টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা
সংক্ষেপে: টিটেনাস টিকা (টিটেনাস টক্সয়েড) একটি টক্সয়েড ভ্যাকসিন—এতে টিটেনাস ব্যাকটেরিয়ার বিষ (toxin) দুর্বল করে ব্যবহার করা হয়, ব্যাকটেরিয়া নিজে নয়। এই ধারণা এসেছিল ১৮৯০-এর দশকে, যখন এমিল ভন বেহরিং প্রমাণ করেন যে টিটেনাসের রোগ সৃষ্টি করে ব্যাকটেরিয়া নয়, বরং তার নিঃসৃত বিষ। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯০১ সালে প্রথম নোবেল পুরস্কার পান। ১৯২০-এর দশকে টক্সয়েড টিকা তৈরি হয়, আর ১৯৪০-এর দশকে DTP (ডিপথেরিয়া-টিটেনাস-পারটুসিস) কম্বিনেশন টিকা লাইসেন্স পায়। বাংলাদেশে EPI কর্মসূচির আওতায় শিশুদের পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার মাধ্যমে এবং গর্ভবতী মায়েদের TD টিকার মাধ্যমে এই সুরক্ষা দেওয়া হয়।
টিটেনাস: মাটিতে লুকিয়ে থাকা ঘাতক
টিটেনাস বা ধনুষ্টংকার Clostridium tetani নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এই ব্যাকটেরিয়ার স্পোর মাটিতে, ধুলায়, এমনকি মরিচার জিনিসে বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে। স্পোর শরীরে প্রবেশ করে সাধারণত কোনো কাটা, খোঁচা বা ক্ষতের মাধ্যমে—বিশেষ করে যদি ক্ষতটি মাটি, মল বা লালা দিয়ে দূষিত হয়।
কিন্তু আসল বিপদ ব্যাকটেরিয়া নয়—বরং টিটেনোস্পাজমিন নামক একটি নিউরোটক্সিন। এই বিষ রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে পেশীর স্বাভাবিক সংকেত বন্ধ করে দেয়। ফলে পেশী অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংকুচিত হতে থাকে। প্রথমে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়—একে বলা হয় লকজাউ। তারপর ঘাড়, পিঠ, এমনকি শ্বাসনালীর পেশীও আক্রান্ত হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, টিটেনাস থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও পরবর্তীতে সুরক্ষা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, একবার আক্রান্ত হলেও আবার হতে পারে। একমাত্র টিকাই দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা দিতে পারে।
একটি বিষ আবিষ্কারের গল্প: বেহরিংয়ের নোবেল
১৯ শতকের শেষের দিকে বিজ্ঞানীরা টিটেনাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৮৮৪ সালে আর্থার নিকোলাইয়ার টিটেনাসের জীবাণু শনাক্ত করেন। কিন্তু আসল ব্রেকথ্রু এসেছিল ১৮৯০ সালে, যখন এমিল ভন বেহরিং এবং কিতাসাতো প্রমাণ করেন যে টিটেনাস ব্যাকটেরিয়া নিজে নয়, বরং এটি নিঃসৃত একটি বিষ (toxin) রোগ সৃষ্টি করে।
এই আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। যদি সমস্যা বিষ হয়, তাহলে বিষকে নিরীহ করে শরীরকে সেটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে শেখানো যায়। বেহরিং আরও দেখান যে টিটেনাস বিষের বিরুদ্ধে তৈরি অ্যান্টিবডি (প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন) আক্রান্ত প্রাণীকে রক্ষা করতে পারে। এই যুগান্তকারী কাজের জন্য তিনি ১৯০১ সালে প্রথম নোবেল পুরস্কার পান।
বেহরিংয়ের আবিষ্কার "টক্সয়েড" ধারণার ভিত্তি তৈরি করে—একটি নিষ্ক্রিয় (inactivated) বিষ যা অনাক্রম্যতা তৈরি করতে পারে কিন্তু রোগ সৃষ্টি করতে পারে না।
টক্সয়েড টিকা: ১৯২০-এর দশকে যেভাবে তৈরি হলো
১৯২০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা টিটেনাস টক্সয়েড টিকা তৈরি করতে সক্ষম হন। পদ্ধতিটি ছিল:
টিটেনাস ব্যাকটেরিয়াকে তরল মাধ্যমে জন্মানো হয়
বিষটি পরিশোধন করা হয়
ফরমালডিহাইড দিয়ে বিষটিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়—যা বিষের রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা ধ্বংস করে কিন্তু অনাক্রম্যতা তৈরির ক্ষমতা রাখে
অ্যালুমিনিয়াম বা ক্যালসিয়াম লবণের সঙ্গে মিশিয়ে টিকা তৈরি হয়
এই টিকা প্রথমে একক (monovalent) হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে DPT (ডিপথেরিয়া-টিটেনাস-পারটুসিস) কম্বিনেশন টিকা লাইসেন্স পায় যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৭৪ সালে WHO-এর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-তে DPT অন্তর্ভুক্ত হয়, যা বিশ্বব্যাপী শিশুদের সুরক্ষার ভিত্তি তৈরি করে।
টিকা কীভাবে কাজ করে
টিটেনাস টক্সয়েড একটি নিষ্ক্রিয় (inactivated) টিকা। এতে কোনো জীবিত ব্যাকটেরিয়া নেই—তাই এটি টিটেনাস সৃষ্টি করতে পারে না। টিকা দেওয়ার পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা টক্সয়েডকে একটি বিদেশি পদার্থ হিসেবে চিনে তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিটক্সিন অ্যান্টিবডি তৈরি করে। যদি ভবিষ্যতে প্রকৃত টিটেনাস বিষ শরীরে প্রবেশ করে, সেই অ্যান্টিবডিগুলো তৎক্ষণাৎ তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ০.০১ IU/ml বা তার বেশি অ্যান্টিবডি মাত্রা সুরক্ষামূলক হিসেবে বিবেচিত। দুই ডোজ টক্সয়েড (৪ সপ্তাহ বা তার বেশি ব্যবধানে) বেশিরভাগ শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সুরক্ষামূলক মাত্রা তৈরি করে। তবে এই সুরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী নয়—বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে। তাই প্রাথমিক সিরিজের ৬-১২ মাস পর একটি বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়, যা সাধারণত ১০ বছরেরও বেশি সুরক্ষা দেয়।
ডোজ সূচি: কখন কী দিতে হয়
শিশুদের জন্য (DTaP):
২ মাস বয়সে
৪ মাস বয়সে
৬ মাস বয়সে
১৫-১৮ মাস বয়সে
৪-৬ বছর বয়সে
১১-১২ বছর বয়সে Tdap বুস্টার
আঘাতের ক্ষেত্রে:
যদি ক্ষতটি গভীর বা দূষিত হয় (মাটি, মল বা লালা দিয়ে)—এবং শেষ টিকা ৫ বছরের বেশি আগে দেওয়া হয়ে থাকে—তাহলে একটি জরুরি বুস্টার প্রয়োজন।
গর্ভবতী মায়েদের জন্য:
বাংলাদেশে ১৫-৪৯ বছর বয়সী সন্তানধারণক্ষম মহিলাদের টিটেনাস-ডিপথেরিয়া (TD) টিকার পাঁচটি ডোজ দেওয়া হয়। প্রথম ডোজের এক মাস পর দ্বিতীয়, ছয় মাস পর তৃতীয়, এক বছর পর চতুর্থ এবং পরবর্তী বছর শেষ ডোজ। এই টিকা মা ও নবজাতককে নবজাতকের টিটেনাস থেকে রক্ষা করে, যা এখনও কিছু উন্নয়নশীল দেশে শিশুমৃত্যুর একটি বড় কারণ।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: সাধারণত মৃদু
টিটেনাস টিকা সাধারণত নিরাপদ। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সাধারণত মৃদু এবং কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়:
বিরল ক্ষেত্রে:
Brachial neuritis—কাঁধ ও বাহুর স্নায়ুর প্রদাহ, যা অত্যন্ত বিরল এবং সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়
গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া (অ্যানাফিল্যাক্সিস)—অত্যন্ত বিরল
কাদের টিকা দেওয়া উচিত নয়: পূর্বে টিকা দেওয়ার পর গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, খিঁচুনি বা চেতনা হারানোর ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে টিটেনাস সুরক্ষা দুইভাবে দেওয়া হয়:
শিশুদের জন্য: EPI কর্মসূচির আওতায় ৬ সপ্তাহ বয়সে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা দেওয়া হয়, যা ডিপথেরিয়া, পারটুসিস (হুপিংকাশ), টিটেনাস, হেপাটাইটিস বি এবং হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি—এই পাঁচটি রোগ থেকে রক্ষা করে। এরপর DPT বুস্টার এবং ১-৫ বছর বয়সে Td বুস্টার দেওয়া হয়।
গর্ভবতী মায়েদের জন্য: ১৫-৪৯ বছর বয়সী সন্তানধারণক্ষম সব নারীকে TD টিকা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে মা ও নবজাতকের টিটেনাস নির্মূল করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
সরকার ২০২৬ সালে UNICEF-এর মাধ্যমে ব্যাপক পরিমাণে TD টিকা সংগ্রহ করেছে—একটি চালানে ৯ লক্ষ ডোজ TD টিকা বাংলাদেশে এসেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার EPI কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং আগামী ৮-১২ মাসের জন্য টিকার ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই।
কেন টিকা এত গুরুত্বপূর্ণ
টিটেনাস Clostridium tetani স্পোর মাটিতে সর্বত্র থাকায় এটি পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। যতদিন স্পোর থাকবে, ততদিন টিকা না নেওয়া মানুষের জন্য টিটেনাসের ঝুঁকি থাকবে। তাই টিকা এবং ক্ষতের সঠিক চিকিৎসাই টিটেনাস প্রতিরোধের একমাত্র উপায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতা এর সেরা উদাহরণ। যেসব সৈনিক টিটেনাস টিকা পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ২৫ লাখেরও বেশি আহত সৈনিকের মধ্যে মাত্র ১২টি টিটেনাস কেস রেকর্ড করা হয়েছিল। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে টিকা কতটা কার্যকর।
আজ টিটেনাস টিকা বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর টিকাগুলোর একটি। একটি ছোট ইনজেকশন আপনার জীবন বাঁচাতে পারে—সেই ঘাতক বিষ থেকে, যা মাটিতে লুকিয়ে আছে।
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
পরবর্তীবিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল

বিজ্ঞান বার্তা
বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল

বিজ্ঞান বার্তা
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
বিজ্ঞান বার্তা
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
বিজ্ঞান বার্তা
HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা

বিজ্ঞান বার্তা
পোলিও টিকা: কীভাবে একটি ভয়ংকর রোগ প্রায় পৃথিবী থেকে মুছে গেল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
