মানুষের মস্তিষ্কের একটি জিনের অংশ মিলল ভাইরাসে—কীভাবে সম্ভব?
মানুষের শরীরের ভেতরে থাকা ডিএনএকে আমরা সাধারণত শরীরের ‘নকশা’ হিসেবে ভাবি। আমাদের চোখের রং থেকে শুরু করে শরীরের কোষ কীভাবে কাজ করবে—অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই এই ডিএনএর মধ্যে থাকে। কিন্তু ডিএনএ মোটেও স্থির কোনো নকশা নয়। এর কিছু অংশ নিজের কপি তৈরি করে জিনোমের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা এমন কিছু জেনেটিক উপাদানকে বলেন ‘জাম্পিং জিন’। এবার গবেষকেরা এমন একটি জেনেটিক ঘটনার সন্ধান পেয়েছেন, যা আরও চমকপ্রদ। মানুষের একটি জিন থেকে তৈরি হওয়া ডিএনএর অংশ পাওয়া গেছে একটি ভাইরাসের জিনোমে।
যে জিনটির কথা বলা হচ্ছে, তার নাম BC200। এটি মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা নিউরনে বিশেষভাবে সক্রিয়। গবেষকেরা মলাস্কাম কনটাজিওসম ভাইরাসের মধ্যে BC200 থেকে উদ্ভূত দুটি ডিএনএ অংশ খুঁজে পেয়েছেন। এই ভাইরাসটি মানুষের ত্বকে সংক্রমণ ঘটায় এবং সাধারণত ছোট ছোট উঁচু গুটি বা ক্ষত তৈরি করে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Science জার্নালে।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ভাইরাসটি মানুষের মস্তিষ্ক থেকে পুরো একটি জিন তুলে নিয়ে নিজের শরীরে বসিয়ে ফেলেছে—এমনটা কিন্তু ঘটেনি। গবেষকেরা যে জিনিসটি পেয়েছেন, সেটি BC200-এর পুরো জিনও নয়। বরং BC200 থেকে তৈরি হওয়া দুটি ছোট জেনেটিক অংশ কোনো এক সময়ে ভাইরাসের জিনোমে ঢুকে গেছে। আর ভাইরাসে যাওয়ার পর এগুলো মানুষের মস্তিষ্কের মতো কোনো কাজ করছে—এমন প্রমাণও এখন পর্যন্ত নেই।
BC200 নিজেই বেশ অদ্ভুত একটি জিন। আমাদের পরিচিত অনেক জিনের কাজ হলো প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা দেওয়া। কিন্তু BC200 সরাসরি কোনো প্রোটিন তৈরি করে না। এটি বরং একটি ছোট RNA অণু তৈরি করে। এই RNA বিশেষ করে নিউরনে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এবং কোষে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে শরীরে BC200 ঠিক কী কাজ করে, বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি।
এখানে ‘মস্তিষ্কের জিন’ কথাটিও একটু ভুল বোঝাবুঝির কারণ হতে পারে। BC200-কে মস্তিষ্কের জিন বলা হয় কারণ এটি নিউরনে বেশি সক্রিয়। এর অর্থ এই নয় যে BC200 শুধু মস্তিষ্কেই থাকে। আমাদের শরীরের প্রায় সব নিউক্লিয়াসযুক্ত কোষেই মূলত একই জেনেটিক তথ্য থাকে। পার্থক্য হলো, কোন কোষে কোন জিন বেশি সক্রিয় আর কোন জিন কম সক্রিয়। তাই ত্বকের কোষেও BC200-এর ডিএনএ থাকতে পারে, যদিও সেখানে এর কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম।
BC200-এর গল্প আরও পুরোনো। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর পূর্বসূরি ছিল এক ধরনের ‘জাম্পিং জিন’। এই ধরনের ডিএনএ নিজের কপি তৈরি করে জিনোমের অন্য জায়গায় যেতে পারে। অনেকটা একটি বইয়ের একটি পৃষ্ঠা ফটোকপি করে বইয়ের অন্য জায়গায় নতুন করে বসিয়ে দেওয়ার মতো। মূল পৃষ্ঠাটি যেখানে ছিল সেখানেই থাকে, কিন্তু তার আরেকটি কপি নতুন জায়গায় চলে যায়।
প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৫ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে বানর ও এপদের একটি সাধারণ পূর্বপুরুষের জিনোমে BC200-এর পূর্বসূরি প্রবেশ করেছিল বলে মনে করা হয়। পরে বিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে সেটি কোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। বিশেষ করে নিউরনে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হয়। সাধারণত কোনো ‘জাম্পিং জিন’ যখন কোষের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তখন তার এদিক-ওদিক যাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু BC200 যেন পুরোনো ক্ষমতার কিছুটা ধরে রেখেছিল।
অর্থাৎ BC200 একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে পারে—একদিকে কোষের কাজে ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে তার জেনেটিক অংশ নতুন জায়গায় চলে যাওয়ার ক্ষমতাও ধরে রেখেছে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সেড্রিক ফেশোটের মতে, বিবর্তন যেন এই দুটি বৈশিষ্ট্যকে পুরোপুরি আলাদা করতে পারেনি।
কিন্তু মানুষের একটি জিনের অংশ ভাইরাসের শরীরে গেল কীভাবে?
গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে থাকতে পারে LINE-1 নামের আরেক ধরনের জাম্পিং জিন। LINE-1 এমন একটি জেনেটিক উপাদান, যা RNA-কে আবার DNA-তে পরিণত করে জিনোমের নতুন জায়গায় বসিয়ে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় আণবিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। BC200-এর নিজের এমন ব্যবস্থা নেই। ফলে BC200 অনেকটা অন্যের তৈরি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নিজের কপি তৈরি করার সুযোগ পেতে পারে।
সহজভাবে বললে, BC200 যদি কোনো জায়গায় যাওয়ার জন্য নিজের গাড়ি না রাখে, তাহলে LINE-1-এর গাড়িতে চড়ে যেতে পারে। গবেষকদের বিশ্লেষণ বলছে, মানুষের জেনেটিক অংশগুলো ভাইরাসের জিনোমে পৌঁছানোর পেছনে এমন একটি প্রক্রিয়া কাজ করে থাকতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা এই ঘটনা চোখের সামনে ঘটতে দেখেননি। তাঁরা ভাইরাসের বর্তমান জিনোমে থাকা ডিএনএ এবং তার আশপাশের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য দেখে অতীতের ঘটনাটি পুনর্গঠন করেছেন। তাই ঠিক কখন এবং কোথায় মানুষের BC200-উৎসজাত অংশ ভাইরাসের মধ্যে ঢুকেছিল, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যেহেতু BC200 মস্তিষ্কের নিউরনে বেশি সক্রিয়, ভাইরাস কি মানুষের মস্তিষ্ক থেকেই এই জেনেটিক অংশ পেয়েছিল?
এমন কোনো প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া যায়নি। কারণ BC200 শুধু নিউরনেই থাকে না; ত্বকের কোষেও অল্প পরিমাণে এটি সক্রিয় হতে পারে। গবেষকেরা পরীক্ষাগারে দেখেছেন, মলাস্কাম কনটাজিওসম ভাইরাস দিয়ে সংক্রমিত মানব কোষে BC200-এর কার্যক্রম বেড়ে যেতে পারে। এতে ধারণা করা যায়, ভাইরাসের সংক্রমণ হয়তো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে এই ধরনের জেনেটিক স্থানান্তর ঘটার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে আসল ঘটনাটি কোথায় ঘটেছিল, তা এখনো অজানা।
গবেষকেরা শুধু ভাইরাসের জিনোমই পরীক্ষা করেননি। তাঁরা ৯০৮ জন মানুষের জেনেটিক তথ্যও বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে BC200 থেকে উদ্ভূত আটটি ভিন্ন জেনেটিক অংশ পাওয়া গেছে, যেগুলো মানুষের জিনোমের বিভিন্ন জায়গায় ঢুকে রয়েছে। এর মধ্যে কিছু অংশ বহু মানুষের মধ্যে পাওয়া গেছে এবং সম্ভবত বেশ পুরোনো। আবার কিছু অংশ এতই বিরল যে মাত্র একজন বা দুজন মানুষের মধ্যে পাওয়া গেছে।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, BC200-এর মতো জেনেটিক উপাদানের চলাচল মানুষের বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটেছে। শুধু মানুষ নয়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রাইমেটের জিনোমেও গবেষকেরা শত শত এমন জেনেটিক অংশ খুঁজে পেয়েছেন। অর্থাৎ এটি কোনো একবারের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং কোটি কোটি বছর ধরে চলতে থাকা একটি বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার অংশ।
তবে ভাইরাসটি মানুষের কাছ থেকে BC200-এর অংশ পাওয়ার পর কোনো সুবিধা পেয়েছে কি না, সেটি এখনো জানা যায়নি। গবেষকেরা দেখেছেন, ভাইরাসের জিনোমে থাকা এই অংশগুলো থেকে RNA তৈরি হতে পারে। সম্ভবত সেই RNA সংক্রমিত কোষের প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এটি সত্যিই ভাইরাসকে কোনো সুবিধা দেয় কি না, তা জানতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই গবেষণা এমন কোনো প্রমাণ দেয়নি যে BC200-এর অংশ পাওয়ার কারণে মলাস্কাম কনটাজিওসম ভাইরাস আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ভাইরাসটি মানুষের মস্তিষ্কের কোনো ক্ষমতা অর্জন করেছে—এমনটাও নয়। গবেষণাটির আসল গুরুত্ব অন্য জায়গায়।
এটি আমাদের দেখাচ্ছে, জিনোমকে হয়তো আমরা যতটা স্থির মনে করি, বাস্তবে সেটি তার চেয়ে অনেক বেশি পরিবর্তনশীল। আমাদের ডিএনএর কিছু অংশ কোটি কোটি বছর ধরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। কখনো তারা নতুন কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, আবার কখনো তাদের পুরোনো ‘জাম্পিং’ ক্ষমতাও ধরে রেখেছে। আর বিরল ক্ষেত্রে সেই জেনেটিক যাত্রা মানুষের জিনোমের বাইরেও পৌঁছাতে পারে।
BC200-এর গল্প তাই শুধু একটি ভাইরাসে মানুষের ডিএনএর অংশ খুঁজে পাওয়ার গল্প নয়। এটি বিবর্তনের একটি গভীর সত্যের কথাও মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিতে জিনের চলাচল সবসময় আমাদের কল্পনার মতো সরল নয়। কোটি কোটি বছর ধরে চলা এই জেনেটিক যাত্রায় কোনো একটি জিনের অংশ কোথায় গিয়ে হাজির হবে, তারও হয়তো নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা নেই।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ: সাত জোড়া দেয়ালে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস
পরবর্তীরায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: যে ইটের দেয়াল আজও বহন করে একাত্তরের শোক
সম্পর্কিত সংবাদ
বিজ্ঞান বার্তা
টেকসই জ্বালানির ভবিষ্যৎ: বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও তরুণ গবেষকদের ভূমিকা
বিজ্ঞান বার্তা
মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা শক্তি: কেন ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎ বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের জ্বালানি বিশ্ব

বিজ্ঞান বার্তা
কাগজের আবিষ্কার: যে উদ্ভাবন জ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছিল মানুষের ঘরে ঘরে
বিজ্ঞান বার্তা
জিপিএস (GPS): পৃথিবীর যেকোনো জায়গা খুঁজে পেতে যে প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন

বিজ্ঞান বার্তা
স্মার্টফোন: যে আবিষ্কার মানুষের পকেটেই এনে দিয়েছে পুরো পৃথিবী
বিজ্ঞান বার্তা
অ্যারিস্টটল: যে দার্শনিক যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত খুলেছিলেন
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
