'বয়হুড': একটি সিনেমা, যা বারো বছরে তৈরি
Editorial Team২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১:০০ PM২ ভিউ৫ মিনিট পড়া
শেয়ার:

প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন মনে হয় সময় খুব ধীরে যায়। পরীক্ষা বিরক্তিকর, বড় হওয়ার অপেক্ষা অসহ্য। কিন্তু একদিন হঠাৎ ফিরে তাকিয়ে দেখা যায়, সেই কঠিন দিনগুলো, সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো, সবকিছু কত দ্রুত ফুরিয়ে গেছে। রিচার্ড লিংকলেটার পরিচালিত 'বয়হুড' (২০১৪) ঠিক এই অনুভূতিটাই পর্দায় তুলে ধরে। এর কোনো নাটকীয় নেই, কোনো অতিরিক্ত আবেগের সংগীত নেই, শুধু একটি ছেলের ছয় বছর বয়স থেকে আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত বারো বছরের জীবন নিঃশব্দে ধারণ করা হয়েছে।
এই সিনেমার সবচেয়ে বিশেষ বিষয় হলো, এটি সত্যিই বারো বছর ধরে চিত্রায়িত হয়েছে। ২০০২ সাল থেকে শুরু করে, পরিচালক প্রতি বছর মাত্র কয়েকদিন শুটিং করেছেন, একই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে। এর মধ্যে আছেন প্রধান চরিত্র মেসনের ভূমিকায় এলার কোলট্রান, মায়ের ভূমিকায় প্যাট্রিসিয়া আর্কেট, বাবার ভূমিকায় ইথান হক, আর বোন সামান্থার ভূমিকায় পরিচালকের নিজের মেয়ে লরেলাই লিংকলেটার। দর্শক পর্দায় শুধু চরিত্রের পরিবর্তন দেখেন না, অভিনেতাদের নিজেদের বাস্তব পরিবর্তনও দেখেন—মেসন একটি গোলগাল মুখের ছোট ছেলে থেকে লম্বা, দাড়িওয়ালা কিশোর হয়ে ওঠে।
কোনো বড় ঘটনা নেই, তবুও এটাই সবচেয়ে বাস্তব জীবন
এই সিনেমার সবচেয়ে ভিন্নধর্মী দিক হলো, এটি কখনও বলে না 'মূল ঘটনা কী'। সাধারণ হলিউড সিনেমা বলে, জীবনে কয়েকটা বড় মুহূর্ত থাকে—গ্র্যাজুয়েশন, প্রথম প্রেম, বিয়ে, মৃত্যু। কিন্তু 'বয়হুড' এটা করে না। এটি ডিভোর্স, বাড়ি বদল, মদ্যপান, ঝগড়া—এই সব ঘটনাকে এত সাধারণভাবে দেখায়, যেন এগুলো জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কারণ বাস্তব জীবনে এগুলো ঠিক এভাবেই ঘটে—এগুলো আসার সময় আপনি প্রস্তুত থাকেন না, চলে যাওয়ার পর আপনি বুঝতে পারেন আপনি বদলে গেছেন।
মেসনের বাবা-মা ডিভোর্স হয়ে যায়, মা পড়াশোনার জন্য দুই সন্তানকে নিয়ে হিউস্টনে চলে যান, পরে একজন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপককে বিয়ে করেন, যিনি পরে মদ্যপ ও হিংস্র হয়ে ওঠেন। মা সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে আসেন, আবার নতুন করে শুরু করেন। বাবা একজন অসংগঠিত কিন্তু আকর্ষণীয় মানুষ, যিনি মাঝে মাঝে আসেন, সন্তানদের ক্যাম্পিংয়ে নিয়ে যান, গান শোনান, জীবন নিয়ে কথা বলেন, তারপর আবার হারিয়ে যান। এই ঘটনাগুলো অন্য সিনেমায় আধা ঘণ্টার দৃশ্য হতে পারত, কিন্তু এখানে এগুলো জীবনের অংশ, যেভাবে বাস্তবে ঘটে।
মেসন: একজন সাধারণ ছেলের অসাধারণ যাত্রা
মেসন কোনো বিশেষ প্রতিভার ছেলে না, কোনো অসাধারণ ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুও না। সে একজন সাধারণ ছেলে, যে ফটোগ্রাফি ভালোবাসে, মাঝে মাঝে উদাসীন, মাঝে মাঝে রাগী, নিজের পরিচয় খুঁজে বেড়ায়। এই সাধারণত্বই তাকে অসাধারণ করে তোলে, কারণ প্রতিটি শিক্ষার্থী মেসনের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায়।
মেসনের স্কুলজীবন, তার প্রথম প্রেম, তার বন্ধুত্ব, তার বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক—সবকিছু এত স্বাভাবিকভাবে দেখানো হয়েছে যে মনে হয় এটি কোনো সিনেমা নয়, এটি কারো বাস্তব জীবন। মেসন যখন স্কুলে বুলির শিকার হয়, যখন তার মা তৃতীয়বার বিয়ে করেন, যখন সে নিজের ছবি তোলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে—এই প্রতিটি ধাপ শিক্ষার্থীদের নিজেদের জীবনের ধাপের মতো।
মা আর বাবা: দুই ধরনের অভিভাবকত্ব
প্যাট্রিসিয়া আর্কেট অভিনীত মা চরিত্রটি সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। তিনি একজন একক মা, যিনি দুই সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে নিজের পড়াশোনা, নিজের ক্যারিয়ার, আর নিজের সম্পর্ক—সবকিছু ত্যাগ করেন। সিনেমার শেষে মেসন যখন কলেজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়, তখন মা কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, "আমি ভেবেছিলাম জীবনে আরও অনেক কিছু থাকবে, কিন্তু এখন দেখছি সব ফুরিয়ে গেছে—শুধু আমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বাকি।"
এই কথাটি সিনেমার সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত, কারণ এটি দেখায়—সন্তান বড় হলে বাবা-মায়ের জীবনে কী শূন্যতা থেকে যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো, বাবা-মায়ের ত্যাগ কখনও কখনও তাদের নিজের স্বপ্নের বিনিময়ে আসে, আর সেই ত্যাগ চিনতে পারাটাই বড় হওয়ার অংশ।
অন্যদিকে ইথান হক অভিনীত বাবা চরিত্রটি দেখায় আরেক ধরনের অভিভাবকত্ব। তিনি ত্রুটিপূর্ণ, তিনি প্রায়ই অনুপস্থিত, কিন্তু তিনি সন্তানদের শেখান কীভাবে ভাবতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়। মেসনকে তিনি বলেন, "তোমার জীবন তোমার, তুমি নিজের সিদ্ধান্ত নেবে।" এই দুই ধরনের অভিভাবকত্বের তুলনা শিক্ষার্থীদের শেখায়—প্রতিটি পরিবার আলাদা, প্রতিটি অভিভাবক আলাদা, কিন্তু ভালোবাসা বিভিন্ন রূপে আসে।
সময়, স্মৃতি আর পরিবর্তন: সিনেমার দর্শন
'বয়হুড' মূলত সময় নিয়ে একটি চিন্তা। এটি দেখায়, সময় কারো জন্য থামে না। মেসন ছোট থেকে বড় হয়, বাবা-মা বয়স বাড়ে, পরিবেশ বদলায়, সম্পর্ক বদলায়। সিনেমার একটি দৃশ্যে মেসন আর তার বান্ধবী কলেজে যাওয়ার পথে গাড়িতে বসে থাকে, আর মেসন বলে, "আমি জানি না কেন, কিন্তু আমি সবসময় ভাবি, মুহূর্তটা কীভাবে ধরে রাখব।" উত্তরে বান্ধবী বলে, "মুহূর্ত ধরে রাখা যায় না, মুহূর্ত তোমাকে ধরে রাখে।"
এই সংলাপটাই সিনেমার সারমর্ম। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—নিজের বর্তমান মুহূর্তকে উপভোগ করা, কারণ এই মুহূর্ত আর ফিরে আসবে না। আজকের স্কুলের দিন, আজকের বন্ধুদের সাথে আড্ডা, আজকের ছোট ছোট আনন্দ—এগুলোই একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই সিনেমা জরুরি
'বয়হুড' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি তাদের নিজের জীবনের গল্প। এটি দেখায়, বড় হওয়া মানে শুধু বয়স বাড়ানো না, বড় হওয়া মানে বোঝা, গ্রহণ করা, আর নিজের পথ খুঁজে নেওয়া। এই সিনেমায় কোনো বীরত্ব নেই, কোনো বড় সাফল্য নেই, শুধু একটি সাধারণ ছেলের সাধারণ জীবন—আর সেই সাধারণ জীবনের মধ্যে অসাধারণ সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।
এই সিনেমা শিক্ষার্থীদের আরও শেখায়, জীবন মানে পরীক্ষার নম্বর বা ভবিষ্যতের চাকরি না, জীবন মানে প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্ত—একটা নতুন গান শোনা, একটা নতুন বন্ধু পাওয়া, একটা নতুন জায়গা দেখা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই সিনেমা শেখায়—নিজের পরিবারকে মূল্য দিতে, কারণ একদিন হয়তো সেই পরিবার আর একসাথে থাকবে না।
শেষ কথা
'বয়হুড' শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি একটি আয়না। এটি শিক্ষার্থীদের শেখায়, জীবন ধীরে চলে, কিন্তু একদিন হঠাৎ ফিরে তাকিয়ে দেখা যায়—সবকিছু বদলে গেছে। ছুটির দিনে বা পড়াশোনার ফাঁকে এই সিনেমাটা দেখলে শিক্ষার্থীরা নিজের শৈশব, নিজের পরিবার, আর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারবে। কারণ কিছু সিনেমা গল্প বলে, আর কিছু সিনেমা জীবন দেখায়। 'বয়হুড' সেই ধরনের একটি সিনেমা।
পূর্ববর্তী
'দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক' (২০১০) : সাফল্যের পেছনের অন্ধকার দিক
পরবর্তী'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' (২০০৬): একটি সিনেমা, যা শেখায় হাল ছাড়া যাবে না
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
'হুইপল্যাশ' (২০১৪) : সাফল্যের আসল দাম
খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' (২০১২): একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের গল্প বলার সাহস

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' (২০০৬): একটি সিনেমা, যা শেখায় হাল ছাড়া যাবে না
খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক' (২০১০) : সাফল্যের পেছনের অন্ধকার দিক

খেলাধুলা ও বিনোদন
Dead Poets Society (1989) : একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের মতো করে বাঁচতে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'লেডি বার্ড' (২০১৭) : একটি সিনেমা, যা পালিয়ে যাওয়ার গল্প বলে, আবার ফিরে তাকানোর গল্পও বলে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
