ফ্র্যাঙ্ক হারবার্টের 'ডিউন' (১৯৬৫): সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ইকোলজিক্যাল মহাকাব্য
best science fiction stories of all time
Editorial Team২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:০০ AM৮ ভিউ৪ মিনিট পড়া
শেয়ার:

একটি মরুভূমির গ্রহের মহাকাব্য, যা পৃথিবীর ভাগ্যও বলে দিয়েছে
ফ্র্যাঙ্ক হারবার্টের 'ডিউন' ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়, এবং এটিকে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি প্রথম নেবুলা পুরস্কার (সেরা উপন্যাস) জিতে নেয়, আর ১৯৬৬ সালে রজার জেলাজনির 'দিস ইমমর্টাল'-এর সাথে যৌথভাবে হুগো পুরস্কারও জেতে। কিন্তু এই উপন্যাসের জন্মটা সহজ ছিল না—Chilton Books নামের একটি প্রকাশনা সংস্থা (যারা মূলত অটোমোবাইল রিপেয়ার ম্যানুয়াল প্রকাশ করত) এটি গ্রহণ করার আগে বিশটিরও বেশি প্রকাশক এটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। 'ডিউন' প্রথমে 'অ্যানালগ' ম্যাগাজিনে দুটি ধারাবাহিক গল্প হিসেবে প্রকাশিত হয়—'ডিউন ওয়ার্ল্ড' (১৯৬৩-৬৪) আর 'দ্য প্রফেট অব ডিউন' (১৯৬৫)।
উপন্যাসটির অনুপ্রেরণা এসেছিল হারবার্টের ওরেগন রাজ্যের বালিয়াড়ি নিয়ে গবেষণা থেকে। তিনি মূলত মার্কিন কৃষি বিভাগ কীভাবে চলমান বালিয়াড়ি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, তা নিয়ে একটি সংবাদ প্রতিবেদন লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিবেদন কখনও সম্পূর্ণ হয়নি। বরং ওরেগনের বালিয়াড়িতে গভীরভাবে গবেষণা করার পর হারবার্টের মধ্যে ইকোলজির প্রতি তীব্র আগ্রহ জন্মায়—বিশেষ করে মানুষের হস্তক্ষেপ কীভাবে পরিবেশকে প্রভাবিত করে। সেই "ব্যর্থ সংবাদ প্রতিবেদন" শেষে একটি মরুভূমির গ্রহের মহাকাব্যে রূপ নেয়।
অ্যারাকিস: একটি গ্রহ, একটি সম্পদ, একটি যুদ্ধ
গল্পটি ঘটে সুদূর ভবিষ্যতে, যেখানে মহাবিশ্ব একটি সামন্ততান্ত্রিক সাম্রাজ্য ব্যবস্থা দ্বারা শাসিত, আর সর্বোচ্চ শাসক হলেন প্যাডিশাহ সম্রাট শাদ্দাম চতুর্থ। এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো মেলাঞ্জ, যা সাধারণত 'স্পাইস' বা মশলা নামে পরিচিত—একটি পদার্থ যা শুধুমাত্র মরুভূমির গ্রহ অ্যারাকিসে (যাকে ডিউনও বলা হয়) পাওয়া যায়। মশলা আয়ু বাড়ায়, মানসিক ক্ষমতা বাড়ায়, আর ইন্টারস্টেলার ভ্রমণের জন্য অপরিহার্য—এটি ছাড়া নেভিগেটররা অতিরিক্ত আলোর গতিতে ভ্রমণ করতে পারে না।
অ্যারাকিস প্রথমে নিষ্ঠুর ও চতুর হাউস হ্যারকোনেন দ্বারা শাসিত ছিল, যারা এই গ্রহের মশলা নিষ্পেষণ করত, কিন্তু স্থানীয় ফ্রিমেন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অসংখ্য নিষ্ঠুরতা করেছিল। কিন্তু সম্রাট অ্যারাকিসের শাসনভার হাউস হ্যারকোনেন থেকে ডিউক লেটো অ্যাট্রেইডেসের নেতৃত্বাধীন হাউস অ্যাট্রেইডেসের কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন। ডিউক লেটো জানতেন এটি একটি ফাঁদ—ব্যারন ভ্লাদিমির হ্যারকোনেন সম্রাটের গোপন সমর্থনে একটি ধ্বংসাত্মক আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন, যা অ্যাট্রেইডেস পরিবারকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ডিউক লেটো নিহত হন, কিন্তু তার ছেলে পল অ্যাট্রেইডেস (তখন মাত্র ১৫ বছর বয়স) এবং পলের মা লেডি জেসিকা মরুভূমির গভীরে পালিয়ে যান।
পল অ্যাট্রেইডেস: ভাগ্য দ্বারা নির্বাচিত এক কিশোর
পল 'ডিউন'-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার মা জেসিকা রহস্যময় বেনি জেসারিট সিস্টারহুডের সদস্য—একটি নারীদের গোপন সংগঠন, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দীর জিনগত নির্বাচন পরিকল্পনার মাধ্যমে 'কুইসাটজ হাডেরাক' নামে একজন অতিমানব তৈরি করার চেষ্টা করছে। জেসিকার একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ডিউক লেটোর প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি পুত্র পলকে জন্ম দেন। ফলে পল সম্ভবত সেই ব্যক্তি, যাকে সিস্টারহুড হাজার হাজার বছর ধরে খুঁজছে—এমন এক সত্তা, যে একই সাথে সব সময় ও স্থানে বিদ্যমান থাকতে পারে।
মরুভূমিতে পল আর জেসিকা ফ্রিমেনদের দ্বারা গৃহীত হন। ফ্রিমেনরা অ্যারাকিসের আদিবাসী, যাদের চোখ মশলার সাথে দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শে গভীর নীল হয়ে গেছে, আর তাদের জীবন সম্পূর্ণভাবে মরুভূমির নিষ্ঠুর পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া। ফ্রিমেনরা একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাস করে—একজন বহিরাগত ত্রাণকর্তা 'লিসান আল-গাইব' তাদের মুক্তি দেবেন। পল ধীরে ধীরে তাদের কাছে সেই ভবিষ্যদ্বাণীর চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। তিনি প্রচুর পরিমাণে মশলা গ্রহণ করেন, ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা অর্জন করেন, আর একই সাথে একটি অস্বস্তিকর ভাগ্যের সাথে লড়াই করেন: যদি তিনি এই ভূমিকা গ্রহণ করেন, তাহলে তার নামে একটি পবিত্র যুদ্ধ শুরু হবে, যেখানে কোটি কোটি মানুষ মারা যাবে। তিনি এই ভাগ্য প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিটি প্রচেষ্টাই তাকে আরও কাছে নিয়ে যায়।
মরুভূমির শক্তি: ফ্রিমেন আর ইকোলজি
ফ্রিমেনরা 'ডিউন'-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাদানগুলোর একটি। তারা অ্যারাকিসের নিষ্ঠুর পরিবেশে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে, এবং নিজেদের প্রযুক্তি ও বিশ্বাস গড়ে তুলেছে। তারা 'স্টিলস্যুট' নামে একটি পূর্ণাঙ্গ পোশাক পরে—যা শরীরের আর্দ্রতা পুনর্ব্যবহার করে, প্রায় এক ফোঁটা পানি নষ্ট করে না। তারা বিশালাকার স্যান্ডওয়ার্মকে নিয়ন্ত্রণ করে—অ্যারাকিসের আদি প্রাণী, যারা মশলার রহস্য রক্ষা করে। তারা 'উয়েজ অব দ্য ডেজার্ট' দিয়ে লড়াই করে, 'ওয়াটার কম্প্যাক্ট' দিয়ে একে অপরকে বাধ্য করে।
হারবার্ট ফ্রিমেনদের মাধ্যমে একটি মূল থিম অন্বেষণ করেন: মানুষ কীভাবে পরিবেশের সাথে খাপ খায়, আর পরিবেশ কীভাবে মানুষকে গড়ে তোলে। অ্যারাকিসের মরুভূমি কোনো পটভূমি না, এটি একটি জীবন্ত চরিত্র। স্যান্ডওয়ার্মের জীবনচক্র মশলার উৎপাদনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত, আর ফ্রিমেনদের টিকে থাকার কৌশল এই চরম ইকোসিস্টেমের প্রতি একটি প্রতিক্রিয়া। হারবার্টকে ব্যাপকভাবে "জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন প্রথম ইকোলজিক্যাল সায়েন্স ফিকশন গল্প" এর লেখক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
উত্তরাধিকার: কাল্ট উপন্যাস থেকে সাংস্কৃতিক ঘটনা
'ডিউন'-এর প্রভাব সাহিত্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। জর্জ লুকাসের 'স্টার ওয়ার্স' হারবার্টের বিশ্ব নির্মাণ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে। ডেভিড লিঞ্চের ১৯৮৪ সালের চলচ্চিত্র রূপান্তর বক্স অফিসে ব্যর্থ হলেও কাল্ট ক্লাসিক হয়ে ওঠে। ডেনিস ভিলেনুভের ২০২১ সালের রূপান্তর সমালোচক ও বাণিজ্যিক উভয় দিক থেকেই সফল হয়, যেখানে টিমোথি শালামে পল অ্যাট্রেইডেস, জেন্ডায়া চানি, আর রেবেকা ফার্গুসন লেডি জেসিকা চরিত্রে অভিনয় করেন।
হারবার্ট ১৯৮৬ সালে মৃত্যুর আগে 'ডিউন'-এর পাঁচটি সিক্যুয়েল লিখেছিলেন। কিন্তু প্রথম 'ডিউন'-ই সর্বাধিক প্রভাবশালী—এটি শুধু একটি সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস না, এটি ক্ষমতা, ধর্ম, ইকোলজি আর মানব ভাগ্য নিয়ে একটি গভীর চিন্তা। পল অ্যাট্রেইডেসের সংগ্রাম—সমস্ত সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ জেনেও একটি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হওয়া—আজও সায়েন্স ফিকশন সাহিত্যের সবচেয়ে জটিল নৈতিক দ্বিধাগুলোর একটি।
পূর্ববর্তী
ই. এম. ফরস্টারের 'দ্য মেশিন স্টপস' (১৯০৯): ইন্টারনেট যুগের ভবিষ্যদ্বাণী, এক শতাব্দী আগে লেখা
পরবর্তীরে ব্র্যাডবেরির 'ফারেনহাইট ৪৫১' (১৯৫৩): বই পোড়ানোর গল্প, যা আজও প্রাসঙ্গিক
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
জল্লাদখানা বধ্যভূমি: মিরপুরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের নির্মম ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: যে ইটের দেয়াল আজও বহন করে একাত্তরের শোক

খেলাধুলা ও বিনোদন
জাতীয় স্মৃতিসৌধ: সাত জোড়া দেয়ালে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
চন্দ্রাবতী মন্দির: কবির প্রেম, বিরহ আর মধ্যযুগের বাংলার এক নীরব স্মৃতিচিহ্ন
খেলাধুলা ও বিনোদন
বাঘা মসজিদ: রাজশাহীর মাটিতে সুলতানি বাংলার এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি

খেলাধুলা ও বিনোদন
পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দিরসমূহ: রাজশাহীর মাটিতে স্থাপত্য আর ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
