বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল

সংক্ষেপে: বিসিজি (BCG) টিকা হলো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত টিকা—১০০ বছরে ৩০০ কোটিরও বেশি ডোজ দেওয়া হয়েছে। ১৯০৮ সালে পাস্তুর ইনস্টিটিউটের দুই বিজ্ঞানী আলবার্ট ক্যালমেট ও ক্যামিল গুয়েরিন গরুর যক্ষ্মা জীবাণু (M. bovis) ২৩০ বার কৃত্রিম কালচারে পাস করে দুর্বল করেন। ১৯২১ সালের ১৮ জুলাই প্যারিসে প্রথম একটি নবজাতককে এই টিকা খাওয়ানো হয়। বাংলাদেশে জন্মের পরপরই বিসিজি টিকা দেওয়া হয় EPI কর্মসূচির অংশ হিসেবে। তবে বিসিজি নিখুঁত টিকা নয়—এটি মারাত্মক যক্ষ্মা (যেমন মেনিনজাইটিস) থেকে ৮০% পর্যন্ত সুরক্ষা দিলেও ফুসফুসের যক্ষ্মার বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা সীমিত।
যক্ষ্মা: এক নীরব ঘাতকের আবির্ভাব
১৮৮২ সালে রবার্ট কখ যক্ষ্মার জীবাণু Mycobacterium tuberculosis আবিষ্কার করেন। সেই সময়ে যক্ষ্মা ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগগুলোর একটি ছিল—বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও শ্রমিকপূর্ণ শহরগুলোতে। ফ্রান্সের লিল শহর ছিল এমনই একটি জায়গা, যেখানে যক্ষ্মা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছিল।
১৮৯৭ সালে আলবার্ট ক্যালমেট লিলে পাস্তুর ইনস্টিটিউটের একটি শাখার পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। যক্ষ্মা তখন লিলের শ্রমিকদের মধ্যে মহামারি আকারে ছিল। ক্যালমেট টিকা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং তার সহকারী হিসেবে নেন ক্যামিল গুয়েরিন—একজন তরুণ পশুচিকিৎসক, যিনি অলফোর্ট ভেটেরিনারি স্কুল থেকে সদ্য পাস করেছেন।
১৩ বছর, ২৩০ বার পাস: বিসিজি-র জন্ম
১৯০৮ সালে ক্যালমেট ও গুয়েরিন গরুর যক্ষ্মা (M. bovis) থেকে একটি স্ট্রেইন সংগ্রহ করেন। তারা এটিকে আলু ও গরুর পিত্ত (bile) দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ পুষ্টি মাধ্যমের ওপর কালচার করতে শুরু করেন।
প্রতি তিন সপ্তাহে তারা ব্যাকটেরিয়াটিকে নতুন মাধ্যমে subculture (উপ-কালচার) করতেন। শুরুতে ব্যাকটেরিয়ার virulence (রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা) বেড়েছিল, কিন্তু ৩০ বার পাস করার পর তা কমতে শুরু করে। তারা নিরলসভাবে এই কাজ চালিয়ে যান—১৩ বছর ধরে, মোট ২৩০ বার পাস করার পর—অবশেষে একটি সম্পূর্ণ নিরীহ স্ট্রেইন পান।
তারা এই দুর্বল স্ট্রেইন গরুতে পরীক্ষা করে দেখেন যে এটি আর রোগ সৃষ্টি করে না, বরং যক্ষ্মার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। এই স্ট্রেইনের নাম দেওয়া হয় ব্যাসিলাস ক্যালমেট-গুয়েরিন বা বিসিজি—তাদের দুইজনের সম্মানে।
ভেতরের রহস্য
আধুনিক জিনোম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিসিজি-র attenuation (দুর্বলীকরণ) মূলত ঘটেছে RD1 (Region of Difference 1) নামক জিন অঞ্চলের ক্ষতির কারণে। এই অঞ্চলটি ESX-1 সিক্রেশন সিস্টেম কোড করে, যা যক্ষ্মা ব্যাকটেরিয়ার virulence-এর জন্য অপরিহার্য। RD1 হারানোর ফলে বিসিজি আর শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে না, কিন্তু রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দিতে পারে।
১৯২১: প্রথম মানুষের টিকা
১৯২১ সালের গ্রীষ্মে প্যারিসের শারিতে হাসপাতালে একটি নবজাতকের জন্ম হয়। শিশুটির মা যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান, এবং নানা-নানিও যক্ষ্মা রোগী ছিলেন। শিশুটিকে রক্ষা করার জন্য চিকিৎসক উইল-হালে সিদ্ধান্ত নেন বিসিজি টিকা দেওয়ার।
১৮ জুলাই ১৯২১ তারিখে শিশুটিকে ক্যালমেট ও গুয়েরিনের তৈরি টিকার দ্রবণ খাওয়ানো হয়—এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম বিসিজি টিকা প্রয়োগ। কয়েক মাস পর দেখা যায়, শিশুটির শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছে এবং সে সংক্রমিত হয়নি। এই সাফল্যের পর ১৯২৪ সাল থেকে বিসিজি-র ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়।
বিসিজি কীভাবে কাজ করে?
বিসিজি একটি লাইভ, অ্যাটেনুয়েটেড (দুর্বল করা) টিকা। এতে যক্ষ্মার জীবাণুর একটি দুর্বল সংস্করণ থাকে, যা রোগ সৃষ্টি করে না কিন্তু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে যক্ষ্মা চিনতে ও মোকাবিলা করতে শেখায়।
টিকা সাধারণত ত্বকের নিচে (intradermal) উপরের বাহুতে ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। টিকা দেওয়ার পর একটি ছোট লাল দাগ, ফোস্কা বা ঘা তৈরি হতে পারে, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায় এবং একটি ছোট দাগ রেখে যায়।
কার্যকারিতা: কতটা সুরক্ষা দেয়?
বিসিজি-র কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে:
মারাত্মক যক্ষ্মার বিরুদ্ধে: বিসিজি বিশেষভাবে কার্যকর—শিশুদের মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কের আবরণের প্রদাহ) এবং মিলিয়ারি টিবি (শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া) থেকে ৮০% পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়।
ফুসফুসের যক্ষ্মার বিরুদ্ধে: প্রাপ্তবয়স্কদের ফুসফুসের যক্ষ্মার বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা সীমিত—কিছু গবেষণায় ৫০% পর্যন্ত দেখা গেছে, আবার কিছু গবেষণায় কার্যকারিতা পাওয়া যায়নি।
সংক্রমণ প্রতিরোধ: ২০২৫ সালের একটি বড় মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিসিজি সংক্রমণ প্রতিরোধে সামগ্রিকভাবে ১৮% সুরক্ষা দেয়। তবে কম-প্রাদুর্ভাবের দেশে এটি ২৯% কার্যকর, আর উচ্চ-প্রাদুর্ভাবের দেশে কার্যকারিতা স্পষ্ট নয়।
অন্যান্য রোগ: বিসিজি কুষ্ঠরোগ (leprosy) প্রতিরোধে ৫০-৮০% কার্যকর। এছাড়া Buruli ulcer এবং কিছু নন-টিউবারকুলাস মাইকোব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের বিরুদ্ধেও কিছু সুরক্ষা দেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-এর অধীনে জন্মের পরপরই বিসিজি টিকা দেওয়া হয়। এটি যক্ষ্মা প্রতিরোধের প্রথম ধাপ, বিশেষ করে শিশুদের মারাত্মক যক্ষ্মা থেকে রক্ষা করতে।
বাংলাদেশে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব এখনও উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে চা-শ্রমিকদের সন্তানদের মধ্যে এই হার বেশি, কারণ তারা ভিড়যুক্ত আবাসন, অপুষ্টি এবং সংক্রামিত প্রাপ্তবয়স্কদের সংস্পর্শে থাকে।
সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে বিসিজি টিকা ছাড়াও যক্ষ্মার পরীক্ষা ও চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য কর্মীরা চা-বাগান এলাকায় ঘরে ঘরে গিয়ে টিকা দিচ্ছেন এবং সচেতনতা বাড়াচ্ছেন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা
বিসিজি সাধারণত নিরাপদ, তবে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে:
সাধারণ:
ইনজেকশনের জায়গায় লালচে ভাব, ফোলা, ঘা
ঘা সেরে যাওয়ার পর ছোট দাগ
বিরল (প্রতি ১০০০ শিশুতে ১):
দীর্ঘস্থায়ী ঘা বা অ্যাবসেস
আর্মপিট বা গ্ৰোইনে লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
অতি বিরল (প্রতি ১,০০,০০০ শিশুতে ১):
কাদের টিকা দেওয়া উচিত নয়:
টিকা দেওয়ার পর যত্ন:
টিকার স্থানে কোনো ওষুধ বা তেল লাগানো যাবে না
ইনজেকশনের পর ফোস্কা দেখা দিলে বুঝতে হবে টিকা সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে
ভবিষ্যৎ: নতুন টিকার খোঁজে
বিসিজি ১০০ বছর ধরে ব্যবহৃত হলেও এটি নিখুঁত নয়। গবেষকরা এখন নতুন, আরও কার্যকর যক্ষ্মা টিকা তৈরির চেষ্টা করছেন। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বিসিজি-র উন্নত সংস্করণ বা নতুন অ্যাডজুভেন্ট ব্যবহার করে আরও ভালো সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
তবে বিসিজি-র সবচেয়ে বড় অবদান হলো—এটি লক্ষ লক্ষ শিশুকে মারাত্মক যক্ষ্মা থেকে রক্ষা করেছে এবং যক্ষ্মা নির্মূলের প্রচেষ্টার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। ১০০ বছর পরেও, বিশ্বের অনেক দেশে—বিশেষ করে যেখানে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব বেশি—বিসিজি টিকা আজও অপরিহার্য।
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা
পরবর্তীগুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল
বিজ্ঞান বার্তা
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা

বিজ্ঞান বার্তা
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
বিজ্ঞান বার্তা
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
বিজ্ঞান বার্তা
HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা

বিজ্ঞান বার্তা
পোলিও টিকা: কীভাবে একটি ভয়ংকর রোগ প্রায় পৃথিবী থেকে মুছে গেল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
