'দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাব' (১৯৮৫) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কেউ আসলে স্টেরিওটাইপ নয়
Editorial Team২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:২৫ PM০ ভিউ৪ মিনিট পড়া
শেয়ার:

স্কুলের করিডোরে প্রতিটি শিক্ষার্থীর একটা পরিচয় থাকে। কেউ 'জক', কেউ 'নর্ড', কেউ 'প্রিন্সেস', কেউ 'ক্রিমিনাল'। এই লেবেলগুলো এত শক্তভাবে গাঁথা থাকে যে মনে হয় সেগুলোই আসল পরিচয়। কিন্তু জন হিউজ পরিচালিত 'দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাব' (১৯৮৫) ঠিক এই লেবেলগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি ১৯৮৪ সালের ২৪ মার্চ শেরমার হাই স্কুলের লাইব্রেরিতে একটি শনিবারের নয় ঘণ্টার ডিটেনশনের গল্প, যেখানে পাঁচজন সম্পূর্ণ আলাদা ছাত্র একসাথে আটকে পড়ে, আর ধীরে ধীরে আবিষ্কার করে—তারা যতটা আলাদা ভেবেছিল, ততটা নয়।
পাঁচটি চরিত্র, পাঁচটি লেবেল
সিনেমার পাঁচটি প্রধান চরিত্র প্রত্যেকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। ক্লেয়ার স্ট্যান্ডিশ (মলি রিংওয়াল্ড) হলো 'প্রিন্সেস'—ধনী, জনপ্রিয়, বন্ধুদের চাপে সব সময় মানিয়ে চলতে হয়। অ্যান্ড্রু ক্লার্ক (এমিলিও এস্তেভেজ) হলো 'অ্যাথলিট'—কুস্তি দলের তারকা, কিন্তু তার বাবা তাকে নিয়ে নিজের হারানো যৌবন ফিরে পেতে চান। ব্রায়ান জনসন (অ্যান্থনি মাইকেল হল) হলো 'ব্রেন'—সব পরীক্ষায় ভালো, কিন্তু শপ ক্লাসে ফেল করেছে। অ্যালিসন রেনল্ডস (অ্যালি শিডি) হলো 'বাস্কেট কেস'—অদ্ভুত, চুপচাপ, নিজের জগতে থাকে। আর জন বেন্ডার (জুড নেলসন) হলো 'ক্রিমিনাল'—বিশৃঙ্খল, রাগী, কিন্তু তার রাগের পেছনে আছে বাবার হাতের আঘাত।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই চরিত্রগুলো আয়না। স্কুলে প্রত্যেককে একটা লেবেল দেওয়া হয়, আর সেই লেবেলের ভেতরে বন্দী হয়ে থাকতে হয়। কিন্তু সিনেমা দেখায়—এই লেবেলগুলোর পেছনে আসল মানুষগুলো আরও জটিল।
নয় ঘণ্টার যাত্রা: ঝগড়া থেকে বন্ধুত্ব
ডিটেনশনের শুরুতে পাঁচজনই পরস্পরকে অপমান করে, ঝগড়া করে। বেন্ডার সবাইকে বিরক্ত করে, ক্লেয়ার তাকে অপছন্দ করে, অ্যান্ড্রু তার সাথে মারামারি করতে চায়। কিন্তু সময় যত এগোয়, তারা একে অপরের গল্প শোনে। ব্রায়ান স্বীকার করে তার আত্মহত্যার চিন্তা ছিল, অ্যান্ড্রু তার বাবার চাপের কথা বলে, ক্লেয়ার তার বাবা-মায়ের ডিভোর্স নিয়ে কাঁদে, অ্যালিসন স্বীকার করে সে প্যাথলজিক্যাল মিথ্যাবাদী, আর বেন্ডার তার বাবার শারীরিক নির্যাতনের কথা বলে।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই অংশটি সবচেয়ে জরুরি। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে তারাই একা যারা পরিবারের চাপ, একাকীত্ব, বা ভয় নিয়ে বাঁচে। কিন্তু এই সিনেমা দেখায়—সবাই কোনো না কোনো যুদ্ধ লড়ছে, শুধু কেউ বলে না।
ব্রায়ানের চিঠি: সিনেমার হৃদয়
সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো ব্রায়ানের লেখা ডিটেনশনের চিঠি, যা ভাইস প্রিন্সিপাল ভার্ননকে উদ্দেশ্য করে লেখা। শেষ দৃশ্যে ব্রায়ানের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়: "আপনি আমাদের দেখেন যেমন দেখতে চান, সবচেয়ে সহজ শর্তে, সবচেয়ে সুবিধাজনক সংজ্ঞায়। কিন্তু আমরা বুঝতে পারলাম—আমাদের প্রত্যেকে একটি ব্রেন, একটি অ্যাথলিট, একটি বাস্কেট কেস, একটি প্রিন্সেস, আর একটি ক্রিমিনাল।"
এই কথাটি সিনেমার সারমর্ম। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—তোমার পরিচয় কেউ নির্ধারণ করে দিতে পারে না, তোমার লেবেল তুমি নিজে ভাঙতে পারো।
শেষ দৃশ্য: বিজয়, নাকি অনিশ্চয়তা?
সিনেমার শেষে বেন্ডার মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যায়, 'ডোন্ট ইউ (ফরগেট অ্যাবাউট মি)' গানটি বাজতে থাকে, আর সে হাত নাড়ে। ছবিটি ফ্রিজ হয়ে যায়। এই ফ্রিজ-ফ্রেমটি সিনেমার সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত। অনেকের কাছে এটি বিজয়ের প্রতীক—পাঁচজন শিক্ষার্থী সিস্টেমকে হারিয়েছে, নিজেদের খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু কিছু সমালোচক মনে করেন, এই ফ্রিজ-ফ্রেম একটি অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে—সোমবার স্কুলে ফিরে গেলে কি তারা আবার সেই পুরনো লেবেলে ফিরে যাবে? ক্লেয়ার নিজেই সিনেমায় সন্দেহ প্রকাশ করে, এই বন্ধুত্ব কি স্কুলের চাপে টিকবে?
শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রশ্নটি জরুরি। কলেজে বা স্কুলে নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হলে সেটা কি টিকে থাকবে, নাকি পুরনো বন্ধুদের চাপে হারিয়ে যাবে? সিনেমা উত্তর দেয় না, শুধু প্রশ্নটা রেখে যায়।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই সিনেমা জরুরি
'দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাব' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি দেখায়—প্রতিটি মানুষ একাধিক পরিচয় বহন করে। কেউ শুধু 'জক' (jock) না, কেউ শুধু 'নর্ড' (nerd) না। অ্যান্ড্রু অ্যাথলিট, কিন্তু তার ভেতরে সংবেদনশীলতা আছে। ব্রায়ান ব্রেন, কিন্তু তার ভেতরে ভয় আছে। বেন্ডার ক্রিমিনাল, কিন্তু তার ভেতরে একটা আহত ছেলে আছে। এই জটিলতা বোঝাই বড় হওয়ার অংশ।
এই সিনেমা আরও শেখায়—পরিবারের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা, নিজের পরিচয়ের সংকট—এই সবকিছু একসাথে বহন করা কঠিন, কিন্তু একা বহন করতে হয় না। যদি কেউ শোনে, যদি কেউ বোঝে, তাহলে সেই বোঝাটা হালকা হয়।
শেষ কথা
'দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাব' শুধু একটি টিনএজ কমেডি নয়, এটি একটি প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি। এটি শেখায়—লেবেল ভাঙা যায়, পরিচয় নতুন করে তৈরি করা যায়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কেউ আসলে সেই লেবেলের চেয়ে অনেক বেশি। ছুটির দিনে বা স্কুলের চাপে যখন মনে হবে কেউ তোমাকে বোঝে না, তখন এই সিনেমাটা দেখো। কারণ পাঁচজন অপরিচিত ছাত্র নয় ঘণ্টায় যা খুঁজে পেয়েছিল, সেটা প্রতিটি শিক্ষার্থীর পাওয়া উচিত—নিজেকে, আর অন্যদের।
পূর্ববর্তী
'স্ট্যান্ড বাই মি' (১৯৮৬) : একটি সিনেমা, যা শেখায় বারো বছর বয়সের বন্ধুত্বই জীবনের সেরা বন্ধুত্ব
পরবর্তী'দ্য থিওরি অব এভরিথিং' (২০১৪) : একটি সিনেমা, যা শেখায় মেধা আর ভালোবাসা একসাথে চলে
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
'আ বিউটিফুল মাইন্ড' (২০০১): একটি সিনেমা, যা শেখায় মেধা আর মানসিক স্বাস্থ্য একসাথে চলে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য এজ অব সেভেনটিন' (২০১৬) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কিশোর বয়সের একাকীত্ব স্বাভাবিক

খেলাধুলা ও বিনোদন
'টয় স্টোরি ৩' (২০১০) : একটি অ্যানিমেশন, যা শেখায় বড় হওয়া মানে ছেড়ে দেওয়া

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য থিওরি অব এভরিথিং' (২০১৪) : একটি সিনেমা, যা শেখায় মেধা আর ভালোবাসা একসাথে চলে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'স্ট্যান্ড বাই মি' (১৯৮৬) : একটি সিনেমা, যা শেখায় বারো বছর বয়সের বন্ধুত্বই জীবনের সেরা বন্ধুত্ব
খেলাধুলা ও বিনোদন
'ডেজড অ্যান্ড কনফিউজড' (১৯৯৩) : একটি সিনেমা, যা একটি রাতের গল্প বলে, কিন্তু একটি প্রজন্মের অনুভূতি ধরে রাখে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
