সৈয়দ শামসুল হক: বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী যোদ্ধা
সৈয়দ শামসুল হক
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘সব্যসাচী’ উপাধি অতি অল্প কয়েকজনকে দেওয়া হয়েছে। যাঁরা কবিতা, উপন্যাস, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ, গান—সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় সমান দক্ষতা অর্জন করেছেন, তাঁরাই এই উপাধির অধিকারী। সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন তেমনই এক বিরল প্রতিভা। ৬০ বছরের দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে ৪০টিরও বেশি উপন্যাস, অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ, নাটক ও গান রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। শুধু সাহিত্যিক নন, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, বাংলাদেশের প্রথম নাট্য আন্দোলনের নেতা, বাংলা গানের জনপ্রিয় গীতিকার, এবং একজন চিত্রশিল্পীও। যাঁর কলমে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রথম মঞ্চে মূর্ত হয়েছে, যিনি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করেও শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’ অনুবাদ করেছেন মাত্র তেরো দিনে—তিনিই সৈয়দ শামসুল হক।
শৈশব ও কৈশোর: কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা
১৯৩৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ শামসুল হক। পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হোসেন ছিলেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, মাতা হালিমা খাতুন। আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ।
শিক্ষাজীবন শুরু কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুলে। পরে ভর্তি হন কুড়িগ্রাম হাই ইংলিশ স্কুলে। পিতার ইচ্ছায় ঢাকায় চলে আসেন এবং ভর্তি হন পুরান ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। ১৯৫০ সালে গণিতে লেটার পেয়ে ম্যাট্রিক পাস করেন।
পিতার ইচ্ছায় প্রথমে বিজ্ঞান নিয়ে পড়লেও পরে জগন্নাথ কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন এবং যুক্তিবিদ্যায় লেটার পেয়ে আই.এ পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অনার্সে ভর্তি হলেও তৃতীয় বর্ষে পড়াকালীন পিতার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্বে তাঁকে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়।
সংগ্রামের শুরু: ছদ্মনামে লিখে পরিবার চালানো
পিতার মৃত্যুর পর সাত ভাইবোনের দায়িত্ব তাঁর ওপর পড়ে। অর্থের প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন ছদ্মনামে স্কুল-কলেজের ডায়েরি, সিনেমার স্ক্রিপ্ট, গল্প ও গান লিখতে শুরু করেন। ‘শীত বিকেল’, ‘মাটির পাহাড়’, ‘তোমার আমার’, ‘আধিকার’—এসব চলচ্চিত্রের জন্য লেখা তাঁর গল্প ও চিত্রনাট্য পরবর্তীতে পুরস্কৃত হয়েছে। সংগ্রামের এই সময়টাই তাঁকে সাহিত্যের নানান শাখায় দক্ষ করে তুলেছিল।
সাহিত্যকীর্তি: প্রায় প্রতিটি শাখায় সাবলীল বিচরণ
কাব্যগ্রন্থ: একদা এক রাজ্যে (১৯৬১), বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা (১৯৬৯), বিরতিহীন উৎসব (১৯৬৯), প্রতিধ্বনিগণ (১৯৭৬), অপর পুরুষ (১৯৭৮), কবিতা সমগ্র (২০০৭, ৩ খণ্ড)।
উপন্যাস: স্থব্ধতার অনুবাদ, বারো দিনের জীবন, তুমি সেই তরবারি, সীমানা ছাড়িয়ে, নীল দংশন, নিষিদ্ধ লোবান, কয়েকটি মানুষের সোনালি যৌবন, নির্দিষ্ট, খেলারাম খেলে যা, মেঘ ও মেশিন, অন্য এক আলিঙ্গন—প্রায় ৪০টি উপন্যাস। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর উপন্যাস ‘রক্ত গোলাপ’ (ব্লাড রোজেস), যা বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার (magic realism) সূচনা করে। পরবর্তীতে মার্কেস তাঁর উপন্যাসে এই ধারা ব্যবহার করলেও শামসুল হক ছিলেন পথিকৃৎ।
নাটক: ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’—মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই নাটকটি এখনও বাংলা নাটকের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে বিবেচিত। এটি এখন পর্যন্ত ২০০টি রাত মঞ্চস্থ হয়েছে। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘এখানে এখন’, ‘ঈর্ষা’, ‘নারীগণ’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’—তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক।
ছোটগল্প: ১৮ বছর বয়সে প্রকাশিত প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘তাস’। তারপর ‘যশবতী’, ‘জলেশ্বরীর গল্প’—যেখানে কুড়িগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতিকে তিনি অমর করেছেন।
অনুবাদ: শেকসপিয়রের হ্যামলেট, ম্যাকবেথ, দ্য টেম্পেস্ট, ট্রয়েলাস অ্যান্ড ক্রেসিডা এবং ইবসেনের পিয়ার গিন্ট বাংলায় অনুবাদ করেন। ক্যান্সারের চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মাত্র তেরো দিনে ‘হ্যামলেট’-এর অনুবাদ সম্পন্ন করেন—যা বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর ঘটনা।
গান: ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘যার ছায়া পড়েছে মনেরো আয়নাতে’, ‘তুমি আসবে বলে কাছেই ডাকবে বলে’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’—এসব গান আজও জনপ্রিয়। তিনি হাজার হাজার গান লিখেছেন এবং চলচ্চিত্রের জন্য গীতিকার হিসেবেও কাজ করেছেন।
ছড়া ও শিশুসাহিত্য: ‘হাডসনের বন্দুক’, ‘সীমান্তের ইনশান’, ‘অনু বড় হয়’, ‘আমার স্কুল’, ‘বঙ্গবন্ধু বীরগাথা’—শিশু-কিশোরদের জন্যও লিখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা: যখন বিবিসি থেকে শোনালেন বিজয়ের খবর
১৯৭১ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর লন্ডনে চলে যান। সেখানে বিবিসিতে খণ্ডকালীন চাকরি পান। তিনি বিবিসির বাংলা বিভাগে নিয়মিত নাটক অনুষ্ঠানের প্রচলন ঘটান, যা আগে ছিল না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর তিনি বিবিসি রেডিওতে প্রথম পড়েন। তাঁর সেই কণ্ঠস্বরই গোটা বাঙালি জাতিকে প্রথম বিজয়ের আনন্দ দেয়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত তাঁর জীবনকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকটি তাঁর মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় সাহিত্যকীর্তি। এছাড়া ‘এক মুঠা জন্মভূমি’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘তুমি সেই তরবারি’, ‘নীল দংশন’—এসব রচনায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম ও বিজয়কে অমর করেছেন।
শিল্পী ও উপস্থাপক: শুধু লেখক নন
শামসুল হক ছিলেন এক বহুমাত্রিক মানুষ। তিনি কাঠের কাজ ও চিত্রাঙ্কন করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ৫৬টি চিত্রকর্ম ও দুটি কাঠের কাজের প্রদর্শনী আয়োজিত হয়।
তিনি টেলিভিশনের একজন স্বনামধন্য উপস্থাপকও ছিলেন। তাঁর অনন্য উপস্থাপনা ও পরিশীলিত বাংলা ভাষা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। এছাড়া তিনি ‘কথা সমন্বয়ী’-এর মতো অভিনব গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার বিষয়বস্তু বাংলা সাহিত্যে আগে আলোচিত হয়নি।
সম্মাননা
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬)—মাত্র ২৯ বছর বয়সে এই পুরস্কার প্রাপ্ত সর্বকনিষ্ঠ লেখক
আরও অসংখ্য পুরস্কার: আলকতা গোল্ড মেডেল, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, কবিতালাপ পুরস্কার, নাসিরউদ্দিন গোল্ড মেডেল, জাতীয় কবিতা পুরস্কার
শেষ জীবন ও মৃত্যু
দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগে ২০১৬ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর ৮১ বছর বয়সে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের পাশে সমাহিত করা হয়।
শেষকথা
সৈয়দ শামসুল হক বাংলা সাহিত্যের সেই বিরল প্রতিভা, যিনি কবিতায় যেমন আপন, উপন্যাসে তেমনি নির্ভীক। ‘জাদুবাস্তবতা’ বাংলা সাহিত্যে ন
আহমদ ছফা: বাংলা চিন্তাজগতের নির্মোহ সৈনিক
পরবর্তীআহসান হাবীব: নগরসভ্যের দীপ্তিময় কবি, যিনি মধ্যবিত্তের স্বপ্ন-বাস্তবতাকে কাব্যরূপ দিয়েছিলেন
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
