ই. এম. ফরস্টারের 'দ্য মেশিন স্টপস' (১৯০৯): ইন্টারনেট যুগের ভবিষ্যদ্বাণী, এক শতাব্দী আগে লেখা
Best science fiction stories of all time
Editorial Team২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১০:০০ AM৪ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

একটি গল্প, যা ১৯০৯ সালে লিখেছিল ২০২০ সালের জীবন
ই. এম. ফরস্টার সাধারণত পরিচিত তার 'এ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া', 'হাওয়ার্ডস এন্ড', আর 'এ রুম উইথ আ ভিউ' উপন্যাসের জন্য—যেগুলো ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাসিক। কিন্তু খুব কম মানুষ জানেন, ফরস্টার ১৯০৯ সালে একটি সায়েন্স ফিকশন ছোটগল্প লিখেছিলেন, যা আজকের ইন্টারনেট, ভিডিও কলিং, আর দূর থেকে কাজ করার জীবনের এতটাই সঠিক বর্ণনা দেয় যেBBC-র সাবেক আর্টস এডিটর উইল গম্পার্টজ ২০২০ সালে লিখেছিলেন, "দ্য মেশিন স্টপস শুধু পূর্বাভাস নয়; এটি ২০২০ সালের লকডাউন জীবনের একটি jaw-droppingly, gob-smackingly, breath-takingly accurate সাহিত্যিক বর্ণনা"।
গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৯ সালের নভেম্বরে 'দ্য অক্সফোর্ড অ্যান্ড কেমব্রিজ রিভিউ'-এ। ফরস্টার নিজে বলেছিলেন, এটি এইচ. জি. ওয়েলসের ভবিষ্যৎ-কল্পনার একটি "প্রতিক্রিয়া" (reaction)। ওয়েলস ভাবতেন প্রযুক্তি মানুষকে মুক্তি দেবে, আর ফরস্টার ভাবতেন প্রযুক্তি মানুষকে বন্দী করবে। ফরস্টারের ভয়টা সত্যি হয়েছিল।
দ্য মেশিন: একটি যন্ত্র, যা সবকিছু দেয়, আবার সবকিছু কেড়ে নেয়
গল্পের ঘটনা ঘটে একটি ভবিষ্যতে, যেখানে মানুষ আর পৃথিবীর পৃষ্ঠে বাঁচতে পারে না। তারা সবাই মাটির নিচে বাস করে, প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ষড়ভুজাকার ঘরে, যা মৌচাকের কোষের মতো। এই ঘরগুলো 'দ্য মেশিন' নামের একটি বিশাল, সর্বজ্ঞ যন্ত্রব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মেশিন খাবার দেয়, বাতাস পরিষ্কার রাখে, গান বাজায়, আর যোগাযোগের সব উপায় দেয়।
গল্পের প্রধান চরিত্র বসতি (Vashti), একজন "উন্নত" মা। সে তার ছোট ষড়ভুজ ঘরে বসে থাকে, ঘর থেকে কখনও বের হয় না। তার চেহারা "ছত্রাকের মতো সাদা", তার শরীর "একটি জড়ানো মাংসের পিণ্ড"। সে কখনও সূর্য দেখেনি, কখনও প্রকৃত বাতাসে শ্বাস নেয়নি। তার পুরো জীবন মেশিনের স্ক্রিনের মধ্য দিয়ে চলে।
বসতির ছেলে কুনো (Kuno) সম্পূর্ণ আলাদা। সে তার মায়ের সাথে দেখা করতে চায়—সরাসরি, স্ক্রিনের মাধ্যমে না। সে বলে, "আমি তোমাকে দেখতে চাই মেশিনের মধ্য দিয়ে না। আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই এই ক্লান্তিকর মেশিনের মধ্য দিয়ে না।"। বসতি ভয় পায়। সে বলে, "তুমি মেশিনের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারবে না।" কুনো তবুও বলে, "আমি বিশ্বাস করি না মেশিন সর্বশক্তিমান।"।
কুনোর বিদ্রোহ: একজন ছেলে, যে সূর্য দেখতে চায়
কুনো শুধু কথা বলে না, সে কাজ করে। সে মেশিনের নিয়ম ভেঙে একটি শ্যাফট দিয়ে উপরে উঠে যায়—পৃথিবীর পৃষ্ঠে, যেখানে মানুষ হাজার বছর ধরে যায় না। সেখানে সে দেখে "নিচু বর্ণহীন পাহাড়"—সেগুলো জীবন্ত, "তাদের ত্বকের নিচে পেশী কাঁপছে"। সে তার আসল চুল স্পর্শ করে, যা মেশিন কেটে ফেলেছিল। সে তার আসল চোখ দেখে, যা মেশিন লুকিয়ে রেখেছিল।
কুনো তার মাকে বলে, "আমি তারাদের দেখেছি। ওরিয়ন নক্ষত্রমণ্ডল। চারটি বড় তারা হলো মানুষের কাঁধ আর হাঁটু।"। বসতি আতঙ্কিত হয়। সে জানে না তার ছেলে কী বলছে। সে ভাবে কুনো পাগল হয়ে গেছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই অংশটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কুনো প্রতিনিধিত্ব করে সেই সাহসী শিক্ষার্থীকে, যে প্রশ্ন করে—"আমরা কেন এভাবে বাঁচছি? এর বাইরে কি কিছু নেই?" বসতি প্রতিনিধিত্ব করে সেই শিক্ষার্থীকে, যে প্রশ্ন করতে ভয় পায়, যে মনে করে যা আছে তাই ঠিক আছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, প্রশ্ন করা মানে বিদ্রোহ না, প্রশ্ন করা মানে সত্য খোঁজা।
যে যন্ত্র ভেঙে পড়ে: একটি সভ্যতার পতন
গল্পের শেষে মেশিন ভেঙে পড়তে শুরু করে। প্রথমে ছোট ছোট সমস্যা—যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়, খাবার দেরি করে আসে। তারপর সবকিছু থেমে যায়। মেশিনের ভেতরে বসবাসকারী মানুষগুলো বুঝতে পারে—তারা কিছুই করতে পারে না। তাদের পেশী atrophy হয়ে গেছে, তারা হাঁটতে পারে না, তারা নিজের খাবার বানাতে পারে না।
মেশিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার নামে। মানুষগুলো চিৎকার করে, কিন্তু কেউ শুনতে পায় না। বসতি আর কুনো একসাথে বসে থাকে, জানে তাদের শেষ সময় এসেছে। কুনো বলে, "মেশিন আমাদের সবকিছু দিয়েছিল, কিন্তু আমাদের কিছুই শেখায়নি।"
শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—প্রযুক্তি যদি তোমাকে নির্ভরশীল করে তোলে, তাহলে প্রযুক্তি তোমার শত্রু। প্রযুক্তি যদি তোমাকে শক্তিশালী করে, তাহলে প্রযুক্তি তোমার বন্ধু। পার্থক্য হলো—তুমি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছ, নাকি প্রযুক্তি তোমাকে ব্যবহার করছে?
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই গল্প জরুরি
'দ্য মেশিন স্টপস' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি ১৯০৯ সালে লেখা, কিন্তু এটি ২০২৬ সালের কথা বলে। ফরস্টার ইন্টারনেটের আগেই ইন্টারনেটের কথা ভেবেছিলেন, ভিডিও কলের আগেই ভিডিও কলের কথা ভেবেছিলেন, দূর থেকে পড়াশোনার আগেই দূর থেকে পড়াশোনার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তার আসল অবদান প্রযুক্তির ভবিষ্যদ্বাণী না—তার আসল অবদান হলো প্রযুক্তির প্রভাবের ভবিষ্যদ্বাণী।
ফরস্টার দেখিয়েছিলেন, যখন মানুষ প্রযুক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভর করে, তখন সে নিজের মানবিকতাও হারায়। বসতি তার ছেলেকে স্ক্রিনে দেখতে পায়, কিন্তু তাকে স্পর্শ করতে পারে না। কুনো তার মাকে বলে, "আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই, মেশিনের মধ্য দিয়ে না।" শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, প্রযুক্তি যোগাযোগ সহজ করে, কিন্তু প্রকৃত যোগাযোগ—স্পর্শ, উপস্থিতি, মুখোমুখি দেখা—সেটা প্রযুক্তি দিতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফরস্টারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব প্রযুক্তির ভবিষ্যদ্বাণী না, মানুষের স্বভাবের ভবিষ্যদ্বাণী। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষ আরাম চাইবে, আর সেই আরামের জন্য নিজের স্বাধীনতা, নিজের শরীর, নিজের সম্পর্ক—সবকিছু ত্যাগ করবে। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, আরাম আর স্বাধীনতা এক নয়। কখনও কখনও আরাম পাওয়ার জন্য স্বাধীনতা হারাতে হয়।
শেষ কথা
'দ্য মেশিন স্টপস' শুধু একটি সায়েন্স ফিকশন গল্প নয়, এটি একটি আয়না। এটি শেখায়—প্রযুক্তি মানুষকে বাঁচাতে পারে, আবার প্রযুক্তি মানুষকে বন্দীও করতে পারে। পার্থক্য নির্ভর করে মানুষ কীভাবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে। ছুটির দিনে বা পড়াশোনার ফাঁকে এই গল্পটা পড়লে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ফোন, নিজেদের স্ক্রিন, নিজেদের ভার্চুয়াল জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারবে।
কারণ কিছু গল্প শুধু ভবিষ্যৎ দেখায়, আর কিছু গল্প ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা দেয়। 'দ্য মেশিন স্টপস' সেই ধরনের একটি গল্প, যা ১৯০৯ সালে লেখা, কিন্তু ২০২৬ সালে পড়লে মনে হয়—এটা তো আজকের কথা।
পূর্ববর্তী
ড্যানিয়েল কিজের 'ফ্লাওয়ার্স ফর অ্যালজারনন' (১৯৫৯): বুদ্ধিমত্তার দাম, মানবতার মূল্য
পরবর্তীআইজ্যাক আসিমভের 'নাইটফল' (১৯৪১): যে গল্পকে আমেরিকান লেখকরা সর্বকালের সেরা সায়েন্স ফিকশন বলেছেন
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
জল্লাদখানা বধ্যভূমি: মিরপুরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের নির্মম ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: যে ইটের দেয়াল আজও বহন করে একাত্তরের শোক

খেলাধুলা ও বিনোদন
জাতীয় স্মৃতিসৌধ: সাত জোড়া দেয়ালে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
চন্দ্রাবতী মন্দির: কবির প্রেম, বিরহ আর মধ্যযুগের বাংলার এক নীরব স্মৃতিচিহ্ন
খেলাধুলা ও বিনোদন
বাঘা মসজিদ: রাজশাহীর মাটিতে সুলতানি বাংলার এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি

খেলাধুলা ও বিনোদন
পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দিরসমূহ: রাজশাহীর মাটিতে স্থাপত্য আর ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
