'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' (২০১২): একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের গল্প বলার সাহস
Editorial Team২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৩:০০ PM২ ভিউ৪ মিনিট পড়া
শেয়ার:
প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে এমন কিছু গল্প থাকে, যা সে কাউকে বলে না। কিছু আঘাত, কিছু স্মৃতি, কিছু ভয়—যা সে নিজের ভেতরে চেপে রাখে। স্টিফেন চবোস্কি পরিচালিত 'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' (২০১২) ঠিক সেই গল্পগুলোর কথা বলে। এটি সেই সব শিক্ষার্থীর গল্প, যারা নিজেদের ভেতরে একটা যুদ্ধ লড়ছে, কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না। সিনেমাটি চবোস্কির নিজের ১৯৯৯ সালের উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে বানানো, এবং তিনি নিজেই চিত্রনাট্য লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন—যা এই সিনেমাকে বইয়ের প্রতি বিশ্বস্ত করে তুলেছে।
সিনেমার প্রধান চরিত্র চার্লি, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন লোগান লারম্যান। সে একজন ১৫ বছরের অন্তর্মুখী ছেলে, যে হাই স্কুলে ভর্তি হয়। তার বন্ধু মাইকেল গত মে মাসে আত্মহত্যা করেছে, তার প্রিয় খালা হেলেন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, আর তার ভেতরে এক ধরনের বিষণ্নতা কাজ করছে। প্রথম দিন থেকে সে একা, কারো সাথে কথা বলার সাহস পায় না। কিন্তু একদিন ফুটবল খেলায় সে প্যাট্রিককে (এজরা মিলার) দেখে, যিনি স্কুলের সিনিয়র, খোলাখুলি গে, আর সবাই তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে। চার্লি তার পাশে বসে, আর সেই এক বসাতেই তার জীবন বদলে যায়।
প্যাট্রিক আর স্যাম: নতুন পরিবার
প্যাট্রিক চার্লিকে তার বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, যাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্যাম (এমা ওয়াটসন), প্যাট্রিকের সৎ বোন। স্যাম সুন্দরী, স্বাধীনচেতা, আর তার নিজেরও কিছু কষ্টের গল্প আছে। স্যাম আর প্যাট্রিক মিলে চার্লিকে তাদের দলে নিয়ে আসে, তাকে পার্টিতে নিয়ে যায়, গান শোনায়, বই পড়তে দেয়।
এই বন্ধুত্বটাই সিনেমার প্রাণ। চার্লি প্রথমবারের মতো অনুভব করে, সে একা না। তার কথা কেউ শোনে, তার উপস্থিতি কেউ অনুভব করে। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা অমূল্য—কলেজে বা স্কুলে হয়তো প্রথমে একা লাগবে, কিন্তু সঠিক মানুষগুলো একদিন আসবেই। আর সেই মানুষগুলোই একদিন পরিবারের মতো হয়ে যাবে।
সিনেমার একটি দৃশ্যে চার্লি, স্যাম আর প্যাট্রিক একসাথে গাড়িতে বসে ডেভিড বোয়ের 'হিরোস' গান শোনে, আর স্যাম ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বাতাস উপভোগ করে। এই দৃশ্যটি সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত, যা দেখায়—তরুণ বয়সের আনন্দ মানে বড় কিছু না, শুধু সঠিক মানুষের সাথে ছোট ছোট মুহূর্ত।
ট্রমা আর গোপন সত্য: চার্লির আসল যুদ্ধ
সিনেমাটি যত এগিয়ে চলে, তত বোঝা যায় চার্লির সমস্যা শুধু লাজুকতা না। তার খালা হেলেনের সাথে তার সম্পর্ক ছিল জটিল। খালা তাকে ছোটবেলায় যৌন নির্যাতন করেছিলেন, আর সেই স্মৃতি চার্লির অবচেতনে লুকিয়ে ছিল। সিনেমার শেষ অংশে, যখন স্যাম তাকে স্পর্শ করে, তখন সেই স্মৃতি ফিরে আসে, আর চার্লি ভেঙে পড়ে। সে তার বোনকে ফোন করে বলে, খালার মৃত্যুর জন্য সে দায়ী, হয়তো সে চেয়েছিল খালা মারা যাক।
এই অংশটি শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন, কিন্তু জরুরি। অনেক শিক্ষার্থী নিজের কষ্ট চেপে রাখে, ভাবে সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু আঘাত চেপে রাখলে সেগুলো আরও গভীরে যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য এই সিনেমার শিক্ষা হলো—নিজের কষ্ট নিয়ে কথা বলা দুর্বলতা না, সাহস। আর যদি কখনও মনে হয় সব শেষ, তাহলে মনে রাখতে হবে চার্লির মতো, সাহায্য চাওয়া যায়, আর সাহায্য আসেও।
সেই বিখ্যাত দৃশ্য: টানেলের ভেতর দিয়ে 'হিরোস'
সিনেমার সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্য হলো টানেলের দৃশ্য। স্যাম গাড়ির পেছনে দাঁড়ায়, প্যাট্রিক গাড়ি চালায়, আর ডেভিড বোয়ের 'হিরোস' গান বাজতে থাকে। চার্লি পেছনে বসে স্যামকে দেখে, আর তার মনে হয়—এই মুহূর্তটা অসীম। এই দৃশ্যটি সিনেমার সৌন্দর্য, সিনেমার যন্ত্রণা, আর সিনেমার আশা—সবকিছু একসাথে ধরে রাখে।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই দৃশ্যটি শেখায়—জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কখনও ফিরে আসে না। কিন্তু সেই মুহূর্তগুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। কলেজ জীবনে হয়তো অনেক কঠিন সময় আসবে, কিন্তু সঠিক বন্ধুদের সাথে, সঠিক গানের সাথে, সেই কঠিন সময়ও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এই সিনেমা জরুরি
'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কারণ এটি দেখায়—প্রত্যেকের ভেতরে একটা গল্প আছে, যা সে কাউকে বলে না। চার্লির গল্প, স্যামের গল্প, প্যাট্রিকের গল্প—সবাই নিজের মতো করে কষ্ট বহন করে। কিন্তু সেই কষ্ট একা বহন করতে হয় না। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, আর সাহস—এই তিনটাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
সিনেমাটি আরও শেখায়, কেউ যদি অন্তর্মুখী হয়, লাজুক হয়, একা থাকে—সে দুর্বল না। চার্লি প্রথমে দুর্বল মনে হলেও, শেষে সে তার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ জিতেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষা হলো—নিজের সম্পর্কে অন্যের মতামতকে নিজের পরিচয় হতে দিও না। নিজের গতি, নিজের সময়, নিজের মতো করে এগিয়ে যাও।
শেষ কথা
'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' শুধু একটি টিনএজ সিনেমা নয়, এটি একটি সাহসের সিনেমা। এটি শেখায়—নিজের গল্প বলতে পারা, নিজের কষ্ট স্বীকার করতে পারা, আর সাহায্য চাইতে পারা—এগুলোই বড় হওয়ার আসল লক্ষণ। ছুটির দিনে বা পড়াশোনার ফাঁকে এই সিনেমাটা দেখলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভেতরের চার্লিকে চিনতে পারবে, আর বুঝবে—একা লাগা মানে একা হওয়া না।
কারণ কিছু সিনেমা বড় হওয়ার গল্প বলে, আর কিছু সিনেমা বড় হতে শেখায়। 'দ্য পার্কস অব বিং আ ওয়ালফ্লাওয়ার' সেই ধরনের একটি সিনেমা, যা দেখার পরও অনেকদিন মনে থেকে যায়।
পূর্ববর্তী
'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' (২০০৬): একটি সিনেমা, যা শেখায় হাল ছাড়া যাবে না
পরবর্তী'হুইপল্যাশ' (২০১৪) : সাফল্যের আসল দাম
সম্পর্কিত সংবাদ

খেলাধুলা ও বিনোদন
'হুইপল্যাশ' (২০১৪) : সাফল্যের আসল দাম

খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য পার্সুইট অব হ্যাপিনেস' (২০০৬): একটি সিনেমা, যা শেখায় হাল ছাড়া যাবে না

খেলাধুলা ও বিনোদন
'বয়হুড': একটি সিনেমা, যা বারো বছরে তৈরি
খেলাধুলা ও বিনোদন
'দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক' (২০১০) : সাফল্যের পেছনের অন্ধকার দিক

খেলাধুলা ও বিনোদন
Dead Poets Society (1989) : একটি সিনেমা, যা শেখায় নিজের মতো করে বাঁচতে

খেলাধুলা ও বিনোদন
'লেডি বার্ড' (২০১৭) : একটি সিনেমা, যা পালিয়ে যাওয়ার গল্প বলে, আবার ফিরে তাকানোর গল্পও বলে
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
