আইজ্যাক আসিমভের 'নাইটফল' (১৯৪১): যে গল্পকে আমেরিকান লেখকরা সর্বকালের সেরা সায়েন্স ফিকশন বলেছেন
Editorial Team২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:০০ AM৪ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:
একটি ছোটগল্প, যা সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি পেয়েছে
আইজ্যাক আসিমভের 'নাইটফল' (Nightfall) মূলত ১৯৪১ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় 'অ্যাস্টাউন্ডিং সায়েন্স ফিকশন' ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি ছোটগল্প । আসিমভ তখন মাত্র একুশ বছরের তরুণ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের স্নাতকোত্তর ছাত্র । কিন্তু এই ছোটগল্পটিই তাকে সায়েন্স ফিকশন জগতের শীর্ষ লেখকদের একজনে পরিণত করে। ১৯৬৮ সালে, সায়েন্স ফিকশন রাইটার্স অফ আমেরিকা তাদের সদস্যদের ভোটে 'নাইটফল'-কে নেবুলা পুরস্কার প্রতিষ্ঠার আগে লেখা সর্বকালের সেরা সায়েন্স ফিকশন ছোটগল্প হিসেবে নির্বাচিত করে । কেউ কেউ এটিকে "নিখুঁত সায়েন্স ফিকশন ছোটগল্প" বলেও অভিহিত করেন।
গল্পটির জন্মের পেছনে একটি মজার ঘটনা আছে। আসিমভ রাল্ফ ওয়াল্ডো এমারসনের একটি উদ্ধৃতি পড়েছিলেন: "যদি তারা হাজার বছরে একবার রাতে দেখা যেত, তাহলে মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করত এবং পূজা করত, এবং বহু প্রজন্ম ধরে ঈশ্বরের শহরের স্মৃতি সংরক্ষণ করত!" । ম্যাগাজিন সম্পাদক জন ডব্লিউ ক্যাম্পবেল এই ধারণার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেছিলেন, মানুষ পাগল হয়ে যেত। ক্যাম্পবেল আসিমভকে বলেন এই গল্পটি লিখতে, যার নাম হবে 'নাইটফল' । আসিমভ লিখলেন, আর ফলাফল হলো একটি অমর সায়েন্স ফিকশন।
লাগাশ গ্রহ: যেখানে কখনও অন্ধকার নামে না
গল্পের ঘটনা ঘটে লাগাশ (Lagash, উপন্যাসে Kalgash) নামের একটি গ্রহে, যা ছয়টি সূর্য দ্বারা আলোকিত একটি জটিল নক্ষত্র ব্যবস্থায় অবস্থিত । এই গ্রহে বসবাসকারী মানুষেরা কখনও প্রকৃত অন্ধকার দেখেনি। কারণ ছয়টি সূর্যের মধ্যে অন্তত একটি সব সময় আকাশে থাকে, তাই রাত বলতে কিছু নেই। গুহা, টানেল বা জানালাবিহীন ঘরের ভেতরে অন্ধকার থাকে, কিন্তু বাইরের জগতে কখনও পূর্ণ অন্ধকার হয় না ।
এই অদ্ভুত পরিবেশে গড়ে ওঠা সভ্যতার একটি জটিল বৈশিষ্ট্য আছে। লাগাশের ইতিহাসবিদরা খনন করে আবিষ্কার করেছেন একটির ওপর আরেকটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর, যা প্রমাণ করে যে এই গ্রহে সভ্যতা প্রতি ২,০৪৯ বছরে একবার ধ্বংস হয়ে যায় এবং আবার নতুন করে গড়ে ওঠে । প্রতিটি ধ্বংসের পেছনে আছে আগুন, পাগলামি এবং রহস্যময় 'তারাদের' উপস্থিতি।
লাগাশের একজন মনোবিজ্ঞানী শিরিন ৫০১ পরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করেন যে লাগাশের মানুষের মস্তিষ্ক অন্ধকারের প্রতি তীব্র ভয়ে অভ্যস্ত। মাত্র পনেরো মিনিটের অন্ধকারের সংস্পর্শে এলেও তারা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে বা এমনকি মারা যায় । একটি 'টানেল অব মিস্ট্রি' নামের আকর্ষণে, যেখানে দর্শনার্থীদের একটি সম্পূর্ণ অন্ধকার টানেলে নিয়ে যাওয়া হয়, অনেক মানুষ পাগল হয়ে যায়, এমনকি কেউ কেউ মারা যায় ।
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার: অদৃশ্য চাঁদ আর আসন্ন গ্রহণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমন্দিরে একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী একটি ভয়ংকর আবিষ্কার করেন। লাগাশের গতিপথে একটি অস্বাভাবিকতা রয়েছে, যা একটি অজানা বস্তুর উপস্থিতি নির্দেশ করে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, লাগাশের একটি চাঁদ আছে যা এতটাই অন্ধকার এবং ছোট যে সূর্যের আলোতে তা দেখা যায় না । এই অদৃশ্য চাঁদটি প্রতি ২,০৪৯ বছরে একবার লাগাশের একমাত্র দৃশ্যমান সূর্য বিটার সামনে এসে পড়ে, যার ফলে পুরো গ্রহে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ অন্ধকার নামবে ।
প্রধান চরিত্র অ্যাটন ৭৭, মানমন্দিরের পরিচালক, এই আবিষ্কারের নেতৃত্ব দেন। তিনি এবং তার সহকর্মীরা ইতিমধ্যেই একটি 'হাইডআউট' (আশ্রয়স্থল) তৈরি করেছেন, যেখানে কয়েকশ মানুষ নতুন আবিষ্কৃত টর্চের আলোতে আসন্ন অন্ধকার মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন ।
সাংবাদিক থাকেরেমনের ভূমিকা
গল্পের মূল আখ্যানের বড় অংশ জুড়ে আছে সাংবাদিক থাকেরেমন ৭৬২-এর মানমন্দিরে অবস্থান। তিনি প্রথমে সন্দিহান ছিলেন—কীভাবে কয়েক ঘণ্টার অন্ধকার একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করতে পারে? তিনি অ্যাটন ৭৭-এর সাক্ষাৎকার নিতে চান । এই সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়েই পাঠক ধীরে ধীরে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী এবং আসন্ন বিপর্যয়ের চিত্র জানতে পারেন।
আসিমভ এই গল্পে 'ফায়ারম্যান' চরিত্রের মতোই একাধিক স্তরের বর্ণনা ব্যবহার করেন—বিজ্ঞান বনাম কুসংস্কার, জ্ঞান বনাম অজ্ঞতা। ধর্মীয় সম্প্রদায় 'দ্য কাল্ট' (The Cult) বিশ্বাস করে যে 'তারারা' আসবে এবং আগুন বর্ষণ করবে, যা মানুষকে পশুতে পরিণত করবে। বিজ্ঞানীরা এই ধর্মীয় বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেন, কিন্তু শেষে দেখা যায় ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি হয় ।
তারার প্রথম দর্শন: যে দৃশ্য সবাইকে পাগল করে দেয়
গ্রহণের সময় লাগাশের সব সূর্য একসাথে অদৃশ্য হয়ে যায়। আকাশ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে যায়। আর তখনই লাগাশের বাসিন্দারা প্রথমবারের মতো তারাদের দেখতে পায়। কারণ লাগাশ একটি বিশাল নক্ষত্র গুচ্ছের কেন্দ্রে অবস্থিত, তাই সেখানে ৩০,০০০-এরও বেশি তারা দৃশ্যমান হয় ।
এই দৃশ্যটি গল্পের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং সবচেয়ে দার্শনিক মুহূর্ত। লাগাশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এতদিন ভাবতেন যে মহাবিশ্বের ব্যাস মাত্র কয়েক আলোকবর্ষ, আর সেখানে নিজেদের সূর্য ছাড়া আর কোনো তারা নেই। কিন্তু তারা যখন দেখে যে আকাশে হাজার হাজার তারা, আর তাদের গ্রহ এই বিশাল মহাবিশ্বে একটি ক্ষুদ্র ধূলিকণা মাত্র, তখন এই সত্য তাদের মস্তিষ্ক গ্রহণ করতে পারে না। বিজ্ঞানীরাও পাগল হয়ে যান ।
লাগাশের সভ্যতা আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়। শহর জ্বলে ওঠে। গল্পের শেষ লাইন—"দীর্ঘ রাত আবার ফিরে এসেছে" (The long night had come again)—আজও পাঠকদের মেরুদণ্ড ঠান্ডা করে দেয় ।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই গল্প জরুরি
'নাইটফল' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি শেখায়—জ্ঞান সীমিত হলে সত্য বোঝা যায় না। লাগাশের বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছিলেন, কিন্তু তাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞান এতটাই সীমিত ছিল যে তারা সত্যকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, নিজের জানার সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। যা আমরা জানি না, তার অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে না—এই ভুলটি সবাই করে।
গল্পটি আরও শেখায়—কুসংস্কার আর বিজ্ঞান একই সত্যের দুই মুখ হতে পারে। ধর্মীয় সম্প্রদায় 'তারাদের' কথা বলেছিল, যা বিজ্ঞানীরা উপহাস করেছিলেন। কিন্তু শেষে দেখা যায় ধর্মীয় বিশ্বাসই সত্যি। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, কোনো কিছুকে শুধু 'কুসংস্কার' বলে উড়িয়ে দেওয়ার আগে তার পেছনের কারণ বোঝা উচিত।
আসিমভ এই গল্পে দেখান যে সভ্যতার পতন শুধু বাইরের আঘাতে হয় না, ভেতরের অজ্ঞতা আর ভয়ও সভ্যতাকে ধ্বংস করতে পারে। লাগাশের মানুষ অন্ধকারকে চিনত না, তাই অন্ধকারকে জয় করতে পারল না। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, যা আমরা চিনি না, তা আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হতে পারে।
শেষ কথা
'নাইটফল' শুধু একটি সায়েন্স ফিকশন গল্প নয়, এটি মানব প্রকৃতি, জ্ঞানের সীমা, এবং সভ্যতার ভঙ্গুরতা নিয়ে একটি গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান। আসিমভ মাত্র একুশ বছর বয়সে এটি লিখেছিলেন, অথচ এর গভীরতা আজও পাঠকদের স্তব্ধ করে দেয়। ছুটির দিনে বা পড়াশোনার ফাঁকে এই গল্পটা পড়লে শিক্ষার্থীরা নিজেদের জানার সীমা, নিজেদের ভয়, আর নিজেদের সভ্যতার ভিত্তি নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারবে।
কারণ কিছু গল্প শুধু মজার জন্য লেখা হয়, আর কিছু গল্প মানুষের মনকে নাড়া দেয়। 'নাইটফল' সেই ধরনের একটি গল্প, যা পড়ার পর মনে হয়—অন্ধকার কখনও কখনও আলোর চেয়ে বেশি সত্য দেখায়।
পূর্ববর্তী
ই. এম. ফরস্টারের 'দ্য মেশিন স্টপস' (১৯০৯): ইন্টারনেট যুগের ভবিষ্যদ্বাণী, এক শতাব্দী আগে লেখা
পরবর্তীরে ব্র্যাডবেরির 'ফারেনহাইট ৪৫১' (১৯৫৩): বই পোড়ানোর গল্প, যা আজও প্রাসঙ্গিক
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
জল্লাদখানা বধ্যভূমি: মিরপুরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের নির্মম ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: যে ইটের দেয়াল আজও বহন করে একাত্তরের শোক

খেলাধুলা ও বিনোদন
জাতীয় স্মৃতিসৌধ: সাত জোড়া দেয়ালে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
চন্দ্রাবতী মন্দির: কবির প্রেম, বিরহ আর মধ্যযুগের বাংলার এক নীরব স্মৃতিচিহ্ন
খেলাধুলা ও বিনোদন
বাঘা মসজিদ: রাজশাহীর মাটিতে সুলতানি বাংলার এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি

খেলাধুলা ও বিনোদন
পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দিরসমূহ: রাজশাহীর মাটিতে স্থাপত্য আর ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
