ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প

সংক্ষেপে: ইয়েলো ফিভার (হলুদ জ্বর) ভ্যাকসিন হলো ইতিহাসের সবচেয়ে সফল এবং কার্যকর লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিনগুলোর একটি। ১৯৩৭ সালে ম্যাক্স থাইলার নামের এক বিজ্ঞানী ইয়েলো ফিভার ভাইরাসের Asibi স্ট্রেইন-কে মুরগির ভ্রূণে ২৩০ বারেরও বেশি পাস করে একটি দুর্বল কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর স্ট্রেইন তৈরি করেন, যার নাম ১৭ডি (17D)। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯৫১ সালে নোবেল পুরস্কার পান—এটি ছিল কোনো ভাইরাস ভ্যাকসিনের জন্য এখন পর্যন্ত একমাত্র নোবেল। এক ডোজ টিকা সাধারণত আজীবন সুরক্ষা দেয়, তাই ২০১৬ সালে WHO ১০ বছরের বুস্টার ডোজের বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়।
ইয়েলো ফিভার: এক ভয়ংকর ভাইরাসজনিত রোগ
ইয়েলো ফিভার একটি মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ, যা Flavivirus পরিবারের অন্তর্গত। আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এটি এখনও একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ভাইরাসটি Aedes এবং Haemagogus প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণ হলো: জ্বর, কাঁপুনি, পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব। গুরুতর ক্ষেত্রে হেমোরেজিক ফিভার, জন্ডিস (তাই নাম "হলুদ জ্বর"), অন্ত্র ও পেটে রক্তক্ষরণ, এবং অর্গান ফেইলিউর হতে পারে। গুরুতর আক্রান্তদের প্রায় ৩০-৫০% মারা যায়।
ম্যাক্স থাইলার: যে বিজ্ঞানী ভাইরাসকে দুর্বল করলেন
ম্যাক্স থাইলার ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী এক বিজ্ঞানী, যিনি পরে যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার ফাউন্ডেশন-এ কাজ করেন। ১৯৩০-এর দশকে তিনি ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা শুরু করেন।
প্রথম প্রচেষ্টা এবং সমস্যা
থাইলার প্রথমে ইঁদুরের মস্তিষ্কে ভাইরাস পাস করে দুর্বল করার চেষ্টা করেন। এতে ভাইরাসের ভিসেরোট্রপিক (অন্ত্রে আক্রমণকারী) ক্ষমতা কমে যায়—যা ইয়েলো ফিভারের মূল লক্ষণগুলোর উৎস। কিন্তু একটি বড় সমস্যা দেখা দেয়: ইঁদুরে পাস করার ফলে ভাইরাসের নিউরোট্রপিক (মস্তিষ্কে আক্রমণকারী) ক্ষমতা বেড়ে যায়। অর্থাৎ, ভ্যাকসিন গ্রহণকারীর এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কম ডোজ দিলে আবার উল্টো ফল হয়—কম ভাইরাস দিলে বানরের মধ্যে এনসেফালাইটিসের হার বেড়ে যায়।
১৭ডি স্ট্রেইনের জন্ম
এই সমস্যা সমাধানে থাইলার একটি নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেন: মুরগির ভ্রূণ ব্যবহার। তিনি Asibi স্ট্রেইন নামের একটি ভাইরাস (যা ১৯২৭ সালে একজন ঘানাইয়ান রোগীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল) নিয়ে মুরগির ভ্রূণের টিস্যু কালচারে পাস করতে শুরু করেন।
মজার ব্যাপার হলো, থাইলার মুরগির ভ্রূণ থেকে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম (মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড) অপসারণ করে নিয়েছিলেন। তিনি ৮৯ থেকে ১১৪তম পাসের মধ্যে হঠাৎ একটি ভাইরাস ভ্যারিয়েন্ট খুঁজে পান, যা ভিসেরোট্রপিক ও নিউরোট্রপিক—দুটো ক্ষমতাই হারিয়েছিল। অর্থাৎ, ভাইরাসটি আর রোগ সৃষ্টি করতে পারত না, কিন্তু অনাক্রম্যতা তৈরি করতে পারত।
এই ভাইরাসটি ছিল স্থিতিশীল এবং মুরগির ভ্রূণে বারবার পাস করলেও তার নিউরোভাইরুলেন্স ফিরে আসেনি। এই স্ট্রেইনের নাম দেওয়া হয় ১৭ডি (17D)।
প্রথম ফিল্ড ট্রায়াল
১৯৩৮ সালে ব্রাজিলে রকফেলার ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে ১৭ডি ভ্যাকসিনের প্রথম ফিল্ড ট্রায়াল শুরু হয়। ফলাফল ছিল অত্যন্ত সফল। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ৪০ কোটিরও বেশি ডোজ ব্যবহৃত হয়েছে এবং এটি একটি অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন হিসেবে প্রমাণিত।
নোবেল পুরস্কার: একটি ভ্যাকসিনের জন্য প্রথম ও একমাত্র
১৯৫১ সালে ম্যাক্স থাইলার নোবেল পুরস্কার পান ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য। এটি ছিল কোনো ভাইরাস ভ্যাকসিনের জন্য এখন পর্যন্ত একমাত্র নোবেল পুরস্কার।
নোবেল কমিটির মূল্যায়নে বলা হয়, থাইলারের কাজের ব্যবহারিক ফলাফল এবং ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নোবেল কমিটি আশা প্রকাশ করেছিল যে থাইলারের সাফল্য অন্যান্য বিজ্ঞানীদের ভাইরাস রোগের ভ্যাকসিন তৈরিতে অনুপ্রাণিত করবে।
১৭ডি ভ্যাকসিন কীভাবে কাজ করে?
১৭ডি একটি লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন। এতে দুর্বল করা ইয়েলো ফিভার ভাইরাস থাকে, যা রোগ সৃষ্টি করে না কিন্তু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেয়।
প্রশাসন: টিকা সাধারণত ত্বকের নিচে (subcutaneous) দেওয়া হয়। এছাড়া একটি ইন্ট্রাডার্মাল (ত্বকের ভেতরে) সংস্করণও আছে, যা কম ডোজে সমান কার্যকর।
অনাক্রম্যতা: ভ্যাকসিন দেওয়ার পর শরীর নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি তৈরি করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ডেনড্রিটিক সেল ও মনোসাইট নামক ইমিউন কোষগুলো ইন্টারফেরন-এর মাধ্যমে সক্রিয় হয়। এই সক্রিয়তার একটি চিহ্ন হলো SIGLEC-1 নামক অণু, যা দ্রুত সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কতটা কার্যকর? কতদিন সুরক্ষা দেয়?
প্রাথমিক সুরক্ষা: টিকা দেওয়ার ১০ দিনের মধ্যে সুরক্ষা শুরু হয় এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ অনাক্রম্যতা তৈরি হয়। প্রথম ৫ বছরে সুরক্ষার হার ৯৭%।
দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা: ২০১৬ সালে WHO-এর বিশেষজ্ঞ প্যানেল সিদ্ধান্ত নেয় যে এক ডোজ ১৭ডি ভ্যাকসিন সাধারণত আজীবন সুরক্ষা দেয়। সেই ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিধিমালা (IHR) থেকে ১০ বছরের বুস্টার ডোজের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়।
তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে পারে। একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে:
ব্রাজিলের একটি গবেষণায় (১৯৭৩-২০০৮) দেখা গেছে, ৫২% ইয়েলো ফিভার কেস ঘটেছে যারা ১০ বছরের বেশি আগে ভ্যাকসিন পেয়েছিলেন, আর মাত্র ৩% ঘটেছে যারা ১০ বছরের কম আগে পেয়েছিলেন।
বুস্টার কার কাদের জন্য? CDC সুপারিশ করে, যারা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণ করবেন এবং শেষ ডোজের ১০ বছর বা তার বেশি হয়ে গেছে, তারা বুস্টার নিতে পারেন। এছাড়া, যারা ২ বছরের কম বয়সে টিকা পেয়েছেন, ইমিউনো-কম্প্রোমাইজড, বা HIV আক্রান্ত ব্যক্তিদের বুস্টার প্রয়োজন হতে পারে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: সাধারণত মৃদু, তবে বিরল গুরুতর ঝুঁকি আছে
সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:
বিরল কিন্তু গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (প্রতি ১,০০,০০০ ডোজে ১-এর কম):
১. YEL-AND (Yellow Fever Vaccine-Associated Neurotropic Disease): ভ্যাকসিন ভাইরাস মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে এনসেফালাইটিস বা মেনিনজাইটিস সৃষ্টি করে।
২. YEL-AVD (Yellow Fever Vaccine-Associated Viscerotropic Disease): ভ্যাকসিন ভাইরাস শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গে (লিভার, কিডনি, হার্ট) uncontrolled replication করে মাল্টি-অর্গান ফেইলিউর সৃষ্টি করে। এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
এই ঝুঁকি প্রথমবার টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে বেশি, বিশেষ করে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে। ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার প্রতি ১,০০,০০০ ডোজে ৭.৭, যেখানে সব বয়সের গড় ৩.৮।
কারা টিকা নিতে পারবেন না? (Contraindications)
টিকা নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে টিকা নিষিদ্ধ (contraindicated):
সতর্কতা (Precautions)—ঝুঁকি-সুবিধা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত:
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিনের ভবিষ্যৎ
বর্তমানে ১৭ডি ভ্যাকসিন অত্যন্ত কার্যকর হলেও, এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে—বিশেষ করে যারা লাইভ ভ্যাকসিন নিতে পারেন না (যেমন ইমিউনো-কম্প্রোমাইজড ব্যক্তি) তাদের জন্য নতুন বিকল্প প্রয়োজন।
গবেষকরা নিষ্ক্রিয় (inactivated) ভ্যাকসিন এবং সাবইউনিট ভ্যাকসিন তৈরি করছেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নিষ্ক্রিয় ভ্যাকসিন প্রোটোটাইপ ৮৩% ক্ষেত্রে ভাইরেমিয়া ও RNAemia ব্লক করতে পেরেছে, আর একটি উদ্ভিদ-ভিত্তিক সাবইউনিট ভ্যাকসিন ৫০% ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। এছাড়া MVA-BN প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক একটি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটও পরীক্ষাধীন।
তবে ১৭ডি ভ্যাকসিনের স্থিতিশীলতা, কম খরচ, এবং এক ডোজে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে অন্য কোনো ভ্যাকসিনে এখনও পাওয়া যায়নি। তাই আগামী অনেক বছর পর্যন্ত ১৭ডি-ই ইয়েলো ফিভার প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হয়ে থাকবে।
সারসংক্ষেপ
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন হলো আধুনিক টিকা বিজ্ঞানের এক অসাধারণ সাফল্য। ম্যাক্স থাইলারের ১৭ডি স্ট্রেইন এক ডোজে আজীবন সুরক্ষা দেয়, এবং এর কার্যকারিতা এতটাই উচ্চ যে এটি বিশ্বের সবচেয়ে সফল ভ্যাকসিনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। তবে ভ্যাকসিনটি নিখুঁত নয়—বিরল কিন্তু গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (YEL-AND, YEL-AVD) আছে, বিশেষ করে বয়স্কদের এবং ইমিউনো-কম্প্রোমাইজড ব্যক্তিদের মধ্যে। তাই টিকা নেওয়ার আগে অবশ্যই ঝুঁকি-সুবিধা বিবেচনা করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যারা ইয়েলো ফিভার-প্রবণ এলাকায় ভ্রমণ করবেন, তাদের জন্য এই টিকা অপরিহার্য—কারণ ইয়েলো ফিভারের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, শুধু প্রতিরোধই সুরক্ষার একমাত্র উপায়।
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
পরবর্তীটিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল

বিজ্ঞান বার্তা
বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল
বিজ্ঞান বার্তা
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা
বিজ্ঞান বার্তা
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
বিজ্ঞান বার্তা
HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা

বিজ্ঞান বার্তা
পোলিও টিকা: কীভাবে একটি ভয়ংকর রোগ প্রায় পৃথিবী থেকে মুছে গেল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
