হেপাটাইটিস বি টিকা: ক্যান্সার প্রতিরোধের প্রথম টিকা
সংক্ষেপে: হেপাটাইটিস বি টিকা ছিল ইতিহাসের প্রথম টিকা যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে। এর গল্প শুরু হয় ১৯৬৫ সালে, যখন বারুচ ব্লামবার্গ নামের এক বিজ্ঞানী একটি রহস্যময় 'Australia Antigen' আবিষ্কার করেন। পরে দেখা যায় এটি আসলে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের পৃষ্ঠ প্রোটিন। ১৯৮২ সালে প্রথম টিকা লাইসেন্স পায়—যা তৈরি হতো সংক্রামিত মানুষের রক্তের প্লাজমা থেকে। ১৯৮৬ সালে আসে Yeast থেকে তৈরি রিকম্বিন্যান্ট টিকা, যা ছিল বিশ্বের প্রথম রিকম্বিন্যান্ট ভ্যাকসিন। আজ ১৯০টিরও বেশি দেশে নবজাতকদের এই টিকা দেওয়া হয়, এবং এটি লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধে একটি বৈপ্লবিক সাফল্য।
হেপাটাইটিস বি: নীরব ঘাতক
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (HBV) লিভারের সংক্রমণ ঘটায়। তীব্র সংক্রমণ কয়েক সপ্তাহের অসুস্থতা থেকে শুরু করে গুরুতর জটিলতা পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর হলো দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ। যারা শৈশবে আক্রান্ত হয়, তাদের প্রায় ৯০% দীর্ঘস্থায়ী বাহক হয়ে যায় । এই দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ বছরের পর বছর ধরে লিভারের ক্ষতি করে—যা সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সার-এ পরিণত হয় ।
বিশ্বে প্রায় ২৫০-৩৫০ মিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস বি-র দীর্ঘস্থায়ী বাহক। প্রতিবছর প্রায় ৯ লাখ মানুষ এই রোগে মারা যায়। সংক্রমণ ছড়ায় রক্ত, বীর্য বা সংক্রামিত তরল থেকে—জন্মের সময় মা থেকে শিশুর কাছে, শেয়ার করা সিরিঞ্জ, বা অরক্ষিত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ।
Australia Antigen: ভুল দিকে খুঁজে পাওয়া সোনা
১৯৬৫ সালে মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (NIH)-এর গবেষক বারুচ ব্লামবার্গ একটি অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী ব্যক্তির রক্তের সিরামে একটি অজানা অ্যান্টিজেন খুঁজে পান—যার নাম দেন "Australia Antigen" । তিনি মূলত জিনগত বৈচিত্র্য এবং রোগ সংবেদনশীলতা নিয়ে গবেষণা করছিলেন, হেপাটাইটিস নিয়ে নয়। অনেকেই তার কাজকে "বিজ্ঞান নয়, বরং ভ্রমণ" বলে উপহাস করতেন ।
কয়েক বছরের মধ্যে দেখা গেল, এই অ্যান্টিজেনটি আসলে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের পৃষ্ঠ প্রোটিন (HBsAg) । এটি ছিল বিশাল আবিষ্কার—কারণ এর মাধ্যমে রক্ত পরীক্ষা করে হেপাটাইটিস বি শনাক্ত করা সম্ভব হলো। ১৯৭২ সালের মধ্যে রক্তদানের স্ক্রিনিং শুরু হয়, যা ট্রান্সফিউশন-পরবর্তী হেপাটাইটিস বি dramatically কমিয়ে দেয় ।
ব্লামবার্গ ১৯৭৬ সালে এই আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পান ।
প্লাজমা-ভিত্তিক টিকা: রক্ত থেকে জীবনরক্ষক
Australia Antigen-এর হেপাটাইটিস বি-র সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর টিকা তৈরির পথ খুলে যায়। ধারণাটি ছিল চতুর: সংক্রামিত ব্যক্তির রক্তে ভাইরাসের পৃষ্ঠ প্রোটিন প্রচুর পরিমাণে থাকে। এই প্রোটিনকে পরিশোধিত করে যদি সুস্থ মানুষের শরীরে দেওয়া হয়, তাহলে তার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা HBsAg-এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে—এবং ভবিষ্যতে প্রকৃত ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে তাকে প্রতিহত করবে।
১৯৬৯ সালে আলফ্রেড প্রিন্স এবং তার সহকর্মীরা এই পদ্ধতির পেটেন্ট আবেদন করেন । কিন্তু ভাইরোলজিস্ট এবং ভ্যাকসিন নির্মাতারা—যারা তখন অ্যাটেনুয়েটেড বা নিহত ভাইরাস দিয়ে টিকা বানাতে অভ্যস্ত—এই নতুন ধারণা মেনে নিতে দ্বিধা করছিলেন ।
মরিস হিলম্যান (যিনি MMR টিকাও তৈরি করেছিলেন)—মার্ক ইনস্টিটিউটে হেপাটাইটিস বি টিকার কাজ শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে প্রথম ১১ জন স্বেচ্ছাসেবকের ওপর টিকা পরীক্ষা করা হয় । ফলাফল নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হয়। এরপর নিউ ইয়র্ক সিটিতে উলফ সিজমুনেস-এর নেতৃত্বে একটি বড় ফিল্ড ট্রায়াল চালানো হয়, যেখানে টিকা ৯০%-এর বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয় ।
১৯৮২ সালে প্রথম হেপাটাইটিস বি টিকা লাইসেন্স পায় । এটি ছিল বিশ্বের প্রথম সাবইউনিট ভাইরাল ভ্যাকসিন এবং প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্যান্সার প্রতিরোধী টিকা ।
সমস্যা ও ঝুঁকি
প্লাজমা-ভিত্তিক টিকার কিছু অসুবিধা ছিল:
সংক্রামিত রক্ত থেকে তৈরি হওয়ায় অন্যান্য ভাইরাস (যেমন ডেল্টা এজেন্ট) সংক্রমণের ঝুঁকি
উৎপাদন খরচ বেশি
তবে purification এবং inactivation প্রক্রিয়া এত কঠোর ছিল যে ১৯৮০-র দশকে HIV আবিষ্কারের পরও এই টিকা নিরাপদ প্রমাণিত হয় ।
Yeast-ভিত্তিক রিকম্বিন্যান্ট টিকা: ১৯৮৬ সালের বিপ্লব
প্লাজমা-ভিত্তিক টিকার সীমাবদ্ধতা কাটাতে বিজ্ঞানীরা জিনগত প্রকৌশলের দিকে মনোনিবেশ করেন। ধারণাটি ছিল: হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের পৃষ্ঠ প্রোটিন তৈরি করার জিনটি ইস্ট (Yeast) কোষে প্রবেশ করানো হবে, এবং ইস্ট কোষটি সেই প্রোটিন উৎপাদন করবে।
১৯৮৬ সালে রিকম্বিন্যান্ট হেপাটাইটিস বি টিকা লাইসেন্স পায়—এটি ছিল বিশ্বের প্রথম রিকম্বিন্যান্ট-এক্সপ্রেসড ভ্যাকসিন । এই টিকার সুবিধা:
সংক্রামিত মানুষের রক্তের প্রয়োজন নেই—কোনো সংক্রমণের ঝুঁকি নেই
বিশাল পরিমাণে উৎপাদন সম্ভব
কম খরচে উৎপাদনযোগ্য
আজ প্রায় সব হেপাটাইটিস বি টিকাই রিকম্বিন্যান্ট প্রযুক্তিতে তৈরি ।
টিকা দেওয়ার সময়সূচি: জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে
হেপাটাইটিস বি টিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জন্ম ডোজ। WHO সুপারিশ করে, নবজাতককে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম ডোজ দিতে হবে । কারণ:
মা থেকে শিশুর সংক্রমণ (perinatal transmission) হেপাটাইটিস বি-র প্রধান উৎস
জন্মের সময় সংক্রামিত নবজাতকের প্রায় ৯০% দীর্ঘস্থায়ী বাহক হয়ে যায়
জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা দিলে এই সংক্রমণ ৮০%-এর বেশি প্রতিরোধ করা যায়
জন্ম ডোজের পর আরও ২-৩টি ডোজ দেওয়া হয়, সাধারণত DTP (ডিপথেরিয়া-টিটেনাস-পারটুসিস) টিকার সঙ্গে মিলিয়ে । টিকার তিন ডোজ সিরিজ ৯৫%-এর বেশি শিশুর মধ্যে অনাক্রম্যতা তৈরি করে, যা কমপক্ষে ২০ বছর—সম্ভবত আজীবন—স্থায়ী হয় ।
বৈশ্বিক সাফল্য: তাইওয়ান থেকে আলাস্কা
হেপাটাইটিস বি টিকা কার্যকারিতার কয়েকটি উজ্জ্বল উদাহরণ:
তাইওয়ান: ১৯৮৪ সালে নবজাতক টিকাদান শুরু। ১-২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে HBV বাহক হার ১০.৭% থেকে ১.৫%-এ নেমে আসে (১৯৮৯) ।
আলাস্কার নেটিভ আমেরিকান: ১৯৮১-১৯৮৩ সালের টিকাদান কর্মসূচির পর তীব্র হেপাটাইটিস বি ২১৫ কেস/১০০,০০০ থেকে ৭-১৪ কেসে নেমে আসে (১৯৯৩)। ১৯৯৫ সালে শূন্য কেস ।
ইতালির আফ্রাগোলা: টিকাদান শুরুর পাঁচ বছর পর, ৫-১০ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে HBsAg হার ১১.৯% থেকে ১.৬%-এ নেমে আসে ।
মঙ্গোলিয়া: ১৯৯১ সালে ক্যাচ-আপ কর্মসূচিতে ৪০% HBV বাহক হার থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১.৩%-এ নেমে আসে—প্রায় ৩০ গুণ হ্রাস।
বিশ্বব্যাপী, ১৯৮২ সালের পর ১০০ কোটিরও বেশি ডোজ টিকা ব্যবহৃত হয়েছে । যেসব দেশে আগে ৮-১৫% শিশু দীর্ঘস্থায়ী বাহক হয়ে যেত, সেখানে টিকাদান সেই হার ১%-এর নিচে নামিয়ে এনেছে ।
ভবিষ্যৎ: আরও ভালো টিকার খোঁজে
বর্তমান টিকা অত্যন্ত কার্যকর হলেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:
মায়ের ভাইরাল লোড অত্যন্ত বেশি হলে টিকা ব্যর্থ হতে পারে
ইমিউনো-কম্প্রোমাইজড ব্যক্তি, বয়স্ক, ধূমপায়ী বা স্থূলকায় ব্যক্তিরা ভালো অ্যান্টিবডি সাড়া নাও দিতে পারেন
টিকা স্ট্রেইন (adw2) ভিন্ন উপপ্রকারের বিরুদ্ধে কম কার্যকর হতে পারে
গবেষকরা এখন নতুন প্রজন্মের টিকা নিয়ে কাজ করছেন, যা preS ডোমেইন অন্তর্ভুক্ত করবে—যা更强的 T ও B সেল সাড়া তৈরি করবে । ম্যামালিয়ান কোষ কালচারে HBsAg উৎপাদন করলে নিউট্রালাইজিং এপিটোপের ভাঁজ (folding) উন্নত হবে। আঞ্চলিকভাবে প্রচলিত HBsAg সাবটাইপ ব্যবহার করলে সুরক্ষা বাড়বে ।
একটি টিকা, একটি ক্যান্সার প্রতিরোধ
হেপাটাইটিস বি টিকার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো—এটি লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধের প্রথম টিকা । দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ। তাই এই টিকা শুধু একটি সংক্রামক রোগ নয়, বরং একটি মারাত্মক ক্যান্সার প্রতিরোধের হাতিয়ার।
বারুচ ব্লামবার্গ তার নোবেল বক্তৃতায় বলেছিলেন, এই আবিষ্কার ছিল "ভাগ্যের খোঁজে বিজ্ঞানীর অটল অধ্যবসায়ের ফল" । তিনি যা খুঁজছিলেন না, তা-ই তাকে নোবেল এনে দেয়—এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচায়।
আজও বিশ্বের অনেক দেশে নবজাতকদের প্রথম টিকা হিসেবে হেপাটাইটিস বি দেওয়া হয়—জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। কারণ একটি টিকার ডোজ একটি শিশুর লিভার, তার ভবিষ্যৎ এবং তার জীবন রক্ষা করতে পারে।
MMR টিকা: তিনটি আলাদা রোগ, একটি সম্মিলিত ঢাল—এল কীভাবে?
পরবর্তীHPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা
সম্পর্কিত সংবাদ

বিজ্ঞান বার্তা
গুটিবসন্তের টিকা: কীভাবে একটি গোয়ালার গল্প বিশ্বকে বদলে দিল

বিজ্ঞান বার্তা
বিসিজি (BCG) টিকা: ১০০ বছরের পুরোনো সেই টিকা, যা এখনও যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রধান ঢাল
বিজ্ঞান বার্তা
টিটেনাস টক্সয়েড টিকা: একটি বিষ থেকে জন্ম নেওয়া সুরক্ষা

বিজ্ঞান বার্তা
ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন: একটি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টিকার গল্প
বিজ্ঞান বার্তা
রেবিজ ও অ্যানথ্রাক্স টিকা: লুই পাস্তুরের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার
বিজ্ঞান বার্তা
HPV ভ্যাকসিন: ক্যান্সার প্রতিরোধের এক বৈপ্লবিক টিকা
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
