'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' (২০০৬): একটি সিনেমা, যা শেখায় হাল ছাড়া যাবে না
Editorial Team২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ২:০০ PM২ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন সবকিছু অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। পরীক্ষায় খারাপ ফল, পরিবারের চাপ, আর্থিক সমস্যা, আর সেই সাথে নিজের ওপর সন্দেহ। এই সময়ে অনেকেই ভাবে, হয়তো আমি পারব না, হয়তো আমার জন্য এটা না। গ্যাব্রিয়েল মুচিনো পরিচালিত 'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' (২০০৬) ঠিক এই জায়গা থেকে শুরু হয়, আর দেখায়—যদি হাল না ছাড়া যায়, তাহলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
সিনেমাটি সত্যি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বানানো, ক্রিস গার্ডনারের জীবনের গল্প। ক্রিস গার্ডনারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন উইল স্মিথ, আর তার ছেলে ক্রিস্টোফারের ভূমিকায় অভিনয় করেছে উইল স্মিথের নিজের ছেলে জেডেন স্মিথ। সিনেমার ঘটনা ঘটে ১৯৮১ সালের সান ফ্রান্সিসকোতে, যখন ক্রিস একজন বিক্রয়কর্মী, যে বোন ডেনসিটি স্ক্যানার বিক্রি করে, কিন্তু তার বিক্রি এত কম যে পরিবার চালানোই মুশকিল হয়ে পড়ে।
যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে
ক্রিসের স্ত্রী লিন্ডা দিন-রাত কাজ করে, তবু সংসার চলে না। শেষে সে ক্রিস আর ছেলেকে ছেড়ে চলে যায়। ক্রিস একা ছেলেকে নিয়ে থাকে, কিন্তু তার হাতে টাকা নেই, বাড়ি ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য নেই। একদিন সে আর তার ছেলে বাস স্টেশনে রাত কাটায়, একদিন মোটেলের বাথরুমে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে, আর একদিন চার্চের শেল্টারে লাইনে দাঁড়ায়। এই দৃশ্যগুলো সিনেমার সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত, কারণ এগুলো কোনো কল্পনা না, বাস্তব।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই অংশটি জরুরি, কারণ এটি দেখায়—জীবনে সবকিছু হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান আর নিজের সন্তানের প্রতি দায়িত্ব হারানো যায় না। ক্রিস কখনও নিজের ছেলেকে বলে না যে তারা অভাবী, সে কখনও ছেলের সামনে ভেঙে পড়ে না। সে ছেলেকে বলে, "আমরা ঠিক আছি।" এই সাহসটাই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ইন্টার্নশিপের সুযোগ: একটি সিদ্ধান্ত, একটি জীবনের মোড়
একদিন ক্রিস একটি লাক্সারি গাড়ি দেখে থেমে যায়, আর সেই গাড়ির মালিকের সাথে কথা বলে জানতে পারে সে ডিন উইটার রেনল্ডস নামের একটি ব্রোকারেজ firm এ কাজ করে। ক্রিস সিদ্ধান্ত নেয় সে এই ফার্মে ইন্টার্নশিপ করবে। কিন্তু সমস্যা হলো, ইন্টার্নশিপের জন্য কোনো বেতন নেই, আর প্রতিযোগিতা এত কঠিন যে বিশজনের মধ্যে মাত্র একজনকে চাকরি দেওয়া হবে।
ক্রিস তবুও চেষ্টা করে। সে দিনের বেলা ইন্টার্নশিপ করে, আর সন্ধ্যায় বোন ডেনসিটি স্ক্যানার বিক্রি করে ছেলের খাবার জোগাড় করে। সে কখনও হাল ছাড়ে না, কখনও নিজের ওপর বিশ্বাস হারায় না। এই লড়াইটা শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা—সুযোগ সব সময় সহজ হয় না, কিন্তু সুযোগ এলে তাকে ধরার সাহস থাকতে হয়।
ছেলে ক্রিস্টোফার: দায়িত্বের আয়না
সিনেমার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক হলো ক্রিস আর তার ছেলে ক্রিস্টোফারের সম্পর্ক। ক্রিস্টোফার ছোট, কিন্তু সে বাবার কষ্ট বোঝে। সে কখনও অভিযোগ করে না, কখনও কাঁদে না। একদিন ক্রিস তাকে বেসবল কোর্টে নিয়ে যায়, আর সেখানে ক্রিস্টোফার একটি বেসবল গ্লাভস হারায়, যা তার কাছে খুব প্রিয় ছিল। ক্রিস তখন বলে, "তুমি যদি কিছু চাও, তাহলে নিজে যাও আর সেটা নিয়ে আসো। কেউ তোমার জন্য কিছু করে দেবে না।"
এই কথাটি সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী সংলাপ, যা শেখায়—নিজের ভাগ্য নিজেকেই গড়তে হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা অমূল্য। কেউ যদি নিজের পড়াশোনা, নিজের ক্যারিয়ার, নিজের স্বপ্নের দায়িত্ব নিজে না নেয়, তাহলে কেউ এসে সেটা করে দেবে না।
'হ্যাপিনেস' শব্দটির আসল অর্থ
সিনেমার শিরোনামে 'হ্যাপিনেস' শব্দটি ভুল বানানে লেখা—'Happyness'। এই ভুল বানানটি সিনেমার মধ্যে একটি দেয়ালে লেখা দেখা যায়, যেখানে ক্রিসের ছেলে একটি ডে-কেয়ার সেন্টারে যায়। ক্রিস ছেলেকে বলে, "এটা 'হ্যাপিনেস' নয়, এটা 'হ্যাপিনেস'—তুমি জানো কেন? কারণ এটা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।"
এই ছোট দৃশ্যটি সিনেমার পুরো দর্শন তুলে ধরে। সুখ কোনো গন্তব্য না, সুখ একটি যাত্রা। সুখ কোথাও পড়ে থাকে না, সুখ নিজেকেই খুঁজে বের করতে হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, জীবনে সাফল্য আসবে, ব্যর্থতাও আসবে, কিন্তু সুখ খোঁজার প্রক্রিয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সেই দৃশ্য: চাকরি পাওয়ার মুহূর্ত
সিনেমার সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্য হলো শেষের দিকে, যখন ক্রিসকে চাকরি দেওয়া হয়। সে অফিস থেকে বেরিয়ে আসে, চোখে পানি, হাততালি দেয়, আর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নিজের ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। এই দৃশ্যটি এত শক্তিশালী কারণ এটি কোনো নাটকীয়তার জন্য বানানো না, এটি সত্যিকারের কষ্টের পর আসা সত্যিকারের আনন্দ।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই দৃশ্যটি মনে রাখা জরুরি। যখন পড়াশোনায় ব্যর্থতা আসে, যখন পরীক্ষায় খারাপ ফল আসে, তখন মনে রাখতে হবে—এটা শেষ না। যদি হাল না ছাড়া যায়, যদি প্রতিদিন চেষ্টা করা যায়, তাহলে একদিন সেই মুহূর্ত আসবেই, যখন সব কষ্ট অর্থবহ হয়ে উঠবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই সিনেমা জরুরি
'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি কোনো সহজ সাফল্যের গল্প বলে না, এটি কঠিন পরিশ্রমের গল্প বলে। ক্রিস গার্ডনার কোনো বিশেষ মেধাবী ছিলেন না, তিনি কোনো ধনী পরিবারের সন্তানও ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ, যিনি হাল ছাড়েননি।
এই সিনেমা আরও শেখায়, টাকা, বাড়ি, গাড়ি—এই সব হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু নিজের মূল্যবোধ, নিজের পরিশ্রম, আর নিজের সন্তানের প্রতি দায়িত্ব কেউ কেড়ে নিতে পারে না। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, জীবনে যা কিছু হারাবে, তা ফিরে আসবে, যদি নিজের ওপর বিশ্বাস থাকে।
এই সিনেমা আরেকটি জরুরি শিক্ষা দেয়—অন্যের সহানুভূতির অপেক্ষা না করে নিজের পথ নিজে তৈরি করা। ক্রিস কারো কাছে হাত পাতেনি, সে নিজের শর্তে নিজের যুদ্ধ লড়েছে। এই মনোভাবটাই একজন শিক্ষার্থীকে তার ক্যারিয়ারে সফল করে তুলতে পারে।
শেষ কথা
'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি একটি প্রেরণা। এটি শেখায়, জীবন কঠিন, কিন্তু হাল ছাড়া যাবে না। ছুটির দিনে বা পড়াশোনার ফাঁকে এই সিনেমাটা দেখলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের কষ্টকে নতুনভাবে দেখতে পারবে, নিজের ওপর আস্থা রাখতে পারবে। কারণ কেউ যদি রাস্তায় ছেলেকে নিয়ে ঘুমিয়ে থেকেও স্বপ্ন দেখতে পারে, তাহলে যে কেউ নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে পারে, যত কঠিনই হোক পথ।
পূর্ববর্তী
'বয়হুড': একটি সিনেমা, যা বারো বছরে তৈরি
পরবর্তী'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' (২০১২): একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের গল্প বলার সাহস
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
'হুইপল্যাশ' (২০১৪) : সাফল্যের আসল দাম
খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' (২০১২): একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের গল্প বলার সাহস

খেলাধুলা ও বিনোদন
'বয়হুড': একটি সিনেমা, যা বারো বছরে তৈরি
খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক' (২০১০) : সাফল্যের পেছনের অন্ধকার দিক

খেলাধুলা ও বিনোদন
Dead Poets Society (1989) : একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের মতো করে বাঁচতে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'লেডি বার্ড' (২০১৭) : একটি সিনেমা, যা পালিয়ে যাওয়ার গল্প বলে, আবার ফিরে তাকানোর গল্পও বলে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
