কোনো দেশের উন্নয়ন কি শুধু রাজনীতির ওপর নির্ভর করে? নাকি তার পেছনে লুকিয়ে থাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অদেখা হাত? শান্তিস্বরূপ ভাটনগর ঠিক সেই উত্তরটিই দিয়েছিলেন নিজের জীবন দিয়ে। তিনি শুধু একজন রসায়নবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভারতের গবেষণাগারগুলির জনক, শিল্প সমস্যার সমাধানকারী, এবং স্বাধীন ভারতের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নীতি নির্মাণের স্থপতি। চৌম্বক-রসায়নে তাঁর অবদান যেমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনি শিল্পক্ষেত্রে তাঁর প্রয়োগ ছিল যুগান্তকারী ।
বিদ্যার সন্ধানে: পাঞ্জাব থেকে লন্ডন
১৮৯৪ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের ভেরা শহরে এক শিক্ষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শান্তিস্বরূপ। মাত্র এক বছর বয়সে পিতৃহারা হন তিনি। তাঁর মাতামহ, যিনি নিজে একজন প্রকৌশলী ছিলেন, ছোটবেলায় শান্তিস্বরূপের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ তৈরি করে দেন। ঘরের তৈরি যান্ত্রিক খেলনা, স্ট্রিং ফোন নিয়ে তিনি সময় কাটাতেন । অন্যদিকে মায়ের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন কবিতার অনুরাগ—পরে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের কুলগীৎ (অ্যান্থেম) রচনা করেছিলেন, যা আজও গীত হয় !
১৯১৩ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন ফরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজে। সেখান থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ও রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন ।
১৯২১ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক ফ্রেডরিক জি ডননের তত্ত্বাবধানে ডক্টরেট (D.Sc.) ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণা ছিল পদার্থ-রসায়নের নতুন এক দিগন্তের সূচনা ।
গবেষণার স্বর্ণযুগ: চৌম্বক-রসায়ন থেকে শিল্পে প্রয়োগ
লন্ডন থেকে ফিরে তিনি প্রথমে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে ১৯২৪ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ-রসায়নের অধ্যাপক ও রাসায়নিক পরীক্ষাগারের পরিচালক হন—এটাই ছিল তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ সময় ।
চৌম্বক-রসায়নে অভাবনীয় অবদান
ভাটনগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অবদান ছিল চৌম্বক-রসায়ন (ম্যাগনেটোকেমিস্ট্রি) নিয়ে কাজ। তিনি দেখান যে কোনো পদার্থের চৌম্বক ধর্ম থেকে তার গঠন ও বন্ধন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় । তাঁর সহকর্মী কে.এন. মাথুরের সঙ্গে যৌথভাবে উদ্ভাবিত 'ভাটনগর-মাথুর চৌম্বকীয় ইন্টারফেরেন্স ব্যালান্স' যন্ত্রটি ছিল সে সময়ের অত্যন্ত সংবেদনশীল চৌম্বক যন্ত্র। ১৯৩১ সালে রয়্যাল সোসাইটির সম্মেলনে এটি প্রদর্শিত হয় এবং লন্ডনের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান অ্যাডাম হিলগার এটির উৎপাদন শুরু করে । ১৯৩৫ সালে তাঁদের যৌথ গ্রন্থ Physical Principles and Applications of Magnetochemistry প্রকাশিত হয়, যা আজও এই বিষয়ের একটি মানক গ্রন্থ ।
শিল্প সমস্যার সমাধানকারী
ভাটনগরের গবেষণা শুধু পরীক্ষাগারের চার দেওয়ালে বন্দী ছিল না; তিনি তা সরাসরি শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্প সমস্যার সমাধান হয়েছিল অ্যাটক অয়েল কোম্পানির ড্রিলিং সমস্যা নিয়ে। খননের সময় ব্যবহৃত কাদামাটি লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে শক্ত হয়ে ড্রিলের ছিদ্র আটকে দিচ্ছিল। ভাটনগর কোলয়েড রসায়নের জ্ঞান প্রয়োগ করে মিশ্রণে একটি দেশীয় গাম যোগ করলেন, যা কাদার সান্দ্রতা কমিয়ে এর স্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দিল। কোম্পানিটি এতটাই সন্তুষ্ট হয় যে তাঁকে গবেষণার জন্য ১৫ লক্ষ টাকা (তৎকালীন মানে যা বিরল) অনুদান দেয়। ভাটনগর ব্যক্তিগতভাবে কোনো টাকা না নিয়ে পুরো অর্থ পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পেট্রোলিয়াম গবেষণা বিভাগ স্থাপনে ব্যয় করেন। তাঁর এই উদারতা মেঘনাদ সাহাকেও মুগ্ধ করেছিল, যিনি লিখেছিলেন, "আপনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মর্যাদা জনগণের চোখে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন" ।
এই গবেষণার অন্যতম সাফল্য ছিল কেরোসিন তেলের শিখার উচ্চতা বৃদ্ধি—তিনি এমন একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছিলেন যার মাধ্যমে কেরোসিনের শিখা প্রায় তিন গুণ উঁচু করা সম্ভব হয়েছিল, তাও আবার প্রতি গ্যালনে মাত্র কিছু পয়সা খরচে । ডেলি ক্লথ মিলস, টাটা অয়েল মিলস, বিরলা ব্রাদার্স—সেসময়ের শিল্প giants তাঁর কাছে সমস্যা সমাধানে আসতেন ।
প্রতিষ্ঠান নির্মাতা: সিএসআইআর ও বারোটি জাতীয় পরীক্ষাগারের স্থপতি
ভাটনগরের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ভারতের বৈজ্ঞানিক ও শিল্প গবেষণার পরিকাঠামো নির্মাণ। ১৯৪০ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতের বৈজ্ঞানিক ও শিল্প গবেষণা বোর্ডের (বিএসআইআর) পরিচালক নিযুক্ত হন। ১৯৪২ সালে তিনি কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর) প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সমর্থনে তিনি মাত্র ১২ বছরে ১২টি জাতীয় পরীক্ষাগার স্থাপন করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—ন্যাশনাল কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি (পুনে), ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি (নয়াদিল্লি), ন্যাশনাল মেটালার্জিক্যাল ল্যাবরেটরি (জামশেদপুর), সেন্ট্রাল ফুয়েল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ধানবাদ) ও সেন্ট্রাল ফুড টেকনোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (মহীশূর) । তিনি ন্যাশনাল রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এনআরডিসি)-এরও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, যা গবেষণার ফল শিল্পে প্রয়োগের সেতু নির্মাণ করে ।
সম্মান ও শেষ জীবন
১৯৪১ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি প্রদান করে । ১৯৪৩ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটি অফ লন্ডনের ফেলো (এফআরএস) নির্বাচিত হন । স্বাধীন ভারতে তিনি পদ্মবিভূষণ (১৯৫৪) সম্মানে ভূষিত হন। তিনি ইউজিসি (বিশ্ববিদ্যালয় অনুদান কমিশন)-এর প্রথম চেয়ারম্যান এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন । ১৯৫৫ সালের ১লা জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে । তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৫৮ সাল থেকে সিএসআইআর বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য 'শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার' প্রদান করে আসছে ।
শেষকথা
শান্তিস্বরূপ ভাটনগর কেবলমাত্র একজন রসায়নবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিজ্ঞান ও শিল্পের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনাকারী এক দূরদর্শী সংগঠক। তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে মৌলিক বিজ্ঞান শিল্পের সমস্যা সমাধান করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে পারে, আবার কীভাবে শিল্পের চাহিদা বিজ্ঞানকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে পারে। তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি হয়তো ছিল, "শিল্পের সমস্যা হলো বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ"। আর সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ভারতের গবেষণা পরিকাঠামোর ভিত্তি—যার ওপর দাঁড়িয়ে আজও দেশের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি অগ্রসর হচ্ছে।