hungaricum বৃত্তি নিয়ে, বলেছেন—তিনি ELTE বেছে নিয়েছিলেন কারণ শিক্ষকরা সহজলভ্য, একাডেমিক চাপ কেমন হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি আসলে কতটা আন্তর্জাতিক—এই বিষয়গুলো তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বাংলাদেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের রিভিউ পড়ে এবং ELTE-র ওয়েবসাইট, পডকাস্ট ও অনলাইন উপস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বুদাপেস্টে পার্ট-টাইম কাজের সুযোগও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল লজিস্টিক্যাল—তিনি ১৫ সেপ্টেম্বর পৌঁছেছিলেন, কিন্তু কিছু সহপাঠী ১ সেপ্টেম্বর থেকেই ক্লাস শুরু করেছিল। প্রথম সপ্তাহেই সপ্তাহে পাঁচ দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪-৫টা পর্যন্ত ক্লাস ছিল, ফলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা প্রশাসনিক কাজ করার সময় পাওয়া কঠিন ছিল। তিন ক্লাস মিস করলে কোর্স ফেল—এই ভয়ে তিনি অ্যাডমিন কাজের চেয়ে ক্লাসে মনোযোগ দিয়েছিলেন। ফলে ডরমিটরি ভাড়ায় দেরি ফি দিতে হয়েছিল, কিন্তু তিনি এটিকে শিক্ষা হিসেবে নিয়েছেন।
শাহরীন ফারাহ খান, যিনি University of Pécs-এ MA Social Policy পড়ছেন, ২০২৪/২০২৫ Stipendium Hungaricum Excellence Award পেয়েছেন। কামাল হোসেন, যিনি বাংলাদেশের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে BSc শেষ করে চীনে MSc করার পর Stipendium Hungaricum বৃত্তি নিয়ে Budapest University of Technology and Economics-এ PhD করছেন, তিনিও এই বৃত্তির একজন সফল বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।
Stipendium Hungaricum শুধু একটি বৃত্তি নয়
Stipendium Hungaricum হাঙ্গেরির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তিগুলোর একটি। এটি শুধু একটি ডিগ্রি নয়; এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও শেনজেন অঞ্চলের ভিতরে পড়াশোনার এবং একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের অংশ হওয়ার সুযোগ। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১৪০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পান।
আপনার যদি হাঙ্গেরিতে পড়ার ইচ্ছা থাকে, শক্তিশালী একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে, এবং ইংরেজি-মাধ্যম প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার লক্ষ্য থাকে—তাহলে Stipendium Hungaricum আপনার জন্যই তৈরি। Tempus পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন করুন, DSHE-তে সমান্তরাল আবেদন জমা দিন, এবং মোটিভেশন লেটারে নিজের গল্প খুঁজে বের করুন। কারণ শেষ বিচারে, Stipendium Hungaricum শুধু একটি বৃত্তি নয়; এটি ইউরোপে আপনার যাত্রার সূচনা।
ঠাকুরগাঁওয়ে স্কুলের মধ্যাহ্নভোজ খেয়ে অসুস্থ অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী
পরবর্তীADB-জাপান বৃত্তি: এশিয়ার উন্নয়নের জন্য জাপানের বিনিয়োগ
সম্পর্কিত সংবাদ

শিক্ষাবৃত্তি
চেভেনিং বৃত্তি: যুক্তরাজ্যের নেতৃত্ব বৃত্তির পূর্ণাঙ্গ গাইড
শিক্ষাবৃত্তি
কমনওয়েলথ বৃত্তি: কমনওয়েলথ দেশের নেতৃত্বের সিঁড়ি

শিক্ষাবৃত্তি
ফুলব্রাইট ফরেন স্টুডেন্ট প্রোগ্রাম: যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বৃত্তির পূর্ণাঙ্গ গাইড

শিক্ষাবৃত্তি
অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস বৃত্তি: অস্ট্রেলিয়ার সরকারি বৃত্তির পূর্ণাঙ্গ গাইড

শিক্ষাবৃত্তি
ইরাসমাস মুন্ডাস জয়েন্ট মাস্টার্স: ইউরোপের সেরা বৃত্তির পূর্ণাঙ্গ গাইড
শিক্ষাবৃত্তি
DAAD বৃত্তি: জার্মানির গবেষণা ও শিক্ষার দরজা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
