রে ব্র্যাডবেরির 'ফারেনহাইট ৪৫১' (১৯৫৩): বই পোড়ানোর গল্প, যা আজও প্রাসঙ্গিক
Best science fiction stories of all time
Editorial Team২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:০০ PM৫ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

৪৫১ ডিগ্রি ফারেনহাইট: যে তাপমাত্রায় কাগজ জ্বলে ওঠে
রে ব্র্যাডবেরির 'ফারেনহাইট ৪৫১' (১৯৫৩) সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাসে এমন একটি বই, যা পড়ার পর আপনি আপনার চারপাশের জগতটাকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করবেন। বইটির শিরোনামই এর মূল বিষয়বস্তু বলে দেয়—৪৫১ ডিগ্রি ফারেনহাইট হলো সেই তাপমাত্রা, যেখানে বইয়ের কাগজ জ্বলে ওঠে । গল্পটি ঘটে একটি ভবিষ্যতের আমেরিকায়, যেখানে বই পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আর যাদের কাজ এই নিষেধাজ্ঞা enforce করা, তাদের বলা হয় 'ফায়ারম্যান'—কিন্তু তারা আগুন নেভায় না, তারা বই পোড়ায় ।
ব্র্যাডবেরি এই বইটি লিখেছিলেন ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে, যখন আমেরিকায় ম্যাককার্থিবাদ আর সেন্সরশিপের জোয়ার চলছিল। তিনি নিজেই বলেছিলেন, তিনি একটি রেন্টাল টাইপরাইটারে এই বইটি লিখেছিলেন, UCLA লাইব্রেরির বেসমেন্টে, যেখানে ১০ সেন্ট প্রতি আধা ঘণ্টায় টাইপরাইটার ভাড়া নিতে হতো । এই বইটি প্রথমে 'দ্য ফায়ারম্যান' নামে একটি ছোট গল্প হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫১ সালে 'গ্যালাক্সি সায়েন্স ফিকশন' ম্যাগাজিনে, তারপর ১৯৫৩ সালে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয় ।
গাই মন্টাগ: একজন ফায়ারম্যান, যে বই পোড়াতে ভালোবাসে
বইয়ের প্রধান চরিত্র গাই মন্টাগ, একজন ত্রিশ বছর বয়সী ফায়ারম্যান, যে তার কাজ নিয়ে গর্বিত। বই পোড়ানোর মধ্যে সে এক ধরনের আনন্দ খুঁজে পায় । তার চুল কালো, তার জীবন সাধারণ—সে একটি প্রাইভেট অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, তার স্ত্রী মিলড্রেড সারাদিন দেয়ালজুড়ে টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে, যাকে সে 'পরিবার' বলে ডাকে । মন্টাগের জীবন যন্ত্রের মতো—সে কাজ করে, ঘরে ফেরে, ঘুমায়, আবার কাজ করে। সে কখনও প্রশ্ন করে না কেন বই পোড়াতে হয়, সে শুধু জানে বই পোড়ানো তার কাজ।
কিন্তু তার জীবন বদলে যেতে শুরু করে যখন তার সতেরো বছরের প্রতিবেশী ক্লারিস ম্যাকক্লেলান তার সাথে কথা বলে। ক্লারিস অদ্ভুত—সে প্রকৃতি ভালোবাসে, সে প্রশ্ন করে, সে মন্টাগকে জিজ্ঞেস করে, "তুমি কি সুখী?" । এই একটি প্রশ্ন মন্টাগের মাথায় ঢুকে যায়, আর সে প্রথমবারের মতো তার জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করে। ক্লারিস তাকে এমন একটি অতীতের কথা বলে, যখন মানুষ ভয় ছাড়া বাঁচত, আর বইয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবীকে দেখত ।
যে দৃশ্য মন্টাগকে বদলে দেয়
বইয়ের প্রথম অংশে একটি দৃশ্য আছে, যা মন্টাগের জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়। ফায়ারম্যানরা একটি বাড়িতে আগুন দিতে ডাক পায়। বাড়ির মালিক মিসেস হাডসন, যিনি তার বইগুলো রক্ষা করতে গিয়ে আগুনেই মরে যেতে বেছে নেন । মন্টাগ বিস্মিত হয়—কী আছে এই বইগুলোতে, যা একজন মানুষকে মৃত্যুর মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়? সেই রাতে মন্টাগ গোপনে একটি বই নিয়ে পালিয়ে যায়, যা তার বাড়িতে লুকিয়ে রাখে।
এরপর মন্টাগ ধীরে ধীরে বই পড়তে শুরু করে, আর সে বুঝতে পারে—এই বইগুলোতে কিছু একটা আছে, যা তার সমাজ হারিয়ে ফেলেছে। সে ফ্যাবার নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজি শিক্ষকের সাথে দেখা করে, যিনি তাকে বইয়ের মূল্য শেখান। ফ্যাবার তাকে বলেন, বইয়ের তিনটি জিনিস দরকার—'কোয়ালিটি' (মান), 'লেজার' (সময় নিয়ে পড়া), আর 'অ্যাকশন' (পড়ার পর কাজ করা) ।
সেন্সরশিপ কীভাবে শুরু হয়েছিল: নিচ থেকে, উপরে নয়
'ফারেনহাইট ৪৫১'-এর সবচেয়ে ভয়ংকর এবং সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দিকটি হলো—এই সেন্সরশিপ শুরু হয়নি কোনো স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশে। ফায়ারম্যানদের প্রধান বিটি নিজেই স্বীকার করেন, "পাবলিক নিজেই পড়া বন্ধ করে দিয়েছিল" । মানুষ ধীরে ধীরে বই পড়া ছেড়ে দিয়েছিল, কারণ বইগুলো ছোট হতে হতে শেষে মিলিয়ে গিয়েছিল, কারণ মানুষ আর সময় নিয়ে পড়তে চাইত না, কারণ মানুষ আর ভাবতে চাইত না ।
ব্র্যাডবেরি ১৯৫৩ সালে যা লিখেছিলেন, তা আজকের দিনে আশ্চর্যজনকভাবে সত্যি মনে হয়। তিনি দেখিয়েছিলেন, সেন্সরশিপ আসে না শুধু সরকারের লাঠির আঘাতে, সেন্সরশিপ আসে যখন মানুষ নিজেই পড়া ছেড়ে দেয়, যখন মানুষের মনোযোগ ছোট হয়ে আসে, যখন বিনোদন এত সহজে পাওয়া যায় যে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তাই হারিয়ে যায় । এই কারণেই এই বইটি আজও এত প্রাসঙ্গিক—আজকের দিনে আমরা শুধু বই পোড়াই না, আমরা মনোযোগ হারিয়ে ফেলছি।
মন্টাগের যাত্রা: অন্ধকার থেকে আলোর দিকে
বইয়ের দ্বিতীয় অংশে মন্টাগ আরও গভীরে ডুবে যায়। সে তার স্ত্রী মিলড্রেডকে বই পড়তে রাজি করানোর চেষ্টা করে, কিন্তু মিলড্রেড বই পড়তে চায় না। সে তার বন্ধুদের সামনে কবিতা পড়ে, যা তাদের আতঙ্কিত করে ফেলে। মন্টাগের বস বিটি তাকে সতর্ক করেন, কিন্তু মন্টাগ শুনতে চায় না ।
তৃতীয় অংশে মন্টাগ তার নিজের বাড়ি পোড়াতে বাধ্য হয়, তার নিজের বইগুলো, তার নিজের লুকিয়ে রাখা সম্পদ। সে তার বস বিটিকে হত্যা করে, আর শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। সে নদী পার হয়, রেললাইন ধরে হাঁটে, আর শেষে সেই 'বুক পিপল'-দের সাথে মিলিত হয়—একটি গোপন দল, যাদের প্রত্যেকে একটি বই মুখস্থ করে রেখেছে, যাতে বইটির বিষয়বস্তু কোনোদিন হারিয়ে না যায় ।
বইয়ের শেষে একটি পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়, আর শহরটি ধ্বংস হয়ে যায়। মন্টাগ আর তার নতুন দলটি শহরের দিকে ফিরে তাকায়, যেখানে আগুনের শিখা আকাশে জ্বলছে। তারা জানে, তারা যদি বাঁচে, তাহলে একদিন এই জ্ঞান আবার ফিরে আসবে। বইয়ের তিনটি অংশ তিনটি আগুনে শেষ হয়—প্রথমে একটি অপরিচিত মানুষের মৃত্যু, তারপর মন্টাগের নিজের বাড়ির ধ্বংস, আর শেষে শহর ধ্বংস ।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই বই জরুরি
'ফারেনহাইট ৪৫১' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি শেখায়—চিন্তা করা মানে প্রশ্ন করা। মন্টাগ প্রথমে প্রশ্ন করত না, সে শুধু কাজ করত। কিন্তু যখন সে প্রশ্ন করতে শুরু করে, তখন সে তার নিজের মন খুঁজে পায়। শিক্ষার্থীদের জন্যও এই শিক্ষা জরুরি—শুধু উত্তর মুখস্থ করাই শিক্ষা না, প্রশ্ন করাও শিক্ষা।
এই বই আরও শেখায়—প্রযুক্তি কখনও কখনও মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। মন্টাগের স্ত্রী মিলড্রেড টেলিভিশনের সাথে এতটাই মিশে গেছে যে সে তার স্বামীর সাথে কথা বলার চেয়ে টেলিভিশনের 'পরিবার'-এর সাথে কথা বলতে বেশি পছন্দ করে । শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা ভালো, কিন্তু প্রযুক্তির দাস হওয়া খারাপ।
বইটি আরেকটি জরুরি শিক্ষা দেয়—সেন্সরশিপ সব সময় বাইরে থেকে আসে না, সেন্সরশিপ আমাদের ভেতর থেকেও আসতে পারে। যদি আমরা নিজেরাই পড়া বন্ধ করে দিই, যদি আমরা নিজেরাই ভাবা বন্ধ করে দিই, তাহলে সেন্সরশিপ জোর করে চাপানোর প্রয়োজন হয় না । শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, নিজের মনকে সচল রাখা, প্রশ্ন করতে শেখা, আর পড়ার অভ্যাস বজায় রাখা।
শেষ কথা
'ফারেনহাইট ৪৫১' শুধু একটি সায়েন্স ফিকশন বই নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। এটি শেখায়—বই শুধু কাগজ আর কালি না, বই হলো চিন্তার সংরক্ষণ, সভ্যতার স্মৃতি। ছুটির দিনে বা পড়াশোনার ফাঁকে এই বইটা পড়লে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পড়ার অভ্যাস, নিজেদের প্রশ্ন করার ক্ষমতা, আর নিজেদের মনোযোগ নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারবে।
কারণ কিছু বই শুধু গল্প বলে, আর কিছু বই পৃথিবীকে বাঁচাতে শেখায়। 'ফারেনহাইট ৪৫১' সেই ধরনের একটি বই, যা পড়ার পর মনে হয়—একটি বই পোড়ানো মানে একটি চিন্তা পোড়ানো, আর একটি চিন্তা পোড়ানো মানে সভ্যতার একটি অংশ মরে যাওয়া।
পূর্ববর্তী
ফ্র্যাঙ্ক হারবার্টের 'ডিউন' (১৯৬৫): সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ইকোলজিক্যাল মহাকাব্য
পরবর্তীএইচ. জি. ওয়েলসের 'দ্য টাইম মেশিন' (১৮৯৫): সময় ভ্রমণের জন্মদাত্রী বই
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
জল্লাদখানা বধ্যভূমি: মিরপুরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের নির্মম ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: যে ইটের দেয়াল আজও বহন করে একাত্তরের শোক

খেলাধুলা ও বিনোদন
জাতীয় স্মৃতিসৌধ: সাত জোড়া দেয়ালে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস
খেলাধুলা ও বিনোদন
চন্দ্রাবতী মন্দির: কবির প্রেম, বিরহ আর মধ্যযুগের বাংলার এক নীরব স্মৃতিচিহ্ন
খেলাধুলা ও বিনোদন
বাঘা মসজিদ: রাজশাহীর মাটিতে সুলতানি বাংলার এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি

খেলাধুলা ও বিনোদন
পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দিরসমূহ: রাজশাহীর মাটিতে স্থাপত্য আর ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
