আহমদ ছফা: বাংলা চিন্তাজগতের নির্মোহ সৈনিক
আহমদ ছফা

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা তাদের সময়ের চেয়ে অনেক আগে থেকেছেন। যাঁদের কলম ছিল একটি তীক্ষ্ণ অস্ত্র, যা সমাজের ভণ্ডামি, বুদ্ধিজীবীদের আত্মাহুতি, আর জাতির পশ্চাদগামিতার কারণ উন্মোচন করেছিল। আহমদ ছফা ছিলেন তেমনই এক ব্যতিক্রমী মানুষ। যাঁকে একাধারে বলা হয় লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ ও গণবুদ্ধিজীবী । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন বাংলা চিন্তাজগতের এক নির্মোহ কণ্ঠস্বর, যিনি কখনও কোনো প্রচলিত স্রোতে ভেসে যাননি ।
জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও সলিমুল্লাহ খানের মতে, মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক হলেন আহমদ ছফা । তাঁর লেখায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে, আর সেই কারণেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচিত ।
শৈশব ও শিক্ষা: গ্রামের মাটিতে চিন্তার বীজ বপন
১৯৪৩ সালের ৩০শে জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আহমদ ছফা । পিতা হেদায়েত আলী ও মাতা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান ।
ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। পিতার প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু। ১৯৫৭ সালে নিজ গ্রামের গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ।
ছাত্রাবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি-ন্যাপ বা তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন । মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন। পরে গ্রেপ্তার এড়াতে কিছুকাল পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মগোপন করেন ।
১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন । কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার অধ্যাপক আহমদ শরীফের ধমক খেয়ে ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দেন—যা তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধী চেতনার প্রথম ঝলক । পরে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্থানান্তরিত হন । ১৯৬৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন । ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন ।
একই বছর বাংলা একাডেমি তাঁকে পিএইচডি গবেষণা বৃত্তি দেয়। গবেষণার বিষয় ছিল—'১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব, বিকাশ, এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব' । জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের তত্ত্বাবধানে গবেষণা শুরু হলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি ।
১৯৮৬ সালে গ্যেটে ইনস্টিটিউট থেকে জার্মান ভাষায় ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন, যা তাঁকে গ্যেটের 'ফাউস্ট' অনুবাদে সহায়তা করে ।
মুক্তিযুদ্ধ ও 'প্রতিরোধ': যখন কলম হয়ে উঠল অস্ত্র
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আহমদ ছফার ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি 'লেখক সংগ্রাম শিবির' গঠন করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা 'প্রতিরোধ' প্রকাশ করেন—যার তিনি ছিলেন প্রকাশক, সম্পাদক ও প্রচারক । ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের দিনই এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এপ্রিল মাসে তিনি কলকাতা চলে যান এবং সেখান থেকে 'দাবানল' নামের পত্রিকা সম্পাদনা করেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য ।
'জাগ্রত বাংলাদেশ' (১৯৭১) স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গ্রন্থ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে ।
'বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস': বুদ্ধিজীবীদের মুখোশ উন্মোচন
১৯৭২ সালে গণকণ্ঠ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় 'বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস' । এই গ্রন্থটি প্রকাশের পর বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলে ভূকম্পনের মতো অভিঘাত সৃষ্টি করে ।
ছফা এতে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদিতার নগ্ন রূপ উন্মোচন করেন। তাঁর ভাষায়:
"আগে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানি ছিলেন, বিশ্বাসের কারণে নয়—প্রয়োজনে। এখন অধিকাংশ বাঙালি হয়েছেন—সেও ঠেলায় পড়ে" ।
তিনি মনে করতেন, বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ-কাঠামো আমূল পরিবর্তন হবে না । তিনি বুদ্ধিজীবীদের সত্যিকার দায়িত্বের স্বরূপ ও দিকনির্দেশনা বর্ণনা করে তাদের সতর্ক করে দিতে ভবিষ্যদ্বাণী করেন—বুদ্ধিজীবীদের ব্যর্থতায় বাংলাদেশের কী দুর্দশা হতে পারে । তাঁর এই পর্যবেক্ষণ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ।
'বাঙালি মুসলমানের মন': আত্মপরিচয়ের সন্ধানে
১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয় 'বাঙালি মুসলমানের মন' প্রবন্ধসংকলন । এতে তিনি বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের হাজার বছরের বিবর্তন বিশ্লেষণ করে তাদের পশ্চাদগামিতার কারণ অনুসন্ধান করেছেন ।
সমালোচক আনিসুজ্জামান ও সলিমুল্লাহ খানসহ আরও অনেকে এটিকে বাংলা ভাষায় রচিত গত শতাব্দীর 'সেরা দশ চিন্তার বইয়ের' একটি বলে মনে করেন । এটি এখনও বাংলা ভাষায় রচিত অন্যতম সেরা নন-ফিকশন বই হিসেবে বিবেচিত ।
সাহিত্যকীর্তি: উপন্যাসে বাস্তবতার অসামান্য চিত্রায়ন
ছফা রচিত প্রতিটি উপন্যাসই ভাষিক সৌকর্য, বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর অভিনবত্বে অনন্য ।
'ওঙ্কার' (১৯৭৫): স্বাধীনতা আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বহিঃপ্রকাশ
'ওঙ্কার' উপন্যাসটি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে রচিত । আবুল ফজল ও আরও অনেকের মতে, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বোত্তম সাহিত্যিক বহিঃপ্রকাশ ।
উপন্যাসটিতে বাঙালি জাতিসত্তার পরিবর্তন একটি বোবা মেয়ের প্রতীকে তুলে ধরা হয়েছে ।
'গাভী বিত্তান্ত' (১৯৯৫): রাজনীতি ও দুর্নীতির ব্যঙ্গ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাসগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত । দলীয় রাজনীতি ও দুর্নীতির যে ব্যঙ্গাত্মক উপ
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: স্বপ্ন আর চিলেকোঠার সেই সৈনিক, যিনি দুই উপন্যাসেই বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি বদলে দিলেন
পরবর্তীসৈয়দ শামসুল হক: বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী যোদ্ধা
সম্পর্কিত সংবাদ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
লীলা মজুমদার: শিশুসাহিত্যের যে অভিভাবক ‘টংলিং’ আর ‘হলদে পাখির পালক’-এ বাংলার ছোটদের স্বপ্নের রাজ্য গড়ে দিলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
আশাপূর্ণা দেবী: যে গৃহবধূ কলমের জোরে বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটিয়ে গেলেন
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: রাঢ়বাংলার মাটি-মানুষের সেই মহাকথাকার, যিনি সাহিত্যের জগতে এক নতুন বিশ্ব গড়ে তুলেছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বিষ্ণু দে: আধুনিকতার কঠিন পথে যে কবি দুর্গমতার মধ্যে সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন

জীবনী ও সাক্ষাৎকার
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত: ধ্রুপদী রীতির কবি, যে নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার এক কঠিন দুর্গ
জীবনী ও সাক্ষাৎকার
বুদ্ধদেব বসু: আধুনিকতার অগ্রদূত, যে 'কবিতাভবন' বাংলা সাহিত্যকে নতুন ঠিকানা দিয়েছিল
মন্তব্য
অনুমোদিত মন্তব্য এখানে দেখা যাবে। নতুন মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশ হয়।
- এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
