পোলিও টিকা: কীভাবে একটি ভয়ংকর রোগ প্রায় পৃথিবী থেকে মুছে গেল

সংক্ষেপে: পোলিও একসময় বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগগুলোর একটি ছিল। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিশু পঙ্গু হয়ে যেত, অনেকে আয়রন লাং-এ শ্বাস নিয়ে বাঁচত। ১৯৫৫ সালে জোনাস সল্কের নিহত-ভাইরাস টিকা (IPV) এবং ১৯৬০-এর দশকে অ্যালবার্ট সাবিনের জীবিত-দুর্বল মৌখিক টিকা (OPV) এই রোগকে প্রায় নির্মূল করে দেয়। কিন্তু ২০২৬ সালে এসেও পোলিও পুরোপুরি শেষ হয়নি—আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে এখনও ভাইরাসটি টিকে আছে, আর টিকা-জাত ভাইরাস নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
পোলিও: এক ভয়ংকর রোগের ইতিহাস
পোলিও (poliomyelitis) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত ছোট শিশুদের আক্রমণ করে। ভাইরাসটি মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র আক্রমণ করে, যার ফলে স্থায়ী পেশী দুর্বলতা, পক্ষাঘাত, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
প্রাচীন মিশরের চিত্রকর্মে লাঠি ভর দিয়ে হাঁটা শিশুদের দেখা যায়, যাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শুকিয়ে গিয়েছিল—এটি পোলিওর লক্ষণ। ১৭৮৯ সালে ব্রিটিশ ডাক্তার মাইকেল আন্ডারউড প্রথম ক্লিনিক্যাল বর্ণনা দেন, এবং ১৮৪০ সালে জার্মান চিকিৎসক জাকব হাইনে এটি একটি রোগ হিসেবে স্বীকৃতি পান।
১৯ শতকের শেষ ও ২০ শতকের শুরুতে পোলিও বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগে পরিণত হয়। ১৯১৬ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে একটি বড় প্রাদুর্ভাব ২০০০-এর বেশি মানুষের প্রাণ নেয়। ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাদুর্ভাবে ৩০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পোলিও প্রতি বছর ৫ লক্ষেরও বেশি মানুষকে পঙ্গু বা হত্যা করত।
যারা বেঁচে যেত, তাদের অনেকেই আজীবন Consequences ভোগ করত। বিকৃত অঙ্গের জন্য লাগত লেগ ব্রেস, ক্রাচ বা হুইলচেয়ার। শ্বাস নিতে না পারলে ব্যবহার করতে হতো আয়রন লাং—একটি বিশাল কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র।
টিকার আবিষ্কারের পটভূমি
টিস্যু কালচারে ভাইরাস জন্মানোর যুগান্তকারী আবিষ্কার
পোলিও টিকা তৈরির পথে সবচেয়ে বড় ব্রেকথ্রু এসেছিল ১৯৪৯ সালে। বোস্টন চিলড্রেনস হাসপাতালের জন এন্ডার্স, টমাস ওয়েলার এবং ফ্রেডরিক রবিন্স আবিষ্কার করেন যে পোলিও ভাইরাস মানব টিস্যু কালচারে জন্মানো সম্ভব। এর আগে ভাইরাসটি শুধু বাঁদর বা ইঁদুরের শরীরে জন্মানো যেত, যা ছিল ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণে ভাইরাস তৈরি করা সম্ভব হলো—যা টিকা তৈরির জন্য অপরিহার্য ছিল। এই আবিষ্কারের জন্য তিনজন ১৯৫৪ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
সল্ক ও সাবিন: দুই প্রতিদ্বন্দ্বী
১৯৫০-এর দশকে পোলিও টিকা তৈরির দৌড়ে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জোনাস সল্ক এবং অ্যালবার্ট সাবিন। তাদের পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, এবং তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত ও পেশাগত দ্বন্দ্ব ছিল তীব্র।
জোনাস সল্ক (১৯১৪-১৯৯৫): সল্ক ছিলেন পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ ভাইরোলজিস্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফ্লু টিকা নিয়ে কাজ করেছিলেন থমাস ফ্রান্সিস-এর সঙ্গে, যেখানে তিনি "নিহত ভাইরাস" পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। পোলিওর ক্ষেত্রেও তিনি একই পদ্ধতি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। তার যুক্তি ছিল: নিহত ভাইরাস কখনো পোলিও সৃষ্টি করতে পারে না, তাই এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। তিনি টিস্যু কালচারে জন্মানো ভাইরাসকে ফরমালডিহাইড দিয়ে মেরে ফেলতেন, তারপর তা ইনজেকশনের মাধ্যমে দিতেন।
সল্কের সমালোচকরা—বিশেষ করে সাবিন—তাকে "রান্নাঘরের বিজ্ঞানী" বলে উপহাস করতেন। সাবিন বিশ্বাস করতেন না যে নিহত টিকা কার্যকর হতে পারে।
অ্যালবার্ট সাবিন (১৯০৬-১৯৯৩): সাবিন ছিলেন সিনসিনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অভিজ্ঞ ভাইরোলজিস্ট। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে পোলিও ভাইরাস প্রথমে পরিপাকতন্ত্র আক্রমণ করে, তারপর স্নায়ুতন্ত্রে যায়। তিনি পোলিওর তিনটি সেরোটাইপ চিহ্নিতকারীদের একজন। সাবিন "জীবিত-দুর্বল" (live-attenuated) টিকা তৈরির পক্ষে ছিলেন—যা মৌখিকভাবে খাওয়ানো যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী অনাক্রম্যতা তৈরি করে।
ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ও "মার্চ অফ ডাইমস"
এই প্রতিযোগিতার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইনফ্যান্টাইল প্যারালাইসিস (NFIP)। ১৯৩৮ সালে পোলিও আক্রান্ত প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট-এর উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর তহবিল সংগ্রহ অভিযান "March of Dimes" নামে পরিচিত হয়ে ওঠে—যেখানে সাধারণ মানুষ ১০ সেন্ট (ডাইম) দান করত।
NFIP-এর সভাপতি বেসিল ও'কনর সল্কের কাজে সবচেয়ে বেশি সমর্থন দেন, যদিও সাবিনও ফাউন্ডেশন থেকে কমপক্ষে ১০ লাখ ডলার পেয়েছিলেন।
সল্কের IPV: ১৯৫৫ সালের ঐতিহাসিক ঘোষণা
বিশাল পরীক্ষা
সল্কের টিকা পরীক্ষার জন্য NFIP একটি অসাধারণ উদ্যোগ নেয়। ১৯৫৪ সালে ১৬ লাখেরও বেশি শিশুকে এলোমেলোভাবে টিকা দেওয়া ও না দেওয়া গ্রুপে ভাগ করা হয়। টিকা কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়: পোলিওর প্রকোপ ৫০% এরও কমে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়, এবং টিকা নেওয়া শিশুরা পোলিওতে আক্রান্ত হলে তা সাধারণত অ-পক্ষাঘাতকারী হতো।
১২ এপ্রিল ১৯৫৫: বিশ্ব বদলে যাওয়ার দিন
১৯৫৫ সালের ১২ এপ্রিল থমাস ফ্রান্সিস ঘোষণা করেন যে সল্কের টিকা "নিরাপদ, কার্যকর এবং শক্তিশালী"। এই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে শোনা যায়। সল্ক রাতারাতি "অলৌকিক কর্মী" হিসেবে প্রশংসিত হন।
সল্কের টিকা লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয় সেই একই দিনে। ছয়টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে IPV উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়া হয়। সল্ক টিকার পেটেন্ট নেননি এবং কোনো আর্থিক লাভ করেননি। ১৯৫৫ সালে যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় কে IPV-এর পেটেন্টের মালিক, তিনি উত্তর দেন: "ভাল, জনগণ, আমি বলব। কোনো পেটেন্ট নেই। আপনি কি সূর্যের পেটেন্ট করতে পারেন?"
ফলাফল
১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ২৮,০০০ পোলিও কেস রিপোর্ট হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে—টিকা শুরুর মাত্র এক বছর পর—কেস সংখ্যা ১৫,০০০-এ নেমে আসে। ১৯৫৭ সালের মধ্যে বার্ষিক কেস ৫৮,০০০ থেকে ৫,৬০০-তে নেমে আসে, এবং ১৯৬১ সালে মাত্র ১৬১টি কেস অবশিষ্ট ছিল।
সাবিনের OPV: মৌখিক টিকার যুগ
জীবিত-দুর্বল পদ্ধতি
সল্কের IPV সফল হলেও সাবিন হাল ছাড়েননি। তিনি জীবিত কিন্তু দুর্বল পোলিও ভাইরাস নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। তিনি ভাইরাসটিকে খরগোশ, ইঁদুর এবং অন্যান্য প্রাণীর কোষে বারবার পাস করে এমনভাবে দুর্বল করেন যে এটি আর স্নায়ুতন্ত্র আক্রমণ করতে পারে না, কিন্তু পরিপাকতন্ত্রে বেঁচে থেকে অনাক্রম্যতা তৈরি করতে পারে।
সোভিয়েত ইউনিয়নে বিশাল ট্রায়াল
যুক্তরাষ্ট্রে সল্কের টিকা ইতিমধ্যে জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ায় সাবিনের টিকা পরীক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল। তাই তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে যান। সেখানে ১৯৫৮ সালে ২০,০০০ শিশুর ওপর এবং ১৯৫৯ সালে ১ কোটি শিশুর ওপর ট্রায়াল চালানো হয়। চেকোস্লোভাকিয়ায়ও ১,১০,০০০-এর বেশি শিশুর ওপর পরীক্ষা হয়। ফলাফল ছিল অসাধারণ—টিকা নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হয়।
মৌখিক টিকার সুবিধা
সাবিনের OPV-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল সহজ প্রশাসন। এটি ইনজেকশনের বদলে মুখে ড্রপ হিসেবে বা চিনির কিউবে দেওয়া যেত। এছাড়াও, OPV দীর্ঘস্থায়ী অনাক্রম্যতা তৈরি করত এবং গাট ইমিউনিটি (অন্ত্রের অনাক্রম্যতা) তৈরি করত—যা ভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তার কমাতে সাহায্য করত।
১৯৬২ সালের মধ্যে সাবিনের টিকা সল্কের টিকার জায়গা নিয়ে নেয়। OPV-এর সহজ প্রশাসন পোলিও নির্মূল অভিযানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
IPV বনাম OPV: দুটি টিকার তুলনা
| বৈশিষ্ট্য | OPV (মৌখিক) | IPV (নিহত) |
|---|---|---|
| ধরন | জীবিত, দুর্বল ভাইরাস | নিহত ভাইরাস |
| প্রশাসন | মুখে ড্রপ | ইনজেকশন |
| অনাক্রম্যতা | গাট ইমিউনিটি + হিউমোরাল | প্রধানত হিউমোরাল |
| ঝুঁকি | বিরল VAPP/cVDPV (২৯ লাখে ১) | পোলিও সৃষ্টি করতে পারে না |
| ব্যবহার | পোলিও-প্রবণ ও সংকটপূর্ণ অঞ্চলে | উন্নত দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ) |
২০২৬ সালের বাস্তবতা: পোলিও এখনও শেষ হয়নি
প্রায় নির্মূল, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়
২০২৬ সালে এসেও ওয়াইল্ড পোলিওভাইরাস টাইপ ১ (WPV1) শুধুমাত্র আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে স্থানীয়ভাবে টিকে আছে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৮টি পোলিও কেস রিপোর্ট হয়েছে—১৫টি আফগানিস্তানে এবং ৩টি পাকিস্তানে। আফগানিস্তানে ৫৩টি পরিবেশগত নমুনাও ইতিবাচক পাওয়া গেছে।
টিকা-জাত ভাইরাসের চ্যালেঞ্জ
OPV-এর একটি বিরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো সার্কুলেটিং ভ্যাকসিন-ডিরাইভড পোলিওভাইরাস (cVDPV)। OPV-এর জীবিত ভাইরাস খুব বিরল ক্ষেত্রে (প্রায় ২৯ লাখ ডোজে ১) মিউটেট হয়ে আবার পক্ষাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। এই মিউটেন্ট ভাইরাস টিকা না নেওয়া মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে।
২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৩২টি cVDPV কেস এবং ২৭টি পরিবেশগত সনাক্তকরণ ১২টি দেশে রিপোর্ট হয়েছে। নাইজেরিয়ায় সবচেয়ে বেশি কেস দেখা গেছে।
নতুন সমাধান: জিনগতভাবে স্থিতিশীল OPV
এই সমস্যা মোকাবিলায় নভেল OPV (nOPV) তৈরি করা হয়েছে—যা জিনগতভাবে আরও স্থিতিশীল এবং দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। টাইপ ২-এর জন্য nOPV2 ইতিমধ্যে ব্যবহার হচ্ছে, এবং টাইপ ১ ও ৩-এর জন্য টিকা শীঘ্রই আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পূর্ববর্তীMMR টিকা: তিনটি আলাদা রোগ, একটি সম্মিলিত ঢাল—এল কীভাবে?
পরবর্তী HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল

বিজ্ঞান বার্তা
বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল
বিজ্ঞান বার্তা
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা

বিজ্ঞান বার্তা
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
বিজ্ঞান বার্তা
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
বিজ্ঞান বার্তা
HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
