আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন: যে মানুষটি বাংলায় বিজ্ঞানকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন
আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন
বিজ্ঞানকে বোঝা কি শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ?
একজন মানুষ যদি পদার্থবিজ্ঞানের কঠিন কোনো বিষয়কে সহজ বাংলায় ব্যাখ্যা করেন, তাহলে কি সেটিও বিজ্ঞানচর্চার অংশ?
অবশ্যই।
কারণ বিজ্ঞান যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের কাছে পৌঁছায় না, ততক্ষণ তার জ্ঞান সমাজকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে না।
বাংলাভাষী মানুষের কাছে বিজ্ঞানকে সহজ, আকর্ষণীয় ও বোধগম্য করে তোলার ক্ষেত্রে এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন আবদুল্লাহ আল-মুতী শরাফুদ্দিন।
তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞান লেখক, বিজ্ঞানশিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে পথিকৃৎ। জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করে তিনি কয়েক প্রজন্মের পাঠকের মধ্যে বিজ্ঞান সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি করেছিলেন।
তাঁর কাছে বিজ্ঞান মানে শুধু পরীক্ষাগারের পরীক্ষা বা পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয়।
বিজ্ঞান ছিল প্রশ্ন করার, জানার এবং পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখার একটি উপায়।
ছোটবেলা থেকেই জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ
১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার বিলকুড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল্লাহ আল-মুতী শরাফুদ্দিন।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।
তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন।
পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের University of Chicago থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
সেখানে শিক্ষাবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানশিক্ষা নিয়ে তাঁর চিন্তার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।
তিনি বুঝতে শুরু করেন, একটি দেশের বিজ্ঞানচর্চা শুধু কয়েকজন গবেষক তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
দরকার এমন একটি সমাজ, যেখানে সাধারণ মানুষও বিজ্ঞানের ভাষা বুঝতে পারে।
বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায় বলা
বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো এর ভাষা।
“পরমাণু”, “মহাকর্ষ”, “আলোকবর্ষ”, “জীববিবর্তন”, “জিন”, “বিকিরণ”—এসব শব্দ শুনলে অনেকের কাছেই বিজ্ঞান কঠিন ও দূরের কোনো বিষয় বলে মনে হতে পারে।
আবদুল্লাহ আল-মুতী শরাফুদ্দিন এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি কঠিন বৈজ্ঞানিক বিষয়কে এমনভাবে লিখতেন, যাতে একজন সাধারণ পাঠকও বিষয়টির মূল ধারণা বুঝতে পারেন।
তাঁর লেখায় তথ্যের পাশাপাশি থাকত—
কৌতূহল।
প্রশ্ন।
উদাহরণ।
গল্পের মতো উপস্থাপন।
আর সহজ ভাষা।
এই কারণেই তাঁর বই শুধু শিক্ষার্থীদের কাছে নয়, বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী সাধারণ পাঠকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞান যখন গল্পের মতো
বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম বড় শক্তি ছিল গল্প বলার কৌশল।
তিনি পাঠককে শুধু বলতেন না—“এই হলো একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য।”
বরং এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করতেন, যাতে পাঠকের মনে আরও একটি প্রশ্ন তৈরি হয়—
“এমন হলো কেন?”
তারপর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই পাঠক বিজ্ঞানের ভেতরে ঢুকে পড়তেন।
এটি ছিল বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি।
কারণ মানুষের শেখার স্বাভাবিক প্রবণতা হলো—
প্রথমে কৌতূহল।
তারপর প্রশ্ন।
তারপর উত্তর খোঁজা।
আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন।
শিশু-কিশোরদের জন্য বিজ্ঞান
আবদুল্লাহ আল-মুতী শরাফুদ্দিন বিশেষভাবে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বিজ্ঞানচেতনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি বুঝেছিলেন, বিজ্ঞানমনস্কতার বীজ সবচেয়ে ভালোভাবে রোপণ করা যায় ছোটবেলায়।
একজন শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে—
“তারারা এত দূরে কেন?”
“চাঁদের আকার বদলে যায় কেন?”
“বৃষ্টি হয় কীভাবে?”
“মানুষ অসুস্থ হয় কেন?”
তাহলে সেই প্রশ্নগুলোই একদিন তাকে বিজ্ঞানীর পথে নিয়ে যেতে পারে।
তাই তাঁর লেখায় শিশু-কিশোরদের কৌতূহলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বিজ্ঞানকে ভয়ের বিষয় না বানিয়ে আনন্দ ও আবিষ্কারের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
বিজ্ঞান শুধু বইয়ের বিষয় নয়
তাঁর বিজ্ঞানচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক তৈরি করা।
আমরা যে বাতি ব্যবহার করি, সেটি কীভাবে জ্বলে?
রেফ্রিজারেটর কীভাবে খাবার ঠান্ডা রাখে?
বৃষ্টির পানি কোথা থেকে আসে?
গাছ কীভাবে খাবার তৈরি করে?
সূর্য কেন আলো ও তাপ দেয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের চারপাশেই রয়েছে।
অর্থাৎ বিজ্ঞান আলাদা কোনো জগত নয়।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনই বিজ্ঞানের একটি বিশাল পরীক্ষাগার।
এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর লেখার মাধ্যমে পাঠকদের কাছে পৌঁছে যায়।
বিজ্ঞান ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে
বিজ্ঞান জনপ্রিয় করার কাজের সঙ্গে আরেকটি বিষয় গভীরভাবে জড়িত—
বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা।
কোনো কিছু শুনেই বিশ্বাস না করা।
প্রমাণ খোঁজা।
পর্যবেক্ষণ করা।
যুক্তি দিয়ে বিচার করা।
প্রশ্ন করা।
এই মানসিকতা গড়ে তুলতে বিজ্ঞানশিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবদুল্লাহ আল-মুতী শরাফুদ্দিনের লেখায় এই বিজ্ঞানমনস্কতার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
তিনি চেয়েছিলেন মানুষ যেন অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করে।
শিক্ষক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
তিনি শুধু লেখক ছিলেন না।
শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বাংলাদেশের বিজ্ঞানশিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষাকে তিনি শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিন্তা করার ক্ষমতা, অনুসন্ধিৎসা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষ করে বিজ্ঞানশিক্ষায় তাঁর লক্ষ্য ছিল—
শিক্ষার্থী যেন শুধু উত্তর মুখস্থ না করে, উত্তর খোঁজার পদ্ধতিটিও শেখে।
একজন বিজ্ঞান লেখকের বিপুল সৃষ্টি
আবদুল্লাহ আল-মুতী শরাফুদ্দিন বহু বিজ্ঞানবিষয়ক বই লিখেছেন।
তাঁর লেখার বিষয় ছিল বিস্তৃত।
মহাকাশ।
পদার্থবিজ্ঞান।
প্রকৃতি।
প্রাণীজগৎ।
মানবদেহ।
প্রযুক্তি।
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার।
বিজ্ঞানীদের জীবন।
শিশু-কিশোরদের উপযোগী নানা বৈজ্ঞানিক বিষয়।
তিনি বিভিন্ন বিদেশি বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ ও ধারণাকেও বাংলায় সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন।
ফলে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠের একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীদের গল্পও বিজ্ঞান শেখায়
বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার আরেকটি কৌশল ছিল বিজ্ঞানীদের জীবন তুলে ধরা।
আইনস্টাইন কীভাবে ভাবতেন?
নিউটন কীভাবে মহাকর্ষ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন?
মেরি কুরি কীভাবে গবেষণা করেছিলেন?
বিজ্ঞানীরা কীভাবে ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করেছিলেন?
এসব গল্প শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞানকে আরও মানবিক করে তোলে।
তারা বুঝতে পারে—
বিজ্ঞানীরা জন্ম থেকেই সবকিছু জানতেন না।
তাঁরাও প্রশ্ন করেছেন।
ভুল করেছেন।
ব্যর্থ হয়েছেন।
আবার চেষ্টা করেছেন।
এবং শেষ পর্যন্ত নতুন জ্ঞান তৈরি করেছেন।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্ব
বাংলায় বিজ্ঞান লেখার কাজটি শুধু অনুবাদের কাজ নয়।
একটি বৈজ্ঞানিক ধারণাকে অন্য ভাষায় বোঝাতে হলে সেই ভাষায় উপযুক্ত শব্দ, উদাহরণ এবং ব্যাখ্যার ধরন তৈরি করতে হয়।
এই কাজটি আবদুল্লাহ আল-মুতী শরাফুদ্দিন অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে করেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন—
বাংলা ভাষায়ও জটিল বিজ্ঞানকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
এটি বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
বিজ্ঞানশিক্ষা ও বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে তাঁর অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং একুশে পদক।
তাঁর কাজের স্বীকৃতি শুধু পুরস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
যে অসংখ্য পাঠক তাঁর বই পড়ে বিজ্ঞানকে নতুনভাবে চিনতে শিখেছেন, তাঁদের মধ্যেই তাঁর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি লুকিয়ে আছে।
বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
একজন গবেষক নতুন কোনো আবিষ্কার করলেন।
কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি সেটি বুঝতেই না পারে, তাহলে সেই জ্ঞান সমাজে কতটা ছড়াবে?
এখানেই বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের গুরুত্ব।
বিজ্ঞান জনপ্রিয়কারীরা গবেষণাগার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করেন।
একদিকে থাকেন বিজ্ঞানী।
অন্যদিকে সাধারণ পাঠক।
মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান লেখক জটিল ধারণাকে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
আবদুল্লাহ আল-মুতী শরাফুদ্দিন ছিলেন সেই সেতুর একজন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা।
শেষ জীবন
দীর্ঘ সাহিত্যিক ও শিক্ষাজীবনের পর ২০১২ সালে
আবদুস সাত্তার খান: যে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর উদ্ভাবিত ধাতু বদলে দিয়েছিল বিমান ও ইঞ্জিনের প্রযুক্তি
পরবর্তীজগদীশচন্দ্র বসু: যে বিজ্ঞানী বেতার তরঙ্গের পর উদ্ভিদেরও ‘ভাষা’ খুঁজেছিলেন
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
