MMR টিকা: তিনটি আলাদা রোগ, একটি সম্মিলিত ঢাল—এল কীভাবে?
সংক্ষেপে: MMR টিকা কোনো একক আবিষ্কার নয়। এর পেছনে আছে তিনটি আলাদা ভাইরাসের দীর্ঘ গবেষণা, যার প্রতিটির নিজস্ব ইতিহাস আছে। হামের ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৫৪ সালে, মাম্পসের ভাইরাস ১৯৩৪ সালে, আর রুবেলার ভাইরাস ১৯৬২ সালে। তিনটি আলাদা টিকা লাইসেন্স পায় ১৯৬৩ (হাম), ১৯৬৭ (মাম্পস) এবং ১৯৬৯ (রুবেলা) সালে। ১৯৭১ সালে মরিস হিলম্যান এই তিনটিকে একত্রিত করে MMR তৈরি করেন—লক্ষ্য ছিল আলাদা আলাদা ডাক্তারি ভিজিট কমিয়ে টিকা গ্রহণের হার বাড়ানো। আর রুবেলা টিকার পেছনে রয়েছে ১৯৬৪-৬৫ সালের এক ভয়ংকর মহামারির করুন ইতিহাস, যা হাজার হাজার গর্ভপাত ও ২০,০০০ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম ডেকে আনে।
হাম: ১৭৫৭ থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ
হামের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত পথ শুরু হয় ১৭৫৭ সালে, যখন স্কটিশ চিকিৎসক ফ্রান্সিস হোম প্রমাণ করেন যে হাম একটি সংক্রামক রোগ—তিনি আক্রান্ত রোগীর রক্ত সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করিয়ে একই রোগ সৃষ্টি করেন।
১৯১১ সালে প্রমাণিত হয় যে হামের কারণ একটি ভাইরাস। কিন্তু ভাইরাসটি বিচ্ছিন্ন ও শনাক্ত করা সম্ভব হয় ১৯৫৪ সালে, যখন থমাস পিবলস এবং জন এন্ডার্স মেট্রিকুলাসভাবে কাজটি করেন।
১৯৫৪ সালে হামের ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর টিকা তৈরির দৌড় শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে প্রথম হামের টিকা লাইসেন্স পায়। এরপর ১৯৬৬ সালে আফ্রিকায় প্রথম আন্তর্জাতিক হাম টিকাদান অভিযান শুরু হয়, এবং ১৯৬৮ সালে হিলম্যান একটি উন্নত সংস্করণ তৈরি করেন যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম ছিল।
মাম্পস: ৫ম শতাব্দীর বর্ণনা থেকে ১৯৬৭ সালের টিকা
মাম্পস রোগের বর্ণনা পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে, গ্রিসে। কিন্তু বিজ্ঞানসম্মতভাবে এটি শনাক্ত হতে আরও অনেক সময় লাগে। ১৭৯০ সালে রবার্ট হ্যামিল্টন মাম্পসের একটি বিস্তৃত অধ্যয়ন প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি অর্কিটিস (অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া) এবং স্নায়বিক জটিলতার কথা উল্লেখ করেন।
১৯৩৪ সালে জনসন এবং গুডপাসচার প্রমাণ করেন যে মাম্পসের কারণ একটি ফিল্টারযোগ্য ভাইরাস। ১৯৪৫ সালে ভাইরাসটি ভ্রূণযুক্ত মুরগির ডিমে জন্মানো সম্ভব হয়। এরপর ১৯৫৫ সালের দিকে টিস্যু কালচারে জন্মানো শুরু হলে ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড মাম্পস টিকা লাইসেন্স পায়।
রুবেলা: একটি মহামারি, একটি হৃদয়বিদারক আবিষ্কার
রুবেলা টিকার গল্প সবচেয়ে করুন। ১৭৪০ সালে জার্মান চিকিৎসক ফ্রিডরিখ হফম্যান প্রথম এই রোগের বর্ণনা দেন—তাই একে "জার্মান হাম" বলা হতো। ১৮৬৬ সালে ইংরেজ সার্জন হেনরি ভিল "রুবেলা" নামটি দেন (ল্যাটিন শব্দ, অর্থ "ছোট লাল")।
১৯৪১ সালে অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক নরম্যান গ্রেগ একটি চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার করেন: গর্ভাবস্থায় রুবেলা সংক্রমণ হলে শিশুর জন্মগত ছানি (cataract), হৃদরোগ এবং বধিরতা হতে পারে। এটি ছিল Congenital Rubella Syndrome (CRS)-এর প্রথম স্পষ্ট বর্ণনা।
কিন্তু আসল বিপর্যয় ঘটে ১৯৬৪-১৯৬৫ সালে। যুক্তরাষ্ট্রে রুবেলার এক মহামারি ছড়িয়ে পড়ে—প্রায় ১২.৫ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়। এর ফলাফল ছিল ভয়ংকর:
১১,০০০ গর্ভপাত বা থেরাপিউটিক অ্যাবরশন
২,১০০ নবজাতকের মৃত্যু
২০,০০০ শিশু CRS নিয়ে জন্ম—যারা আজীবন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বাঁচবে
এই মহামারির মাঝেই রুবেলা ভাইরাস প্রথম বিচ্ছিন্ন করা হয়। ১৯৬২ সালে দুইটি স্বাধীন দল—পল পার্কম্যান এবং থমাস ওয়েলার—রুবেলা ভাইরাস আলাদা করেন। এরপর টিকা তৈরির কাজ শুরু হয়।
স্ট্যানলি প্লটকিন: রুবেলা টিকার নায়ক
স্ট্যানলি প্লটকিন ছিলেন সেই সময়ে লন্ডনে পেডিয়াট্রিক রেসিডেন্সি করছিলেন এবং CRS-এ আক্রান্ত প্রথম শিশুদের দেখাশোনা করেছিলেন। ১৯৬৪-৬৫ সালের মহামারির সময় তিনি ফিলাডেলফিয়ায় ছিলেন, যেখানে সমস্ত নবজাতকের ১% CRS-এ আক্রান্ত হয়েছিল।
প্লটকিন উইস্টার ইনস্টিটিউটে ফিরে গিয়ে রুবেলা টিকা তৈরির কাজে হাত দেন। তার পদ্ধতি ছিল: আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে রুবেলা ভাইরাস নিয়ে বিভিন্ন কোষ কালচারে বারবার পাস করা, যাতে ভাইরাসটি দুর্বল হয়ে যায় কিন্তু অনাক্রম্যতা তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। তিনি RA 27/3 নামে পরিচিত একটি স্ট্রেইন তৈরি করেন—যা আজও বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত রুবেলা টিকার ভিত্তি।
রুবেলা টিকা ১৯৬৯ সালে লাইসেন্স পায়।
MMR-এর জন্ম: ১৯৭১
তিনটি টিকা আলাদাভাবে তৈরি হওয়ার পরও অভিভাবকদের সমস্যা ছিল: ছয়টি ডাক্তারি ভিজিট, ছয়টি ইনজেকশন—হাম, মাম্পস ও রুবেলার দুই ডোজ মিলিয়ে।
মরিস হিলম্যান ছিলেন মার্ক ইনস্টিটিউটের একজন কিংবদন্তি microbiologist। তিনি মাম্পসের টিকা (১৯৬৭) তৈরি করেছিলেন এবং হামের টিকাও উন্নত করেছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি তিনটি টিকাকে একত্রিত করে MMR তৈরি করেন।
কেন একত্রিত করা সম্ভব হলো?
লক্ষ্য ছিল সহজ: কম ভিজিট, কম ইনজেকশন, বেশি টিকা গ্রহণ। যদি আলাদা করতে হয়, তাহলে ছয়টি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগত। তাহলে অনেক পরিবার টিকা দিতে পিছিয়ে যেত, ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ত।
রুবেলা টিকার প্রয়োজনীয়তা: একটি সংখ্যাগত দৃষ্টিভঙ্গি
রুবেলা টিকা শুধু ব্যক্তিকে রক্ষা করে না—এটি ভ্রূণকে রক্ষা করে। ১৯৬৪-৬৫ সালের মহামারির সংখ্যাগুলো আবার দেখুন:
প্লটকিনের মতে, "ফিলাডেলফিয়ায়, মহামারির চরম মুহূর্তে সমস্ত জন্মের ১% আক্রান্ত হয়েছিল"।
রুবেলা ভাইরাসের একমাত্র হোস্ট মানুষ। তাই টিকা দিয়ে এটি সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব—যেমন গুটিবসন্তকে করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে আমেরিকা অঞ্চল রুবেলা-মুক্ত ঘোষিত হয়।
MMR-এর পরের ইতিহাস
১৯৮৯: দ্বিতীয় ডোজ সুপারিশ করা হয়—হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে।
আজ: বিশ্বব্যাপী MMR বা MMRV (ভ্যারিসেলাসহ) ব্যবহার হচ্ছে। MR (হাম-রুবেলা) টিকা কিছু দেশে ব্যবহার হয়—যেখানে মাম্পস প্রতিরোধ কম অগ্রাধিকার।
উপসংহার
MMR টিকা কোনো একজন বিজ্ঞানীর একক কৃতিত্ব নয়। এটি দশকের গবেষণা, একটি ভয়ংকর মহামারির করুন অভিজ্ঞতা এবং টিকা গ্রহণ বাড়ানোর বাস্তব চিন্তার মিশ্রণ। মরিস হিলম্যান তিনটি টিকাকে একত্রিত করে দেখিয়েছিলেন যে সুবিধা ও বিজ্ঞান একসঙ্গে কাজ করতে পারে। আর স্ট্যানলি প্লটকিনের রুবেলা টিকা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কখনো কখনো একটি টিকা শুধু ব্যক্তিকে নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে রক্ষা করে।
আইনস্টাইনের সমস্যার পেছনের আকৃতিতে মিললো নতুন বিস্ময়কর পদার্থবিজ্ঞান
পরবর্তীম্যালেরিয়া টিকা: একটি প্রাচীন ঘাতকের বিরুদ্ধে নতুন অস্ত্র
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল

বিজ্ঞান বার্তা
বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল
বিজ্ঞান বার্তা
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা

বিজ্ঞান বার্তা
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
বিজ্ঞান বার্তা
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
বিজ্ঞান বার্তা
HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
