'স্ট্যান্ড বাই মি' (১৯৮৬) : একটি সিনেমা, যা শেখায় বারো বছর বয়সের বন্ধুত্বই জীবনের সেরা বন্ধুত্ব
Editorial Team২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:২১ PM০ ভিউ৪ মিনিট পড়া
শেয়ার:

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন মনে হয় বন্ধুরাই সব। পরিবার বোঝে না, শিক্ষক বোঝে না, কিন্তু বন্ধুরা বোঝে। রব রাইনার পরিচালিত 'স্ট্যান্ড বাই মি' (১৯৮৬) ঠিক সেই বন্ধুত্বের গল্প, কিন্তু একই সাথে এটি সেই বন্ধুত্ব হারানোর গল্পও। সিনেমার শেষে প্রাপ্তবয়স্ক গর্ডি বলেন, "বারো বছর বয়সের বন্ধুর মতো বন্ধু আমি আর কখনও পাইনি। ঈশ্বর, কেউ কি পেয়েছে?" এই কথাটি সিনেমার সারমর্ম—বারো বছরের বন্ধুত্ব জীবনে একবারই আসে, আর সেটাই সবচেয়ে খাঁটি।
স্টিফেন কিং-এর 'দ্য বডি' উপন্যাস অবলম্বনে বানানো এই সিনেমার ঘটনা ঘটে ১৯৫৯ সালের গ্রীষ্মে, ওরেগনের কাল্পনিক শহর ক্যাসল রকে। চারজন বারো বছরের ছেলে—গর্ডি, ক্রিস, টেডি আর ভার্ন—জানতে পারে যে শহরের বাইরে রেললাইনের পাশে একটি হারিয়ে যাওয়া ছেলের মৃতদেহ পড়ে আছে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় তারা সেই মৃতদেহ খুঁজে বের করবে, যাতে স্থানীয় হিরো হয়ে যায় । কিন্তু সেই যাত্রায় তারা যা খুঁজে পায়, তা কোনো হিরো হওয়ার গল্প না—তারা খুঁজে পায় নিজেদের, নিজেদের ভয়, নিজেদের কষ্ট, আর নিজেদের বন্ধুত্ব।
চারজন ছেলে, চারটি ভিন্ন যুদ্ধ
সিনেমার চারটি চরিত্র প্রত্যেকে নিজের মতো করে কষ্ট বহন করে। গর্ডি (উইল হুইটন) একজন লেখক হতে চায়, কিন্তু তার বাবা তাকে কখনও গুরুত্ব দেন না, কারণ তার বড় ভাই ডেনি ফুটবল তারকা ছিলেন, যিনি কয়েক মাস আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। বাবা এমনকি গর্ডিকে বলেন, "তোমার বন্ধু কেন ডেনির মতো নয়?" । ক্রিস (রিভার ফিনিক্স) একটি খারাপ পরিবার থেকে আসে, সবাই তাকে "খারাপ বীজ" বলে মনে করে, কিন্তু তার ভেতরে একটা সৎ, সংবেদনশীল ছেলে লুকিয়ে আছে। টেডি (কোরি ফেল্ডম্যান) তার মানসিকভাবে অসুস্থ বাবা দ্বারা নির্যাতিত, যিনি তাকে চুলার ওপর চেপে ধরে তার কান পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর ভার্ন (জেরি ও'কনেল) মোটা, ভীতু, সবকিছুতে ভয় পায়।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই চারটি চরিত্র আয়না। অনেক শিক্ষার্থীও পরিবারের চাপ, একাকীত্ব, বা ভয় নিয়ে বাঁচে, কিন্তু কাউকে বলে না। এই সিনেমা দেখায়—সবাই কোনো না কোনো যুদ্ধ লড়ছে, শুধু কেউ বলে না। আর সেই যুদ্ধ একা লড়তে হয় না, যদি সঠিক বন্ধু থাকে।
মৃতদেহের যাত্রা: আসল গন্তব্য নিজের ভেতরে
চারজন ছেলে রেললাইন ধরে হাঁটতে শুরু করে, আর সেই যাত্রায় ঘটে নানা ঘটনা—একটি জাঙ্কইয়ার্ডের কুকুর তাদের তাড়া করে, একটি পুকুরে জোঁক তাদের আক্রমণ করে, একটি রেলসেতুতে তারা প্রায় ট্রেনের নিচে পড়ে মারা যায়। কিন্তু এই ঘটনাগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের কথোপকথন। রাতের আগুনের পাশে বসে তারা কথা বলে—সুপারম্যান আর মিকি মাউসের লড়াই কে জিতবে, গুফি কি কুকুর, আর তাদের পরিবার, তাদের ভয়, তাদের স্বপ্ন ।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই অংশটি সবচেয়ে জরুরি। সিনেমাটি দেখায়—আসল যাত্রা গন্তব্যের দিকে না, যাত্রার পথে। মৃতদেহ খুঁজতে গিয়ে তারা যা খুঁজে পায়, তা হলো নিজেদের সম্পর্কে সত্য। গর্ডি বুঝতে পারে সে লেখক হতে পারে, ক্রিস বুঝতে পারে সে তার পরিবারের ভাগ্য নয়, টেডি বুঝতে পারে তার বাবার ভালোবাসা তার কল্পনা, আর ভার্ন বুঝতে পারে সাহস মানে ভয় না পাওয়া না, সাহস মানে ভয় পেয়েও এগিয়ে যাওয়া।
সেই বিখ্যাত দৃশ্য: মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া
চারজন ছেলে অবশেষে মৃতদেহ খুঁজে পায়। কিন্তু সেই মুহূর্তে তারা যা অনুভব করে, তা কোনো হিরো হওয়ার আনন্দ না। তারা প্রথমবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়, আর বুঝতে পারে—জীবন এত সহজ না, মৃত্যু এত দূরে না । গর্ডি তখন বলে, "এটা প্রথমবার আমি একটা মৃত মানুষ দেখলাম।" এই কথাটি সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত, যা দেখায়—বড় হওয়া মানে মৃত্যুকে চেনা, জীবনের সীমা বোঝা।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা অমূল্য। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে তারা অমর, তাদের সময় অসীম। কিন্তু এই সিনেমা শেখায়—সময় সীমিত, তাই প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানো উচিত, আর যাদের ভালোবাসো তাদের বলা উচিত।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই সিনেমা জরুরি
'স্ট্যান্ড বাই মি' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি দেখায়—বারো বছরের বন্ধুত্ব জীবনে একবারই আসে। সেই বন্ধুত্বে কোনো স্বার্থ থাকে না, কোনো মিথ্যা থাকে না, শুধু সত্য থাকে। সিনেমার শেষে গর্ডি বলেন, "আমরা ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। ক্রিস রাতের ক্লাসে গেল, টেডি স্কলারশিপ পেল না, ভার্ন বিয়ে করল।" এই কথাগুলো দেখায়—বন্ধুরা একদিন চলে যায়, কিন্তু সেই স্মৃতি থেকে যায় ।
এই সিনেমা আরও শেখায়—প্রত্যেকের বাড়িতে সমস্যা আছে, কিন্তু সেই সমস্যা কাউকে ভাঙতে দেয় না। গর্ডির বাবা তাকে অবহেলা করেন, ক্রিসের বাবা মদ্যপ, টেডির বাবা পাগল, কিন্তু তারা সবাই সেই কষ্ট নিয়ে বাঁচে, আর বন্ধুদের সাথে সেই কষ্ট ভাগ করে।
শেষ কথা
'স্ট্যান্ড বাই মি' শুধু একটি অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা নয়, এটি একটি বন্ধুত্বের সিনেমা। এটি শেখায়—বারো বছরের বন্ধুত্ব জীবনের সবচেয়ে খাঁটি বন্ধুত্ব, আর সেই বন্ধুত্ব একদিন হারিয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়। ছুটির দিনে বা কলেজে যাওয়ার আগে এই সিনেমাটা দেখলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শৈশবের বন্ধুদের কথা ভাবতে পারবে, সেই দিনগুলোর কথা মনে করতে পারবে।
কারণ কিছু সিনেমা শুধু গল্প বলে, আর কিছু সিনেমা বন্ধুত্বকে মনে করিয়ে দেয়। 'স্ট্যান্ড বাই মি' সেই ধরনের একটি সিনেমা, যা দেখার পর মনে হয়—বারো বছরের সেই বন্ধুদের একজনকে আজ ফোন করা উচিত।
পূর্ববর্তী
'ডেজড অ্যান্ড কনফিউজড' (১৯৯৩) : একটি সিনেমা, যা একটি রাতের গল্প বলে, কিন্তু একটি প্রজন্মের অনুভূতি ধরে রাখে
পরবর্তী'দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাব' (১৯৮৫) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কেউ আসলে স্টেরিওটাইপ নয়
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
'আ বিউটিফুল মাইন্ড' (২০০১): একটি সিনেমা, যা শেখায় মেধা আর মানসিক স্বাস্থ্য একসাথে চলে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য এজ অব সেভেনটিন' (২০১৬) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কিশোর বয়সের একাকীত্ব স্বাভাবিক

খেলাধুলা ও বিনোদন
'টয় স্টোরি ৩' (২০১০) : একটি অ্যানিমেশন, যা শেখায় বড় হওয়া মানে ছেড়ে দেওয়া

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য থিওরি অব এভরিথিং' (২০১৪) : একটি সিনেমা, যা শেখায় মেধা আর ভালোবাসা একসাথে চলে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাব' (১৯৮৫) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কেউ আসলে স্টেরিওটাইপ নয়
খেলাধুলা ও বিনোদন
'ডেজড অ্যান্ড কনফিউজড' (১৯৯৩) : একটি সিনেমা, যা একটি রাতের গল্প বলে, কিন্তু একটি প্রজন্মের অনুভূতি ধরে রাখে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
