আবদুস সাত্তার খান: যে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর উদ্ভাবিত ধাতু বদলে দিয়েছিল বিমান ও ইঞ্জিনের প্রযুক্তি
আবদুস সাত্তার খান
Editorial Team১৭ আগস্ট, ২০২৬ এ ১১:২৭ AM২ ভিউ১০ মিনিট পড়া
শেয়ার:

একটি বিমানের ইঞ্জিন যখন আকাশে হাজার হাজার মিটার ওপরে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের মধ্যে কাজ করে, তখন তার ভেতরের প্রতিটি উপাদানকে সহ্য করতে হয় অসাধারণ কঠিন পরিবেশ।
সেখানে সাধারণ ধাতু বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারে না।
প্রয়োজন এমন উপাদান, যা প্রচণ্ড তাপ সহ্য করতে পারবে, অক্সিডেশন ও ক্ষয় প্রতিরোধ করতে পারবে, আবার একই সঙ্গে শক্তিশালী ও তুলনামূলকভাবে হালকা হবে।
এই কঠিন সমস্যার সমাধান খুঁজতে কয়েক দশক গবেষণা করেছিলেন একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী—ড. আবদুস সাত্তার খান।
রসায়নে পড়াশোনা করা এই বিজ্ঞানী পরবর্তীতে প্রবেশ করেন materials engineering ও aerospace research-এর জগতে। NASA, United Technologies এবং Alstom-এর মতো প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করে তিনি উদ্ভাবন করেন ৪০টিরও বেশি নতুন alloy। এসব উপাদানের কিছু ব্যবহার হয়েছে space shuttle, উন্নত jet engine, U.S. Air Force-এর যুদ্ধবিমান, industrial gas turbine এবং দ্রুতগতির ট্রেনের প্রযুক্তিতে।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত সংখ্যার মধ্যে নয়।
তাঁর গবেষণা দেখিয়েছিল, একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত aerospace ও materials technology-এর সমস্যার সমাধান করতে পারেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্রাম থেকে শুরু
আবদুস সাত্তার খান জন্মগ্রহণ করেন প্রায় ১৯৪১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির খাগতুয়া গ্রামে, বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর এলাকায়।
তাঁর শৈশব কেটেছিল এমন এক সময়ে, যখন এই অঞ্চলে আধুনিক বিজ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ভর্তি হন রতনপুর হাই স্কুলে। এরপর পড়াশোনা করেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে।
কিন্তু তাঁর মেধার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করেন।
১৯৬২ সালে তিনি Chemistry-তে B.Sc. (Honours) সম্পন্ন করেন এবং ১৯৬৩ সালে Master's degree in Chemistry অর্জন করেন। তাঁর ফলাফল ছিল এতটাই অসাধারণ যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
এখানেই তাঁর জীবনের প্রথম বড় অধ্যায়।
তিনি শুধু পড়াশোনা করেননি।
নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন পড়াতে শুরু করেন।
কিন্তু তাঁর আগ্রহ ছিল আরও গভীরে।
রসায়নের মাধ্যমে নতুন পদার্থ তৈরি করা যায় কীভাবে?
কোনো ধাতুর গঠন পরিবর্তন করলে তার শক্তি কতটা বাড়ানো সম্ভব?
চরম তাপমাত্রায় কোন উপাদান সবচেয়ে ভালো কাজ করবে?
এই প্রশ্নগুলোই তাঁকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় materials science-এর দিকে।
অক্সফোর্ডে উচ্চশিক্ষা
১৯৬৪ সালে তিনি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের University of Oxford-এ যান।
সেখানে তিনি Chemistry-তে গবেষণা শুরু করেন এবং ১৯৬৮ সালে PhD অর্জন করেন।
ডক্টরেট শেষ করার পর তিনি আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন।
এবার তিনি রসায়ন বিভাগের Associate Professor হিসেবে কাজ শুরু করেন।
১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু তাঁর সামনে তখন আরও বড় একটি সুযোগ অপেক্ষা করছিল।
রসায়ন থেকে Aerospace Technology
১৯৭৩ সালে আবদুস সাত্তার খান যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
এখানে তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র আরও পরিবর্তিত হয়।
তিনি রসায়নের মৌলিক গবেষণার পাশাপাশি materials engineering, alloys এবং high-temperature materials নিয়ে কাজ শুরু করেন।
এটি ছিল এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশল একসঙ্গে কাজ করে।
কারণ একটি উন্নত বিমান ইঞ্জিনের জন্য শুধু শক্ত ধাতু যথেষ্ট নয়।
ধাতুটিকে একই সঙ্গে হতে হবে—
শক্তিশালী।
হালকা।
উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল।
অক্সিডেশন প্রতিরোধী।
ক্ষয় প্রতিরোধী।
এবং দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভরযোগ্য।
এই সমস্যাগুলোর সমাধানই পরবর্তীতে সাত্তার খানের গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
NASA-তে শুরু হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
১৯৭৬ সালে তিনি NASA-এর Lewis Research Center-এ গবেষণায় যোগ দেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি NASA Glenn Research Center নামে পরিচিত।
NASA-তে এসে তিনি মহাকাশযান ও বিমান ইঞ্জিনে ব্যবহারযোগ্য উন্নত high-temperature alloys নিয়ে কাজ শুরু করেন।
এই গবেষণার ফল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি এমন ধরনের alloy নিয়ে কাজ করেন, যেগুলো প্রচণ্ড তাপমাত্রায়ও তাদের শক্তি ও স্থায়িত্ব ধরে রাখতে পারে।
এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল nickel-based alloys।
এই ধরনের alloy jet engine-এর মতো পরিবেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইঞ্জিনের ভেতরে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি হতে পারে।
আর ইঞ্জিন যত বেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে, বিমান তত বেশি কার্যকরভাবে শক্তি ব্যবহার করতে পারে।
৪০টিরও বেশি নতুন Alloy
আবদুস সাত্তার খানের গবেষণার সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিসংখ্যানগুলোর একটি হলো—
তিনি ৪০টিরও বেশি alloy উদ্ভাবন করেছিলেন।
এগুলো শুধু গবেষণাগারের পরীক্ষামূলক পদার্থ ছিল না।
তাঁর উদ্ভাবিত ও উন্নত করা বিভিন্ন alloy এবং protective coating বাস্তব বাণিজ্যিক ও aerospace applications-এ ব্যবহৃত হয়।
কিছু alloy ব্যবহৃত হয়েছে—
Space shuttle technology-তে
Advanced commercial jet engine-এ
U.S. Air Force-এর jet engine-এ
Industrial gas turbine-এ
Train engine-এর প্রযুক্তিতে
উন্নত alloy ব্যবহারের অন্যতম সুবিধা ছিল ইঞ্জিনের ওজন কমানো এবং উচ্চ তাপমাত্রায় কর্মক্ষমতা বাড়ানো। এর ফলে বিমান ও ইঞ্জিনের দক্ষতা উন্নত করা সম্ভব হয়।
F-15 ও F-16-এর ইঞ্জিনে তাঁর Alloy
আবদুস সাত্তার খানের গবেষণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল high-strength nickel-based alloy।
এই alloy-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার ছিল F-15 ও F-16 fighter aircraft-এর engine technology-তে।
এই উপাদানগুলো ইঞ্জিনের fuel efficiency বাড়াতে সাহায্য করে।
১৯৮৬ সালে এই কাজের জন্য তিনি United Technologies Special Award পান।
তাঁর তৈরি Alloy Y-কে পরবর্তীতে উন্নত aircraft engine-এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ material হিসেবে তুলে ধরা হয়।
একজন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রসায়নবিদের উদ্ভাবিত alloy যখন বিশ্বের অন্যতম উন্নত যুদ্ধবিমানের engine technology-তে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে, তখন সেটি নিঃসন্দেহে তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।
শুধু Alloy নয়, Engine Coating-এও বিপ্লব
বিমান ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে শুধু ভালো alloy তৈরি করলেই হয় না।
ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশকে উচ্চ তাপমাত্রা, oxidation, corrosion এবং wear থেকে রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য আবদুস সাত্তার খান advanced protective coatings নিয়ে গবেষণা করেন।
বিশেষ করে MCrAlY coating technology তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
এই ধরনের coating turbine blade ও অন্যান্য high-temperature components-কে oxidation ও corrosion থেকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়। তাঁর নামে একাধিক coating-related U.S. patent রয়েছে।
অর্থাৎ তিনি শুধু নতুন ধাতু তৈরি করেননি।
তিনি সেই ধাতুকে চরম পরিবেশে দীর্ঘদিন কার্যকর রাখার প্রযুক্তিও উন্নত করেছিলেন।
Pratt & Whitney-তে নতুন অধ্যায়
NASA-র পর আবদুস সাত্তার খান যোগ দেন United Technologies-এর সঙ্গে এবং aerospace engine technology-তে আরও গভীরভাবে কাজ করেন।
United Technologies-এর অংশ Pratt & Whitney উন্নত aircraft engine তৈরির জন্য বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান।
এখানে সাত্তার খান advanced materials, surface protection এবং engine efficiency নিয়ে গবেষণা করেন।
তাঁর গবেষণার ফল হিসেবে তৈরি advanced abrasion-resistant materials fighter engine-এর fuel efficiency উন্নত করার কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া corrosion ও fatigue-resistant coating technology-ও advanced commercial jet engine-এর জন্য তৈরি হয়।
১৯৯৩ সালে advanced jet engine-এর জন্য surface protection coating-এর manufacturing technology উন্নয়নে অবদানের জন্য তিনি Pratt & Whitney Special Award লাভ করেন।
Missile ও High-Speed Aircraft-এর জন্য Fuel Catalyst
তাঁর গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল hydrocarbon fuel catalyst।
NASA ও U.S. Air Force-এর একটি গবেষণা চুক্তির অধীনে তিনি এমন catalyst technology নিয়ে কাজ করেন, যা high-speed aircraft ও missile propulsion-এর ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য ছিল।
এই প্রযুক্তিকে ১৯৯২ সালে NASA ও U.S. Air Force “enabling technology” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৯৪ সালে এই কাজের জন্য তিনি United Technologies Research Center Award of Excellence পান।
এখানে তাঁর কাজের ব্যাপ্তিটা বোঝা যায়।
একদিকে alloy।
অন্যদিকে protective coating।
তার পাশাপাশি fuel catalyst।
অর্থাৎ aircraft propulsion technology-এর বিভিন্ন স্তরেই তাঁর গবেষণার প্রভাব ছিল।
Alstom-এ গিয়ে আরও ২৫টি Patent
এক জায়গায় দীর্ঘদিন কাজ করে থেমে থাকেননি আবদুস সাত্তার খান।
পরবর্তীতে তিনি সুইজারল্যান্ডের Alstom-এ যোগ দেন, যা power generation technology-র একটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।
সেখানে মাত্র প্রায় পাঁচ বছর কাজ করেই তাঁর নামে যুক্ত হয় ২৫টি patent।
Alstom-এ তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল industrial gas turbine।
তিনি turbine blade-এর জন্য উন্নত materials এবং protective coating নিয়ে কাজ করেন।
তাঁর গবেষণার ফল হিসেবে তৈরি কিছু electrodeposited coating Alstom GT24/26 industrial gas turbine এবং GT-11 power turbine-এর প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়।
অর্থাৎ তাঁর গবেষণা এবার মহাকাশ বা fighter aircraft-এর বাইরে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তিতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
দ্রুতগতির ট্রেনেও তাঁর গবেষণার প্রভাব
আবদুস সাত্তার খানের alloy research-এর আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো এর ব্যবহার transportation technology-তে।
তাঁর গবেষণায় উন্নত alloy ও materials train engine-এর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
অর্থাৎ একই বিজ্ঞানীর গবেষণার প্রভাব দেখা যায়—
মহাকাশযানে,
যুদ্ধবিমানে,
বাণিজ্যিক বিমানে,
গ্যাস টারবাইনে,
এবং
ট্রেনের প্রযুক্তিতেও।
এটাই তাঁর গবেষণার ব্যাপ্তিকে বিশেষ করে তোলে।
৩০টিরও বেশি Patent
আবদুস সাত্তার খানের উদ্ভাবনী কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো তাঁর patent portfolio।
Asia Research News-এর তথ্য অনুযায়ী তাঁর নামে ৩০টিরও বেশি patent ছিল।
Patent-এর বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল—
MCrAlY bond coating,
thermal barrier coating,
wear-resistant coating,
oxidation-resistant materials,
এবং gas turbine components-এর জন্য বিভিন্ন advanced coating technology।
এগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—
তিনি শুধু গবেষণাপত্র লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না।
তাঁর লক্ষ্য ছিল গবেষণাকে প্রযুক্তি ও বাস্তব ব্যবহারে রূপান্তর করা।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
এত বিস্তৃত গবেষণার স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছিলেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে।
NASA, U.S. Air Force, United Technologies এবং Alstom—বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁর গবেষণা ও প্রযুক্তিগত অবদানের জন্য তাঁকে পুরস্কৃত করেছে।
তিনি ১৯৯৬ সালে Fellow of the Royal Society of Chemistry (UK) নির্বাচিত হন এবং ২০০৫ সালে Chartered Scientist হিসেবে স্বীকৃতি পান।
এগুলো তাঁর বৈজ্ঞানিক ক্যারিয়ারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অবসরেও থামেনি গবেষণা
একজন বিজ্ঞানীর গবেষণাজীবন অবসরের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি।
আবদুস সাত্তার খান অবসর জীবনে Florida State University-এর Mechanical Engineering বিভাগে Honorary Professor হিসেবে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সেখানে তিনি nanomaterials এবং carbon nanotechnology নিয়ে গবেষণার জন্য একটি Center of Excellence প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন।
অর্থাৎ জীবনের শেষ পর্যায়েও তাঁর আগ্রহ ছিল নতুন প্রজন্মের materials technology নিয়ে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কও ভুলে যাননি
বিদেশে দীর্ঘদিন কাজ করলেও বাংলাদেশ তাঁর কাছে কখনো দূরের হয়ে যায়নি।
তিনি শুধু নিজে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল হননি, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সক্ষমতা বাড়াতেও উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
তিনি Dhaka University ও Lamar University-এর মধ্যে একটি cooperative agreement প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন, যার লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের faculty members ও graduate students-দের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা।
অর্থাৎ নিজের সাফল্যকে তিনি একা নিজের মধ্যে আটকে রাখেননি।
তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশের তরুণ গবেষকরাও আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হোক।
বিজ্ঞানীর পাশাপাশি সমাজসেবক
আবদুস সাত্তার খান শুধু গবেষণাগারের মানুষ ছিলেন না।
যুক্তরাষ্ট্রে তিনি Bangladeshi Association of Florida প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলাদেশি ও এশীয় কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
১৯৯১ সালের বাংলাদেশের ভয়াবহ বন্যার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ সংগ্রহ করে ৬১,০০০ ডলার সংগ্রহ করেন এবং তা American Red Cross-এর মাধ্যমে বন্যার্তদের সহায়তায় দেন।
তাঁর এই কাজ দেখায়, বিজ্ঞানীর পরিচয়ের পাশাপাশি নিজের দেশের মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাও ছিল গভীর।
২০০৮ সালে থেমে গেল একটি দীর্ঘ গবেষণাযাত্রা
দীর্ঘ চার দশকের গবেষণাজীবনের পর ২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় আবদুস সাত্তার খান মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।
কিন্তু তাঁর তৈরি alloy, coating এবং materials technology তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে হারিয়ে যায়নি।
কারণ তাঁর অনেক কাজ ইতিমধ্যেই বাস্তব প্রযুক্তির অংশ হয়ে গিয়েছিল।
আবদুস সাত্তার খান কেন স্মরণীয়?
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া একজন রসায়নবিদ কীভাবে NASA-র গবেষণাগারে পৌঁছাতে পারেন—আবদুস সাত্তার খানের জীবন তার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
কিন্তু তাঁর সাফল্য শুধু NASA-তে কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি—
৪০টিরও বেশি alloy উদ্ভাবন করেছেন।
F-15 ও F-16 fighter engine-এর fuel efficiency উন্নত করতে ব্যবহৃত high-strength nickel-based alloy তৈরি করেছেন।
Space shuttle ও advanced jet engine-এর জন্য materials তৈরি করেছেন।
Industrial gas turbine-এর জন্য advanced coating technology উন্নত করেছেন।
৩০টিরও বেশি patent অর্জন করেছেন।
NASA, U.S. Air Force, United Technologies ও Alstom-এর কাছ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
Royal Society of Chemistry-এর Fellow ও Chartered Scientist হয়েছেন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—
তাঁর গবেষণা ল্যাবরেটরির কাগজে আটকে থাকেনি।
তা পৌঁছেছিল বিমান ইঞ্জিনে, মহাকাশ প্রযুক্তিতে, যুদ্ধবিমানে, গ্যাস টারবাইনে এবং পরিবহন প্রযুক্তিতে।
একজন রসায়নবিদ যখন এমন উপাদান তৈরি করেন যা একটি বিমানকে আরও হালকা, ইঞ্জিনকে আরও দক্ষ এবং high-temperature technology-কে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে, তখন তাঁর কাজকে শুধু Chemistry research বলা যায় না।
এটি হয়ে ওঠে বিজ্ঞান থেকে প্রযুক্তিতে রূপান্তরের গল্প।
আর সেই গল্পের কেন্দ্রে ছিলেন বাংলাদেশের সন্তান—
ড. আবদুস সাত্তার খান।
এক নজরে আবদুস সাত্তার খান
পুরো নাম: Abdus Suttar Khan
জন্ম: প্রায় ১৯৪১, খাগতুয়া, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
মৃত্যু: ৩১ জানুয়ারি ২০০৮, ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র
প্রধান ক্ষেত্র: রসায়ন, Materials Science, Materials Engineering ও Aerospace Research
স্নাতক: Chemistry, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মাস্টার্স: Chemistry, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
PhD: Chemistry, University of Oxford
গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র: NASA, United Technologies/Pratt & Whitney, Alstom
প্রধান আবিষ্কার: ৪০টিরও বেশি alloy
বিশেষ অবদান: High-strength nickel-based alloys, aerospace materials, turbine coatings, fuel catalyst technology
F-15/F-16: তাঁর high-strength nickel-based alloy fighter engine-এর fuel efficiency বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়।
Patent: ৩০টিরও বেশি
পুরস্কার: NASA, U.S. Air Force, United Technologies ও Alstom-এর বিভিন্ন পুরস্কার
বিশেষ সম্মান: Fellow of the Royal Society of Chemistry; Chartered Scientist
অন্যান্য অবদান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও Lamar University-এর মধ্যে academic cooperation প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা; ১৯৯১ সালের বন্যায় বাংলাদেশিদের জন্য $61,000 তহবিল সংগ্রহ।
পূর্ববর্তী
আলবার্ট আইনস্টাইন: যে মানুষটি বদলে দিয়েছিলেন সময়, স্থান আর মহাবিশ্বকে দেখার চোখ
পরবর্তীআবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন: যে মানুষটি বাংলায় বিজ্ঞানকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
