মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র কীভাবে অতীতকে দেখতে পায়?

মহাবিশ্বের দিকে তাকানো মানে শুধু দূরের কোনো নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিকে দেখা নয়, বরং সময়ের পেছনেও ফিরে যাওয়া। মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এমন সব গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, যাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে কয়েক শ কোটি বছর পর্যন্ত সময় নিয়েছে। অর্থাৎ, আমরা আজ সেই গ্যালাক্সিগুলোকে যেমন অবস্থায় দেখছি, বাস্তবে সেগুলো তেমন ছিল বহু কোটি বা কোটি কোটি বছর আগে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব এই ‘অতীত দেখা’?
আলো যখন সময়ের বার্তাবাহক
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আলোর গতির মধ্যে। শূন্যস্থানে আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। মানুষের পরিচিত দৈনন্দিন দূরত্বের তুলনায় এটি অবিশ্বাস্য দ্রুত হলেও মহাবিশ্বের বিশালত্বের কাছে আলোর গতিও সীমাবদ্ধ।
সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো পৌঁছাতে প্রায় আট মিনিট ২০ সেকেন্ড লাগে। অর্থাৎ, আমরা যখন সূর্যের দিকে তাকাই, তখন সূর্যকে দেখি প্রায় আট মিনিট আগের অবস্থায়। এই মুহূর্তে সূর্যে কোনো পরিবর্তন ঘটলেও তার আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে ওই সময়টুকু লাগবে।
একইভাবে, পৃথিবী থেকে ১০০ আলোকবর্ষ দূরের কোনো নক্ষত্রকে দেখার অর্থ হলো, আমরা নক্ষত্রটির প্রায় ১০০ বছর আগের আলো দেখছি। আলোকবর্ষ সময়ের একক নয়, দূরত্বের একক। এক বছরে আলো যতটা পথ অতিক্রম করে, সেটিই এক আলোকবর্ষ।
অর্থাৎ, কোনো মহাজাগতিক বস্তু যত দূরে, তার আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে সাধারণত তত বেশি সময় লাগে। দূরবর্তী মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাই আমরা মহাবিশ্বের পুরোনো অবস্থার ছবি পেতে পারি।
মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র কীভাবে কাজ করে?
মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র মূলত দূরের মহাজাগতিক বস্তু থেকে আসা আলো বা অন্যান্য তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ সংগ্রহ করে। সাধারণ ক্যামেরার মতোই এটি আলোকে শনাক্ত করে ছবি বা বৈজ্ঞানিক তথ্য তৈরি করে। তবে মহাকাশের অত্যন্ত ক্ষীণ আলো ধরতে এর আয়না, সেন্সর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ বিশেষভাবে তৈরি করা হয়।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অনেক ধরনের বিকিরণ শোষণ করে এবং দৃশ্যমান আলোকে কিছুটা বাঁকিয়ে দেয়। ফলে স্থলভিত্তিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মহাবিশ্বের সবকিছু সমান স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। মহাকাশে স্থাপিত দূরবীক্ষণ যন্ত্র এই বাধার অনেকটাই এড়িয়ে কাজ করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (James Webb Space Telescope) প্রধানত অবলোহিত বা ইনফ্রারেড আলো পর্যবেক্ষণ করে। এই আলো ব্যবহার করে এটি ধূলিমেঘের আড়ালে থাকা নক্ষত্রের জন্মস্থান এবং মহাবিশ্বের প্রাচীন গ্যালাক্সি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
তবে দূরবীক্ষণ যন্ত্র নিজে সময়ের পেছনে যায় না। এটি কেবল বহু আগে কোনো মহাজাগতিক বস্তু থেকে যাত্রা শুরু করা আলো সংগ্রহ করে। সেই আলো বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা বস্তুটির অতীত অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পান।
হাবল ও জেমস ওয়েব: মহাবিশ্বের অতীতের জানালা
মহাবিশ্বের অতীত অনুসন্ধানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র হলো হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ।
হাবল দীর্ঘদিন ধরে দূরবর্তী গ্যালাক্সি, নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছে। এর বিখ্যাত ডিপ ফিল্ড ছবিগুলোতে আকাশের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশে অসংখ্য দূরবর্তী গ্যালাক্সি দেখা যায়। এসব গ্যালাক্সির আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে কয়েক শ কোটি বছর লেগেছে।
অন্যদিকে, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ অবলোহিত আলো শনাক্ত করতে বিশেষভাবে সক্ষম। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রসারিত হয়ে দীর্ঘতর হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় মহাজাগতিক লোহিত সরণ (Cosmological Redshift)। প্রাচীন গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো প্রায়ই অবলোহিত অঞ্চলে সরে যায়। তাই সেই আলো শনাক্ত করার মাধ্যমে জেমস ওয়েব মহাবিশ্বের প্রাথমিক যুগের গ্যালাক্সি অনুসন্ধান করতে পারে।
তবে শুধু দূরবীক্ষণ যন্ত্রে কোনো গ্যালাক্সিকে দেখা গেলেই তার বয়স বা মহাবিশ্বের কোন সময়ে সেটি ছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। বিজ্ঞানীরা আলোর বর্ণালি, লোহিত সরণের পরিমাণ এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে তার দূরত্ব ও অতীত অবস্থা নির্ণয়ের চেষ্টা করেন।
মহাবিশ্বের বয়স কতটা পেছনে দেখা যায়?
বিজ্ঞানীদের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর। মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে আমরা মহাবিশ্বের ইতিহাসের অত্যন্ত প্রাচীন পর্যায়ের গ্যালাক্সিও পর্যবেক্ষণ করতে পারি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোনো গ্যালাক্সির আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে যত বছর সময় নিয়েছে, সেই সময়কে তার বর্তমান দূরত্বের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যায় না। কারণ, আলো চলার সময় মহাবিশ্ব নিজেই সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে দূরবর্তী গ্যালাক্সির আলো আমাদের দিকে যাত্রা শুরু করার পর থেকে গ্যালাক্সিটি আরও দূরে সরে যেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা তাই শুধু আলোর যাত্রার সময় নয়, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হিসাবও বিবেচনায় নেন। এসব তথ্যের সাহায্যে তাঁরা নির্ণয় করেন, মহাবিশ্বের কোন সময়ে গ্যালাক্সিটি আলো ছড়িয়েছিল এবং সেই সময় গ্যালাক্সিটি কেমন ছিল।
এভাবে দূরবর্তী গ্যালাক্সির ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, মহাবিশ্বের প্রথম দিকের গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছিল, নক্ষত্র গঠনের প্রক্রিয়া কেমন ছিল এবং সময়ের সঙ্গে গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
মহাবিশ্বের প্রাচীনতম আলো: কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড
মহাবিশ্বের অতীত সম্পর্কে জানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি হলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (Cosmic Microwave Background বা CMB)। এটি মহাবিশ্বের প্রাথমিক যুগ থেকে আসা এক ধরনের বিকিরণ।
বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর মহাবিশ্ব যথেষ্ট ঠান্ডা হয়ে আসে। তখন আলো তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। সেই সময়ের আলো মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কারণে আজ প্রসারিত হয়ে মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ হিসেবে শনাক্ত করা যায়।
এই বিকিরণ কোনো একটি গ্যালাক্সির ছবি নয়; বরং এটি প্রায় পুরো আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন আলোর একটি পটভূমি। বিজ্ঞানীরা এর ক্ষুদ্র তাপমাত্রাগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক মহাবিশ্বের ঘনত্ব, গঠন এবং পরবর্তী সময়ে গ্যালাক্সি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন।
কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড পর্যবেক্ষণে প্ল্যাঙ্ক ও ডব্লিউএমএপি-র মতো মহাকাশ মিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই তথ্যগুলো মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি।
অতীত দেখা মানেই কি সবকিছু জানা?
দূরবীক্ষণ যন্ত্র মহাবিশ্বের অতীত সম্পর্কে অসাধারণ তথ্য দিলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। খুব দূরের বস্তু থেকে আসা আলো অত্যন্ত ক্ষীণ হতে পারে। মহাজাগতিক ধূলিকণা আলো শোষণ বা ছড়িয়ে দিতে পারে। আবার মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কারণে আলোর বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ ও হিসাব করতে হয়।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার—আমরা কোনো গ্যালাক্সির অতীতের আলো দেখলেও সেটি বর্তমানে ঠিক কেমন অবস্থায় আছে, তা একইভাবে দেখতে পারি না। তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের কাছে পৌঁছানো আলো ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়; কিন্তু সেই তথ্যও অতীতের কোনো সময়ের খবর বহন করে।
এ কারণেই মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ শুধু ছবি তোলার বিষয় নয়। আলো বিশ্লেষণ, পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র, গাণিতিক মডেল এবং বিভিন্ন দূরবীক্ষণ যন্ত্রের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের ইতিহাস পুনর্গঠন করেন।
মহাকাশের দিকে তাকানো মানে সময়ের দিকে তাকানো
মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র আমাদের এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করে, যা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বাইরে। আমরা যখন রাতের আকাশে কোনো নক্ষত্র দেখি, তখন সব সময় সেটিকে তার বর্তমান অবস্থায় দেখি না; বরং তার কাছ থেকে বহু আগে যাত্রা শুরু করা আলো দেখি। দূরবর্তী গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে এই সময়ের ব্যবধান আরও বিশাল।
এই কারণেই মহাকাশবিজ্ঞানীরা দূরবীক্ষণ যন্ত্রকে শুধু দূরের বস্তু দেখার যন্ত্র হিসেবে দেখেন না। এগুলো মহাবিশ্বের ইতিহাস জানারও মাধ্যম। কোটি কোটি বছর আগে যাত্রা শুরু করা আলোর ক্ষীণ সংকেত বিশ্লেষণ করে মানুষ আজ অনুসন্ধান করছে—প্রথম গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছিল, নক্ষত্রের জন্ম কীভাবে ঘটেছিল এবং মহাবিশ্ব সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলে গেছে।
মহাবিশ্বের গভীরে তাকালে তাই আমরা শুধু দূরত্ব অতিক্রম করি না; আমরা যেন সময়েরও গভীরে প্রবেশ করি। আর সেই যাত্রার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, অতীতের আলোই আমাদের মহাবিশ্বের বর্তমান ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে।
ইবনে আল-হাইসাম: আলো ও দৃষ্টির রহস্য উন্মোচনকারী বিজ্ঞানী
পরবর্তীএক্স-রে আবিষ্কার: শরীরের ভেতর দেখার যে প্রযুক্তি বদলে দিয়েছিল চিকিৎসাবিজ্ঞান
সম্পর্কিত সংবাদ
বিজ্ঞান বার্তা
টেকসই জ্বালানির ভবিষ্যৎ: বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও তরুণ গবেষকদের ভূমিকা
বিজ্ঞান বার্তা
মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা শক্তি: কেন ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের জ্বালানি বিশ্ব

বিজ্ঞান বার্তা
কাগজের আবিষ্কার: যে উদ্ভাবন জ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছিল মানুষের ঘরে ঘরে
বিজ্ঞান বার্তা
জিপিএস (GPS): পৃথিবীর যেকোনো জায়গা খুঁজে পেতে যে প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন

বিজ্ঞান বার্তা
স্মার্টফোন: যে আবিষ্কার মানুষের পকেটেই এনে দিয়েছে পুরো পৃথিবী
বিজ্ঞান বার্তা
অ্যারিস্টটল: যে দার্শনিক যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত খুলেছিলেন
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
