বাংলা কবিতার আধুনিক পর্বে এমন কিছু নাম আছে যাঁরা শুধু কবিতা লিখে যাননি, বরং ভাষার সঙ্গে এক কঠিন সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, যা পাঠকের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি ছিল এক অসাধারণ শিল্পকলা। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন তেমনই এক কবি। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ দশকে যে পাঁচজন কবি রবীন্দ্রনাথের প্রভাব কাটিয়ে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার সূচনা ঘটিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম । তাঁকে বলা হয় বাংলা কবিতায় "ধ্রুপদী রীতির প্রবর্তক" , যার কবিতা যেমন দুর্গম, তেমনি তার গভীরতা আজও পাঠককে ভাবায়। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সম্পাদক —যিনি বাংলা কবিতার ভাষা ও চিন্তার পরিধিকে বিশ্বায়িত করেছিলেন ।
শৈশব ও শিক্ষা: বিত্তের ঘরে বুদ্ধির চর্চা
১৯০১ সালের ৩০শে অক্টোবর কলকাতার হাতিবাগানে এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত । পিতা হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট দার্শনিক ও আইনজীবী , মাতা ইন্দুমতি বসুমল্লিক ছিলেন রাজা সুবোধচন্দ্র বসুমল্লিকের বোন । শৈশব কেটেছে কাশীতে। ১৯১৪ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত কাশীর থিয়সফিক্যাল হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন । পরবর্তীতে কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি থেকে ম্যাট্রিক ও স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক (১৯২২) পাস করেন ।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এবং আইন কলেজে আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু করলেও কোনো বিষয়েই পরীক্ষা দেননি তিনি । সারা জীবন তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত — জ্ঞান অর্জন করতেন কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বাঁধাধরা কাঠামোকে ভয় পেতেন না।
আত্মপ্রকাশ ও কাব্যগ্রন্থসমূহ
১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'তন্বী' । পরবর্তীতে একে একে প্রকাশিত হয়—
'সংবর্ত' (১৯৫০) কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম কবিতাটি ১৯৪০ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর লেখা — যা কাব্যগ্রন্থের শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে বিবেচিত। এই ১৬৬ লাইনের দীর্ঘ কবিতাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভিক সময়ের পটভূমিতে রচিত এবং এক অনন্য প্রেমের কবিতা ও ইতিহাসের তীক্ষ্ম ভাষ্যের অসাধারণ মিশেল । কবির পূর্ববর্তী বিখ্যাত কবিতা 'উৎপাখী'-তে তিনি লিখেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় পঙ্ক্তি:
"অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?"
'পরিচয়' পত্রিকার সম্পাদক: আধুনিকতার মঞ্চ
১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত — প্রায় বারো বছর — তিনি 'পরিচয়' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন । এই পত্রিকা বাংলা কবিতার আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল । তিনি প্রমথ চৌধুরীর 'সবুজপত্র'-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৪৫-৪৯ সাল পর্যন্ত 'স্টেটসম্যান' পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন । নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পাদিত 'দ্য ফরওয়ার্ড' পত্রিকার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন ।
কবিতার ভাষা ও শৈলী: দুর্ভেদ্য কিন্তু অপরূপ
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো —
ফরাসি প্রতীকবাদীদের প্রভাব
স্টিফেন মালার্মে-র মতো ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের দ্বারা তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন । তাঁর কবিতা যেমন কঠিন, তেমনি ছিল রূপকের এক জটিল জাল — যা পাঠককে বারবার ফিরিয়ে আনে।
নগর সভ্যতার কবি
ত্রিশের দশকের অন্যান্য কবিদের মতো তিনিও রবীন্দ্রনাথের প্রাকৃতিক ও রোমান্টিক জগৎ থেকে সরে এসে তৈরি করলেন এক শহুরে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মননশীল জগৎ । তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে নাগরিক জীবন, বিশ্বরাজনীতি, ইতিহাসের টানাপোড়েন — যার জন্য তাঁকে বলা হয় 'নাগরিক বৈদগ্ধ্যের কবি'।
দার্শনিক চিন্তা ও নাস্তিকতা
তিনি বাংলা কবিতায় দর্শনচিন্তার নান্দনিক প্রকাশ ঘটিয়েছেন । তাঁর কবিতার ভিত্তিভূমি ছিল সর্বব্যাপী নাস্তিকতা, দার্শনিক চিন্তা, সামাজিক হতাশা এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবাদ । হুমায়ূন আজাদের মতে, ত্রিশের অন্যান্য কবি অবিশ্বাসী হলেও সুধীন্দ্রনাথ দত্তই ঈশ্বরকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন । জীবনানন্দ দাশ তাঁকে বলেছিলেন "আধুনিক বাংলা কাব্যের সবচেয়ে নিরাশাকরোজ্জ্বল চেতনা" ।
শিক্ষকতা ও শেষ জীবন
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদবপুর
১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন । এই সময় তিনি তাঁর আত্মজীবনী ইংরেজিতে লেখার কাজ শুরু করলেও তা শেষ করেননি । দেশে ফিরে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন ।
অন্তরঙ্গ জীবন
১৯২৪ সালে ছবি বসুর সঙ্গে বিবাহ হলেও এক বছরের মধ্যে তাঁদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । ১৯৪৩ সালের ২৯শে মে প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রাজেশ্বরী বসুর সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন । তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় ১৯৬০ সালের ২৫শে জুন কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।
বাংলা সাহিত্যে স্থান
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা কবিতাকে দিয়েছেন এক শক্তিমান, দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে বাংলা কবিতা কেবল রবীন্দ্রনাথের সুরেই বাঁধা নয় — তা বিশ্বসাহিত্যের মূলস্রোতে উঠে আসতে পারে, ফরাসি প্রতীকবাদের সঙ্গে মিশে তৈরি করতে পারে নিজস্ব এক অনন্য ধারা। 'উৎপাখী'-র সেই বিখ্যাত প্রশ্ন "অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?" আজও কবিতাপ্রেমীদের মনে গভীরভাবে রেশ রেখে যায়। বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার যে দুর্গ তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা এখনও অটুট, এখনও চ্যালেঞ্জিং, এখনও অপরূপ।