আদি শঙ্করাচার্য: যিনি আত্মা ও ব্রহ্মের একত্বের দর্শন ব্যাখ্যা করেছিলেন
মানুষের প্রকৃত পরিচয় কী? আমরা কি কেবল শরীর, মন ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের সমষ্টি, নাকি আমাদের অস্তিত্বের গভীরে এমন কোনো সত্য রয়েছে, যা বাহ্যিক পার্থক্যের ঊর্ধ্বে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভারতীয় দর্শনে গড়ে উঠেছে নানা মতবাদ। সেসব ধারার মধ্যে অদ্বৈত বেদান্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। এই দর্শনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাখ্যাকারদের একজন আদি শঙ্করাচার্য। তাঁর মতে, মানুষের প্রকৃত সত্তা এবং পরম সত্যের মধ্যে মৌলিক কোনো ভেদ নেই। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে মানুষ এই একত্ব উপলব্ধি করতে পারে না।
আদি শঙ্করাচার্য শুধু একজন ধর্মীয় চিন্তাবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক, ভাষ্যকার ও শিক্ষক। উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র এবং ভগবদ্গীতার মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ব্যাখ্যা করে তিনি অদ্বৈত বেদান্তের দার্শনিক ভিত্তিকে সুসংহত করেন। তাঁর রচনায় আত্মা, জগৎ, চেতনা, জ্ঞান ও মুক্তির মতো গভীর বিষয় নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায়। তাঁর চিন্তাধারা পরবর্তী ভারতীয় দর্শন এবং হিন্দুধর্মের বিভিন্ন দার্শনিক ধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
কেরালায় জন্ম, অল্প বয়সেই জ্ঞানচর্চা
আদি শঙ্করাচার্যের জন্ম ও জীবন সম্পর্কে প্রচলিত অনেক কাহিনি রয়েছে। ঐতিহ্যগত জীবনী অনুসারে, তিনি বর্তমান ভারতের কেরালা রাজ্যের কালাডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মকাল সাধারণত অষ্টম শতকের কাছাকাছি ধরা হয়, যদিও সুনির্দিষ্ট সময় নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাঁর জীবনের বহু ঘটনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য সীমিত। ফলে প্রচলিত জীবনীতে বর্ণিত সব ঘটনাকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, শঙ্করাচার্য ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃত ভাষা, বেদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও দার্শনিক গ্রন্থ অধ্যয়নে অসাধারণ আগ্রহ দেখান। অল্প বয়সেই তিনি সংসারজীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। এরপর তিনি একজন আধ্যাত্মিক শিক্ষকের সন্ধানে বের হন এবং গোবিন্দ ভগবৎপাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন বলে ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে।
শঙ্করাচার্যের জীবনের এই পর্যায়টি তাঁর দার্শনিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু প্রচলিত ধর্মীয় বক্তব্য গ্রহণ করেননি; বরং প্রাচীন গ্রন্থের অর্থ, আত্মার প্রকৃতি এবং পরম সত্যের ধারণা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। পরবর্তী সময়ে এই চিন্তাই তাঁকে অদ্বৈত বেদান্তের অন্যতম প্রধান ব্যাখ্যাকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
অদ্বৈত বেদান্ত: সবকিছুর অন্তরালে এক পরম সত্য
আদি শঙ্করাচার্যের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো অদ্বৈত বেদান্ত। ‘অদ্বৈত’ শব্দের অর্থ দ্বৈতহীন বা দুই নয়। এই দর্শন অনুসারে, চূড়ান্ত সত্যের স্তরে আত্মা ও ব্রহ্মের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। এখানে ‘আত্মা’ বলতে মানুষের গভীরতম প্রকৃত সত্তাকে বোঝানো হয়, আর ‘ব্রহ্ম’ বলতে বোঝানো হয় পরম বাস্তবতাকে—যা সবকিছুর চূড়ান্ত ভিত্তি।
আমরা সাধারণত নিজেদের আলাদা ব্যক্তি হিসেবে দেখি। পৃথিবীর মানুষ, বস্তু ও ঘটনাকেও একে অপরের থেকে পৃথক বলে মনে হয়। কিন্তু শঙ্করাচার্যের দর্শনে এই পার্থক্যগুলো চূড়ান্ত বাস্তবতার শেষ কথা নয়। তাঁর মতে, মানুষের প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই আমরা নিজেকে সীমাবদ্ধ ও স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে উপলব্ধি করি। যথার্থ জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে এই ভুল ধারণা দূর করা সম্ভব।
অদ্বৈত বেদান্তের একটি বিখ্যাত বক্তব্য হলো, আত্মার প্রকৃত স্বরূপ ব্রহ্ম থেকে আলাদা নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যক্তিগত অহংকার, ইচ্ছা কিংবা শরীরকে সরাসরি ঈশ্বরের সমান ঘোষণা করা হচ্ছে। বরং এখানে ব্যক্তির গভীরতম সত্তা এবং পরম বাস্তবতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই পার্থক্যটি বুঝতে পারলেই শঙ্করাচার্যের দর্শনের মূল বক্তব্য স্পষ্ট হয়।
মায়া: জগৎ কি তবে মিথ্যা?
শঙ্করাচার্যের দর্শন বুঝতে হলে ‘মায়া’ ধারণাটি বোঝা জরুরি। সাধারণ কথাবার্তায় মায়া বলতে অনেক সময় সম্পূর্ণ অবাস্তব কিছু বোঝানো হয়। কিন্তু অদ্বৈত বেদান্তে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। এই দর্শন অনুসারে, আমরা যে বহুবিচিত্র জগৎ অনুভব করি, তা আমাদের অভিজ্ঞতায় বাস্তব হলেও তার অস্তিত্ব পরম সত্যের মতো স্বাধীন ও চূড়ান্ত নয়।
শঙ্করাচার্যের চিন্তায় ব্রহ্ম হলো চূড়ান্ত বাস্তবতা, আর জগতের বহুত্বকে বুঝতে হয় সেই পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে। মানুষ যখন বাহ্যিক পার্থক্যকেই চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেয়, তখন সে বাস্তবতার গভীরতর ঐক্য উপলব্ধি করতে পারে না। অজ্ঞতা ও ভুল উপলব্ধি এই বিভ্রান্তির সঙ্গে যুক্ত।
বিষয়টি বোঝার জন্য দড়ি ও সাপের পরিচিত উদাহরণ দেওয়া হয়। অন্ধকারে পড়ে থাকা একটি দড়িকে কেউ ভুল করে সাপ মনে করতে পারে। তখন তার মনে ভয় তৈরি হয়, যদিও সেখানে প্রকৃতপক্ষে কোনো সাপ নেই। আলো জ্বালিয়ে দড়িটিকে চিনতে পারলে ভুল ধারণা দূর হয়। একইভাবে, অদ্বৈত বেদান্তে যথার্থ জ্ঞানকে এমন উপলব্ধির সঙ্গে তুলনা করা হয়, যা মানুষের অজ্ঞতা দূর করে বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে সাহায্য করে।
তবে এই উদাহরণের অর্থ এই নয় যে দৈনন্দিন পৃথিবী সম্পূর্ণ অর্থহীন বা মানুষের কাজকর্মের কোনো মূল্য নেই। বরং অদ্বৈত দর্শন বাস্তবতার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে পার্থক্য করে এবং চূড়ান্ত সত্যকে উপলব্ধি করার প্রশ্নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
জ্ঞানই মুক্তির প্রধান পথ
আদি শঙ্করাচার্যের মতে, মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মোক্ষ বা মুক্তি। অদ্বৈত বেদান্তে মুক্তি বলতে অজ্ঞতা ও ভুল আত্মপরিচয় থেকে মুক্ত হওয়াকে বোঝানো হয়। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে, তখন সে নিজেকে কেবল সীমাবদ্ধ শরীর ও মনের পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ বলে মনে করে না।
এই মুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে শঙ্করাচার্য জ্ঞানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এখানে জ্ঞান বলতে শুধু বই পড়ে তথ্য অর্জন করা বোঝায় না। বরং আত্মা ও ব্রহ্মের প্রকৃত সম্পর্ক সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি অর্জন করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তাঁর দর্শনে নৈতিক প্রস্তুতি, মনকে সংযত করা, শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া, চিন্তাভাবনা করা এবং ধ্যানের মাধ্যমে সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার গুরুত্ব রয়েছে।
শঙ্করাচার্যের মতে, আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় অনুশীলন মানুষের মনকে প্রস্তুত করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু অজ্ঞতা দূর করে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করার জন্য জ্ঞান অপরিহার্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় দর্শনে জ্ঞান, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র ও ভগবদ্গীতার ব্যাখ্যাকার
আদি শঙ্করাচার্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মৌলিক গ্রন্থগুলোর ওপর তাঁর ভাষ্য রচনা। তিনি উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র এবং ভগবদ্গীতার ব্যাখ্যার মাধ্যমে অদ্বৈত বেদান্তের মূল বক্তব্য তুলে ধরেন। এসব গ্রন্থের বক্তব্যের মধ্যে যে দার্শনিক জটিলতা ও ব্যাখ্যাগত পার্থক্য রয়েছে, সেগুলোকে একটি সুসংহত কাঠামোর মধ্যে বোঝানোর চেষ্টা করেন তিনি।
উপনিষদে আত্মা, ব্রহ্ম, চেতনা ও পরম সত্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। শঙ্করাচার্য এসব আলোচনাকে অদ্বৈত দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন। ব্রহ্মসূত্রের ওপর তাঁর ভাষ্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে বেদান্ত দর্শনের বিভিন্ন বক্তব্য ও যুক্তিকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভগবদ্গীতার ভাষ্যে তিনি জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি ও মুক্তির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র দার্শনিক রচনা হলো ‘উপদেশসাহস্রী’। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংলাপ, আত্মজ্ঞান এবং মুক্তির পথ নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায়। এসব রচনার মাধ্যমে শঙ্করাচার্য শুধু নিজের মত প্রকাশ করেননি; বরং প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যাপদ্ধতিও গড়ে তুলেছিলেন।
তবে তাঁর নামে প্রচলিত সব গ্রন্থ যে তাঁরই লেখা, তা নিশ্চিত নয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বহু রচনা তাঁর নামে পরিচিত হয়েছে। তাই গবেষকেরা ভাষা, দর্শন ও ঐতিহাসিক প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তাঁর প্রকৃত রচনা শনাক্ত করার চেষ্টা করেন।
দার্শনিক বিতর্ক ও জ্ঞানচর্চা
শঙ্করাচার্যের জীবনীতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ, দার্শনিকদের সঙ্গে বিতর্ক এবং নিজের মতবাদ প্রচারের কথা বলা হয়েছে। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, তিনি বিভিন্ন দার্শনিক ও ধর্মীয় ধারার পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। এসব বিতর্কের মাধ্যমে তিনি নিজের যুক্তি ব্যাখ্যা করতেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী মতবাদের বক্তব্যের সমালোচনা করতেন।
তবে তাঁর ভ্রমণ ও বিতর্কের বহু বিবরণ পরবর্তী সময়ে রচিত জীবনীগ্রন্থ থেকে এসেছে। ফলে এগুলোর সবকিছুকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। তারপরও তাঁর রচনাগুলো থেকে বোঝা যায়, তিনি যুক্তি, ব্যাখ্যা ও দার্শনিক বিশ্লেষণকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
শঙ্করাচার্যের দার্শনিক পদ্ধতিতে শুধু একটি বক্তব্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট ছিল না। প্রাচীন গ্রন্থের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা, বিভিন্ন মতের মধ্যে অসংগতি শনাক্ত করা এবং যুক্তির সাহায্যে নিজের ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ছিল তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই কারণে তাঁকে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে একজন প্রভাবশালী ভাষ্যকার ও পদ্ধতিগত চিন্তাবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চার মঠ প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্য
আদি শঙ্করাচার্যের সঙ্গে ভারতের চার প্রান্তে চারটি প্রধান মঠ প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্য যুক্ত রয়েছে। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, এসব মঠের উদ্দেশ্য ছিল বেদান্তের শিক্ষা সংরক্ষণ, সন্ন্যাসীদের প্রশিক্ষণ এবং দার্শনিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। উত্তর ভারতের জ্যোতির্মঠ, দক্ষিণের শৃঙ্গেরী মঠ, পূর্বের পুরীর গোবর্ধন মঠ এবং পশ্চিমের দ্বারকার শারদা মঠ এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিতভাবে যুক্ত।
এই মঠগুলো পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতচর্চা ও দার্শনিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। শঙ্করাচার্যের নামে প্রচলিত সন্ন্যাসী সম্প্রদায় ও শিক্ষাপরম্পরাও তাঁর দর্শনের বিস্তারে ভূমিকা রাখে।
তবে ঐতিহাসিক গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চারটি মঠই যে তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক প্রমাণ সীমিত। এসব প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ও শঙ্করাচার্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ মূলত পরবর্তী ঐতিহ্য থেকে পাওয়া যায়। তাই তাঁর ঐতিহাসিক অবদান আলোচনা করতে গেলে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রমাণভিত্তিক ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য রাখা প্রয়োজন।
ভারতীয় দর্শনে তাঁর প্রভাব
আদি শঙ্করাচার্যের দর্শন পরবর্তী ভারতীয় চিন্তাজগতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাঁর ব্যাখ্যা অদ্বৈত বেদান্তকে একটি সুসংহত দার্শনিক ধারায় প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। পরবর্তী বহু চিন্তাবিদ তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তি দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ তাঁর মতবাদের সমালোচনা করে বিকল্প ব্যাখ্যাও হাজির করেছেন।
বিশেষ করে রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈত বেদান্ত এবং মাধ্বাচার্যের দ্বৈত বেদান্ত শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত দর্শন থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতে আলাদা। রামানুজ আত্মা ও ব্রহ্মের সম্পর্ককে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে ঐক্যের পাশাপাশি পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, মাধ্বাচার্য আত্মা ও ঈশ্বরের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের ওপর জোর দেন। এসব মতবাদের বিকাশ দেখায়, ভারতীয় দর্শন একক কোনো ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং একই প্রাচীন গ্রন্থকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দার্শনিক অবস্থান গড়ে উঠেছিল।
এই বিতর্কগুলো শঙ্করাচার্যের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। তাঁর দর্শন শুধু অনুসারীদের প্রভাবিত করেনি; বরং বিরোধী মতবাদের দার্শনিকদেরও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা ও সুসংহত করতে উৎসাহিত করেছে।
আধুনিক যুগে আদি শঙ্করাচার্যের প্রাসঙ্গিকতা
আজও আত্মপরিচয়, চেতনা, বাস্তবতা এবং মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে দর্শন ও মননের জগতে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। আদি শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত এসব প্রশ্নের একটি গভীর দার্শনিক উত্তর দেয়। তাঁর মতে, মানুষ নিজের পরিচয়কে কেবল বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেললে অস্তিত্বের গভীরতর সত্য উপলব্ধি করতে পারে না।
তাঁর দর্শনের গুরুত্ব শুধু আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা কতটা নির্ভরযোগ্য, নিজের পরিচয়কে আমরা কীভাবে বুঝি এবং জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ভুল ধারণা কীভাবে সংশোধন করা যায়—এসব প্রশ্নও তাঁর চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে অদ্বৈত বেদান্ত একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য। এর বক্তব্যকে আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়; বরং একে দর্শনের নিজস্ব যুক্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আদি শঙ্করাচার্যের স্থায়ী অবদান হলো, তিনি প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক চিন্তাকে বিশ্লেষণ করে আত্মা ও ব্রহ্মের সম্পর্ক সম্পর্কে একটি সুসংহত ব্যাখ্যা নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর রচনা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাঠ, ব্যাখ্যা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাই তিনি শুধু একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নন; ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসেও তিনি এমন একজন চিন্তাবিদ, যাঁর কাজ আজও গভীর মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়ন করা হয়।
ইবনে সিনা: যে মনীষী চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দর্শনে বদলে দিয়েছিলেন জ্ঞানচর্চার ইতিহাস
পরবর্তীগৌতম বুদ্ধ: যিনি শিখিয়েছিলেন, দুঃখের কারণ বুঝলেই মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া যায়
সম্পর্কিত সংবাদ

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
ইবনে রুশদ: যে দার্শনিক দেখিয়েছিলেন, সত্যের পথে যুক্তি ও ধর্ম পাশাপাশি চলতে পারে

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
থমাস অ্যাকুইনাস: যে দার্শনিক যুক্তি ও বিশ্বাসের মধ্যে খুঁজেছিলেন মিলের পথ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি: যে দার্শনিক রাজনীতিকে দেখেছিলেন ক্ষমতা ও বাস্তবতার চোখে

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
রেনে দেকার্ত: যে দার্শনিক বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
জন লক: যে দার্শনিক বলেছিলেন, মানুষের অধিকার রাষ্ট্রের চেয়েও প্রাচীন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
ইমানুয়েল কান্ট: যে দার্শনিক প্রশ্ন করেছিলেন, মানুষ কীভাবে সত্য ও নৈতিকতার সন্ধান পায়
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
