'দ্য থিওরি অব এভরিথিং' (২০১৪) : একটি সিনেমা, যা শেখায় মেধা আর ভালোবাসা একসাথে চলে
Movies you should watch before college
Editorial Team২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:২৮ PM০ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন মনে হয় জ্ঞানই সব। ভালো ফল করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু জেমস মার্শ পরিচালিত 'দ্য থিওরি অব এভরিথিং' (২০১৪) ঠিক উল্টোটা শেখায়—জ্ঞান একা যথেষ্ট না, ভালোবাসা আর মানবিক সম্পর্কও সমান জরুরি। এটি বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংয়ের জীবনী, যিনি ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে বড় রহস্য—টাইমের শুরু, ব্ল্যাক হোলের প্রকৃতি—নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু সেই সাথে তার নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতার সাথে লড়াই করেছেন।
সিনেমার প্রধান চরিত্র স্টিফেন হকিং, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন এডি রেডমেইন। হকিং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ পিএইচডি ছাত্র, যে বিশ্বাস করে—মহাবিশ্বের সবকিছুর একটা ব্যাখ্যা আছে, শুধু সঠিক সমীকরণ খুঁজে বের করতে হবে। প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায় সে তার বন্ধু ব্রায়ান আর জেন ওয়াইল্ডকে (ফেলিসিটি জোন্স) নিয়ে ক্যামব্রিজের পার্টিতে যায়, যেখানে সে জানের সাথে কথা বলে, আর সেই কথা থেকেই তাদের প্রেমের শুরু।
প্রথম প্রেম, প্রথম রোগ: একসাথে দুটো সংগ্রাম
হকিং আর জেনের সম্পর্ক সিনেমার প্রাণ। জেন একজন মেধাবী ভাষা শিক্ষার্থী, যে হকিংয়ের অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব আর অসাধারণ মেধায় মুগ্ধ হয়। কিন্তু তাদের প্রেমের শুরুতে হকিংয়ের শরীরে Amyotrophic Lateral Sclerosis (ALS) ধরা পড়ে, যা ধীরে ধীরে তার পেশি অচল করে দেয়। ডাক্তার বলেন তার আর দুই বছর বাঁচার কথা।
কিন্তু জেন হকিংকে ছেড়ে যায় না। সে বিয়ে করে, সন্তান জন্ম দেয়, তার যত্ন নেয়। এই অংশটি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি দেখায়—ভালোবাসা মানে সুখের সময় পাশে থাকা না, ভালোবাসা মানে কঠিন সময়েও পাশে থাকা। জেন হকিংয়ের হয়ে পড়ে, লিখে, হাঁটে—যখন হকিং নিজে হাঁটতে পারে না।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, জীবনে সম্পর্ক মানে সব সময় সহজ না। সম্পর্ক মানে দায়িত্ব, সম্পর্ক মানে ত্যাগ। আর সেই ত্যাগই সম্পর্ককে শক্ত করে।
হকিংয়ের মেধা: শরীর অচল, মন মুক্ত
সিনেমার সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী দিক হলো হকিংয়ের মেধা। তার শরীর ধীরে ধীরে অচল হয়ে যায়—প্রথমে লাঠি, তারপর হুইলচেয়ার, তারপর কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে যায়। কিন্তু তার মন কখনও অচল হয় না। সে তার মাথার মধ্যে ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে জটিল সমীকরণ সমাধান করে, ব্ল্যাক হোল নিয়ে তত্ত্ব দেয়, টাইমের শুরু নিয়ে ভাবে।
এই অংশটি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রেরণা। এটি দেখায়—শরীরের সীমাবদ্ধতা মনের সীমাবদ্ধতা না। যদি ইচ্ছা শক্তি থাকে, যদি পরিশ্রম থাকে, তাহলে যেকোনো obstacles অতিক্রম করা যায়। হকিং যখন কথা বলার ক্ষমতা হারায়, তখন সে কম্পিউটারের মাধ্যমে কথা বলে, তার আইব্রো দিয়ে। তবুও সে তার গবেষণা চালিয়ে যায়, লেকচার দেয়, বই লেখে।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—সমস্যা যত বড়ই হোক, হাল ছাড়া যাবে না। বরং সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।
জেন আর হকিংয়ের বিচ্ছেদ: ভালোবাসা মানে ছেড়ে দেওয়াও
সিনেমার সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো যখন হকিং আর জেন আলাদা হয়ে যায়। জেন দীর্ঘদিন হকিংয়ের যত্ন নিয়েছে, কিন্তু সেই যত্নের ভার তার ওপর এত বেড়ে যায় যে সে নিজের জীবন হারিয়ে ফেলে। শেষে জেন চার্চের গায়ক জোনাথনকে ভালোবাসে, আর হকিং তার নার্স ইলেনকে।
এই বিচ্ছেদ সিনেমার সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত, কিন্তু একই সাথে সবচেয়ে বাস্তব। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—ভালোবাসা মানে সব সময় একসাথে থাকা না। কখনও কখনও ভালোবাসা মানে ছেড়ে দেওয়া, কারণ সেই ছেড়ে দেওয়াই দুইজনের জন্য ভালো।
সিনেমার একটি দৃশ্যে হকিং জেনকে বলে, "তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ।" এই কথাটি সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর সংলাপ, যা দেখায়—তাদের সম্পর্ক শেষ হলেও কৃতজ্ঞতা শেষ হয় না।
হকিংয়ের বই: 'আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম'
সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হকিংয়ের বই লেখা। সে চায় সাধারণ মানুষও ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য বুঝুক, তাই সে জটিল সমীকরণ বাদ দিয়ে সহজ ভাষায় বই লেখে—'আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম'। বইটি এত জনপ্রিয় হয় যে এটি বেস্টসেলার হয়ে যায়।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—জ্ঞান শুধু নিজের জন্য না, জ্ঞান সবার জন্য। যদি কেউ জটিল বিষয়কে সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, তাহলেই সে প্রকৃত শিক্ষক।
শেষ দৃশ্য: সময়ের সৌন্দর্য
সিনেমার শেষ দৃশ্যে হকিং একটি লেকচারে বলেন, "মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো সময়। আর সময়ের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর জিনিস হলো মানুষ।" এই কথাটি সিনেমার সারমর্ম। হকিং সারাজীবন ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য খুঁজেছেন, কিন্তু শেষে তিনি বুঝেছেন—সবচেয়ে বড় রহস্য হলো ভালোবাসা, সম্পর্ক, আর মানুষ।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—জ্ঞান অর্জন করা ভালো, কিন্তু সেই জ্ঞানের পেছনে মানুষকে ভুলে যাওয়া যাবে না। কারণ শেষে যা থাকে, তা হলো সম্পর্ক, স্মৃতি, আর ভালোবাসা।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই সিনেমা জরুরি
'দ্য থিওরি অব এভরিথিং' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি দেখায়—জীবনে সাফল্য মানে শুধু পুরস্কার না। হকিং নোবেল পাননি, কিন্তু তিনি তার কাজের জন্য বিশ্বজুড়ে সম্মান পেয়েছেন। কিন্তু সেই সম্মানের চেয়ে বড় ছিল তার পরিবার, তার সন্তান, তার প্রেম।
এই সিনেমা আরও শেখায়—শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানসিক সীমাবদ্ধতা না। হকিং যখন হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন, তখনও তিনি বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের একজন ছিলেন। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—তোমার পরিস্থিতি যাই হোক, তোমার ইচ্ছা আর পরিশ্রমই তোমাকে এগিয়ে নেবে।
সিনেমাটি আরেকটি জরুরি শিক্ষা দেয়—সময়ের মূল্য। হকিং জানতেন তার সময় সীমিত, তাই তিনি প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের জন্যও এই শিক্ষা জরুরি—সময় ফিরে আসে না, তাই প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানো উচিত।
শেষ কথা
'দ্য থিওরি অব এভরিথিং' শুধু একটি বায়োপিক নয়, এটি একটি মানবিক গল্প। এটি শেখায়—মেধা আর ভালোবাসা একসাথে চলে। ছুটির দিনে বা পড়াশোনার ফাঁকে এই সিনেমাটা দেখলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বপ্ন, নিজেদের সম্পর্ক, আর নিজেদের সময় নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারবে।
কারণ কিছু সিনেমা শুধু গল্প বলে, আর কিছু সিনেমা জীবন শেখায়। 'দ্য থিওরি অব এভরিথিং' সেই ধরনের একটি সিনেমা, যা দেখার পর মনে হয়—সময় সীমিত, কিন্তু ভালোবাসা অসীম।
পূর্ববর্তী
'দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাব' (১৯৮৫) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কেউ আসলে স্টেরিওটাইপ নয়
পরবর্তী'টয় স্টোরি ৩' (২০১০) : একটি অ্যানিমেশন, যা শেখায় বড় হওয়া মানে ছেড়ে দেওয়া
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
'আ বিউটিফুল মাইন্ড' (২০০১): একটি সিনেমা, যা শেখায় মেধা আর মানসিক স্বাস্থ্য একসাথে চলে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য এজ অব সেভেনটিন' (২০১৬) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কিশোর বয়সের একাকীত্ব স্বাভাবিক

খেলাধুলা ও বিনোদন
'টয় স্টোরি ৩' (২০১০) : একটি অ্যানিমেশন, যা শেখায় বড় হওয়া মানে ছেড়ে দেওয়া

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য ব্রেকফাস্ট ক্লাব' (১৯৮৫) : একটি সিনেমা, যা শেখায় কেউ আসলে স্টেরিওটাইপ নয়

খেলাধুলা ও বিনোদন
'স্ট্যান্ড বাই মি' (১৯৮৬) : একটি সিনেমা, যা শেখায় বারো বছর বয়সের বন্ধুত্বই জীবনের সেরা বন্ধুত্ব
খেলাধুলা ও বিনোদন
'ডেজড অ্যান্ড কনফিউজড' (১৯৯৩) : একটি সিনেমা, যা একটি রাতের গল্প বলে, কিন্তু একটি প্রজন্মের অনুভূতি ধরে রাখে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
