চেভেনিং বৃত্তি: যুক্তরাজ্যের নেতৃত্ব বৃত্তির পূর্ণাঙ্গ গাইড
শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক বৃত্তিসমূহ

চেভেনিং বৃত্তি যুক্তরাজ্য সরকারের সবচেয়ে সম্মানিত আন্তর্জাতিক বৃত্তি প্রোগ্রাম। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন অফিস এবং অংশীদার সংস্থাগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত এই বৃত্তির মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্ভাবনাময় নেতাদের যুক্তরাজ্যে এক বছরের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ দেওয়া। চেভেনিং কেবল একটি ডিগ্রি নয়; এটি একটি বৈশ্বিক নেতৃত্বের নেটওয়ার্কের অংশ হওয়ার সুযোগ।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পান। ১৯৮৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৯৫ জনেরও বেশি বাংলাদেশি চেভেনিং বৃত্তি পেয়েছেন। যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেছেন, চেভেনিং বৃত্তি বাংলাদেশের উজ্জ্বল মেধাবীদের সম্ভাবনা উন্মোচন করে চলেছে। আবেদন গ্রহণ করা হয় আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে। ২০২৭-২০২৮ শিক্ষাবর্ষের আবেদনের শেষ তারিখ ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০০ ইউটিসি।
চেভেনিং কী দেয়
চেভেনিং বৃত্তি সম্পূর্ণ অর্থায়িত। এর মধ্যে রয়েছে যেকোনো যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সম্পূর্ণ টিউশন ফি, মাসিক জীবনযাত্রার ভাতা, বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য রিটার্ন ইকোনমি এয়ারফেয়ার, ভিসা খরচ এবং আগমন-প্রস্থান অনুদান। এর বাইরে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো চেভেনিং অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক, যা একটি বৈশ্বিক নেতৃত্বের পরিবার হিসেবে সারা জীবন কাজে লাগে।
যোগ্যতা: কারা আবেদন করতে পারবেন
যোগ্যতা যাচাই করা প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অযোগ্য আবেদন সরাসরি বাতিল করা হয়। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মূল শর্তগুলো হলো—আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং বৃত্তি শেষে অন্তত দুই বছরের জন্য বাংলাদেশে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। স্নাতক ডিগ্রি শেষ করার পর অন্তত দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, যা ২,৮০০ ঘণ্টার সমান হতে হবে। স্নাতক ডিগ্রি শেষ হতে হবে আবেদনের শেষ তারিখের অন্তত দুই বছর আগে। এবং আবেদনকারীকে তিনটি ভিন্ন যোগ্য যুক্তরাজ্যের স্নাতকোত্তর কোর্সে আবেদন করতে হবে।
যারা আবেদন করতে পারবেন না তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটিশ বা দ্বৈত ব্রিটিশ নাগরিকত্বধারী, আবেদনের সময় যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী, সরকারি বিভাগ বা ব্রিটিশ কাউন্সিলের কর্মী বা তাদের নিকট আত্মীয়, এবং যারা আগে যুক্তরাজ্য সরকারের বৃত্তিতে যুক্তরাজ্যে পড়েছেন।
প্রস্তুতির কৌশল
চেভেনিং কী চায় তা বোঝা
চেভেনিং অন্য বৃত্তিগুলোর মতো নয়। এটি একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বের চেয়ে নেতৃত্ব, প্রভাব এবং নেটওয়ার্কিং খোঁজে। চেভেনিং বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী জয়দীপ সিনহা রায় বলেছেন, চেভেনিং একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব বা পেশাগত অর্জনের বাইরে। এটি আপনার অনন্য গল্প, আপনার মূল্যবোধ এবং আপনি যে প্রভাব তৈরি করতে চান তা নিয়ে।
নেতৃত্ব মানে পদ নয়। অনেকের ভুল ধারণা যে নেতৃত্ব মানে ম্যানেজার বা ডিরেক্টর হওয়া। চেভেনিং বাংলাদেশের আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী মাহবুবা কামাল বলেছেন, পদ নেতৃত্বকে নির্ধারণ করে না, উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা করে। আপনি যদি কখনো কোনো ছোট উদ্যোগ নিয়ে থাকেন যা পরিবর্তন এনেছে, সেটাই আপনার নেতৃত্বের গল্প।
চারটি প্রবন্ধ: আপনার আসল অস্ত্র
চেভেনিং আবেদনে চারটি প্রবন্ধ থাকে—নেতৃত্ব, নেটওয়ার্কিং, স্টাডি প্ল্যান এবং ক্যারিয়ার প্ল্যান। ২০২৬ সালের চক্র থেকে প্রতিটি প্রবন্ধের শব্দসংখ্যা ৩০০ শব্দে নামিয়ে আনা হয়েছে। তাই প্রতিটি শব্দ মূল্যবান।
গল্প সাজানোর জন্য STAR পদ্ধতি ব্যবহার করুন। পরিস্থিতি, কাজ, পদক্ষেপ এবং ফলাফল—এই চারটি ধাপে আপনার গল্প সাজান। একটি শক্তিশালী উদাহরণ সম্পূর্ণভাবে বিকাশ করুন, চার-পাঁচটি দুর্বল উদাহরণের চেয়ে ভালো। প্রতিটি প্রবন্ধে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কাঠামো ব্যবহার করুন। আপনি অতীতে কী করেছেন, বর্তমানে কী করছেন, এবং চেভেনিং আপনাকে ভবিষ্যতে কীভাবে সাহায্য করবে—এই তিনটি অংশে আপনার গল্প সাজান।
নেটওয়ার্কিং প্রবন্ধে শুধু ইভেন্টের তালিকা করবেন না। দেখান কীভাবে আপনার নেটওয়ার্ক আপনাকে সাহায্য করেছে এবং আপনি কীভাবে অন্যদের সাহায্য করেছেন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা—AI ব্যবহার করবেন না। চেভেনিং কর্তৃপক্ষ AI দিয়ে লেখা প্রবন্ধ শনাক্ত করে। আপনার নিজের কণ্ঠস্বর, এমনকি অসম্পূর্ণ ইংরেজিতেও, বেশি মূল্যবান।
বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন
আপনাকে তিনটি ভিন্ন যোগ্য যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর কোর্সে আবেদন করতে হবে। শুধু নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম লিখলেই হবে না; কেন সেই নির্দিষ্ট কোর্স, সেই মডিউল, সেই ফ্যাকাল্টি আপনার ক্যারিয়ারের জন্য প্রয়োজন—তা ব্যাখ্যা করতে হবে।
চেভেনিং আবেদন জমা দেওয়ার সাথে সাথেই আপনার বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন শুরু করুন। চেভেনিং বৃত্তি পেতে হলে অন্তত একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শর্তহীন ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে ৮ জুলাই ২০২৭ তারিখের মধ্যে।
সুপারিশপত্র
আপনার দুইজন সুপারিশকারীর নাম ও যোগাযোগের তথ্য লাগবে। ইন্টারভিউয়ের জন্য নির্বাচিত হলে তাদের ইংরেজিতে লেখা দুটি সুপারিশপত্র জমা দিতে হবে। সেই সুপারিশকারীদের বেছে নিন যারা আপনাকে ভালো জানেন এবং আপনার নেতৃত্ব ও প্রভাবের সাক্ষ্য দিতে পারবেন। শুধু বড় পদ বা নামী প্রতিষ্ঠান দেখে সুপারিশকারী বাছাই করবেন না; যিনি আপনাকে ভালো জানেন এবং আন্তরিকভাবে আপনার পক্ষে বলতে পারেন, তিনিই সেরা।
আবেদনের সময়সূচি
চেভেনিং আবেদন থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি প্রায় এক বছর সময় নেয়। ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আবেদন শুরু হবে এবং ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০০ ইউটিসিতে শেষ হবে। অক্টোবরে যোগ্যতা যাচাই হবে। মধ্য-অক্টোবর ২০২৬ থেকে জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত স্বাধীন পঠন কমিটি আবেদন মূল্যায়ন করবে। মধ্য-ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এ ইন্টারভিউয়ের জন্য নির্বাচিতদের তালিকা প্রকাশ হবে। মার্চ-এপ্রিল ২০২৭-এ ব্রিটিশ দূতাবাসে ইন্টারভিউ হবে। মধ্য-জুন ২০২৭-এ ফলাফল ঘোষণা হবে। ৮ জুলাই ২০২৭ তারিখের মধ্যে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শর্তহীন ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর ২০২৭-এ যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা শুরু হবে।
বাংলাদেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পরামর্শ
মাহবুবা কামাল, যিনি বর্তমানে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, বলেছেন যে তিনি যখন চেভেনিংয়ে আবেদন করি, তখন আমার কোনো আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের পদ ছিল না। তার পরামর্শ হলো নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে আপনার উদ্যোগ ও প্রভাব দেখান, পদ নয়।
জয়দীপ সিনহা রায়, যিনি ২০১৮-১৯ সালে চেভেনিং পান, বলেছেন, আপনার গল্পে বিশ্বাস করুন, আপনার যাত্রার মালিক হোন, এবং নির্দ্বিধায় নিজের মতো হোন। এটাই আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি আরও পরামর্শ দেন যে ছোট অভিজ্ঞতাও মূল্যবান যদি তা প্রভাব বা বৃদ্ধি দেখায়।
প্রস্তুতির সময়রেখা
আপনি যদি ২০২৭-২০২৮ চক্রে আবেদন করতে চান, তাহলে এখনই প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। এখন থেকে অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত আপনার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন নিয়ে গবেষণা করুন এবং প্রবন্ধের খসড়া তৈরি করুন। আগস্ট ২০২৬-এ আবেদন শুরু করুন। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রবন্ধ চূড়ান্ত করুন এবং সুপারিশকারীদের সাথে যোগাযোগ করুন। অক্টোবর ২০২৬-এ আবেদন জমা দিন। নভেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন সম্পন্ন করুন। ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ২০২৭-এ ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি নিন। জুন-জুলাই ২০২৭-এ ফলাফল এবং অফার জমা দিন।
চেভেনিং একটি বৃত্তি যার গ্রহণযোগ্যতার হার প্রায় ১ শতাংশ। এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তিগুলোর একটি। কিন্তু প্রতিযোগিতা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত ৩৯৫ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা, কিন্তু তাদের একটি জিনিস共通—তারা বিশ্বাস করতেন তারা নেতা।
চেভেনিং আপনাকে শুধু যুক্তরাজ্যে পড়ার সুযোগ দেয় না; এটি আপনাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতৃত্বের নেটওয়ার্কের অংশ করে। এটি আপনাকে শেখায় কীভাবে আপনার সমাজ, আপনার দেশ এবং বিশ্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হয়।
আপনার যদি নেতৃত্বের গল্প থাকে, যা হয়তো আপনি নিজেও গুরুত্ব দেননি, তাহলে চেভেনিং আপনার জন্যই তৈরি। আমি কি একজন নেতা—এই প্রশ্নটি নিজেকে করুন। উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে এখনই প্রস্তুতি শুরু করুন। কারণ চেভেনিং শুধু একটি বৃত্তি নয়; এটি একটি যাত্রা, যা আপনার জীবন বদলে দিতে পারে।
কমনওয়েলথ বৃত্তি: কমনওয়েলথ দেশের নেতৃত্বের সিঁড়ি
পরবর্তীঢাকায় চলছে দুই দিনের স্টাডি অ্যাব্রোড ফেয়ার
সম্পর্কিত সংবাদ
শিক্ষাবৃত্তি
কমনওয়েলথ বৃত্তি: কমনওয়েলথ দেশের নেতৃত্বের সিঁড়ি

শিক্ষাবৃত্তি
ফুলব্রাইট ফরেন স্টুডেন্ট প্রোগ্রাম: যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বৃত্তির পূর্ণাঙ্গ গাইড

শিক্ষাবৃত্তি
অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস বৃত্তি: অস্ট্রেলিয়ার সরকারি বৃত্তির পূর্ণাঙ্গ গাইড

শিক্ষাবৃত্তি
ইরাসমাস মুন্ডাস জয়েন্ট মাস্টার্স: ইউরোপের সেরা বৃত্তির পূর্ণাঙ্গ গাইড
শিক্ষাবৃত্তি
DAAD বৃত্তি: জার্মানির গবেষণা ও শিক্ষার দরজা
শিক্ষাবৃত্তি
MEXT বৃত্তি: জাপানে পড়াশোনার স্বপ্নপূরণের পথ
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
