শহরের গাছই কি বাড়াচ্ছে বায়ুদূষণ? নতুন গবেষণায় উঠে এলো চমকপ্রদ তথ্য
শহরের গাছই কি বাড়াচ্ছে বায়ুদূষণ? নতুন গবেষণায় উঠে এলো চমকপ্রদ তথ্য
সবুজ গাছপালা মানেই নির্মল বাতাস—শহুরে জীবনে এমন ধারণাই সবচেয়ে প্রচলিত। দূষণে জর্জরিত নগরগুলোকে বাসযোগ্য করতে তাই রাস্তার পাশে, পার্কে ও আবাসিক এলাকায় ব্যাপকভাবে গাছ লাগানো হয়। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং শহরকে সবুজ করে তোলে—এসবই সত্য। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির গাছ শহরের বায়ুর মান উন্নত করার বদলে উল্টো ওজোন দূষণ বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে ব্যাপকভাবে লাগানো উইলো ও পপলারজাতীয় গাছ থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ বায়ুমণ্ডলে এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা ক্ষতিকর ভূ-পৃষ্ঠীয় ওজোন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Science Advances সাময়িকীতে।
গাছ থেকে বের হওয়া রাসায়নিক কীভাবে দূষণ বাড়ায়?
গাছপালা বিভিন্ন ধরনের উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা Volatile Organic Compounds (VOCs) বাতাসে ছেড়ে দেয়। এর মধ্যে অন্যতম একটি যৌগ হলো আইসোপ্রিন। এটি উদ্ভিদের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তৈরি হয়।
তবে আইসোপ্রিন সরাসরি ওজোন তৈরি করে না। সমস্যা শুরু হয় যখন এটি বায়ুমণ্ডলে থাকা নাইট্রোজেন অক্সাইড বা NOx-এর সঙ্গে বিক্রিয়া করে। যানবাহন, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট উৎস থেকে নির্গত NOx এবং VOC সূর্যালোকের উপস্থিতিতে জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি ওজোন তৈরি করতে পারে।
এই ওজোন কিন্তু পৃথিবীর ওপরের বায়ুমণ্ডলের সেই উপকারী ওজোনস্তর নয়, যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে আমাদের রক্ষা করে। মাটির কাছাকাছি তৈরি হওয়া ওজোন একটি ক্ষতিকর বায়ুদূষক।
এটি শ্বাসনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে হাঁপানি বা ফুসফুসের বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের জন্য এটি বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
বেইজিংয়ের গাছপালা নিয়ে গবেষণা
গবেষকেরা ২০২১ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বেইজিংয়ের বিভিন্ন স্থান থেকে বাতাসের নমুনা সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে ওজোনসংক্রান্ত তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ওই সময় বেইজিংয়ের মোট VOC নির্গমনের প্রায় ১০ শতাংশ এসেছিল উদ্ভিদ থেকে। বাকি বড় অংশের উৎস ছিল যানবাহন, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট কার্যক্রম।
তবে মোট VOC নির্গমনের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও ওজোন তৈরির রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের ভূমিকা ছিল অনেক বেশি।
গবেষকেরা হিসাব করে দেখেন, ওজোন তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার প্রায় ৫২ শতাংশে উদ্ভিদ থেকে নির্গত যৌগ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আইসোপ্রিনের।
অর্থাৎ, দূষণের উৎস হিসেবে গাছের নির্গমন হয়তো যানবাহন বা শিল্পকারখানার তুলনায় কম, কিন্তু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই নির্গত যৌগ ওজোন তৈরির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
কোন গাছগুলো নিয়ে উদ্বেগ?
সব গাছ সমান পরিমাণে VOC বা আইসোপ্রিন নির্গত করে না। কিছু প্রজাতি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি নির্গমন করে।
বেইজিংয়ে ব্যাপকভাবে দেখা যায় উইলো (Salix) ও পপলার (Populus) জাতীয় গাছ। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের প্রায় ৩৫ শতাংশ গাছ এমন প্রজাতির, যেগুলো আইসোপ্রিন নির্গত করতে পারে।
এই গাছগুলো শহরে লাগানোর পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণও রয়েছে। অনেক প্রজাতি দ্রুত বেড়ে ওঠে, কঠিন পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এবং শহুরে সবুজায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
কিন্তু গবেষণাটি দেখাচ্ছে, শহরে গাছ লাগানোর পরিকল্পনার সময় শুধু কত দ্রুত গাছ বড় হয় বা কতটা কার্বন শোষণ করতে পারে, তা বিবেচনা করলেই যথেষ্ট নয়। গাছটি বায়ুমণ্ডলে কী ধরনের রাসায়নিক নির্গত করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শুধু বেইজিং নয়
গবেষকেরা বিশ্বের ২৪টি বৃহৎ শহরে লাগানো বিভিন্ন গাছের সম্ভাব্য আইসোপ্রিন নির্গমনও বিশ্লেষণ করেছেন।
ফলাফল বলছে, অনেক শহরে গাছপালা থেকে সম্ভাব্য আইসোপ্রিন নির্গমনের মাত্রা বেইজিংয়ের চেয়েও বেশি হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে শহরের প্রায় ৬৫ শতাংশ গাছ আইসোপ্রিন নির্গত করে বলে গবেষকেরা অনুমান করেছেন। মেলবোর্নসহ আরও কয়েকটি বড় শহরেও একই ধরনের পরিস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে।
এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—শহুরে সবুজায়নের পরিকল্পনায় কি গাছের প্রজাতি নির্বাচনের বিষয়টি নতুনভাবে ভাবতে হবে?
তাপমাত্রা বাড়লে বাড়তে পারে সমস্যা
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো তাপমাত্রার সঙ্গে VOC এবং ওজোন তৈরির সম্পর্ক।
গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে বেড়ে ৩৫ ডিগ্রিতে পৌঁছালে উদ্ভিদ থেকে নির্গত VOC-এর সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার প্রায় সাত গুণ বেড়ে যেতে পারে।
২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় উদ্ভিদের অবদান ছিল প্রায় ২১ শতাংশ। কিন্তু ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ শতাংশে।
অর্থাৎ, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহুরে গাছপালা থেকে নির্গত কিছু রাসায়নিকের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বিশ্বের অনেক শহর ক্রমেই বেশি গরম হয়ে উঠছে, তখন বিষয়টি নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তাহলে কি শহরে গাছ লাগানো বন্ধ করতে হবে?
একেবারেই নয়।
এই গবেষণার মূল বার্তা গাছকে দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা নয়। বরং এটি দেখায় যে, শহরের বায়ুর রসায়ন অত্যন্ত জটিল এবং সব ধরনের গাছ সব পরিবেশে একই রকম প্রভাব ফেলে না।
গাছ এখনও শহরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, ছায়া দেয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এবং মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।
কিন্তু শহরে কী ধরনের গাছ লাগানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে যেসব শহরে যানবাহন ও শিল্পকারখানা থেকে প্রচুর NOx নির্গত হয় এবং যেখানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেশি থাকে, সেখানে উচ্চমাত্রায় আইসোপ্রিন নির্গতকারী গাছের ব্যাপক উপস্থিতি ওজোন দূষণের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
শহুরে সবুজায়নের নতুন সমীকরণ
দীর্ঘদিন ধরে নগর পরিকল্পনায় একটি সরল ধারণা কাজ করেছে—যত বেশি গাছ, তত ভালো পরিবেশ।
নতুন এই গবেষণা সেই ধারণাকে পুরোপুরি ভুল বলছে না, তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যোগ করছে: সঠিক জায়গায় সঠিক প্রজাতির গাছ।
শহরের তাপমাত্রা, যানবাহনের নির্গমন, শিল্পকারখানার অবস্থান, স্থানীয় আবহাওয়া এবং গাছের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যতের সবুজায়ন পরিকল্পনা করতে হতে পারে।
কারণ একটি গাছ একই সঙ্গে শহরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করতে পারে, কার্বন শোষণ করতে পারে, আবার নির্দিষ্ট বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিতে এমন যৌগও নির্গত করতে পারে যা ওজোন তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে তাই শহরকে শুধু সবুজ করাই যথেষ্ট নয়। সেই সবুজের প্রকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনার প্রশ্ন হয়তো আর শুধু এমন হবে না—‘কত গাছ লাগানো হবে?’
প্রশ্নটি হতে পারে—‘কোন গাছ, কোথায় এবং কেন লাগানো হবে?’
এক হাজার বছরের প্রবাল বলছে, শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সতর্কসংকেত?
পরবর্তীসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিগন্তবিস্তারক
সম্পর্কিত সংবাদ
বিজ্ঞান বার্তা
টেকসই জ্বালানির ভবিষ্যৎ: বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও তরুণ গবেষকদের ভূমিকা
বিজ্ঞান বার্তা
মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা শক্তি: কেন ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের জ্বালানি বিশ্ব

বিজ্ঞান বার্তা
কাগজের আবিষ্কার: যে উদ্ভাবন জ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছিল মানুষের ঘরে ঘরে
বিজ্ঞান বার্তা
জিপিএস (GPS): পৃথিবীর যেকোনো জায়গা খুঁজে পেতে যে প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন

বিজ্ঞান বার্তা
স্মার্টফোন: যে আবিষ্কার মানুষের পকেটেই এনে দিয়েছে পুরো পৃথিবী
বিজ্ঞান বার্তা
অ্যারিস্টটল: যে দার্শনিক যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত খুলেছিলেন
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
