মেডিকেল, ডেন্টাল ও নার্সিং—স্বাস্থ্যশিক্ষায় এগিয়ে নারীরা
Editorial Team২৬ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:১৬ PM২ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

বাংলাদেশে চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬৩ শতাংশই ছাত্রী। ডেন্টাল শিক্ষায়ও ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। আর নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী। তবে শিক্ষায় নারীদের এই অগ্রগতির প্রতিফলন কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে, এখনো পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদনে চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অগ্রগতির এ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, চিকিৎসক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষায় নারীরা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। গত কয়েক বছর ধরেই মেডিকেল কলেজগুলোতে ছাত্রীদের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। শুধু ভর্তি নয়, এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকদের মধ্যেও নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি।
মেডিকেল কলেজে ছাত্রী প্রায় ৬৩ শতাংশ
ব্যানবেইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১০৯টি সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ৫১ হাজার ৩১৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৭৯ শতাংশ নারী। ওই সময়ের হিসাবে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে মোট শিক্ষার্থীর ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ ছিলেন ছাত্রী। বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে এ হার আরও বেশি—৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ।
অর্থাৎ, সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের মেডিকেল কলেজেই নারীরা শিক্ষার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। চিকিৎসাশিক্ষায় তাঁদের এই অবস্থান প্রমাণ করে, চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ এখন বেশ শক্তিশালী। তবে শিক্ষায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি কর্মজীবনে তাঁদের অবস্থান কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ডেন্টাল ও নার্সিং শিক্ষাতেও নারীদের প্রাধান্য
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অগ্রগতি শুধু এমবিবিএস কোর্সে সীমাবদ্ধ নয়। ডেন্টাল শিক্ষাতেও তাঁরা এগিয়ে রয়েছেন। শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ৩৫টি ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল ইউনিটে শিক্ষার্থী প্রায় সাড়ে সাত হাজার। তাঁদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৮৫ শতাংশ নারী।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও বেশি। দেশে এ ধরনের কলেজ ও ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ৪৭৫। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী প্রায় ৪০ হাজার, যাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী। স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্স ও মিডওয়াইফদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসব পেশার শিক্ষায় নারীদের বড় অংশগ্রহণ দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এমবিবিএস পাসেও এগিয়ে নারীরা
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অগ্রগতির প্রবণতা সাম্প্রতিক নয়। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই ১০ বছরে দেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোট ৪৮ হাজার ৭৭৭ জন এমবিবিএস পাস করেন। তাঁদের মধ্যে নারী ছিলেন ২৬ হাজার ৯০১ জন, যা মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর প্রায় ৫৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, মেডিকেল কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসাশিক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও তাঁদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তবে চিকিৎসাশিক্ষায় ভালো ফল এবং পেশাগত জীবনে প্রবেশের সুযোগ—দুটি বিষয় এক নয়। কর্মক্ষেত্রে নারীরা কতটা সুযোগ পাচ্ছেন, তা বুঝতে নিয়োগের পরিসংখ্যানও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সরকারি চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীরা এগিয়ে থাকলেও সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। ৩৯তম বিশেষ বিসিএসে ৬ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ছিলেন ৫৩ শতাংশ এবং নারী ৪৭ শতাংশ। অথচ ওই বিসিএসে আবেদনকারীদের ৫৬ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী।
একই ধরনের চিত্র দেখা যায় ৪২তম বিশেষ বিসিএসেও। এ পরীক্ষার মাধ্যমে ৪ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৯ শতাংশ নারী। অথচ আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর অংশ ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।
এ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ তাঁদের আবেদনকারীর অনুপাতের তুলনায় কম ছিল। তবে শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে এর নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা যায় না। কর্মপরিবেশ, কর্মস্থলের অবস্থান, পারিবারিক দায়িত্ব এবং পেশাগত সুযোগের মতো বিষয়গুলো নারী চিকিৎসকদের কর্মজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার পেছনে কী ভূমিকা রাখছে?
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি চিকিৎসাশিক্ষায় তাঁদের অগ্রগতির অন্যতম পটভূমি। এসব স্তরে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতায় তাঁদের অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। চিকিৎসক হওয়ার প্রতি আগ্রহ এবং পরিবারের উৎসাহও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের অগ্রগতির পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণকে একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। পারিবারিক ও আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষার সুযোগ, ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্য এবং পেশা নির্বাচনের পছন্দ—সবকিছুই উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে নারীদের এগিয়ে থাকা ইতিবাচক দিক। তবে কর্মক্ষেত্রে তাঁদের জন্য কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়েছে। বিশেষ করে মফস্সল এলাকার কর্মপরিবেশ ও অন্যান্য বাস্তবতার কারণে নারী চিকিৎসকদের কাজ করতে অসুবিধায় পড়তে হতে পারে।
বিশেষায়িত চিকিৎসায়ও ভারসাম্য প্রয়োজন
চিকিৎসা পেশায় প্রবেশের পর কোন শাখায় কাজ করবেন, সেটিও নারী চিকিৎসকদের পেশাগত অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) নিবন্ধিত ৩৪ হাজার ৬৯৭ জন চিকিৎসকের তথ্য নিয়ে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও আইসিডিডিআরবির গবেষকেরা একটি বিশ্লেষণ করেছিলেন। গবেষণাটি ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্লস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, নিবন্ধিত চিকিৎসকদের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী এবং ৪৮ শতাংশ পুরুষ ছিলেন। পুরুষ চিকিৎসকদের মধ্যে ৮৭ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা ছিল মেডিসিন ও সার্জারিতে। নারী চিকিৎসকদের মধ্যে ৯৬ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা ছিল গাইনি ও প্রসূতিবিদ্যায়। এ তথ্য নির্দিষ্ট সময়ের গবেষণার ফল; বর্তমান সময়ের সব চিকিৎসকের বিশেষায়িত ক্ষেত্রের চিত্র হিসেবে একে ধরে নেওয়া যাবে না।
তবে গবেষণাটি চিকিৎসার বিভিন্ন শাখায় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। স্বাস্থ্যসেবার সব বিশেষায়িত ক্ষেত্রেই দক্ষ চিকিৎসক প্রয়োজন। তাই নারীদের চিকিৎসাশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের জন্য বিভিন্ন বিশেষায়িত শাখায় প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নতি ও নেতৃত্বের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার সাফল্য যেন কর্মক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়
চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মেডিকেল, ডেন্টাল, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় তাঁদের অংশগ্রহণ স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যৎ জনবল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু শিক্ষার্থী হিসেবে এগিয়ে থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রশিক্ষণ শেষে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, পেশায় টিকে থাকা এবং দক্ষতা অনুযায়ী উন্নতির সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নারী চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা, নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো গেলে শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতি কর্মজীবনেও আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। চিকিৎসাশিক্ষায় নারীদের এই অগ্রগতি তাই শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় দক্ষ জনবল ও পেশাগত সুযোগ নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
পূর্ববর্তী
২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার টেস্টের সময়সূচি ঘোষণা, ফল প্রকাশের শেষ তারিখ ১৫ নভেম্বর
পরবর্তীশতভাগ জিপিএ-৫ নিশ্চিত করতে ১০১ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার বাইরে রাখার অভিযোগ, ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
