সুমেরীয় সভ্যতা: যেখানে শহর, লিখন আর রাষ্ট্রের প্রথম গল্প লেখা হয়েছিল
Top 10 most ancient civilizations in the world
Editorial Team২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৪:০০ PM১৩ ভিউ৪ মিনিট পড়া
শেয়ার:
মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন একটি ছোট পরিবর্তন পুরো পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। কৃষির আবিষ্কার ছিল তেমনই একটি পরিবর্তন। কিন্তু কৃষির পর মানুষ যখন স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে শুরু করল, তখন সামনে এল আরও বড় প্রশ্ন—কে জমি দেখবে? কে শস্যের হিসাব রাখবে? কে শহর পরিচালনা করবে? আর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পণ্য গেলে তার হিসাবই বা থাকবে কীভাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠতে শুরু করেছিল এক নতুন পৃথিবী। নাম তার সুমের।
আজকের মানচিত্রে এই অঞ্চলটি মূলত ইরাকের দক্ষিণাংশ। কিন্তু কয়েক হাজার বছর আগে এখানে ছিল না আধুনিক কোনো রাষ্ট্র। ছিল টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর বিস্তৃত সমভূমি, অসংখ্য খাল, কৃষিজমি এবং একের পর এক গড়ে ওঠা নগর। আর সেই নগরগুলোর মধ্যেই জন্ম নিয়েছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—সুমেরীয় সভ্যতা।
নদীর পানি থেকে শহরের জন্ম
সুমেরের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল এর নদী। তবে নদী যেমন জীবন দিয়েছে, তেমনই দিয়েছে বিপদ। বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণ করে কৃষিজমিতে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন ছিল খাল, বাঁধ ও সেচব্যবস্থার।
এই সেচনির্ভর কৃষিই ধীরে ধীরে মানুষকে বড় আকারের স্থায়ী বসতি গড়ার সুযোগ দেয়। ছোট গ্রাম একসময় পরিণত হয় বড় নগরে। আর নগরের সঙ্গে তৈরি হয় প্রশাসন, শ্রমবিভাগ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্য।
এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ উরুক।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় উরুককে বিশ্বের প্রাচীনতম বড় নগরকেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের শেষ দিকে উরুক এমন এক নগরজগতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করত এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছিল।
একটি গ্রাম থেকে শহর—মানব ইতিহাসে এই পরিবর্তনটি যতটা সাধারণ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই বিপ্লবী ছিল।
আর তখনই জন্ম নিল লিখন
শহর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন সমস্যা দেখা দিল—হিসাব।
কত শস্য জমা হলো? কত পশু আছে? কে কত শস্য পেল? মন্দিরে কত পণ্য জমা পড়ল?
মুখে মুখে এসব তথ্য ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। ফলে মাটির তৈরি ছোট ফলকের ওপর চিহ্ন আঁকার মাধ্যমে শুরু হয় প্রশাসনিক হিসাব সংরক্ষণের একটি নতুন পদ্ধতি।
ক্রমে এই চিহ্নগুলো বিকশিত হয়ে পরিচিত হয় কিউনিফর্ম নামে।
কাদামাটির ফলকের ওপর খাগের মতো ধারালো কোনো বস্তু দিয়ে চাপ দিয়ে তৈরি করা হতো কীলকাকৃতির চিহ্ন। শুরুতে এর ব্যবহার ছিল মূলত হিসাব-নিকাশ ও প্রশাসনিক কাজে। পরে এই লিখনপদ্ধতিতে লেখা হয়েছে আইন, চিঠি, সাহিত্য, ধর্মীয় রচনা ও রাজাদের কাহিনি।
অর্থাৎ মানুষের কথা প্রথমবারের মতো স্থায়ীভাবে মাটিতে বন্দী হতে শুরু করল।
এক দেশ নয়, অনেক নগররাষ্ট্র
সুমেরীয় সভ্যতাকে আধুনিক অর্থে একটি একক সাম্রাজ্য ভাবলে ভুল হবে। বরং এটি ছিল একাধিক নগররাষ্ট্রের সমষ্টি।
উরুক, উর, লাগাশ, কিশ, নিপ্পুর—প্রতিটি নগরের নিজস্ব শাসক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল।
কখনো তারা একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য করেছে, আবার কখনো যুদ্ধ করেছে।
এই নগররাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই পরবর্তী সময়ে মেসোপটেমিয়ার ইতিহাসকে আরও জটিল করে তোলে। সুমেরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন শাসক ও রাজবংশের মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে।
দেবতাদের জন্য বিশাল স্থাপত্য
সুমেরীয়দের শহরের কেন্দ্রে সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা থাকত। পরবর্তী মেসোপটেমীয় স্থাপত্যে এর সবচেয়ে পরিচিত রূপ দেখা যায় জিগুরাত-এ।
ধাপে ধাপে ওপরে উঠে যাওয়া বিশাল কাঠামো—দূর থেকে দেখলে যেন কাদামাটির তৈরি পাহাড়।
জিগুরাত ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এর ওপরের অংশে দেবতার সঙ্গে সম্পর্কিত মন্দির স্থাপিত থাকত।
উরের বিখ্যাত জিগুরাত অব উর আজও প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার স্থাপত্য দক্ষতার অন্যতম প্রতীক।
শুধু শহর আর মন্দির নয়
সুমেরীয়দের অবদান শুধু নগর ও লিখনপদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না।
গণনা, পরিমাপ, সময়ের হিসাব এবং জ্যামিতির বিভিন্ন ধারণার বিকাশে মেসোপটেমীয় সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরবর্তী মেসোপটেমীয় গণিতের ধারায় ৬০-ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। আজও সময়কে ৬০ সেকেন্ডে এক মিনিট এবং ৬০ মিনিটে এক ঘণ্টায় ভাগ করার মধ্যে সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়।
আকাশ পর্যবেক্ষণেও মেসোপটেমিয়ার মানুষের আগ্রহ ছিল। নক্ষত্র, গ্রহ ও চন্দ্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তারা সময় ও ক্যালেন্ডার গণনার নানা পদ্ধতি তৈরি করেছিল।
রাজা, যুদ্ধ আর ইতিহাসের পাতায় সুমের
সুমেরের ইতিহাসে বহু শাসকের নাম পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে গিলগামেশ সবচেয়ে কিংবদন্তিতুল্য।
উরুকের রাজা হিসেবে গিলগামেশের নাম পাওয়া যায় সুমেরীয় রাজতালিকায়। পরে তাঁর কাহিনি নিয়ে তৈরি হয় বিশ্বের প্রাচীনতম সাহিত্যকর্মগুলোর অন্যতম—গিলগামেশের মহাকাব্য।
বন্ধুত্ব, মৃত্যু, মানুষের অমর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা—হাজার হাজার বছর আগে লেখা এই কাহিনির বিষয়গুলো আজও আশ্চর্যভাবে পরিচিত।
এ যেন প্রমাণ করে, প্রযুক্তি বদলালেও মানুষের কিছু মৌলিক প্রশ্ন খুব একটা বদলায়নি।
সুমেরের পতন, কিন্তু উত্তরাধিকার থেকে গেল
সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক শক্তি চিরস্থায়ী হয়নি। বিভিন্ন যুদ্ধ, ক্ষমতার পরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে আক্কাদীয়, ব্যাবিলনীয় ও অন্যান্য মেসোপটেমীয় শক্তির উত্থানের মধ্য দিয়ে সুমেরীয় রাজনৈতিক আধিপত্য ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু সভ্যতা কখনো শুধু একটি রাজবংশের নাম নয়।
সুমেরীয়দের তৈরি লিখনপদ্ধতি, প্রশাসনিক ঐতিহ্য, নগরজীবন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য ও গণনার পদ্ধতি পরবর্তী মেসোপটেমীয় সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
তাই সুমেরের গল্প আসলে কোনো হারিয়ে যাওয়া জাতির গল্প নয়। এটি সেই মুহূর্তের গল্প, যখন মানুষ গ্রাম থেকে শহরে, মৌখিক স্মৃতি থেকে লিখিত নথিতে এবং বিচ্ছিন্ন বসতি থেকে সংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
হয়তো এ কারণেই সুমেরীয় সভ্যতার দিকে তাকালে আমরা শুধু পাঁচ হাজার বছর আগের একটি পৃথিবী দেখি না। দেখতে পাই—শহর, প্রশাসন আর লিখিত ইতিহাসের যে পৃথিবীতে আমরা আজ বাস করি, তার একটি প্রাচীন ভিত্তিও।
পূর্ববর্তী
নর্তে চিকো: আমেরিকার প্রাচীনতম নগরসভ্যতার এক বিস্ময়কর গল্প
পরবর্তীগিজার মহান পিরামিড: ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বিস্ময়
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
