মাধ্যমিকে কমছে শিক্ষার্থী, বাড়ছে মাদ্রাসায়: বদলে যাচ্ছে শিক্ষার চিত্র?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের চিত্রে ভিন্নধর্মী পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একদিকে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমছে, অন্যদিকে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। একই সময়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও সেখানে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র। ২০২৪ সালের সঙ্গে ২০২৫ সালের তথ্য তুলনা করে দেখা যায়, দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখেরও বেশি। তবে এই পরিবর্তনের পেছনে কী কারণ কাজ করছে, তা প্রতিবেদনে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি।
প্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমছে শিক্ষার্থী
ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের কিছু বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখ আট হাজারের বেশি।
অন্যদিকে, একই সময়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৯ হাজার ১১৭ থেকে বেড়ে ১৯ হাজার ২১১টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলেও শিক্ষার্থীসংখ্যা বাড়েনি; বরং কমেছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা দেওয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে সব স্তর মিলিয়ে শিক্ষার্থী ছিল ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। ২০২৫ সালে তা কমে ১৫ লাখ ৩১ হাজারের কিছু বেশি হয়েছে। অথচ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৪ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫৫৬টিতে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিসংখ্যান শিক্ষা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। কোনো এলাকায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হলেও সেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে কি না, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে কি না এবং শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
কারিগরি শিক্ষাতেও কমছে অংশগ্রহণ
সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার পাশাপাশি স্বতন্ত্র কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীসংখ্যা কমেছে। ২০২৪ সালে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ৬ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি। ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রবণতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ৩০ শতাংশকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। কর্মমুখী দক্ষতা তৈরি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতেই শিক্ষার্থী কমে গেলে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যেও বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমে অনেক আসন ফাঁকা থাকার চিত্র উঠে এসেছে। কেন শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে আগ্রহী হচ্ছে না, তা বোঝার জন্য প্রশিক্ষণের মান, কর্মসংস্থানের সুযোগ, পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।
মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে বাড়ছে শিক্ষার্থী
মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমলেও মাদ্রাসায় দেখা যাচ্ছে বিপরীত প্রবণতা। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাস), ফাজিল (অনার্স) ও কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসা ছিল ৯ হাজার ২৬৯টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি।
২০২৫ সালে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ২৯৬টি হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরে এসব মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারেরও বেশি।
এ হিসাবের মধ্যে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি ও কওমি মাদ্রাসা অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে দেশের সব ধরনের মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সামগ্রিক চিত্র জানতে হলে সেগুলোর পরিসংখ্যানও আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলেও শিক্ষার্থীসংখ্যা সামান্য বেড়েছে। ২০২৪ সালে দেশে ১৪৩টি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষার্থী ছিল ২৯ হাজার ৭৭ জন। ২০২৫ সালে একইসংখ্যক স্কুলে শিক্ষার্থী বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ৬৭২ জন।
তবে এই পরিসংখ্যান থেকে সরাসরি বলা যায় না যে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসা বা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে চলে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী বৃদ্ধির পেছনে নতুন ভর্তি, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন কিংবা এক শিক্ষাধারা থেকে অন্য ধারায় স্থানান্তরের ভূমিকা কতটা, তা জানতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী কমার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?
ব্যানবেইসের প্রতিবেদন শিক্ষার্থী কমার নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেনি। তবে শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাস মহামারির পর শিখনঘাটতি, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পরিবারের আর্থিক সংকট এবং পাঠ্যক্রমের প্রভাব শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে থাকতে পারে।
করোনাকালে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। কেউ কেউ শেখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে, আবার আর্থিক সংকটে থাকা কিছু পরিবারের শিশুদের কাজে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তবে এসব কারণ বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থী কমার ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিশ্চিত করতে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।
বাল্যবিবাহের বিষয়টিও উদ্বেগজনক। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ১ হাজার ৩৫০ জন পরীক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। সেই অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৫৪৯ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের ৯৭ শতাংশই ছাত্রী।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, অন্তত ওই পরীক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের অনুপস্থিতির সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক ছিল। তবে এই অনুসন্ধান দেশের সব শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। শিক্ষার্থীরা কেন স্কুল ছাড়ছে, কোন পর্যায়ে তাদের ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেশি এবং এর পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো কী—এসব বিষয় আরও বিস্তৃতভাবে যাচাই করা দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমানের মতে, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমার পেছনে মহামারিজনিত শিখনঘাটতি, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, শিশুশ্রম এবং পাঠ্যক্রমের প্রভাব থাকতে পারে। তবে এই প্রবণতা এবং অন্যান্য পরিসংখ্যানের পরিবর্তন বুঝতে গভীর গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণার ফলের ভিত্তিতেই কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
শিক্ষা পরিকল্পনায় নতুন করে ভাবার প্রয়োজন
মাধ্যমিক পর্যায়ে এক বছরে চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার তথ্যকে শুধু সংখ্যার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। শিক্ষার্থীরা স্কুলে ভর্তি হচ্ছে কি না, নিয়মিত ক্লাস করছে কি না, পড়াশোনা শেষ করছে কি না এবং কোনো শিক্ষাধারা থেকে অন্য ধারায় যাচ্ছে কি না—এসব বিষয় একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
একইভাবে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমার কারণ অনুসন্ধান এবং মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বৃদ্ধির প্রবণতা বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে শিক্ষার্থীদের পছন্দ, স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার চাহিদা এবং বিভিন্ন শিক্ষাধারার সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা, আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, শিখনঘাটতি পূরণ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের মতো উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। তবে কোন এলাকায় কোন ধরনের পদক্ষেপ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও গবেষণা জরুরি।
ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান তাই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে: প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় ধরে রাখা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই হতে পারে শিক্ষার্থীসংখ্যার পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ।
প্রথম শ্রেণিতে লটারি, দ্বিতীয় থেকে নবমে ভর্তি পরীক্ষা: বদলাচ্ছে স্কুলে ভর্তির নিয়ম
পরবর্তীদুর্গাপূজায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ছুটি, বিদ্যালয়ে টানা ১০ দিন বন্ধের সুযোগ
সম্পর্কিত সংবাদ
বাংলা শিক্ষা
‘গাইড বইওয়ালারা সাবধানে থাকবেন, এবার ধরা খাবেন’: শিক্ষামন্ত্রী

বাংলা শিক্ষা
নভেম্বরের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা তিন দিনের ছুটি

বাংলা শিক্ষা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ৩১ অক্টোবর, পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন ১ নভেম্বর থেকে
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন
বাংলা শিক্ষা
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ৮ ডিসেম্বর, চলবে চার দিন

বাংলা শিক্ষা
বিটিসির মাধ্যমে কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশনে নতুন নির্দেশনা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
