বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন
বিষ্ণু দে

বাংলা কবিতার আধুনিক পর্বে এমন কিছু কবি আছেন যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই মনে হয় এক কঠিন, দুরূহ কিন্তু অত্যন্ত শিল্পসমৃদ্ধ জগতের কথা। তাঁদের কবিতা যেমন পাঠককে তাড়া করে, তেমনি মুগ্ধ করে ভাষার এক অপার কারুকাজে। বিষ্ণু দে ছিলেন তেমনই এক কবি — যিনি তিরিশের দশকে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার যে নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন, তার অন্যতম পুরোধা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের মধ্যে তিনি, বুদ্ধদেব বসু ও সমর সেনের মতো, বাংলা সাহিত্যে ‘নতুন কবিতার’ সূচনা করেছিলেন । তাঁকে যেমন বলা হয় আধুনিক বাংলা কবিতার শব্দ-ম্যাজিশিয়ান , তেমনি তিনি ছিলেন গভীর মার্কসবাদী চেতনার অধিকারী এক মননশীল শিল্পী , যার কবিতা আজও পাঠককে নতুন করে ভাবায়, প্রশ্ন তুলতে শেখায়।
জীবনপঞ্জি: কলকাতার পটলডাঙ্গা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা
১৯০৯ সালের ১৮ই জুলাই কলকাতার পটলডাঙ্গায় এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বিষ্ণু দে । পিতা অবিনাশচন্দ্র দে ছিলেন অ্যাটর্নি । কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউট ও সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা শুরু । ১৯২৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইএ (১৯৩০), সেন্ট পলস কলেজ থেকে ইংরেজিতে বিএ অনার্স (১৯৩২) ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ (১৯৩৪) ডিগ্রি লাভ করেন ।
১৯৩৫ সালে কলকাতার রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু । পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে (১৯৪৪-১৯৪৭), মৌলানা আজাদ কলেজে (১৯৪৭-১৯৬৯) ও কৃষ্ণনগর কলেজে অধ্যাপনা করেন ।
‘কল্লোল’ থেকে ‘পরিচয়’: সাহিত্য আন্দোলনের নায়ক
ঊনিশশো বিশের দশকে ‘কল্লোল’ পত্রিকা যে নতুন সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা করেছিল, বিষ্ণু দে ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা ও দিশারি । কিন্তু ১৯৩০ সালে ‘কল্লোল’ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ পত্রিকায় যুক্ত হন এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এর সম্পাদকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন । এই পত্রিকাটি তিরিশের আধুনিক কবিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে ।
১৯৪৮ সালে চঞ্চলকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় তিনি ‘সাহিত্যপত্র’ প্রকাশ করেন এবং ‘নিরুক্ত’ নামে আরও একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন । পাশাপাশি তিনি প্রগতি লেখক শিল্পী সংঘ, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ ও সোভিয়েত সুহৃদ সমিতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন ।
কাব্যগ্রন্থসমূহ: ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ থেকে ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’
বিষ্ণু দে-র কাব্যযাত্রা শুরু হয় ১৯৩৩ সালে ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে । এই গ্রন্থে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পুরাণের যুগল স্মরণ বিদ্যমান । কিন্তু তাঁর কবিখ্যাতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ‘চোরাবালি’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর । ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘সাত ভাই চম্পা’ । এরপর প্রকাশিত হয় ‘নাম রেখেছি কোমল গান্ধার’ (১৯৫৩) এবং ‘তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ’ (১৯৫৮) ।
তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’ (১৯৫৫-১৯৬১) । এই গ্রন্থটি বাংলা কবিতায় এক নতুন precedent স্থাপন করে এবং ১৯৬৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ও ১৯৭১ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার-সহ ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করে ।
কবিতার ভাষা ও শৈলী: শব্দ-ম্যাজিশিয়ানের কারুকাজ
বিষ্ণু দে-র কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো শব্দের প্রতি তাঁর অসামান্য দখল। তিনি বাংলা কবিতায় তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, সঙ্গীতবিষয়ক, অন্ত্যজ শ্রেণিবিষয়ক, রাজনীতিঘেষা — নানা ধরণের শব্দ নিয়ে খেলেছেন ম্যাজিশিয়ানের মতো । এ কারণে তাঁকে আধুনিক বাংলা কবিতার শব্দ-ম্যাজিশিয়ান বলা হয় ।
১. প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিলন ও পুরাণচেতনা
তাঁর কবিতায় পুরাণ ও ঐতিহ্যের ব্যবহার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য । ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’-এ যেমন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পুরাণের সম্মিলন ঘটেছে , তেমনি পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতেও তিনি ভারতীয় পুরাণকে আধুনিক চেতনায় পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন । তিনি দেশীয় ঐতিহ্য, ইতিহাসবোধ, স্বদেশ, সংস্কৃতি ও সমাজভাবনা-কে কবিতার কেন্দ্রে রেখেছেন ।
২. বিদেশি প্রভাব: টি. এস. এলিয়ট ও ফরাসি কবিদের প্রভাব
বিষ্ণু দে টি. এস. এলিয়টের রচনাশৈলী ও ভাবনা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন । এছাড়া শেক্সপিয়ার, দান্তে, গ্যেটে, বোদলেয়ার, মালার্মে, ইয়েটস, এলুয়ার্ড, নেরুদা-সহ প্রায় ৫০ জন বিদেশি কবির প্রভাব তাঁর কবিতায় পড়েছে । কিন্তু তিনি কখনও অনুকরণে আটকে থাকেননি; তিনি বিশ্বসাহিত্যের ঐতিহ্যকে নিজের ভাবনায় আত্মস্থ করেছেন ।
৩. মার্কসবাদ ও বামপন্থী দর্শনের প্রভাব
বিষ্ণু দে মার্কসবাদে অগাধ বিশ্বাস রাখতেন এবং বামপন্থী দর্শন দ্বারা উদ্বুদ্ধ ছিলেন । ১৯২০-৩০-এর দশকে তিনি মার্কসবাদী দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হন এবং সেটি তাঁর কবিতায় গভীর ছাপ ফেলে । তিনি ফরাসি প্রতিরোধের কবি পল এলুয়ার্ড ও জুল সুপারভিয়েলের মতো জনগণের প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন এবং তিনি কখনও ‘জনসাধারণ’-এর জন্য ‘নেমে’ লেখেননি; বরং নিজের আবেগ, দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক চেতনা থেকেই সোজা লিখেছেন ।
৪. দুর্ভেদ্যতা ও বিতর্ক
বিষ্ণু দে-র কবিতা কখনও কখনও দুর্বোধ্য ও দুরূহ বলে সমালোচিত হয়েছে । তাঁর প্রাথমিক কাব্যগ্রন্থগুলোতে এই অভিযোগ বিশেষভাবে প্রযোজ্য ছিল । এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কোনো একটি কবিতা বুঝতে পারলে তিনি শিরোপা দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন — এমন একটি কাহিনিও প্রচলিত আছে !
এই দুর্বোধ্যতার কারণে তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতৃত্বের কাছেও তাঁকে সমালোচিত হতে হয়েছিল । কিন্তু বিষয়টি হলো, বিষ্ণু দে প্রথমত এবং প্রধানত একজন কবি ছিলেন । তিনি কখনও ফেলে দেওয়া প্রপাগান্ডা মেনে শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির পক্ষপাতী ছিলেন না । আর তাঁর পরবর্তী কাব্যগুলোতে এই দুরূহতা অনেকাংশে কমে এসেছে ।
চিত্রকলায় আগ্রহ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম
শুধু কবিতা নয়, বিষ্ণু দে শিল্প, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির বিবিধ বিষয় নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত রচনা রেখে গেছেন । শিল্পী যামিনী রায়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল এবং এর ফলেই তিনি চিত্রকলার ওপর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন । ‘দ্য পেইন্টিংস অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ (১৯৫৮) ও ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড মডার্ন আর্ট’ (১৯৫৯) তাঁর উল্লেখযোগ্য শিল্পসমালোচনা গ্রন্থ ।
তিনি টি. এস. এলিয়টে
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
পরবর্তীতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
শক্তি চট্টোপাধ্যায়: আধুনিক বাংলা কবিতার বাউণ্ডুলে পুরোহিত
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
