আলবার্ট আইনস্টাইন: যে মানুষটি বদলে দিয়েছিলেন সময়, স্থান আর মহাবিশ্বকে দেখার চোখ
আলবার্ট আইনস্টাইন

একজন মানুষ যদি আপনাকে বলেন, সময় সবার জন্য একই গতিতে চলে না—আপনি হয়তো প্রথমে কথাটা বিশ্বাসই করবেন না। কারণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সময়কে আমরা খুব সরল একটি বিষয় হিসেবেই দেখি। এক ঘণ্টা মানে এক ঘণ্টা, এক মিনিট মানে এক মিনিট। কিন্তু মহাবিশ্বের বিশাল পরিসরে সময় আর স্থান এতটা সরল নয়।
এই আপাত অসম্ভব কথাটিকেই একসময় বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিলেন এক অদ্ভুত স্বভাবের মানুষ—আলবার্ট আইনস্টাইন।
তাঁর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এলোমেলো চুল, গোঁফ আর গভীর চিন্তায় ডুবে থাকা একজন বিজ্ঞানীর ছবি। কিন্তু আইনস্টাইনের গল্প শুধু আপেক্ষিকতার তত্ত্ব কিংবা বিখ্যাত E=mc² সমীকরণের গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে ভয় পাননি এবং কল্পনাকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন।
ছোটবেলার সেই ‘ধীর’ ছেলেটি
১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জার্মানির উল্ম শহরে জন্ম নেন আলবার্ট আইনস্টাইন। জন্মের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর তাঁর পরিবার চলে যায় মিউনিখে। তাঁর বাবা হারমান আইনস্টাইন বৈদ্যুতিক প্রকৌশলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছোটবেলায় আইনস্টাইনের মধ্যে গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।
তাঁর শৈশব নিয়ে অনেক জনপ্রিয় গল্প প্রচলিত আছে—যেমন, তিনি নাকি ছোটবেলায় কথা বলতে দেরি করেছিলেন এবং স্কুলে খুব একটা ভালো ছাত্র ছিলেন না। এসব গল্পের কিছু অংশ অতিরঞ্জিত হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার: আইনস্টাইন প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খুব সহজে মানিয়ে নিতে পারতেন না।
তিনি মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পছন্দ করতেন না। কোনো বিষয়কে শুধু শিক্ষক বলেছেন বলেই মেনে নেওয়ার বদলে তিনি জানতে চাইতেন—কেন?
এই ‘কেন’ প্রশ্ন করার অভ্যাসই পরবর্তীতে তাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তার অন্যতম বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
জার্মানি থেকে সুইজারল্যান্ড
পরিবার পরে ইতালিতে চলে গেলে আইনস্টাইনের পড়াশোনার একটি অংশ সুইজারল্যান্ডে সম্পন্ন হয়। ১৮৯৬ সালে তিনি জুরিখের Swiss Federal Polytechnic School-এ ভর্তি হন। সেখানে তিনি পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হওয়ার জন্য পড়াশোনা করেন। ১৯০১ সালে তিনি ডিপ্লোমা লাভ করেন এবং একই বছর সুইস নাগরিকত্ব অর্জন করেন।
কিন্তু ডিগ্রি অর্জনের পর তাঁর সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের চাকরি অপেক্ষা করছিল না।
বরং জীবনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছিল একেবারে অন্য জায়গায়।
বার্নের সুইস পেটেন্ট অফিসে।
বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরি ছিল একটি অফিস
১৯০২ সালে আইনস্টাইন বার্নের Swiss Patent Office-এ টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। বাইরে থেকে দেখলে এটি একজন তরুণ পদার্থবিজ্ঞানীর জন্য খুব সাধারণ একটি চাকরি। বিভিন্ন আবিষ্কারের পেটেন্ট আবেদন পরীক্ষা করা, প্রযুক্তিগত বিষয় বোঝা এবং সেগুলোর মূল্যায়ন করা—এই ছিল তাঁর কাজের বড় অংশ।
কিন্তু দিনের কাজ শেষ হওয়ার পর তাঁর চিন্তা থামত না।
এই সময়েই তিনি পদার্থবিজ্ঞানের কিছু মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। আর তারপর আসে ১৯০৫ সাল—যে বছরটি পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
১৯০৫: আইনস্টাইনের ‘অলৌকিক বছর’
১৯০৫ সালে আইনস্টাইন চারটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এগুলোর প্রতিটিই পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ কোনো না কোনো ধারণাকে নতুনভাবে দেখার পথ তৈরি করে।
তিনি কাজ করেন—
ব্রাউনিয়ান গতির ব্যাখ্যা নিয়ে,
আলোর প্রকৃতি নিয়ে,
বিশেষ আপেক্ষিকতা নিয়ে,
এবং ভর ও শক্তির সম্পর্ক নিয়ে।
এই সময়ের কাজগুলো তাঁকে বৈজ্ঞানিক জগতে দ্রুত পরিচিত করে তোলে।
এর মধ্যে আলোর প্রকৃতি নিয়ে তাঁর কাজটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তখন আলোকে প্রধানত তরঙ্গ হিসেবে বোঝা হতো। আইনস্টাইন প্রস্তাব করলেন, কিছু পরিস্থিতিতে আলোকে শক্তির ক্ষুদ্র প্যাকেট বা কোয়ান্টা হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। পরবর্তীতে এই ধারণাই ফোটনের ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়।
যে কাজের জন্য নোবেল পেলেন
এখানে একটি মজার বিষয় আছে।
বিশ্বজুড়ে আইনস্টাইনকে আমরা সবচেয়ে বেশি চিনি আপেক্ষিকতার তত্ত্বের জন্য। কিন্তু তিনি নোবেল পুরস্কার পান আপেক্ষিকতার তত্ত্বের জন্য নয়।
১৯২১ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার তাঁকে দেওয়া হয়েছিল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর অবদানের জন্য, বিশেষ করে photoelectric effect-এর সূত্র আবিষ্কারের জন্য। পুরস্কারটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে দেওয়া হয় ১৯২২ সালে।
সময় যখন আর সবার জন্য এক নয়
১৯০৫ সালের আরেকটি গবেষণাপত্র আইনস্টাইনের নামকে চিরকালের জন্য বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত করে।
এটি ছিল বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব।
আমরা সাধারণত মনে করি, সময় সবার জন্য একই। কিন্তু আইনস্টাইনের তত্ত্ব দেখাল, খুব বেশি গতিতে চলমান পর্যবেক্ষকের জন্য সময়ের পরিমাপ ভিন্ন হতে পারে। স্থান ও সময় আলাদা দুটি বিষয় নয়; তারা একটি বৃহত্তর কাঠামোর অংশ—space-time।
এখান থেকেই আসে বিখ্যাত সমীকরণ:
E = mc²
অর্থাৎ ভর ও শক্তি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। খুব অল্প পরিমাণ ভরের মধ্যেও বিপুল পরিমাণ শক্তি নিহিত থাকতে পারে।
এই ধারণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়।
এরপর এল সাধারণ আপেক্ষিকতা
আইনস্টাইন এখানেই থেমে থাকেননি।
বিশেষ আপেক্ষিকতার কয়েক বছর পর তিনি আরও কঠিন একটি প্রশ্নের দিকে এগিয়ে গেলেন—মহাকর্ষ আসলে কী?
১৯১৫ সালে তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্বে মহাকর্ষকে শুধু একটি অদৃশ্য আকর্ষণ বল হিসেবে না দেখে স্থান-কালের জ্যামিতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বিশাল ভর স্থান-কালকে প্রভাবিত করে এবং সেই পরিবর্তিত কাঠামোর মধ্য দিয়েই বস্তু ও আলো চলাচল করে।
এটি ছিল নিউটনের মহাকর্ষের ধারণার ওপর একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।
আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব পরবর্তীতে মহাবিশ্ব, নক্ষত্র, কৃষ্ণগহ্বর এবং মহাকর্ষীয় ঘটনাগুলো বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আইনস্টাইন কেন আজও গুরুত্বপূর্ণ?
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবুও আইনস্টাইনের নাম বিজ্ঞান থেকে হারিয়ে যায়নি।
কারণ তিনি শুধু নতুন কিছু সমীকরণ দেননি। তিনি মানুষকে প্রশ্ন করার একটি নতুন পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন।
তিনি দেখিয়েছিলেন, কোনো ধারণা বহুদিন ধরে সত্য বলে মেনে নেওয়া হলেও সেটিকে নতুন করে প্রশ্ন করা যায়। কল্পনা শুধু গল্প লেখার বিষয় নয়—সঠিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হলে কল্পনাই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পথ খুলে দিতে পারে।
আইনস্টাইনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো তাঁর কোনো একটি সমীকরণ নয়।
বরং সেই মানসিকতা—
“যা সবাই সত্য বলে মেনে নিয়েছে, সেটি কি সত্যিই শেষ কথা?”
এই প্রশ্ন থেকেই কখনো কখনো বদলে যায় পুরো পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
আর আলবার্ট আইনস্টাইনের ক্ষেত্রে, সেই পরিবর্তন শুধু পৃথিবীর নয়—সময়, স্থান এবং পুরো মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রেও ঘটেছিল।
এক নজরে আলবার্ট আইনস্টাইন
পুরো নাম: Albert Einstein
জন্ম: ১৪ মার্চ ১৮৭৯, উল্ম, জার্মানি
মৃত্যু: ১৮ এপ্রিল ১৯৫৫, প্রিন্সটন, নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র
পেশা: তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী
বিশেষ পরিচিতি: বিশেষ ও সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, ভর-শক্তি সমতুল্যতা, কোয়ান্টাম তত্ত্বে অবদান
নোবেল পুরস্কার: পদার্থবিজ্ঞান, ১৯২১
নোবেল পুরস্কার প্রদানের বছর: ১৯২২
নোবেল পুরস্কারের কারণ: তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অবদান, বিশেষ করে photoelectric effect-এর সূত্র আবিষ্কার
এসএসসি ও সমমানের ফল ২০২৬: পাসের হার ৬২.২৫%, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ শিক্ষার্থী
পরবর্তীআবদুস সাত্তার খান: যে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর উদ্ভাবিত ধাতু বদলে দিয়েছিল বিমান ও ইঞ্জিনের প্রযুক্তি
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
