শক্তি চট্টোপাধ্যায়: আধুনিক বাংলা কবিতার বাউণ্ডুলে পুরোহিত
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
বাংলা কবিতার আকাশে যখন জীবনানন্দের নক্ষত্র ডুবতে শুরু করেছে, তখন পঞ্চাশের দশকের এক ঝড়ো বিকেলে আবির্ভাব ঘটল এক নতুন গ্রহের। যার আলো ছিল অন্যরকম, যার ভাষা ছিল অচেনা, যার সুর ছিল বিদ্রোহী। তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়—যাকে বলা হয় আধুনিক বাংলা কবিতার বাউণ্ডুলে পুরোহিত । যার জীবন যেমন মিথে ঢাকা, তাঁর কবিতাও তেমনি এক অনন্য মহাবিশ্ব। তিনি শুধু কবিতা লেখেননি, তিনি কবিতাকে বাঁচিয়ে ছিলেন—সচেতনভাবে, উচ্ছ্বলভাবে, আর এক অনন্য একগুঁয়েমির সাথে। তাঁর কবিতাকে তিনি বলতেন 'পদ্য' —যেন উচ্চারণটুকুতেই তিনি কবিতার প্রচলিত জাঁকজমক খারিজ করে দিয়ে সেটাকে নামিয়ে আনতে চাইতেন মাটির কাছাকাছি, মানুষের কাছাকাছি।
শৈশব ও কৈশোর: পিতৃহারা ছেলেটির সংগ্রামী জীবন
১৯৩৩ সালের ২৫শে নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বহড়ু গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় । পিতা বামানাথ চট্টোপাধ্যায় ও মাতা কমলা দেবী। মাত্র চার বছর বয়সে পিতৃহারা হন তিনি, এরপর বড় হন পিতামহের কাছে ।
১৯৪৮ সালে কলকাতার বাগবাজারে চলে আসেন এবং মহারাজা কাশিমবাজার পলিটেকনিক স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখানেই এক শিক্ষকের মাধ্যমে মার্ক্সবাদের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি । ১৯৪৯ সালে তিনি 'প্রগতি লাইব্রেরি' প্রতিষ্ঠা করেন এবং 'প্রগতি' নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা শুরু করেন, যা পরে 'বহ্নিশিখা' নামে মুদ্রিত হয় ।
১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে সিটি কলেজে কমার্সে ভর্তি হন—কারণ তাঁর অভিভাবক মাতুল তাঁকে অ্যাকাউন্ট্যান্টের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন । একই বছর তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সদস্যপদ লাভ করেন । ১৯৫৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট কমার্স পাস করে তিনি কমার্স ছেড়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে বাংলা সাহিত্যে অনার্সে ভর্তি হন ।
কিন্তু পড়াশোনায় তাঁর মন বসেনি। প্রেসিডেন্সি কলেজের কঠোর শৃঙ্খলা তাঁর অস্বস্তি তৈরি করেছিল। তিনি পরীক্ষায় বসেননি । পরে বুদ্ধদেব বসুর আহ্বানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য অধ্যয়ন শুরু করলেও তা-ও অসমাপ্ত রেখে দেন । দারিদ্র্যের কারণে স্নাতক পাঠ অসমাপ্ত রেখে তিনি সাহিত্যকে জীবিকা করার সিদ্ধান্ত নেন ।
আত্মপ্রকাশ: 'কবিতা' পত্রিকা থেকে বাংলা কবিতায় আগমন
১৯৫৬ সালের মার্চ মাসে, বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকায় 'যম' কবিতাটি প্রকাশিত হয় । এটি ছিল বাংলা কবিতায় এক নতুন ঝড়ের সূচনা। মাত্র ২৩ বছর বয়সে, কলকাতা থেকে ২৮ মাইল দূরের বহড়ু গ্রাম থেকে আসা এই তরুণ কবি যেন হাজির হয়েছিলেন তারুণ্যের এক ইশতেহার নিয়ে ।
এর আগে ১৯৫৮ সালে তিনি ‘হে প্রেম, হে নৈশব্দ’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন, যা তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ । বুদ্ধদেব বসু তাঁর প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন এবং তাঁকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য কোর্সে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন । এই সময় থেকেই তিনি 'কৃত্তিবাস' পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ও কাব্যসাধনা আজীবন অটুট ছিল ।
হাংরি আন্দোলন: বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহের আগুন
১৯৬১ সালের নভেম্বরে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায় ও মলয় রায়চৌধুরী—এই চারজন কবি মিলে শুরু করলেন হাংরি আন্দোলন (Hungry Movement) । বাংলা সাহিত্যের স্থিতাবস্থা ভাঙার জন্য, প্রচলিত শিল্প-সাহিত্যের ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য এই আন্দোলনের সূচনা ।
শক্তি নিজেই এই আন্দোলনের স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছিলেন:
"বিদেশে সাহিত্য কেন্দ্রে যেসব আন্দোলন বর্তমানে হচ্ছে, কোনটি বিট জেনারেশন কোনটি এ্যাংরি বা সোবিয়েত রাশিয়াতেও সমপর্যায়ী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যদি বাংলা দেশেও কোন অনুক্ত বা অপরিষ্কার আন্দোলন ঘটে গিয়ে থাকে তবে তা আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক বা সামাজিক পরিবেশে ক্ষুধা সংক্রান্ত আন্দোলন হওয়াই সম্ভব... আমরা ক্ষুধার্ত। যে কোন রূপের বা রসের ক্ষুধাই একে বলতে হবে। কোন রূপ রসই এতে বাদ নেই, বাদ দেওয়া সম্ভব নয়" ।
হাংরি আন্দোলনের মূল কথা ছিল 'সর্বগ্রাস' । তিনি প্রায় ৫০টি হাংরি বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন । কিন্তু ১৯৬৩ সালে সাহিত্যিক মতান্তরের কারণে তিনি হাংরি গোষ্ঠী ত্যাগ করে 'কৃত্তিবাস' গোষ্ঠীতে যোগ দেন ।
কবিতার ভাষা ও শৈলী: 'পদ্য'র এক নতুন দর্শন
শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর কবিতাকে 'পদ্য' বলতেন, 'কবিতা' নয় । এই নামকরণের পেছনে ছিল তাঁর গভীর দর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, উচ্চশিল্পের রহস্য নয়, বরং উচ্চারিত শব্দের প্রক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ । তাঁর পদ্যের পুরস্কার ছিল আবিষ্কারের উত্তেজনায় নয়, বরং পরিচিতকে অপরিচিত বেশে দেখার আনন্দে ।
তাঁর শৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:
১. সংস্কৃত শব্দের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার মিশেল: তিনি নির্ভয়ে, সাহসের সঙ্গে সংস্কৃত-উৎসী 'তৎসম' শব্দ ও বাক্যবিন্যাসকে মিশিয়ে দিতেন খাঁটি কথ্য ভাষা এমনকি রঙিন রাস্তার ভাষার সঙ্গে । অলৌকিকভাবে, তিনি অধিকাংশ সময়ই তা সফলভাবে করতে পেরেছেন।
২. স্বয়ংক্রিয় লেখনী: কখনও কখনও তিনি স্বয়ংক্রিয় লেখার (automatic writing) চেষ্টা করেছেন, যা ধারাবাহিক চিন্তা ও 'যুক্তিসম্মত' কাঠামোকে অমান্য করে ।
৩. ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ: তাঁর প্রথম দিকের কবিতা 'যম' মহাভারতের চরিত্রকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও পরে তিনি সম্পূর্ণ অচেনা অঞ্চলে পা বাড়ান ।
৪. নিয়মের প্রতি বিদ্রোহ: ছন্দ, অলংকার বা ভাষার কোনো কাঠিন্য তাঁর কল্পনাকে বাধা দিতে পারেনি। সাহিত্য বা ভাষাগত প্রচলন তাঁর কাছে প্রায় অর্থহীন ছিল ।
শ্রেষ্ঠ রচনাসমূহ
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:


