বাংলাদেশের যশোর জেলার জোলখাদা গ্রামে ১৮৯২ সালের ২রা জানুয়ারি যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল, তিনি বড় হয়েছিলেন ভারতীয় পদার্থ-রসায়নের (Physical Chemistry) এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে। তাঁর নাম নীলরতন ধর। যাঁকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহল চেনে 'ফাদার অব ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি' নামে । তিনি শুধু রসায়নের জটিল সমীকরণ নিয়ে পড়ে থাকেননি; তিনি পৃথিবীর মাটি ও সূর্যের আলোর মধ্যে এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন, যা আজও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে।
প্রথম জীবন ও শিক্ষা: যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ডক্টরেট
নীলরতন ধর আইনজীবী পিতা প্রসন্ন কুমার ধর ও মাতা নীরদে মোহিনী দেবীর সন্তান। পড়াশোনার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল তীক্ষ্ণ। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়নে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯১৪ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান ।
বিশ্বযুদ্ধের দামামা তখন গোটা ইউরোপকে গ্রাস করেছে। লন্ডনে তিনি প্ররোচিত বিক্রিয়া (induced reaction) নিয়ে কাজ শুরু করেন—বিশেষত পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের উপস্থিতিতে মারকিউরিক ক্লোরাইড ও অক্সালিক অ্যাসিডের বিক্রিয়া নিয়ে পড়াশোনা করেন । কিন্তু যুদ্ধপরিস্থিতিতে সুইডেন বা জার্মানিতে যাওয়ার পথ বন্ধ। শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালে তিনি প্যারিসের সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ে (Sorbonne) অধ্যাপক জর্জ উরবাঁর কাছে গবেষণার সুযোগ পান ।
প্যারিসের পরিস্থিতিও ছিল ভয়াবহ। পরীক্ষাগারে গরম নেই, যন্ত্রপাতি নেই। কিন্তু নীলরতন থেমে থাকেননি। তিনি রাসায়নিক গতিবিজ্ঞান (chemical kinetics) ও অনুঘটক (catalysis) নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান । তাঁর গবেষণার অন্যতম প্রধান আবিষ্কার ছিল—এক অণুবিক্রিয়ার (unimolecular reaction) তাপমাত্রা গুণাঙ্ক দ্বি-অণু বা বহু-অণুবিক্রিয়ার চেয়ে বেশি। পরবর্তীকালে সর্বনের অধ্যাপক পল প্যাসকাল তাঁর বিখ্যাত রসায়ন গ্রন্থে এই সূত্রকে 'ধরের সূত্র' (Law of Dhar) নামে অভিহিত করেন ।
১৯১৮ সালের অক্টোবরে তিনি তার থিসিস জমা দেন এবং ফ্রান্সের সর্বোচ্চ ডিগ্রি 'স্টেট ডক্টরেট অব সায়েন্স' (Docteur ès Sciences) লাভ করেন। তাঁর ভাইভা বোর্ডে ছিলেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক জঁ পেরাঁ (Jean Perrin)-সহ তিন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ।
বিজ্ঞানে অবদান: মাটির নাইট্রোজেন ও আলোক-রসায়ন
১. আলোক-রাসায়নিক নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ তত্ত্ব
নীলরতন ধর-এর সবচেয়ে বড় অবদান হলো মহাকাশীয় নাইট্রোজেনের (atmospheric nitrogen) স্থিতিকরণ নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্ব । তিনি দেখান যে মৃত্তিকায় নাইট্রোজেনের পরিণতি (nitrification) ও বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন的吸收 (fixation) শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়ার কাজ নয়; সূর্যের আলোও এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে আলোক-রাসায়নিক (photochemical) প্রক্রিয়ায় মাটি নিজেই নাইট্রোজেন সংগ্রহ করতে পারে—একটি তত্ত্ব যা পরবর্তীকালে বহু বিতর্কের জন্ম দিলেও, কৃষি-রসায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে । এই আবিষ্কারের জন্য তিনি চারবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন ।
২. রাসায়নিক গতিবিজ্ঞান ও অনুঘটক গবেষণা
তিনি দেখান যে বিক্রিয়ার গতিবিজ্ঞান, তাপমাত্রা সহগ ও বিক্রিয়ার ক্রম (order of reaction)-এর মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে । বিখ্যাত রসায়নবিদ ফ্রিটজ হেবারের অ্যামোনিয়া সংশ্লেষণ পদ্ধতি নিয়েও তিনি সমালোচনা করে নিজস্ব মত পোষণ করেন । তিনি জার্মানির কাইজার উইলহেলম ইনস্টিটিউটেও কাজ করেছেন এবং সেখানকার মুক্ত বৈজ্ঞানিক আলোচনার চর্চা ভারতীয় বিজ্ঞানমহলে প্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ।
৩. বহুমুখী গবেষণা
১৯২০-৩০-এর দশকে তিনি প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন :
ফটোকেমিস্ট্রি: আলোর তীব্রতা ও বিক্রিয়ার গতির সম্পর্ক
অধিশোষণ (Adsorption): বেরিয়াম সালফেটের উপর অধিশোষণ নিয়ে গবেষণা
লিসেগাং রিং (Liesegang rings): পর্যায়ক্রমিক অধঃক্ষেপণ (periodic precipitation) তত্ত্ব
তড়িৎ-রসায়ন: ইলেকট্রোলাইটিক বিয়োজন তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা
শিক্ষাবিদ ও সংগঠক: ইলাহাবাদ থেকে বিশ্বভারতী
১৯১৯ সালে তিনি ভারতীয় শিক্ষা সেবায় (IES) যোগ দিয়ে ইলাহাবাদের মিউর সেন্ট্রাল কলেজে অধ্যাপক হন । পরবর্তীকালে তিনি শীলা ধর মৃত্তিকা বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (Sheila Dhar Institute of Soil Science)-এর প্রতিষ্ঠাতা হন ।
তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে—ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটি ও ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস, ইন্ডিয়া । তিনি ১৯৩৩-৩৪ সালে ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটির সভাপতি এবং ১৯৩৫-৩৭ সালে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের সভাপতি ছিলেন । ১৯৬১ সালে তিনি ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের সাধারণ সভাপতি নির্বাচিত হন ।
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে ।
স্মৃতি ও শেষকথা
১৯৮৬ সালের ৫ই ডিসেম্বর ৯৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই মহান বিজ্ঞানী ।
নীলরতন ধর শুধু রসায়নের সমীকরণে বন্দী ছিলেন না; তিনি প্রকৃতিকে পড়েছেন তাঁর নিজস্ব ভাষায়। তিনি দেখিয়েছেন যে আলো ও মৃত্তিকা, মহাকাশ ও কৃষি—এর মাঝে রয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। তাঁর আবিষ্কৃত 'ধরের সূত্র' হয়তো আজ অল্প কথায় বলা হয়, কিন্তু তিনি সেই সময়ে একটি নতুন চিন্তার ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ভারতীয় বিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক আসনে স্থান করে দিয়েছিল।
তাঁর জীবন বলছে—বিজ্ঞান কখনো পরীক্ষাগারের চার দেওয়ালে আটকে থাকে না; এটি ছড়িয়ে পড়ে মাটিতে, আলোতে, প্রকৃতির প্রতিটি কণায়।